কাটোয়ার কার্তিকপুজোর যে বৈশিষ্ট্যগুলি অন্য কোথাও দেখা যায় না!

Share your experience
  • 447
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    447
    Shares

স্বপনকুমার ঠাকুরঃকাটোয়া মানেই কার্তিকপুজো।কার্তিকলড়াই নামে বিখ্যাত।কিন্তু খুব কি প্রাচীন? গ্রিক রোমান লেখকবর্গ কথিত কটদুপা যদি আধুনিক কাটোয়া শহর হয়,তাহলে অন্তত এই জনপদের বয়স দুহাজার বছরের কাছাকাছি।কিন্তু শহর কাটোয়ার কার্তিকপুজো হাল আমলের।তবে কাটোয়ার কার্তিকপুজোর এমন কতকগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা বিচিত্র ও বিস্ময়কর।সেই আলোচনার প্রবেশের পূর্বে কার্তিক সম্পর্কে জানানো প্রয়োজন।

গবেষকদের মতে কার্তিক  আদতে লোকদেবতা ।পতঞ্জলির মহাভাষ্যে স্কন্দ কার্তিককে ভয়ংকর লৌকিকদেবতা বলা হয়েছে। অপর নাম স্কন্দ। ইনি  মূলত যুদ্ধদেবতা ।গীতার দশম অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিলেন “সেনানীনামহং স্কন্দঃ সরসামস্মি সাগর।’২৪।।।অর্থাৎ সেনাপতিদের মধ্যে আমি দেবসেনাপতি কার্তিক এবং জলাশয়সমূহের মধ্যে আমি সাগর।অন্যদিকে স্কন্দ শব্দটির অর্থ বীজ বা বীর্য। কার্তিক বীর্যবান। সাহসী নির্ভীক শক্তিশালী।আবার স্কন্দ শব্দের অর্থ থেকে বোঝা যায় তিনি কৃষিদেবতা।প্রজননের দেবতা।  মোটামুটি এই রূপে আজও কার্তিকের আরাধনা হয়  সমগ্র বঙ্গদেশে।

ইংরেজ আমলে  গাঙ্গেয় বাংলায় কার্তিকপুজো শুরু হয় জমিদার বণিক ও বারবণিতাদের উদ্যোগে।কাটোয়ার কার্তিকপুজো এর ব্যতিক্রম নয়।যদিও এর ইতিহাস খুব একটা প্রাচীন নয় বলেই মনে করা হয়।কাটোয়ার মিশনারিদের লেখায় কিম্বা নিবারণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাটোয়ার ইতিহাসে এই পুজো নিয়ে কোন কথা নেই।তবে কাটোয়া মহকুমার কার্তিক উপাসনা সুপ্রাচীন ঐতিয্যবাহী।মঙ্গলকোটে উৎখননে পাওয়া গেছে টেরাকোটার কার্তিকমূর্তি।কেতুগ্রামের বাহুলক্ষ্মী হিসাবে পূজিত পালপর্বের  পার্বতী মূর্তিতে রয়েছে শিশু কার্তিকের উপস্থিতি।তবে কাটোয়ার কার্তিকপুজোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা বাংলার অন্যত্র দেখা যায় না। আর এখানেই কাটোয়ার কার্তিকপুজোর অনন্যতা।

কাটোয়ার কার্তিকপুজোতে থাকার ব্যবহার দেখা যায়,যা অন্যত্র না থাকারই সামিল।থাকা হলো বাঁশ দিয়ে তৈরি সিঁড়ির মতো ক্রমোচ্চমান গ্যালারি।খানিকটা ট্র্যাপিজিয়মের মতো দেখতে। ধাপে ধাপে পুতুল সাজিয়ে একটি নাট্যরূপ দেওয়া হয় পৌরাণিক কাহিনির।মূলত রামায়ণ মহভারত বা পুরাণের নির্বাচিত পালা অবলম্বনে ৪০ থেকে ৩৫টি পুতুলে সাজিয়ে এই স্থির পুতুল-নাট্যটি উপস্থাপন করা হয়।দাঁইহাটের রাসে আর কাটোয়ার কার্তিকপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।এই থাকার মধ্যে লক্ষ্য করা যায় দক্ষিণভারতের নবরাত্রির সময় এই ধরনের পুতুলপ্রদর্শনের থাকার প্রভাব। দক্ষিণভারতের থাকাগুলি সাত নয় কিম্বা এগারো এই ধরনের বিজোড় সংখ্যায় উপস্থাপন করা হয়।এগুলিকে বলা হয় কলু বা গোলু কিম্বা বোম্বেহাব্বা।থাকায় ব্যবহৃত হয় কাঠ বা মাটির পুতুল।দেবদেবীর পুতুলের সঙ্গে থাকে রাজা ও রানি।কাটোয়ার কার্তিক-থাকায় যেকোন পালা হোক না কেন সবার উপরে থাকে শিশুকার্তিক কোলে জগদ্ধাত্রী।আর একটি পার্থক্য রয়েছে –কলু বা গোলুর পুতুল আকৃতিতে ছোট হয় আর থাকার পুতুল প্রমাণ সাইজের।সঙ্গে বিশেষ পদ্ধতিতে নির্মিত এই বাঁশের খাঁচা।বাঁশের কাবারি দিয়ে ধাপি বা সিঁড়ি বানানো হয় পাঁচ থেকে ছয়টি। সুতলি দড়ি দিয়ে বাঁধা  হয়।সিঁড়ির চাতালটি সিংহাসনের মত।এবার সিঁড়ির  দুদিকের রেলিং’র মতো ছয়টি বা পাঁচটি করে সখি দাঁড় করানো হয়।এরা একহাতে রেকাবি কিম্বা মালা নিয়ে  বা শঙ্খবাদন রত অথবা নাচের ভঙ্গিতে থাকে। এই বিশেষ পদ্ধতির প্রতিমা সজ্জার জন্য কাটোয়ার কার্তিকপুজো অনন্য।

কাটোয়ার সাতভাই কার্তিক পুজো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।সাতভাই মানে সাত কার্তিক।এমন ধরনের মূর্তি পরিকল্পনা অভিনব। পুরাণ বা লৌকিক স্তরে সাত কার্তিক বলে কিছু শোনা যায় না।আমাদের মনে হয় এর মধ্যে দুটি প্রাচীন ধর্ম ভাবনার প্রলেপ আছে এক—সপ্তমাতৃকার মতো সাত কার্তিকের কল্পনা। দুই-কাটোয়া অঞ্চলে একাধিক ধর্মরাজমন্দিরে সাত ভাই বা নয় ভাই ধর্মশীলা পূজিত হয়। এর প্রভাবেও গড়ে উঠতে পারে সাতভাই কার্তিকের কল্পনা। প্রসঙ্গত-তাঁতিপাড়ার এই সাতভাই কার্তিকের পাশে রয়েছে কাটোয়ার ধর্মরাজের এক মন্দির।

কার্তিক মূলত লৌকিক দেবতা।কৃষি দেবতা।এই রূপে কাটোয়ার পানুহাট দাঁইহাটে পূর্ববঙ্গের লোকজন পুজো করেন।সে পুজোর নাম কার্তিকের হালাপুজো।সংক্রান্তির আগের দিন এই  ব্যতিক্রমী শস্যপুজোটি অনুষ্ঠিত হয় কার্তিকের মৃৎমূর্তির সামনে।এই পুজো করেন বাড়ির গিন্নিরা।ওয়ার্ডসাহেবের হিন্দুস বইটি থেকে জানা যায় কার্তিক ব্রত করতো মেয়েরা।সেই ব্রতের অন্যতম অঙ্গ ছিল মহাভারত পাঠ।মহকুমার বিভিন্ন গ্রামে পরের বাড়িতে লুকিয়ে কার্তিক ফেলা অন্যতম বৈশিষ্ট্য।কাটোয়াথানার গ্রামগুলিতে কার্তিকের পুজো হয় চার প্রহরে চারবার।

শহর কাটোয়ার কার্তিকপুজোর লড়াই মানেই একসময়  কাটোয়ার  জমিদারদের কার্তিক ঠাকুরের ভাসানের প্রতিযোগিতা ।এখন সেই লড়াইর অর্থান্তর ঘটে গিয়ে   ক্লাবগুলির প্যান্ডেলসজ্জায়  আলোকমালায় বাজনায় আর নতুন নতুন থিমের প্রতিযোগিতাকে প্রকট করে।

ছবি–লেখক।


Share your experience
  • 447
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    447
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ড.স্বপনকুমার ঠাকুর

DR.SWAPAN KUMAR THAKUR
ড.স্বপনকুমার ঠাকুর।গবেষক লেখক ও ক্ষেত্রসমীক্ষক।কৌলালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।