কাটোয়ার প্রথম মিশনারি রেভাঃ জন চেম্বারলিন

Share your experience
  • 39
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    39
    Shares

স্বপনকুমার ঠাকুর

 

রেভাঃ জন চেম্বারলিন ড. কেরির মতোই এক অসামান্য প্রতিভাধর ব্যাপটিস্ট মিশনারি ছিলেন।শহর কাটোয়ার সাহেববাগানের ইতিহাস বিস্মৃত মিশনারি।কয় জন জানি তাঁর পরিচয়? গঞ্জ কাটোয়ায় তাঁর সংক্ষিপ্ত অথচ বর্ণময় জীবনের ইতিবৃত্ত? কাটোয়া মহকুমা-সহ বিভিন্ন জেলাজুড়ে খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচারে ও প্রসারে তাঁর আপোষহীন সংগ্রামের কথা?

চেম্বারলিনের  জন্ম ১৭৭৭ সালের ২৪ জুলাই।ইংল্যাণ্ডের ওয়েলটন শহরে।চাষার ঘরের ছেলে হলেও চাষবাসে তাঁর আদৌ মন ছিল না।বরং ধর্ম চর্চায় ছিল তাঁর অসীম আগ্রহ।শরীরটা ছিল বড় দুর্বল।তিন বছর বয়সে প্রবল জ্বরে ভুগতে শুরু করেন।জ্বর সারলেও জন্মের মতো একটা কান বধির হয়ে যায়।আরও একটু বড় হলে তাঁর বাবা তাঁকে পাঠালেন কৃষি প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশুনো করতে।কিন্তু চেম্বারলিন ব্যাপটিস্ট মিশনারিদের বক্তৃতা শুনে সময় কাটাতে লাগলেন।পড়াশুনো শিকেয় উঠলো। ১৮ বছর বয়সে তাঁর জীবনে গভীর পরিবর্তন এলো।মনে মনে ঠিক করে নিলেন ধর্মজীবন তাঁর একমাত্র কাম্য।এমন সময় আলাপ হয় শ্রীরামপুরের মিশনারি ড. উইলিয়ম কেরি ও টমাসের সঙ্গে। তখন অবশ্য কেরি ভারতে আসেননি।১৯ বছর বয়সে সিমন্সের কাছে  খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা নিলেন চেম্বারলিন।এবার মনে মনে সিদ্ধান্ত পাকা করে নিলেন তিনি কেরিয়ার শুরু করবেন মিশনারি হিসাবে।প্রিয় শিক্ষক মিঃ হাডন তাঁকে মিশনারিদের শিক্ষানবিশি কোর্সে ভর্তি করে দিলেন।মিঃ স্যুটক্লিপের অধীনে একবছর ওলনে শহরে নিবিড় অধ্যয়নের শেষে পুনরায় ভর্তি হলেন ব্রিস্টল একাডেমিতে।এখানে ১৮০২ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত পড়াশুনো করেছিলেন।দৈনিক ১৯ ঘণ্টা যাবৎ লেখাপড়া নিয়ে মগ্ন থাকতেন। তাঁর এই সময়পর্ব সম্পর্কে লেখা হয়েছে–“During the whole period of this coarse of preparation for his important work, Mr. Chamberlain studied with the greatest diligence, often spending no less than nineteen hours a day in literary pursuits. He did not however neglect either private devotion or public services. As to the former,besides perusing many of the best devotional books, he was accustomed to read fifteen chapters from the Bible, and also to engage in prayer five or six times every day.”

লণ্ডনের ব্যাপটিস্ট মিশন চেম্বারলিনকে মিশনারি হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন ১৮০২ সালে।এই বছরে শ্রীরামপুরে আসার আগে আমেরিকা গিয়েছিলেন।সেখানে প্রেয়সী হানার সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয়ে কয়েক মাস ওখানেই কাটালেন।অতঃপর ১৮০৩ সালে ২৭শে জানুয়ারি সস্ত্রীক চেম্বারলিন শ্রীরামপুরে এসে পৌঁছালেন।প্রথম প্রথম ভাষাগত অসুবিধার জন্য প্রবল উদ্যমে বাংলাভাষা শিখতে শুরু করেন।একটা বছর সস্ত্রীক চেম্বারলিন শ্রীরামপুরে স্কুলের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।১৮০৪ সালে জানুয়ারি মাসে স্ত্রী হানাকে শ্রীরামপুরে রেখে ধর্মপ্রচারের কাজে গঙ্গাসাগরের মেলা গিয়েছিলেন।এই সময় হানা ছিলেন সন্তান সম্ভবা।মেলা থেকে বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে চেম্বারলিন যখন শ্রীরামপুরে পৌঁছালেন তখন দেখলেন যে তাঁর সদ্য প্রসূত সন্তানটি মারা গেছে।স্ত্রী হানা ভেঙে পড়েছেন প্রচণ্ড দুঃখে।সব মিলিয়ে এই ব্যাথাদীর্ণ সময়কে ভোলবার উদ্দেশ্যে সস্ত্রীক চেম্বারলিন আবার বেরিয়ে পড়লেন দিনাজপুর-সদামহলের পথে।বন্ধু ফার্নান্ডেজের অকৃত্রিম আতিথ্যে প্রায় দুমাস  সেখানে দারুন ভাবে আনন্দ উপভোগ করে শ্রীরামপুর ফেরার পথে কাটোয়ায় এসে থামলেন।স্ত্রীকে বজরায় রেখে এক ঝটকায় শহর কাটোয়া পরিক্রমা করে নিলেন।ইতিমধ্যে তিনি মনস্থীর করে নিয়েছিলেন যে কাটোয়াতে তিনি মিশনারি স্টেশন প্রতিষ্ঠা করবেন।এই উদ্দেশ্যেই তিনি শহর কাটোয়া ঘুরে পরিচিত লোকের সঙ্গে কথা বলে নিলেন।

১৮০৪ সালের ৫ই মে কাটোয়াতে পাকাপাকি ভাবে মিশন স্থাপনের জন্য শ্রীরামপুর থেকে একাকী কাটোয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।৮ই মে রবিবার কাটোয়া পৌঁছে গেলেন।রাত্রে আশ্রয় নিয়েছিলেন পরিত্যক্ত নবাবি সরাইখানায়।ধর্ম বিষয়ে কাটোয়াবাসীর সঙ্গে আলাপ আলোচনায় ব্যাপৃত হলেন।কেউ কেউ সাহেবের প্রতি বিরক্ত হলেন।কেউ বা মোক্ষম প্রশ্ন করে সাহেবকে বেকায়দায় ফেলবার চেষ্টা করলেন;সাহেবরা এতোই যদি ধার্মিক হোন তাহলে এই দেশ কেন তাঁরা দখল করেছেন?চেম্বারলিন যুক্তি দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করলেন-নবাবি শাসনের সঙ্গে ইংরাজ শাসনের পার্থক্য কোথায়।শেষে তারাও মেনে নিল সাহেবের কথা ও যুক্তি। তিনি নিজেই লিখেছেন–” But why do you speak ill of the Sahibs? Has not their coming into this country been for your good ? Is it not better for you than when the Nabob governed? All replied : ‘ True, Europeans do not take our money, and murder us.”

চমৎকার সব ছবি ধরা পড়েছে চেম্বারলিনের লেখা ডায়েরিতে।কোনদিন দেখলেন কাটোয়ার এক দোকানদার সুর করে মহাভারত পড়ছেন।বড় রাস্তার ধারে গাছতলায় অনেক নরনারী সমবেত হয়েছেন।পুরিতে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উপলক্ষে তারা যাত্রা শুরু করবেন।দূর দূর গ্রাম থেকে পুণ্যার্থীরা আসছেন।তাদের জন্য অপেক্ষা করে রয়েছেন অন্য তীর্থযাত্রীরা।চেম্বারলিন এই সুযোগে পুণ্যার্থীদের সঙ্গে জুড়ে দিলেন তর্ক বিতর্ক।যার হাত নেই, পা নেই, কথা বলেনা,কানে শোনে না,তাকে দেবতা বলে মানা কেন?মানুষ অবাক হয়ে সাহেবের কথা শুনছেন।তাইতো! এভাবে এত দিন তো কেউ  এসব কথা এমন ভাবে বলেনি। সাহেবের এইসব কথা শুনে ব্রাহ্মণরা কোথাও কোথাও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছেন।এইভাবে কয়েকদিনের মধ্যে কাটোয়াবাসীর মনোভাব বুঝে নেবার চেষ্টা করেছিলেন।আবার কাটোয়ার মানুষ সম্পর্কে হতাশও তিনি হয়েছেন।তিনি নিজেই লিখেছেন–“Here are crowds of people, some blind as bats, and insensible as stones ; others careless and indifferent :a few others seem rather more serious. I think that a school may be set up here to advantage : some children have been to me this morning to pay me their respects, with whom I am much pleased.”কয়েকদিনের মধ্যে কাটোয়ায় জমি বাগান কিনে মিশনবাড়ি স্কুল ইত্যাদি তৈরি করে কাটোয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেন।

১৮০৪ সালের জুলাই মাসের প্রথম দিকে চেম্বারলিন শ্রীরামপুরে গেলেন।১৮ দিন থাকার পর স্ত্রী হানাকে নিয়ে এসে কাটোয়ায় পাতলেন সুখের সংসার।এই সময় কাটোয়ার মিশনবাড়িতে লোকজন আসতে শুরু করলো।তবে সেটা ধর্মের টানে নাকি সুন্দরী মেমসাহেবকে দেখার টানে এই নিয়ে নিজে সূক্ষ্ম রসিকতা করতেও ছাড়েননি।চেম্বারলিন নেটিভদের সঙ্গে ধর্মালোচনা করতেন।সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত মিশন সচল থাকতো।এছাড়া বাজারে রাস্তায় পথ-চলতি মানুষের সঙ্গে ধর্মালোচনা করতেন সাহেব।১৮০৪ সালের ১৩ ই অক্টোবর তিনি সুদপুরে গিয়েছিলেন।কয়েকজনের সঙ্গে ধর্ম নিয়ে তর্কাতর্কি করলেন।সেখান থেকে গেলেন ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে  সুদপুরের তাঁতিপাড়ায়।এইভাবেই বেশ কাটছিল সুখে দুঃখে দিনগুলি।হঠাৎ একদিন তাঁর জীবনে নেমে এলো এক ভয়ংকর আঘাত।তাঁর সন্তান সম্ভবা  প্রিয়তমা পত্নী কাটোয়াতে সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা গেলেন।

চেম্বারলিন জীবনে যতবার আঘাত পেয়েছেন ততবারই সেই আঘাত সামলে নিয়ে পূর্ণোদ্যমে আবার কর্মে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।কয়েকদিন শ্রীরামপুরে থাকার  পর কাটোয়ায় ফিরে এলেন।এই সময়ে তাঁকে সহায়তা করার জন্য কেরি দ্য জুনিয়ার কয়েকমাস কাটোয়ায় এসেছিলেন।তবে বেশিদিন কেরিকে  থাকতে হয়নি।কারণ চেম্বারলিন আবার বিয়ে করলেন ১৮০৫ সালের ২৮শে ডিসেম্বর,প্রয়াত মি.গ্রান্টের বিধবা স্ত্রী মিসেস গ্রান্টকে।ইনিও চেম্বারলিনকে খুব ভালোবাসতেন।নেটিভদের সঙ্গে মিসেস গ্রান্ট খুব ভালো মিশতে পারতেন।ইনি কাটোয়ায় থেকে স্বামীর কাজে সাহায্য করতেন।

আট মাস সুখে কাটানোর পর আবার সেই একই দুঃসময়ের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি।গর্ভবতী গ্রান্ট সন্তান প্রসব করার জন্য শ্রীরামপুরে যেতে চাইলেন।ভরা বর্ষাকাল।গঙ্গায় তখন প্রবল ঢেউ।এছাড়া জল সম্পর্কে গ্রাণ্টের ছিল অস্বাভাবিক ফোবিয়া।অবশেষে ১৮০৬ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর সস্ত্রীক চেম্বারলিন শ্রীরামপুরের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলেন গঙ্গাপথে।কিন্তু ভয়াবহ বিপদ অপেক্ষা করছিল গঙ্গাগর্ভে।বজরা তখন কালনা শান্তিপুরের মাঝামাঝি।এদিকে এগিয়ে আসছে জোয়ারের উন্মত্ত স্রোত।নৌকার গতি রুদ্ধ।শুরু হলো মিসেস গ্রান্টের প্রসব বেদনা। বহু যাতনার পর বজরার মধ্যেই প্রসব করলেন ফুটফুটে এক সুন্দর শিশু।তারপর থেকে হানার মতো একই অবস্থা।তবে হানার মতো শেষপর্যন্ত  তিনি উন্মাদ হয়ে যাননি।পরের দিন সকালে প্রবল রক্ত ক্ষরণে মাঝ নদীতে তিনি প্রয়াতা হলেন।নিজের কপালে করাঘাত করে সাহেব যিশুর চরণে নতজানু হলেন।পরের দিন শ্রীরামপুরে পৌঁছে খবর পেলেন তাঁর আরেক পুত্র উইলিয়ম  গ্রাণ্ট মায়ের মতোই পাড়ি দিয়েছে মৃত্যুলোকে। চেম্বারলিন  সেই দুঃসময়ের ইতিকথা প্রসঙ্গে  লিখেছেন– ” Since my arrival, I have heard of the death of our dear child William Grant. Thus am I afflicted with wave upon wave, till I am shipwrecked in the midst of the storm ! The arrows of the Almighty stick fast in me, and I am consumed with the blow of his hand. ”

রেভাঃজন চেম্বারলিনের মিশনারি কৃতিত্ব ঈর্ষণীয়।তবে কাটোয়ায় কাকে প্রথম খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন এ সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়না।তখন ধর্মান্তরিত করা কঠিন বিষয় ছিল।কোম্পানির নিষেধাজ্ঞার ফলে ড.উইলিয়ম কেরি ১৭৯৩ সালে মিশনারি কার্যকলাপ শুরু করলেও ১৮০০ সালে শ্রীরামপুরে জনৈক কৃষ্ণচন্দ্র পালকে একমাত্র খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করতে পেরেছিলেন।চেম্বারলিন সম্ভবত ১৮০৬ সালের আগে কাটোয়ায় কাউকেই ব্যাপটাইজড করতে পারেননি।এ বিষয়ে তাঁর লেখা দুটি চিঠি গুরুত্বপূর্ণ।প্রথম চিঠিটি লেখা হয়েছিল ১৮০৬ সালের ২১শে জুন বন্ধু মি.হোয়াইট সাহেবকে।ধর্মপ্রচারে এতদাঞ্চলের মানুষের অনাগ্রহ প্রতিরোধ ইত্যাদি জানিয়ে কাজের কথাটি লিখেছিলেন যে একজনকে মাত্র তিনি ধর্মান্তরিত করতে পেরেছিলেন।তাঁর চিঠি থেকে জানা যায় অনেকেই ঝোঁকের বশে ধর্মান্তরিত হলেও পরে আবার স্বধর্মে ফিরে যান।একই বৎসর ২৭শে জুন লেখা আর একটি চিঠি থেকে জানা যায় তিনি কাঙ্গালী ও তার স্ত্রীকে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করেছেন।

কাটোয়া থেকে পরবর্তীকালে আরও তিনটি স্টেশন পরিচালিত হতো যথা বীরভূমজেলার লাকড়াকুণ্ডা সিউড়ি আর মুর্শিদাবাদজেলার বহরমপুরের ব্রিটিশ সেনানিবাস।কাটোয়ার পাশাপাশি দেওয়ানগঞ্জেও চেম্বারলিন প্রতিপত্তি বাড়াতে থাকেন।১৮০৭ সালে দেওয়ানগঞ্জের বাসিন্দা মুখার্জি নামে জনৈক ব্রাহ্মণকে ধর্মান্তরিত করেন চেম্বারলিন।তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো বৃন্দাবন নামে জনৈক ভিক্ষুককে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা দান করা।বৃন্দাবন পরবর্তীকালে জনপ্রিয় নেটিভ মিশনারি হয়ে উঠেছিলেন।১৮০৯ সাল থেকে চেম্বারলিন কাটোয়া থেকে বহরমপুরে নিয়মিত যাতায়াত করতেন ব্রিটিশ সৈন্যদের খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে।এখানে তিনি চল্লিশ জন ব্রিটিশ সৈন্যকে ব্যাপটাইজড করেন। এ প্রসঙ্গে লেখা হয়েছে– “His labours were now divided between the heathen at Cutwa, and the European Soldiers at the Military station of Berhampore. Here his preaching was greatly blessed to his countrymen, so that, when the Regiment was removed from Berhampore, the Church consisted of between thirty and forty members.” কাটোয়া চার্চে অধিকাংশ সময়ে বাংলাভাষাতেই ধর্মসভার কাজ হতো।বাংলাভাষার মাধুর্যে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন।তাঁর স্কুল স্থাপনের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না।

চেম্বারলিনের দ্বিতীয় স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে কাটোয়া মহকুমার বিভিন্ন গ্রামে জোর কদমে তিনি খ্রিষ্টধর্ম প্রচার করেছিলেন।ঘোড়ায় চড়ে পৌঁছে যেতেন গ্রাম গ্রামান্তরে।গাছতলায় বসতো ধর্মসভা।কোথাও বাধা পেতেন।কোথাও বা জুটতো টিটকারি।আবার কোথাও গ্রামবাসীরা সাগ্রহে শুনতেন যিশুর জীবনী।কারুর চোখে নামতো অশ্রুর বন্যা।চেম্বারলিনের সঙ্গে থাকতেন কাঙালি বা বৃন্দাবন।সকাল ৫ টার পর বেরিয়ে পড়তেন।ফিরতেন সন্ধ্যার সময়।কোনদিন আবার আহার জুটতো না।চেম্বারলিন তাঁর ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করেছেন এমনি কয়েকটি টুকরো টুকরো ছবি।দাঁইহাটের কাছাকাছি ইসলামপুর গ্রাম।এখানে একটি গাছতলায় দাঁড়িয়ে চেম্বারলিন যিশুর জীবনী বলছিলেন বাংলায়।দুই ব্রাহ্মণের সঙ্গে জড়িয়ে গেলেন তর্কে বিতর্কে।অবশেষে তর্কে পরাজিত হয়ে দুই ব্রাহ্মণ তখন পরাস্ত হয়ে পালিয়ে গেলেন।১৮০৬ সালের ২২শে অক্টোবর।এদিন তিনি sorda অর্থাৎ কাটোয়া থানার সুড্ডোগ্রামে ধর্ম প্রচার করতে গিয়েচ্ছিলেন।২৩ শে অক্টোবর  কাটোয়ার বেড়া গ্রামের পথে দেখতে পেলেন বেশ কিছু লোক দুর্গাপুজো উপলক্ষে আনন্দে মত্ত হয়ে আছেন।তাদের কাছে মূর্তি পুজোর অসারতা সম্পর্কে বোঝালেও তারা সাহেবকে খুব একটা পাত্তা দিলেন না।৩১ শে ডিসেম্বর গিয়েছিলেন মুস্থুলগ্রামে।সেখানে গাছতলায় বসে যিশুর জীবনী পাঠ করেছিলেন।উপস্থিত অনেক দর্শকের চোখে জল দেখে সাহেব বিস্মিত ও আনন্দিত হয়েছিলেন।মুস্থলের কাজ শেষ করে পাঁচবেরিয়া গ্রামে গিয়েছিলেন এবং মৃৎশিল্পীদের তৈরি করা ঠাকুর দেখে বিরক্ত প্রকাশ করেছিলেন।

১৮০৬ সালের ৫ই নভেম্বর। এই দিন তিনি দাঁইহাটে গিয়েছিলেন ধর্মপ্রচার করতে।একটি পুরাতন মন্দিরের কাছে ধর্মসভার আয়োজন করেছিলেন।সেখানে অনেক লোক তাঁর কথা শুনছিলেন।এমন সময় এক ব্রাহ্মণ এসে সভা পণ্ড করে দেবার চেষ্টা করলেন।একই বছরে ৯ই ডিসেম্বর পুনরায় দাঁইহাট গিয়েছিলেন।সেখানে একটি ফাঁকা স্থানে গিয়ে দেখতে পেলেন দাঁইহাটের ভাস্কররা পাথর খোদাই করে মূর্তি তৈরি করছেন।তিনি তাদেরকে মূর্তি তৈরি করা পাপ ও বোকামির কাজ বলে বোঝালেও শিল্পীরা কোন উত্তর না দিয়ে কাজ করতে লাগলো।পরে দাঁইহাটে এক বিচিত্র সাধুকে দেখে চেম্বারলিনের প্রতিক্রিয়া–“At Dina-hat we came to an open place, where a number of large stones were collected, and several men at work, forming them into their shameful idols. I endeavoured to expose the sin and folly of their conduct, and was heard without any opposition. After this we saw a man with his arm erect and stiffened, and his nails grown like birds claws.He had been in that situation from the age of twelve years,and the people called him a god.”একই বছরে ২৩শে নভেম্বর গিয়েছিলেন কাটোয়ার চুড়পুনি গ্রামে। একটি দুষ্টু লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎকার হয়েছিল বড়াশ্যামবাজারের পথে।চুড়পুনিতে সেদিন ছিল নবান্ন উৎসব।তাই ধর্মপ্রচার তেমন জমে উঠেনি।

জুনিয়ার দ্য কেরি কাটোয়ার মিশনারি ।আমৃত্যু কাটোয়ায় ছিলেন।

১৮০৮ সালে জানুয়ারি মাসে শ্রীরামপুর থেকে রবিনসন দম্পতি এসেছিলেন কাটোয়ায় চেম্বারলিনকে ধর্মপ্রচারে সাহায্য করার জন্য। ১৮০৮ সালের ১০ই জুন রবিনসনের লেখা থেকে জানা যায় যে চেম্বারলিন বৃন্দাবনকে নিয়ে জগদানন্দপুর গ্রামে গিয়েছিলেন ধর্মপ্রচার করতে।ওখান থেকে মুস্থল হয়ে ঘোড়ানাশ গ্রামে যান।সেখানে তাঁরা কীরূপ হেনস্থার শিকার হয়েছিলেন তার বর্ণনা স্বয়ং চেম্বারলিন লিখেছেন।সভা বেশ ভালোই জমে উঠেছিল।এমন সময় এক বেঁটে খাটো ব্রাহ্মণ এসে সাহেবের বিরুদ্ধে উপস্থিত দর্শকদের একাংশকে ক্ষেপিয়ে তোলেন এবং  শেষে সভা পণ্ড করে দেন– “Great was the attention of many to the word ; but at last a stout Brahmun came, and incited the young Brahmuns to raise the cry, ‘ Hurry bol !’ which they vociferated so violently that I could not hear my own words. Perceiving that the hubbub was likely to continue and increase, I left them. They followed us with hisses, shoutings, and clapping of hands, and threw dust on Brindabun ; but we at length got clear of them, and free from harm।”

চেম্বারলিন ১৮০৯ সালে মিসেস আণ্ডারউডকে  বিয়ে করেছিলেন। তবে তাঁর স্ত্রী কাটোয়া এসেছিলেন কিনা এমন তথ্য জানা যায় না।বিভিন্ন ভাষায় চেম্বারলিনের দক্ষতা, কাজে অসাধারণ নিষ্ঠা ও কর্মতৎপরতা দেখে শ্রীরামপুর মিশন তাঁকে আগ্রায় নতুন স্টেশন স্থাপন করার কাজে পাঠালেন।১৮১১ সালের জানুয়ারি মাসে কাটোয়া থেকে চেম্বারলিন চির বিদায় নিলেন।আগ্রায় তাঁর সহকর্মি ছিলেন মি.পিকক।এখানে পনেরো মাস ছিলেন।কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি বাইবেল অনুবাদ করতে থাকেন হিন্দিতে।কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রোষে পড়ে কলকাতা চলে এলেন এবং গৃহশিক্ষকতা শুরু করেন।কলকাতা থেকে পরে চলে আসেন শ্রীরামপুরে।এখানেও অনুবাদের পাশাপাশি নেটিভদের ধর্ম বিষয়ে তিনি সাহায্য করতে থাকেন।১৮২০ সাল নাগাদ অতিরিক্ত পরিশ্রমে তার শরীর ভেঙে পড়ে। তাঁর ফুসফুসের সংক্রমণ ধরা পড়ে ১৮২১ সালে। চিকিৎসার জন্য ইংল্যাণ্ডের উদ্দেশ্যে চেম্বারলিন জাহাজে চাপেন।জাহাজেই খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন।৬ই ডিসেম্বর এই মহান কর্মসাধকের প্রয়াণ ঘটে জাহাজের কেবিনেই।তাঁর মরদেহ ইংল্যাণ্ডের সার্কুলার রোডের কবরখানায় পবিত্র মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।সেখানে লেখা আছে–“Sacred to the Memory of Mr. John Chamberlain,who, after having devoted with unabated zeal and indefatigable labour, nearly twenty years of his life to the propagation of the gospel among the Heathen in India, died on his passage to England for the recovery of his health, Dec. 6th 1821.Lat. 9. 30. N. Long. 85. E., near the Island of Ceylon ; aged 45 years. ” Be ye followers of them, who through faith and patience, inherit the promises.” Heb. vi. 12″

 

তথ্যসংকেত

THE BAPTIST MAGAZINE 1843

THE BENGAL OBITUARY

.MEMOIRS OF MR. J. CHAMBERLIN

CIRCULAR ROAD BAPTIST CHAPEL

বাঙ্গলার ইতিহাসে  কাটোয়া–স্বপনকুমার ঠাকুর

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 39
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    39
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ড.স্বপনকুমার ঠাকুর

DR.SWAPAN KUMAR THAKUR
ড.স্বপনকুমার ঠাকুর।গবেষক লেখক ও ক্ষেত্রসমীক্ষক।কৌলালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।