জয়নগরের জয়চণ্ডী ও বেশেরমেলা

Share your experience
  • 1.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.3K
    Shares


শুভঙ্কর মণ্ডলঃদক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলার জয়নগর-মজিলপুর পাশাপাশি অবস্থানরত দুটি পৃথক গ্রাম হলেও মজিলপুরের তুলনায় জয়নগর অপেক্ষাকৃত বেশি প্রাচীন। জয়নগরের মোয়া সকলের কাছে যে কতখানি জনপ্রিয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ইতিহাসে জয়নগর

সপ্তদশ শতাব্দীতে রচিত কৃষ্ণরাম দাসের রায়মঙ্গল কাব্যে জয়নগর গ্রামের উল্লেখ পাওয়া যায়। এককালের স্রোতস্বিনী আদিগঙ্গা প্রবাহপথের পশ্চিম ধারেই গড়ে উঠেছিল এই জয়নগর গ্রামটি। এই গ্রামের প্রাচীন নাম হয়তো ‘পলাবাটি’ ছিল। প্রখ্যাত গবেষক কালিদাস দত্ত মহাশয় ঘটককারিকা ও প্রাচীন বৈষ্ণব গ্রন্থাদিতে ব-দ্বীপের উত্থানভিত্তিক আলোচনা প্রসঙ্গে এই দক্ষিণাঞ্চলের প্রাচীন নাম ‘প্রবালদ্বীপ’ ছিল বলে মত প্রকাশ করেন। সেই প্রবালদ্বীপ থেকেই হয়তো পলাবাটি নামকরণ হয়েছিল। আবার অনেক গবেষকের মতে গঙ্গার পলি জমে এই অঞ্চল সৃষ্টি হওয়ায় তা থেকে পলাবাটি নামটি আসতে পারে। এই নিয়ে বিস্তর মতপার্থক্য থাকতেই পারে।

জয়চণ্ডী ও মতিলাল বংশ

লোকশ্রুতি অনুসারে স্থানীয় মতিলালবংশের পূর্বপুরুষ গুনানন্দ মতিলাল এবং তাঁর এক বিশ্বস্ত সঙ্গী টুনু পণ্ডীত প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে আদিগঙ্গার পথ ধরে বাণিজ্যিক কারণে যাতায়াতকালে এই অঞ্চলে আসেন এবং নিজের বসতি গড়ে তোলেন। ততদিনে আদিগঙ্গা লুপ্তপ্রায়। এই বনিক শ্রেণীর মতিলালদের আদি বাসস্থান ছিল যশোরের বিক্রমপুর। পরবর্তীকালে হয়তো কোলকাতার বৌবাজারে বসতি স্থাপন করেছিলেন। এই গুণানন্দ মতিলাল দেবী জয়চণ্ডীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে তাঁর নামে একটি মন্দির গড়ে তোলেন। এই দেবীর নাম হতেই এই গ্রামের নাম হয় জয়নগর। তবে গবেষক লালমোহন ভট্টাচার্যের মতানুযায়ী প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে নীলকণ্ঠ মতিলাল নামের কোনো এক জমিদারের জমিদারি এই জয়নগর অঞ্চলে ছিল। তাঁর বাড়ির সম্মুখস্থিত আদিগঙ্গার নাম ‘রাজার গঙ্গা’ ছিল। এই গুনানন্দ মতিলাল তাঁরই বংশধর এবং সেই রাজার গঙ্গা বর্তমানে ছোট্ট জলাশয় রূপে ‘মতিলাল গঙ্গা’ নামে পরিচিত।

জয়চণ্ডীতলা

জয়নগর-মজিলপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ভ্যান-রিক্সা করে বা পায়ে-হেঁটে জয়নগরের জয়চণ্ডীতলায় পৌঁছানো যায়। জয়চণ্ডীতলায় স্থিত জয়চণ্ডীর দালানযুক্ত পাকামন্দিরটি প্রায় শতাধিক বছরের পুরোনো। তবে অনেকবার নানা ভাবে সংস্কার হলেও মন্দিরটির প্রাচীনরূপ সম্পর্কে মোটামুটি একটি ধারণা করা যায়। অশোক মিত্র মহাশয় ১৯৬১ সালে প্রকাশিত ‘পশ্চিমবঙ্গের পূজা-পার্বণ ও মেলা’ নামক গ্রন্থের তৃতীয় খন্ডে এপ্রসঙ্গে বলেছেন যে, ‘…প্রায় ৮০ বৎসর পূর্বে কলিকাতা নিবাসী শ্রীমহেন্দ্র শ্রীমানি মহাশয়ের অর্থানুকূল্যে ও স্থানীয় গ্রামবাসীর সাহায্যে নির্মিত হয়। তৎপূর্বে এই স্থানে খড়ের ছাউনিযুক্ত একটি মাটির ঘরে জয়চণ্ডীদেবীর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত ছিল। মন্দিরের সম্মুখে টিনের ছাউনিযুক্ত প্রশস্ত নাটমন্দিরটি নিত্যহরি মতিলাল মহাশয়ের অর্থানুকূল্যে ১৯৫০ খৃষ্টাব্দে নির্মিত হয়।’ বর্তমানেও সামনের টিনের ছাউনিটি একইরকম ভাবে আছে। আজোও টুনু পণ্ডিতের বংশধরেরা সেবাইতের কাজ করছেন। বর্তমান প্রজন্মের সুপ্রীয়বাবুরা তাঁদের পূর্বপুরুষের ‘পণ্ডিত’ উপাধি ত্যাগ করে ‘চক্রবর্তী’ উপাধি ধারণ করছেন।

কথিত আছে সুদূর অতীতে কোনো এক জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা তিথিতে গুণানন্দ মতিলাল স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে আদিগঙ্গার তীরবর্তী জঙ্গল থেকে প্রাপ্ত একটি প্রস্তরখণ্ডকে দেবীরূপে স্থাপনা করেছিলেন। দেবীর প্রতীকরূপী ওই শিলাখন্ডটি আজোও মন্দিরস্থিত দেবীর দারুমূর্তির সম্মুখে একটি বেদিতে প্রতিষ্টিত। বকুলকাঠে নির্মিত দেবীর দারুমূর্তিটি পরবর্তীকালের হলেও এটির বয়সও তিনশো বছরের কম নয়। অলংকারাদি ও নববস্ত্রে সুসজ্জিতা দেবীর মনোহর মূর্তিটি দৈর্ঘ্যে প্রায় তিনফুট এবং প্রস্থে দেড়ফুটের কাছাকাছি। এটি কোন শিল্পীর সৃষ্টি তা জানা যায়নি।

মূর্তিটি যে সিংহাসনে উপবিষ্টা সেটিও দারুভাস্কর্যের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। অলঙ্কৃত পদ্মের উপর সমভঙ্গে দন্ডায়মানা দেবী দ্বিভুজা, তাঁর এক হাতে বরাভয় ও অপর হাতে অভয়মুদ্রা। প্রতিদিন অন্নপূর্ণা ধ্যানে দেবীর নিত্যপূজা হয়। পাশাপাশি শারদীয়া অষ্টমী তিথিতে, চৈত্রের অন্নপূর্ণা পূজা উপলক্ষে, স্নানযাত্রার দিন দেবীর স্বারম্বরে পূজা হয়। স্নানযাত্রার দিন ভোররাত্রে দেবীর শিলামূর্তিতে স্নান হয় এবং ঐদিন বহু দূরদূরান্ত থেকে ভক্তের সমাগম ঘটে।


জয়চণ্ডীমাতা ঠাকুরাণীর আবির্ভাব উৎসব

তবে জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা তিথি হতে পরবর্তী পনের দিন ধরে চলে দেবীর মহোৎসব যা ‘জয়চণ্ডীমাতা ঠাকুরাণীর আবির্ভাব উৎসব’ নামে পরিচিত। এই কয়েকদিন মন্দির প্রাঙ্গণে মেলা বসে যা স্থানীয়দের কাছে বেশের মেলা নামেই পরিচিত। জ্যৈষ্ঠমাসের শুক্লা প্রতিপদ হতে পূর্ণিমা পর্যন্ত একপক্ষকাল ধরে দেবীকে নানা রূপে সাজানো হয় ও তাঁর পূজা করা হয়। যেমন, শুক্লাপ্রতিপদে ‘কাত্যায়ণী’, দ্বিতীয়াতে ‘ইন্দ্রাণী’, তৃতীয়ায় ‘শ্রীলক্ষ্মী’, চতুর্থীতে ‘বৈষ্ণবী’, পঞ্চমী ও ষষ্ঠীতে ‘দেবী মনসা’, সপ্তমীতে ‘রাইরাজা’, অষ্টমীতে ‘কমলেকামিনী’, নবমীতে ‘জগদ্ধাত্রী’, দশমীতে ‘জাহ্নবী’, একাদশীতে ‘অন্নপূর্ণা’, দ্বাদশীতে ‘ব্রহ্মাণী’, ত্রয়োদশীতে ‘বিপত্তারিণী’, চতুর্দ্দশীতে ‘গনেশ জননী’, পূর্নিমাতে ‘রাজরাজেশ্বরী’। এই বেশের মেলা নামকরণের এটাই একমাত্র কারণ। এই রাজরাজেশ্বরী বেশ পরবর্তী তিনদিনও থাকে।

ওই দিনগুলোয় ভাঙ্গামেলা চলে। দেবীর নানান রূপের প্রয়োজনীয় সাজসরঞ্জাম, অন্যান্য পার্শ্ব দেবদেবীর মূর্তি ইত্যাদি এখানের স্থানীয় শিল্পীরাই তৈরি করে থাকেন। তবে বর্তমানে পূজা যথাপোচারে হলেও মেলার আড়ম্বর অনেকখানি স্তিমিত। এখানের স্থানীয় এক বর্ষীয়ান বাসিন্দা শ্রীমতি অপর্ণা দে তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছিলেন যে স্নানযাত্রার দিন এবং এই একপক্ষকাল ভক্তদর্শনার্থীদের আগমনে মন্দির গমগম করতো। অসংখ্য পসার বসতো সারামাঠ জুড়ে। কত দূর দূর থেকে পুণ্যার্থীরা আসতেন পূজা দিতে, মানসিক চোকাতে। একসময় বলিও হতো। এখন আর সে জৌলুষের সিকিভাগও নেই। এখন গুটিকয়েক মনোহারীর দোকান, প্লাস্টিকের ছেলে-ভোলানো খেলনা সামগ্রী ও দুএকটি খাবারের দোকান নিয়ে এই মেলা কোনোক্রমে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে। তবে মজিলপুরের ধন্বন্তরী কালী মন্দিরে অনুষ্ঠিত বেশের মেলা এখনও যথেষ্ট জমজমাট এবং তুলনায় অধিক পরিচিত। এবছর কোরোনা সংক্রামণের ফলে সৃষ্ট এই অতিমারির কৃপায় মজিলপুরের বেশের মেলার ন্যায় এই মেলাও যে বন্ধ থাকবে তা সহজেই অনুমেয়।


দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার এই ধরণের শতাব্দী প্রাচীন ধর্মীয় মেলাগুলি যেমন সমাজের একশ্রেণীর মানুষের কাছে শুধুমাত্র কয়েকদিনের বিনোদনের উপলক্ষ্যমাত্র তেমনই সমাজের আরেকশ্রেণীর মানুষের জীবনধারণের ও জীবিকানির্বাহের একমাত্র পথ। আবার মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগের পাশাপাশি এর সঙ্গে একান্তভাবে জড়িয়ে থাকে মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ, অনুভূতি এবং নানান উজ্জ্বল স্মৃতি। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলি মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিকগুলির নানান গল্প বলে। জয়নগর-মজিলপুরের এই দুই বেশের মেলা তার একেকটি উজ্জ্বলতম উদাহরণ।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা- অলোক কুমার শর্মা (সোনারপুর), সুপ্রীয় চক্রবর্তী (জয়নগর-মজিলপুর), অপর্ণা দে (জয়নগর-মজিলপুর), বিকি কর (পাটুলী)।

তথ্যসূত্র

  1. চট্টোপাধ্যায়, সাগর (২০০৫), দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার পুরাকীর্তি, প্রত্নতত্ত্ব ও সংগ্রহালয় অধিকার, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, কোলকাতা।
  2. দত্ত, কালিদাস (১৯৮৯), দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার অতীত, দ্বিতীয় খণ্ড, সুশীল ভট্টাচার্য ও হেমেন মজুমদার, সুন্দরবন আঞ্চলিক সংগ্রহশালা, বারুইপুর, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা।
  3. সিং, সুকুমার (২০১০), দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার ইতিহাস (একখণ্ডে), মাস এন্টার্‌টেন্‌মেন্ট্‌ প্রাইভেট লিমিটেড, কোলকাতা, পুঃ মুঃ।
  4. ভট্টাচার্য, লালমোহন (২০১৬), অতীতের জয়নগর-মজিলপুর, প্রকাশক-রমাপ্রসাদ চক্রবর্ত্তী, জয়নগর মজিলপুর, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা।
  5. মিত্র, অশোক (সম্পাদক) (১৯৭১), পশ্চিমবঙ্গের পূজা-পার্বণ ও মেলা, তৃতীয় খণ্ড, দি ম্যানেজার অব্‌ পাবলিকেশনস্‌, সিভিল লাইনস্‌, দিল্লী, পুঃমুঃ।

Share your experience
  • 1.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.3K
    Shares

Facebook Comments

Post Author: shuvankar1koulal

শুভঙ্কর মণ্ডল
শুভঙ্কর মণ্ডল গবেষক, সিনিয়র রিসার্চ ফেলো (ইউজিসি নেট) শিল্পের ইতিহাস বিভাগ, দৃশ্যকলা অনুষদ রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কোলকাতা নিবাস- নোয়াপাড়া, সোনারপুর, ডাকঘর + থানা- সোনারপুর