ঝুলন ও শান্তিপুর

Share your experience
  • 36
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    36
    Shares

অমিতাভ মিত্র

আগে কথায় ছিল বারো মাসে তেরো পার্বণ। কথাটা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও শান্তিপুরের ক্ষেত্রে খাটে না।এখানে সব পূজোই একাধিকবার হয় এবং অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণ ভাবে। ১লা বৈশাখ গণেশদিয়ে শুরু হয়ে, একে একেব্রহ্মা, গঙ্গা, মনসা, চন্ডী, শনি, ছট, বিভিন্নপ্রকার কালী, অন্নপূর্ণা, গণেশজননী, ছিন্নমস্তা, ওলাবিবি, রথ, ঝুলন, ৩৭ টি বিগ্রহ বাড়ির সুবাদে জন্মাষ্টমী,দুর্গা, রাস, দোল, নৃত্যকালী, চড়ক ইত্যাদি। এছাড়াও এখন গনেশ চতুর্থীও হচ্ছে ধূমধাম করে। ঝুলনের প্রসঙ্গে আসি।

শান্তিপুরে একসময়ে চারধরনের ঝুলন হত..– বিগ্রহ বাড়িগুলোর রাধাকৃষ্ণের ঝুলন যা এখনও সমানতালে অনুষ্ঠিত হয় ।পুতুলঝুলন, এই ঝুলনটা এখন নেই বললেই চলে। শতাংশের হিসেবে ৯৭ ই ভাগই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। একটা সময়ে এই পুতুল ঝুলনের এতই আনন্দ আর আবেগ ছিল যে তিন চারদিনের ঝুলনে বাচ্চারা পুতুল সাজাবে বলে ইসকুল ছুটি দিয়ে দিত। বাচ্চারা সারাদিন ধরে বিভিন্নপ্রকার পুতুল কিনত ঘুরে ঘুরে। মাছ ধরছে, বাজার করছে, ফুটবল খেলছে, মাথায় করে সব্জী নিয়ে যাচ্ছে এটাতো থাকতোই, আর কি থাকতো জানেন..? সৈন্য।চ্যাপ্টা  আকৃতির সৈন্য, শুয়ে বন্দুক নিয়ে যুদ্ধ করছে। বাচ্চা, বুড়ো সকলেই যেহেতু  এই আনন্দে সামিল ছিল সেহেতু পুতুল ঝুলনে চীন ভারতের যুদ্ধ সাজানোর জন্য ভেতরে এবড়ো খেবড়ো ইঁট সাজিয়ে কাপড়েকাদা মাখিয়ে পাহাড় তৈরী করত। তাতে দুপাশের পাহাড়ে সৈন্য সাজানো হত। দপদপ করে জ্বলা আলো দেওয়া হত যাতে গোলাগুলি চলছে বোঝানো যায়। প্লাস্টিকের হেলিকপ্টার সুতো দিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হত। ওহঃ,সে কি দিন ছিল! ঘাসের চাঙর কোদাল দিয়ে তুলে মাঠ করা হত। বালি আর কাঠের গুঁড়ো দিয়ে রাস্তা।

আর এক ধরনের পুতুল হত, কালো রং করা নকশাল। তিন চারটে কালো রঙ করা পুতুল সাজিয়ে একটা পুতুলের মুন্ডু ভেঙ্গে দেওয়া হত।খুন হয়েছে বোঝাতে।এই ধরনের মোটিভ কাজ করত কারন শান্তিপুরও একসময় নকশালপ্রবণ ছিল। হাজার হাজার লোক পুতুল ঝুলন দেখতে রাস্তায় নামত।

এই প্রতিবেদকেরও পুতুল ঝুলন শান্তিপুরের বিখ্যাত ঝুলন ছিল। নন্তু পাল, নিশুপদ পাল, মহানন্দ পাল, অজিত পাল, স্বপন পাল, নিমাই পাল এইসব নামকরা মৃৎশিল্পীরা তৈরী করতেন পুতুল। মানুষ তখন আনন্দে যৌথভাবে সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে বাঁচত। এটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার একটা বড় কারনই হল মুঠোফোন। মানুষ এখন একা বাঁচতে চায়।

মানুষ ঝুলন, এটাও শান্তিপুরের একসময়ের খুব জনপ্রিয় ঝুলন ছিল। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের অথবা কিশোর কিশোরীদের রাধা কৃষ্ণ সাজিয়ে বাড়ি বাড়ি বা পাড়ার মণ্ডপে, মন্দিরে বসানো হত। তাই দেখতেও হাজার হাজার মানুষ পথে নামত। ওই যে বললাম, যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়া, একা বাঁচার ইচ্ছা, প্রতিবেশীর প্রতি ঈর্ষার ফলে এটাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

পৌরানিক কাহিনী নিয়ে মানুষ ঝুলন..এটা একসময়ে রমরম করে শুরু হয়েছিল, সারারাত ধরে চলত।কিন্তু যত দিন যাচ্ছিল অশালীনতার মাত্রা বাড়ছিল ভীড় বেশি হওয়ার জন্য। আমার মনে হয় এখন এইসমস্ত কমে যাওয়ার মূলে নেটদুনিয়ার অবদানও কম নয়। মানুষ এখন আর এইসব নির্ভেজাল আনন্দের জন্য সময় খরচ করতে চায় না। তাদের কাছে অনেক বেশি মূল্যবান, সেল্ফি তোলা বা চ্যাট করা।

আরও পড়ুন--ঝুলনযাত্রায় শান্তিপুরের মাটির পুতুল

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 36
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    36
    Shares

Facebook Comments

Post Author: অমিতাভ মিত্র

অমিতাভ মিত্র
অমিতাভর জন্ম নদিয়ার শান্তিপুরে।দাদু স্বাধীনতা সংগ্রামী, বাবা হাই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। মা গৃহবধূ।ছোট থেকেই সাংস্কৃতিক ও শিক্ষার পরিমন্ডলে বড় হওয়া। ইতিহাসের স্নাতক আবার সংগীতেও। তালিম নিয়েছেন শিবকুমার চট্টোপাধ্যায়, উপেন চন্দ্র ও সাগর সেনের কাছে। ইতিহাসকেই ভালবেসে ঝাঁপিয়ে পড়া, সম্পূর্ণ অন্যধারায় গিয়ে তৈরী করেছেন ১১ খানি তথ্যচিত্র। তার মধ্যে চিলেকোঠার চিঠি দুটি সম্মানে ভূষিত। গতবছরে মুক্তি পেয়েছে ভারতবর্ষের প্রায় দেড় হাজার বছরের নাচমন্দিরের নাটমন্দিরে বিবর্তন নিয়ে তথ্যচিত্র " নাটমন্দির "।প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে এসেছেন মহাশ্বেতা দেবী ও শ্যামলী খাস্তগীরের।বহু বছর ধরে অসহায় ভাললাগার মানুষদের জন্য বস্ত্র সংগ্রহ করে বিলি করেন। ২০১৩ সাল থেকে ব্রত নিয়েছেন অনুষ্ঠান বাড়ির উদবৃত্ত খাবার একেবারেই যারা খেতে পান না ভাল করে তাঁদের খাওয়ানোর।রাতেই বিলি করেন সেই খাবার গ্রামেগঞ্জে।তিনটি বই " ললিতমোহন সেন শিল্পী অ শিল্প"..প্রকাশক পত্রলেখা, কলকাতা, শান্তিপুরের সেকাল একাল প্রথাম খন্ড সুধীর চক্রবর্তীর ধ্রুবপদ প্রকাশন থেকে, ঘাট আঘাটার ইতিকথা.. অমিতাভর নিজের প্ল্যটফর্ম স্পন্দনশীল শান্তিপুর থেকে