কাঠের খেলনা আজও তৈরি করেন শুকদেবপুরের শ্রবণ দাস

Share your experience
  • 425
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    425
    Shares

 

কাঠের খেলনা হাতি ঘোড়া
কাঠের খেলনা হাতি ঘোড়া

শুভঙ্কর মণ্ডলঃ দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার বিষ্ণুপুর থানার অন্তর্গত জয়রামপুরের খড়্গেশ্বর শিবমন্দির। চৈত্রসংক্রান্তির গাজনোৎসব ও মেলা, এই জেলার সুপ্রাচীন মেলা-পার্বণগুলোর মধ্যে অন্যতম। মেলার অন্যতম আকর্ষণ কাঠের খেলনা।এগুলি গ্রামগঞ্জের সাধারণ ঘরের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বড় আদরের সম্পদ।কাঠের খেলনা আজও তৈরি করেন শুকদেবপুরের শিল্পী শ্রবণ দাস।গতবছর এই মেলার উদ্দেশ্যেই রওনা দিয়েছিলাম। চৈত্রের অস্বস্তিকর দাবদাহকে উপেক্ষা করে যখন বারুইপুর পৌঁছাতে হবে তখন সূর্যদেব প্রবল বিক্রমে মাথার উপর বিরাজ করছেন। বারুইপুর স্টেশন থেকে অটো করে আমতলা হয়ে জয়রামপুর পৌঁছালাম।আরো ঘণ্টাখানেক সময় লেগে গেল। জয়রামপুর নেমে আরোও মিনিট দশেক পায়ে হেঁটে মেলার দোরগোড়ায় পৌছালাম।

 কাঠের খেলনা মেলায়

যাইহোক, মেলায় ঢোকার মুখে, রাস্তার ধার ধরে বসা হরেকরকম পসারের ভিড়। প্লাস্টিকের তিরপল খাটানো একটা দোকান দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। খাট, আলমারি, ড্রেসিংটেবিল, ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে রথ, লরি, ট্রেন, জাহাজ, উড়োজাহাজ ইত্যাদি। নানান ধরণের বর্ণময় কাঠের খেলনার ছোট্ট একটা পসার। খানিকক্ষণের জন্য যেন সেই ছোটবেলার স্মৃতিগুলো খিলখিল করে হেসে উঠল। খানিকটা কাছে গিয়ে দেখি এক ভদ্রলোক। একটা ছোট্ট হাতুড়ি দিয়ে ঠুকঠুক করে একমনে একটা গাড়ির চাকা লাগাচ্ছেন। আমার হাতের পেন-খাতা আর আমার সঙ্গীর হাতে ক্যামেরা ।দেখে প্রথমে তিনি একটু গুছিয়ে বসলেন। তারপর খুব উৎসাহের সঙ্গে একগাল হেসে জিজ্ঞাসা করল…

, ‘রিপোর্টার? কোন কাগজের? টিভি চ্যানেলের?’

-‘আরে না না। আমি গবেষণা করছি আর টুকটাক লেখালিখিও করি, এই আর কি।’ আমার উত্তরটা বোধহয় ওঁনার মনঃপুত হলনা। তবুও খানিকক্ষণ চুপ । আবার কাজ করতে করতেই প্রশ্ন করলেন, ‘সে যাক গে। বলুন। কি জানতে চান। এরকম তো কতলোকই আসে।’ ওই একচিলতে দোকানের মধ্যে দোকানদারি করতে করতেই চলল কথপোকথন। তিনি শ্রবণ দাস।  দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার জয়রামপুরের ছেলেভোলানো কাঠের খেলনার এক প্রবীণ স্রষ্টা।

কাঠের খেলনার কারিগর শ্রবণ দাস

তারপর বেশ কয়েকবার তাঁর বাড়ি গেছি। শ্রবণবাবুর বাড়ি শুকদেবপুরের দাসপাড়ায়। আমতলা থেকে সাইকেল-রিক্সায় মিনিট কুড়ির পথ। বাড়িতেই তাঁর নিজস্ব কর্মশালা। তাঁর বাবা স্বর্গীয় রামপ্রসাদ দাসও এই কাঠের কাজে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাই কাঠের খেলনা বানানোর এক প্রবাহমানধারা তাঁদের বংশপরম্পরায় চলে আসছে। তাঁর পুত্র শুভঙ্কর দাস তাঁদের এই পারিবারিক ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যথেষ্ট তৎপর।

কাঠের খেলনা তৈরির জালি মেসিন
কাঠের খেলনা তৈরির জালি মেসিন

 কিভাবে তৈরি হয়  কাঠের খেলনাগুলি

কাঠের পাতলা পাটাকে জালিমেশিনের সাহায্যে প্রয়োজনানুসারে কেটে নেওয়া হয়। সেগুলোকে পেরেক দিয়ে জুড়ে জুড়ে এই জ্যামিতিক আকৃতি বিশিষ্ট খেলনাগুলো তৈরি হয়। শ্রবণবাবুর বাবার সময় থেকেই এই জালিমেসিনের ব্যবহার করা হচ্ছে। জালিমেসিনের ব্যবহার করে  ত্রিভুজাকার, বর্গক্ষেত্রাকার অথবা আয়তক্ষেত্রাকার পাটা কাটা হয়। এছাড়া  গোলাকার ও অন্যান্য আলঙ্কারিক গুণসমৃদ্ধ আকারবিশিষ্ট কাঠের পাটা কাটতে যথেষ্ট সুবিধা হয়। এর ফলে কায়িকশ্রমও অনেক কম হয়।সময়ও বাঁচে। শিল্পীর কথানুযায়ী একার হাতে একটা সম্পূর্ণ গাড়ি তৈরি করতে গেলে কমপক্ষে ঘণ্টাখানেক সময় লেগে যেত। যদিও তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও তাঁকে যথেষ্ট সাহায্য করেন।

 কাঠের খেলনার অলঙ্করণ

এগুলোর রঙ ও অলংকরণের কাজ করেন শ্রবণবাবুর স্ত্রী ভারতী দাস। স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে ভারতীদেবী বলেন যে শ্রবণবাবুর এই কাঠের খেলনার ব্যবসা দেখেই তাঁদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর রঙ করার কাজে তাঁর প্রথম হাতেখড়ি হয় তাঁর ননদদের কাছে। তারপর নিজের শৈল্পিক দক্ষতাকে পাথেয় করেই শ্রবণবাবুর গাড়িগুলোকে রাঙিয়ে তুলতে থাকেন। প্রথমে বাজার থেকে রাসায়নিক রঙ কিনে আনা হয়। তার সঙ্গে বার্নিশ ও কেরোসিন তেল মিশিয়ে নেন। এই রঙের পাতলা প্রলেপে গাড়িগুলো সেজে ওঠে। গাড়ির রঙ সম্পূর্ণ হলে তবে চাকা লাগানো হয়। একই ভাবে আলমারির আয়নাযুক্ত পাল্লা অথবা ড্রেসিংটেবিলের কাঁচ ইত্যাদিও সব শেষে লাগানো হয়।

এইগাড়িগুলো একান্তই ছোটদের খেলার জন্য তৈরি ।তাই গাড়ির সামনে একটা পেরেক আটকে দেওয়া হয়। যাতে ওখানে দড়ি বেঁধে সহজেই টানা যেতে পারে। হলুদ, সবুজ, লাল, নীল ইত্যাদি উজ্জ্বল রঙে রঞ্জিত । সোনালী, রুপালী, লাল, সাদা ইত্যাদি নানা রঙের সর্পিল রেখায় অলংকৃত এই খেলনাগুলো। সবধরণের দর্শক এবং ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণে যথেষ্ট সক্ষম। এই ধরণের কাঠের খেলনা যে অন্যত্র কোথাও তৈরি হয়না সেকথা বলা অনুচিত। কারণ এই কাঠের খেলনার পসার আমি উত্তর কোলকাতার ছাতুবাবুর বাজারের ঐতিহ্যবাহী চড়কের মেলাতেও দেখেছি। তবে সেগুলোর রঙে, অলঙ্করণে, বার্নিশের চাকচিক্যে আছে এক মার্জিত জৌলুস। কিন্তু শ্রবণবাবুর কাঠের খেলনায় রঙের ব্যবহারে, আলপনার সহজ সরল আলঙ্কারিক রেখার ব্যবহারে আছে এক অদ্ভুত সারল্য, শিল্পীর শৈল্পিক নিজস্বতা।

 

কাঠের খেলনা–রথ

এই খেলনা ছাড়াও শ্রবণবাবুরা আষাঢ় মাসে রথের সময় কাঠের রথ বানিয়ে থাকেন। কোনো রঙিন কাগজ বা চকচকে প্লাস্টিক দিয়ে সেগুলোকে সাজানো হয়না। বরং ভারতীদেবী রঙে-রেখায়-আলপনায় সেগুলোকে সাজিয়ে তোলেন নিজের মতো করে। এছাড়া কাঠের পাটায় লাগানো বিভিন্ন দেবদেবীর ছবিও তৈরি করেন। শিল্পী নিজের শৈল্পিক ধারণানুযায়ী ছবিগুলোকে আরও আকর্ষণীয় ও ক্রেতার মনোগ্রাহী করা হয়।তার জন্য পাটাগুলোকে আলঙ্কারিক নকশায় কাটেন।

কাঠের খেলনা জিপগাড়ি
কাঠের খেলনা জিপগাড়ি

মেলায় পশরা কাঠের খেলনার

শ্রবণবাবুরা স্থানীয় কয়েকটা মেলাতেই দোকান দেন। শহরের কোনো মেলাতে কখনও যাননি। কারণ তাঁর ধারণা শহুরে মেলার প্লাস্টিকের সাম্রাজ্যে তাঁর সৃষ্টি কোনোভাবেই গুরুত্ব পাবেনা। তবে এই নিয়ে তাঁর কোনোও আক্ষেপ নেই। একসময় প্রায় প্রতিটা মেলাতেই এই ধরণের কাঠের খেলনা দেখা যেত। ঠাকুরের ছবি, পুতুলের আসবাবপত্র ইত্যাদিও পসার অহরহ দেখা যেত। একটু ভাবনাচিন্তা করলে দেখা যাবে একটা শিশু সর্বদা প্রভাবিত হয় তাঁর পরিবার ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের দ্বারা। তাদের খেলাধুলা, আচার-আচরণেও তার বিশেষ প্রভাব পড়ে। বাড়ির মা-জেঠিমাদের ঘরকন্না, রান্নাবান্নার অনুকরণে তারাও তৈরি করে নেয় তাদের নিজেদের জগৎ।

নিজের বাড়ির খাট, আলমারি, আলনা ইত্যাদি আসবাবপত্রের ক্ষুদ্র সংস্করণই তাঁদের সাজানো আপন খেলাঘরে ঠাই পায়। ফলে এককালে এই ধরণের কাঠের খেলনা শিশুমহলে যে বিশেষ জনপ্রিয় ছিল তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটেছে। তেমনই শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সংজ্ঞার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। এখনকার ডিজিটাল গ্যাজেটের রঙিন দুনিয়ায় হারিয়ে যাওয়া শৈশবের কাছে এই কাঠের খেলনা অনেকটাই মূল্যহীন। তাই এখন এগুলো বিস্মৃতপ্রায়।

   দারু খেলনার  শিল্পীর বারোমাস্যা

বর্তমানে এসবের চাহিদা ক্রমশ নিম্নমুখী ।এই কাজের সঙ্গে যুক্ত শিল্পীরাও পেট চালানোর দায়ে কাঠের আসবাবপত্র বানানোর দিকেই বিশেষ মননিবেশ করেছেন। অথবা অন্যকোনো পেশায় নিযুক্ত হয়েছেন। কিন্তু শ্রবণবাবুর মতো এখনও অনেক শিল্পী আছেন… যাঁরা নিজেদের শিল্পসত্ত্বাকে হারিয়ে যেতে দেননি। সমাজের পরিবর্তনশীল রুচির সঙ্গে সঙ্গে সমকালকেও গ্রহণ করেছেন খেলার ছলে। তাই তাঁর কাঠের খেলনার তালিকায় একতলা ঘর, খাট, ড্রেসিংটেবিল, আলমারি, ময়ূরপঙ্খী রথ,  যুক্হত ইয়েছে।এছাড়া-ঘোড়ায় টানা রথ, লরি, জীপগাড়ি ইত্যাদির পাশাপাশি ট্রেকার, ট্রেন, জাহাজ, উড়োজাহাজের মতো বিষয়গুলোও যুক্ত হয়েছে। তবে শিল্পীর নিজস্বতা হারিয়ে যায়নি। তাই আকৃতিগত দিক থেকে তাঁর ছয়-চাকাওয়ালা ট্রেনটার সঙ্গে সাধারণ ট্রেনের তুলনা করা চলেনা। তিনি জানেন যে তাঁর উড়োজাহাজ আকাশে ওড়ার জন্য নয়,।বরং মাটিতে চলাই তার উদ্দেশ্য। তাই প্রতিটা উড়োজাহাজের নিচে কাঠের পাটা লাগিয়ে, তার চারদিকে চারটে চাকা লাগিয়ে দিয়েছেন।

উড়োজাহাজের দুই ডানায় লিখেছেন নিজের দেশের নাম, INDIA। চাকা লাগানো জাহাজের ক্ষেত্রেও ঠিক একই বিষয় লক্ষণীয়। এমনকি তাঁর খেলনার মধ্যে আছে খরগোশ, বাঘ, হরিণ, ঘোড়া, হাতির মতো বিভিন্ন পশুরাও। এদের নিচের পাটায় চাকা লাগানোয় এরাও যথেষ্ট গতিশীল। শিল্পী কোনো একটা বিষয়কে দেখে ঠিক হুবহু নকল করার চেষ্টা করেননি। বরং সেইসব বিষয়গুলোর সরলীকৃত রূপকেই তাঁর নিজের মতো করেই গড়ে তুলেছেন,যা তাঁর নিজস্ব পর্যবেক্ষণের ফলাফল। সুখের কথা শুভঙ্কর দাসও ভবিষ্যতে এই খেলনার তালিকাকে আরোও প্রসারিত করতে চান। শিল্পীপুত্রের স্বপ্ন তাঁদের এই কাঠের খেলনাকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলবে। তা নিঃসন্দেহে বলতে পারি।

আরও পড়ুন-https://bengali.koulal.com/sutradhar-chutorder-carpentary-kotha-bengal/
কাঠের খেলনা ময়ূরপঙ্খী
কাঠের খেলনা ময়ূরপঙ্খী

 উপেক্ষিত লোকশিল্পী

শ্রবণবাবু সেই সব শিল্পীদের এক প্রত্যক্ষ উদাহরণ যাঁরা সর্বদা লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে গেছেন। ‘”এরকম তো কত লোকই আসে……”এই কটাক্ষটা হয়তো সত্যি আমার পাওনা ছিল। সত্যিই তো এই ধরণের শিল্পীদের নিয়ে কতো লেখালিখি করা যায়। লেখা প্রকাশের পর লেখকের লেখার মুনশিয়ানা নিয়ে পাঠকমহলে বেশ কয়েকদিন আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। শিল্পীর সম্পর্কে কিছু মানুষের উৎসাহ, কিছু মানুষের সমবেদনা, আবার কিছু মানুষের সাহায্যের হাত এগিয়ে আসে। কিন্তু তা ক্ষণিকের জন্য। এইসব শিল্পীরা পিছনেই থেকে যান। তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কোনো পরিবর্তন আসেনা। স্থানীয় মেলাগুলোর উপরেই তাঁদের রুজিরুটি নির্ভর করে। এবছর করোনার অনুগ্রহে সেসব মেলাও বন্ধ। তার উপর আমফান নামক প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের দাপট! ফলে শ্রবণবাবুর কাঠের খেলাঘর কি আদেও টিকে থাকতে পারে? মাথার ছাদ বাঁচাতে আর পেটের আগুন নেভাতে যখন হিমসিম খেতে হয় তখন শিল্পীর শিল্পসত্ত্বা কতদূর লড়াই করে এগিয়ে যেতে পারে? প্রশ্নটা থেকেই যায়।

 

 

 

অশেষ কৃতজ্ঞতা- শ্রবণ দাস (শুকদেবপুর), শুভঙ্কর দাস (শুকদেবপুর), ভারতী দাস (শুকদেবপুর), বিকি কর (পাটুলী)।


Share your experience
  • 425
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    425
    Shares

Facebook Comments

Post Author: shuvankar1koulal

শুভঙ্কর মণ্ডল
শুভঙ্কর মণ্ডল গবেষক, সিনিয়র রিসার্চ ফেলো (ইউজিসি নেট) শিল্পের ইতিহাস বিভাগ, দৃশ্যকলা অনুষদ রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কোলকাতা নিবাস- নোয়াপাড়া, সোনারপুর, ডাকঘর + থানা- সোনারপুর