ঝুলনযাত্রায় শান্তিপুরের মাটির পুতুল

Share your experience
  • 64
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    64
    Shares

.মাছ ধরা পুতুল

সুমনকুমার গায়েন

বারো মাসে তেরো পার্বন’-এই প্রবাদ বাংলায় বিশেষ ভাবে পরিচিত। এই ‘তেরো পার্বনের’ শিকড় বাংলার প্রায় প্রত্যেকটি জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। নদীয়া জেলার অন্তর্গত শান্তিপুর তার মধ্যে অন্যতম।গঙ্গার তীরবর্তী এই অঞ্চলটি ধর্মীয়  দিক থেকে বহুগুণে প্রসিদ্ধ।যার সুবাদে  শান্তিপুরবাসী নানান উৎসব ও পার্বনে জাঁকজমকতায় প্রায় সারাবছরই ব্যস্ত ভাবেই মেতে থাকেন।দূর্গাপুজো, কালীপুজো, গনেশজননী,নেত্যকালী পুজো,এমনকি দোলপূর্ণিমা, রাসযাত্রা তো রয়েছেই। কিন্তু ঝুলনের সময় ঝুলনযাত্রাকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের ছোট ছোট কচি কাঁচারা মেতে ওঠে পুতুল সাজানোর মজায়।

ঝুলনের সময় শান্তিপুরের চৌগাছা  অঞ্চলের কুমোরটুলিতে পা রাখলেই দেখতে পাওয়া যাবে মৃৎশিল্পীদের মধ্যে ঝুলনকে কেন্দ্র করে হরেক রকমের পুতুল তৈরির ব্যাস্ততা।রাস্তার দুই ধারে অসংখ্য পুতুল।কেউ রং মাখবার আগে রোদে শুকোচ্ছে, আবার কেউ রং মেখে সেজেগুজে রোদে শুকোচ্ছে। আর মাত্র কিছু সময়ের অপেক্ষা তার পরেই পুতুলেরা  কচিকাঁচাদের হাত ধরে রহনা দেবে তাদের বাড়িতে।আর যাদের হাতে এই ধরনের চমৎকার পুতুলগুলি প্রাণ পায় সেই সকল মৃৎশিল্পীরা হলেন জয়দেব পাল, রীতা পাল,দীনবন্ধু পাল,সত্যজিৎ পাল প্রমুখেরা।

পুতুলের বৈচিত্র্য নেহাত কম নয়, মাছের ধরা পুতুল,চাষা-চাষি,গরুরগাড়ী চালানো পুতুল,ঘোড়ার গাড়ী চালানো পুতুল,সাঁওতাল মেয়ে, বাঘ,হাতি, শিকারী বাঘ,মাছ বিক্রেতা,সবজি বিক্রেতা, কঙ্কাল,বর-বউের পুতুল, এর পাশাপাশি গৌর -নিতাই,রাধা-কৃষ্ণ,হামাগোপাল, তো রয়েছেই।এমনকি  পাশাপাশি উঠে আসে সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর প্রতীক রূপে সৈন্য পুতুল, ক্রিকেট বা ফুটবল খেলোয়াড় পুতুলের মতন বেশ কিছু পুতুল।

h
মাছ বিক্রেতা পুতুল

পুতুলগুলি তৈরী করা হয় দুইভাবে।কখনও  ছাঁচের মাধ্যমে দুই খোলে পুতুল বানিয়ে তারপর জোড়া দিয়ে।আবার কখনও করা হয় আঙুলে দিয়ে টিপে ও চেয়ারির(সরু বাঁশের কাঠির থেকে তৈরী  পুতুল গড়বার এক ধরনের যন্ত্র)সাহায্যে।মুলত এই ধরনের পুতুল বানাতে মজে যাওয়া বেলেমাটি ও এঁটেল মাটি ব্যাবহার করা হয়। মাটিকে প্রথমে চালুনি বা ন্যাকড়ার সাহায্যে চেলে নেয়া হয়। পুতুল বানাবার পর রোদে শুকিয়ে নিয়ে তারপর আসে রং করবার পালা।এক্ষেত্রে সাধারণত এলামাটি বা খড়ীমাটির  সাথে গুড়ো রং ও গদ জাতীয় আঠা ব্যাবহার করা হয়।উজ্বল লাল,নীল,হলুদ,হালকা সবুজ ,খয়েরী, বেগুনী,সাদা, কালো সবধরনের রং।

এধরণের পুতুলগুলি শান্তিপুরে তৈরী হলেও, শুধুমাত্র শান্তিপুরেই চৌহদ্দিতেই সীমাবদ্ধ  থাকে এমনটি নয়।কখনও কখনও ক্রেতারা ন্যায্যমূল্যে এই সকল পুতুলগুলি মৃৎশিল্পীদের কাছ থেকে পাইকারি দামে কিনে থাকেন।তখন এই পুতুলগুলো পাড়ি দেয় রানাঘাট, কৃষ্ণনগর বা কখনও আবার কোলকাতার মতন অঞ্চলেও।

k
.সৈন্য পুতুল

বর্তমান যুগেযখন অধিকাংশ মানুষ শহরকেন্দ্রিক  যন্ত্র সভ্যতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে মানিয়ে নিতে সক্ষম হচ্ছে।মাটির পুতুলের জায়গায়  অধিকাংশ ছেলে-মেয়েদের ঘরে দখল নিয়েছে বার্বি ডল,ফ্রান্সি খেলনা। তখনও শান্তিপুরের মতন এমন কিছু মফস্বল অঞ্চলের  ছোট ছোট কচিকাচাদের হাতে আজও ঘোরে ফেরে মাছ বিক্রেতা পুতুল,চাষা-চাষীর পুতুলের মতন আরো কত রকমের পুতুল।ঝুলনে ওরা মেতে ওঠে পুতুল সাজানোর নেশায়। আর এদের হাত ধরেই আজও বেঁচে থাকে শান্তিপুরের চৌগাছা  অঞ্চলের মতন আরো কত অজানা জেয়গায়,অজানা পুতুল,অজানা মৃৎশিল্প ও শিল্পীরা।

সবজি বিক্রেতা পুতুল

ছবি,লেখক.

 

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 64
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    64
    Shares

Facebook Comments

Post Author: সুমনকুমার গায়েন

সুমনকুমার গায়েন
,সুমন কুমার গায়েন, ২০১৫ সালে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃশ্যকলা বিভাগ(ছাপাই চিএ) থেকে স্নাতক পাঠ শেষ করে শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীর কলাভবনের ছাপাই চিএ বিভাগ হতে ২০১৭ সালে স্নাতকোত্তর পাঠ সম্পূর্ণ করেছেন।ছাপাইচিত্র অনুশীলনের পাশাপাশি এবং বঙ্গদর্শন,কৌলাল এর মতনই লোকশিল্প বিষয়ক পএিকাগুলির পাঠক হওয়ার সুবাদে এবং বাংলার গ্রাম ঘোরার পাশাপাশি লোক শিল্পের প্রতি একপ্রকার ভালবাসা, থেকে এই লোকশিল্পর ওপর লেখার আগ্রহ।

2 thoughts on “ঝুলনযাত্রায় শান্তিপুরের মাটির পুতুল

Comments are closed.