জলসত্র- বাংলার ঘরবাড়ি ও স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন

Share your experience
  • 370
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    370
    Shares

গাছতলায় জলসত্র
গাছতলায় জলসত্র

জলসত্র- বা গ্রাম্যভাষায় জলচ্ছত্র।সাময়িক পানশালা। বাংলার ঘরবাড়ি স্থাপত্যের এ হলো এক অনন্য নিদর্শন। সচিত্র লিখছেন–দীপঙ্কর পাড়ুই।

জলসত্র

প্রত্যন্ত গ্রামবাংলায় বটগাছের তলায় এক সময় বাঁশের চালাঘরের মধ্যে,জলের কলসি নিয়ে বসে থাকতে দেখা যেত দুই একজন লোককে। ক্লান্ত পথচারী পথিকরা তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লে তাদেরকে জল পান করানোর জন্য এই জলসত্র ঘর নির্মাণ করা হতো। জলছত্র গ্রাম্য ভাষায় জলচ্ছত্র।গ্ৰীস্মকালে তৃষ্ণার্থ পথিককে যে স্থানে জলপান করানো হয় তাকে জলছত্র বলে।সত্র কথাটির অপভ্রংশ হল ছত্র,গ্ৰাম‍্যভাষায় বলে ছত্তর। অমরকোষে রয়েছে-‘আবেশানং শিল্পশালা প্রপা পানীয়শালিকা।।’ প্রপা বলতে এখানে পানগৃহ বা যে স্থানে বসে মদ‍ পান করা হয়, সেই ঘরকে প্রপা বা পানীয়শালা বলে।জলসত্র বলতেও পানীয়শালা,দানগৃহ প্রভৃতি বোঝায়।সত্র অর্থাৎ আচ্ছাদন, যজ্ঞ, সদাব্রত, আশ্রম, অরণ্য ইত্যাদি। সত্রশালা মানে অন্নাদি বিতরণের স্থান যজ্ঞাগার। কাজেই জলের সাথে সত্র যোগ হওয়ায় বা পানীয় রাখার আচ্ছাদিত কোন জায়গা বা চালাঘরকেই জলসত্র বলে।

জলসত্রের  ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

বাংলার ভিন্নতর একটি স্থাপত্য হলো জলসত্র। প্রাচীনকালে সম্রাট বা জমিদার ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য নানা কাজ করতেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৃক্ষ, জলাশয় ও দেবালয় প্রতিষ্ঠা করতেন সাধারণ মানুষের জন্য। এরকম একটি প্রতিষ্ঠা হলে জলসত্র। স্থাপত্য গত দিক থেকে দেখলে জলসত্র মাচানঘরের একটি প্রকারভেদ। এই জলসত্র কোনো নগর বা বড় গ্রামের চতুর্দিকে নির্মাণ করতেন।চারটি দিকে তৈরির কথা জানা যায় উত্তর,দক্ষিণ,পূর্ব ও পশ্চিম। এগুলো মূলত তৈরি হতো বড় বড় রাস্তার ধারে। তৃষ্ণার্ত পথিক পথিকদের জল পান করানোর জন্য জলসত্র ঘর নির্মিত হত। তৃষ্ণার্ত পথিককে জল দান ভারতীয় ধর্ম অনুসারে পূণ‍্য কাজ বলে বিবেচিত।

সম্রাট অশোক

পুরাকালে সম্রাট অশোক পথিকদের জন্য রাস্তার ধারে ধারে বড় বড় গাছ রোপন করেছিলেন।একজন প্রজাহিতৈষী রাজার সামাজিক কর্তব্য ছিল এই সমস্ত কাজ। রাজ‍্যের সুখের জন্য কার্য করতে হত তারমধ্যে দেবালয় প্রতিষ্ঠা,জলাশয় প্রতিষ্ঠা, বৃক্ষরোপণ প্রভৃতি। এই সমস্ত কাজ অতীতকাল থেকে অভিজাত শ্রেণী লোকেরা বা রাজারা প্রজাসুখের জন্য ও পূণ‍্য সঞ্চয়ের কাজ চলে আসছে। গোপাল ভট্টের হরিভক্তি বিলাস গ্রন্থে রয়েছে মানিক সত্র জলাশয় পাত্রবিশেষ স্থাপনের কথা। যথা-
‘কৃচ্ছ্র যুগ্মে তু গোযুগ্মং দদ‍্যাদ্বিপ্রাংশ্চ ভোজয়েৎ।
ত্রিরাত্রে মণিকং ছত্রমজাং চোপানহৌ তথা।।’

অর্থ:কৃচ্ছ্র অর্থাৎ সান্তপনাদি ব্রতদ্বয়ে দুইটি ধেনু দান ও ব্রাহ্মণ ভোজন করাইতে হয়। ত্রিরাত্রব্রতে মনিক (বৃহৎ জলপাত্রবিশেষ) ছত্র, একটি ছাগী ও পাদুকাযুগল অর্পণ করিবে।

মাণিকসত্র

এখানে ব্রতের দান হিসাবে বিভিন্ন জিনিস স্থাপন বা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মানিক সত্র বলতে বৃহৎ জলপাত্র বোঝায় তা উক্ত বিবরণে রয়েছে। বৃহৎ জলপাত্র মানেই বোঝা যায় যে, রাজা প্রজাকল্যাণের জন‍্য জলপাত্র স্থাপন করতেন। ‘হরিভক্তি বিলাস’গ্ৰন্থের বর্ণনার মতই বিশুদ্ধ নিত্যকর্ম পদ্ধতি গ্রন্থে ‘দানোৎসর্গ’ বলে একটি বিষয় দেখতে পাই। সেখানেও ১৬ টি বা ১২টি দ্রব্য দানের কথা উল্লেখিত হয়েছে। এই দানোৎসর্গে বিভিন্ন জিনিস নিজের জন্য ও প্রেতের জন্য দান করার বিধান রয়েছে। ষোড়শ দানে ১৬ টি জিনিস হল- ভূমি, আসন, জল, বস্ত্র, দীপ, অন্ন, পান,ছত্র, গন্ধ, মাল্য, ফল, শয‍্যা বা বিছানা, পাদুকা, গরু বা গোমূল্য, কাঞ্চন বা সোনা ও রুপা।

দ্বাদশ দান

আবার দ্বাদশদানের ১২টি দ্রব্য হল- ভূমি, আসন,জল, অন্ন,বস্ত্র,তাম্বুল,ফল, গন্ধ, ছত্র, পাদুকাযুগল,শয‍্যা ও গোমূল্য। ভূমির জায়গায় কেউ ধান‍্য,মৃত্তিকা ও ভূমির মূল্য দান করতে পারে এবিধি দেওয়া রয়েছে।’বিশুদ্ধ নিত্যকর্ম পদ্ধতি’ গ্ৰন্থে এসমস্ত বর্ণনা পড়ে মনে হয় এগুলি শ্রাদ্ধকাজে বিভিন্ন দ্রব‍্য দানের কথা বলা হয়েছে।সেখানে এও বলা হয়েছে যে নিজের জন্য ষোড়শদান, দ্বাদশদান কিংবা অন্ন-জল-বস্ত্র উৎসর্গ করার নিয়ম শাস্ত্রে আছে। অতীতকালে এই অন্ন-জল-বস্ত্র দান করার কথার ভেতরই যেন সেই জলসত্র স্থাপনেরই ইঙ্গিত লুকিয়ে রয়েছে। জলদান কিভাবে সম্ভব!হরিভক্তিবিলাস গ্ৰন্থে বড় জলাধার কথা উল্লেখিত হয়েছে।বড় জলাধার কে গ্রামবাংলায় কুঁজো বলে। জলসত্র ঘরে সেই বড় বড় কুঁজোতে জল রাখা হত। জলসত্র গুলো প্রতিষ্ঠা করা হত রাস্তার ধারে।যাতে ক্লান্ত পথিকরা জল পান করতে পারে। এইজন্যই প্রাচীনকালে রাজা ‘দানোৎসর্গ’ ব্রত করতেন। জলসত্র প্রতিষ্ঠা সেই ব্রতেরই একটি অংশ বা ভাগ মনে করা যেতে পারে।

পল্লীসাহিত‍্যে জলসত্র

দীনেন্দ্রকুমার রায় তার পল্লীচিত্র গ্রন্থে উল্লেখ করছেন- ‘গ্রাম হইতে প্রায় এক কোশ দূরে– এই পথের ধারে “জলসত্র তলা” ; গ্রাম্য জমিদার গাঙ্গুলির এই দারুণ রৌদ্রে নিবারনের জন্য চৈত্র সংক্রান্তির দিন হইতে ‘জলসত্র’ দিয়াছেন ; বৈশাখ মাস টা তৃষ্ণার্ত পথিক কে জল দান করা হইবে। ‘পাউণ্ডের’ কাছে একটা প্রকাণ্ড ঝাঁকড়া বটগাছের নিচে প্রতি বৎসর জলসত্র দেওয়া হয়, সেই গাছতলা ‘জলসত্র তলা’ নামে পরিচিত। এটি গ্রামের পূর্ব দিক। এর উত্তর ও দক্ষিণ দু’ দিকে অনেকদিন আগে জলছত্র ছিল; বাড়ুয‍্যেদের বড়কর্তার স্থাপিত সেই জলসত্র দুটি তাহার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে উঠিয়া গিয়াছে; স্বর্গীয় পিতার কীর্তি লোভ করিয়া তাহার যোগ্য পুত্র ‘সাহেবদাস’ বাবু (এটি তাহার অন্নপ্রাশনের নাম নয়, গ্রামবাসীদের প্রদত্ত নাম) নূতন রকম জলসত্র স্থাপনের ব্যবস্থা করিয়াছেন।

কিন্তু সে গ্রীষ্মকালে নহে শীতকালে! বড়দিনের সময় তিনি এ তল্লাটে ইংরেজদের কুঠীতে কুঠীতে ‘বিলাতি পানী’ ও ‘সরাব’ সরবরাহ করিয়া পৈতৃক অনুষ্ঠান প্রকারান্তরে বজায় রাখিয়াছেন। ইহাতে তাহার পারত্রিক ফল কিছুই লাভ হোক না হোক,ঐহিক ফল লাভ হইতেছে বলিয়া শুনিতে পাওয়া যায়; তিনি ‘অনাহারী হাকিম’ হইয়াছেন! তাহার সহিত সাক্ষাৎ হইলেই কুঠিয়ালরা ‘হ্যাল্লো মিঃ ব্যানার্জি, হাডুডু’ বলিয়া সাদরে তাঁহার করমর্দন করেন, সুতরাং তাহার সশরীরে মোক্ষলাভ হয়; এতদ্ভিন্ন শীঘ্রই তাঁহার ‘রায় বাহাদুর’ খেতাব লাভেরও সম্ভাবনা আছে।’

চিত্রশিল্পে জলসত্র

নন্দলাল বসু শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন গ্ৰাম‍্য নানা জিনিসের অনুষঙ্গ তার ছবিতে উঠে আসতে থাকে।১৯৫৯ সালে সাদাকালো জলরঙে খোয়াই,জলসত্রে,ভুবনডাঙার মাঠ, শান্তিনিকেতনের আশেপাশের নানা জায়গার দৃশ‍্য নন্দলাল বসু এঁকেছিলেন।নন্দলাল বসুর ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে এক প্রকাণ্ড বটগাছের তলায় একটি মাচানঘরের মত চারচালা ঘর।মাচানের উপর একটি লোক জলের পাত্র নি এ বসে আছেন।একটি বাঁশের নল নিয়ে তার একপ্রান্ত দিয়ে জল ঢেলে দিচ্ছে আর অন‍্যপ্রান্তে বসে থাকা ক্লান্ত পথিকটি জলপান করছেন।প্রখর রৌদ্রের মধ‍্যে যেন একপ্রস্ত বটগাছের ছাওয়ায় অবস্থান করছে ছোট্ট জলসত্রটি;এ ছবির দৃশ‍্য দেখে যেন তাই মনে হয়।

ধর্মপ্রতিষ্ঠার অঙ্গ জলসত্র

“ধর্ম করিতে যবে জানি, প্রখরি দিয়া রাখিব পানি,
গাছ রইলে বড় ধর্ম, মন্ডপ দিলে বড় কর্ম
যে দেই ভাত শালা পানিশালী, সে না যায় যমের বাড়ি।
স্বর্ণভূমি কন্যা দান, বলে ডাক স্বর্গের স্থান।”

জলসত্র ও স্থাপত্য
জলসত্র ও স্থাপত্য

নানা তথ্য ডাকের বচনে

ডাকের বচন’ এ আমরা ভাতশালা, পানিশালা, মন্ডপশালা পাই। প্রাচীনকালে বাংলায় কতগুলি সামাজিক আচার প্রচলিত ছিল বাংলায়। পুষ্করিণী খনন, বৃক্ষরোপণ, ভূমিদান কার্য বলে বিবেচিত ছিল। গৃহস্ত লোকেরা এগুলো ধর্মের অঙ্গ বলে জানত ও পালন করত।এ প্রসঙ্গে যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি উল্লেখ করছেন– ‘মধ্যবিত্ত শ্রেণী দেশের জাতীয় উৎসবের উদ্যোক্তা ছিলেন। পাড়ায় গ্রামবাসীকে নানা প্রকারে আনন্দ দান করতেন। গ্রামবাসী তাহাদিগকে আপনজন মনে করি তো। অল্পে অল্পে শেষ হয়নি অদৃশ্য হইতেছে। যাহারা অর্থ উপার্জন করিয়া ধনবান হইতেছেন, তাহাদের সে কৌলিক ধারা নাই, দেব-দেবীর পূজায় শ্রদ্ধা নাই। তাহারা রামায়ণ ও ভাগবত পাঠ করার না; বৃক্ষ প্রতিষ্ঠা দেবালয় প্রতিষ্ঠা ও পুষ্করিণী প্রতিষ্ঠা করান না। প্রতিষ্ঠা শব্দের অর্থ জানেন না এখন নগরবাসী পতাকা লইয়া পথে পথে ভ্রমণ করেন এবং মনে করেন উৎসব হইতেছে। আর দীর্ঘ দীর্ঘ বক্তৃতায় তাহার সমাপ্তি হইতেছে। তাহারা জানেন না, উৎসব মাত্রেরই তিনটি অঙ্গ আছে। প্রথমে দেবার্চনা, তারপর কর্মের অনুষ্ঠান,অবশেষে ভুরিভোজন।’

আরও পড়ুন –তালপাতার বৈচিত্র্যময় লোকশিল্প পাখা আজও গ্রাম গঞ্জে টিকে আছে

প্রতিষ্ঠা বলতে বোঝায় সুকীর্তি, গৌরব, পদমর্যাদা, সম্মান,সংস্থাপন প্রভৃতি। এছাড়া কূপ, মঠ, পুষ্করিণী ইত্যাদি দেব ব্রাহ্মণাদির উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয় একেই প্রতিষ্ঠা বলে।জলসত্রও সেই প্রতিষ্ঠাএকটি দিক বলা যেতে পারে।

গ্রন্থঋণ
১. রায় বিদ্যানিধি, যোগেশচন্দ্র- পূজা-পার্বণ, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, পৌষ ১৪২০
২. রচনা সংগ্রহ – দীনেন্দ্রকুমার রায়, আনন্দ জানুয়ারি ২০০৪
৩. স্মৃতিতীর্থ, শ্রী রামদেব- বিশুদ্ধ নিত্যকর্ম পদ্ধতি, দেব সাহিত্য কুটির ,মার্চ ২০১৯
৪. শ্রী শ্রী হরি ভক্তি বিলাসঃ- গোপালভট্টঊ গোস্বামিনা বিলিখিত, গিরিজা, ডিসেম্বর২০০৬

ছবি : শিল্পী নন্দলাল বসু ও লেখকের অঙ্কিত।

কৌলালের লৌকিক দেবদেবী নিয়ে ভিডিও তথ্যচিত্র দেখুন–


Share your experience
  • 370
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    370
    Shares

Facebook Comments

Post Author: দীপঙ্কর পাড়ুই

দীপঙ্কর পাড়ুই
দীপঙ্কর পাড়ুই--বর্ধমান বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে চিত্রকলায় স্নাতক।কলকাতা বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে চিত্রকলায় স্নাতকোত্তর।লোকশিল্প নিয়ে গ্ৰাম ঘোরাঘুরিও লিখতে ভালোবাসি।আচমন,রাঢ়কথা ইত‍্যাদি পত্রিকায় ও বঙ্গদর্শন ও দুনিয়াদারি পোর্টালে কতগুলি লোকশিল্পের প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।