খেলাইচণ্ডী লোকদেবীর পুজো হয় পশ্চিম বর্ধমানের কাল্লা গ্রামে

Share your experience
  • 1.5K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.5K
    Shares

খেলাইচণ্ডী -থান
খেলাইচণ্ডী -থান

খেলাইচণ্ডী এক বিচিত্র লেকদেবী। পূজিত হন পশ্চিম বর্ধমানের আসানশোলের কাছে কাল্লাগ্রামে।এই পুজোর উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, মাটির কলসিতে তৈরি করা , মায়ের অন্নভোগ বা জুড়ি পায়েস । ৪০ সের দুধ, গোবিন্দভোগ চাল ও গুড় জ্বাল দিয়ে তৈরি জুড়ি পায়েস।লিখছেন–ডা.তিলক পুরকায়স্থ

সময়- টাইম ও স্পেস , আদি ও অনন্ত, সময়ের হাত ধরে ঘুরছে জীবনচক্র। সময়ের সঙ্গে সতত পরিবর্তনশীল সমগ্র জীব জগৎ, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড। কবি গেয়ে ওঠেন- জীর্ন পুরাতন যাক ভেসে যাক। পরিবর্তনশীল সময়ের সঙ্গে বদলাতে থাকে ঋতুচক্র। প্রতি মাসের অন্ত দিনটি তাই সংক্রান্তি। বারো মাসের মতন বারো রাশিও ঋতুচক্রের মতন সতত আবর্তনশীল।

খেলাইচণ্ডীর পুজো আষাঢ় সংক্রান্তিতে

হিন্দু শাস্ত্রে বলে চৈত্র সংক্রান্তি বা মহাবিষুব এবং আশ্বিন সংক্রান্তি বা জল বিষুব সংক্রান্তিতে দিন রাতের সময়কাল সমান হয়। আর মাঘ, ফাল্গুন, চৈত্র, বৈশাখ,জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় এই ছয় মাসকে বলা হয় উত্তরায়ণ। দেবলোক এই সময় জেগে ওঠে, অর্থাৎ দেবলোকের দিবস। বাকি ছয় মাস হচ্ছে দক্ষিণায়ণ, দেবলোকের রাত্রিকাল। তাই দেবলোক জেগে ওঠার সময় , এবং নিদ্রা যাবার প্রাক্কালে, গ্রাম বাংলার অনেক স্থানে পুজো ও মেলার আয়োজন হয়। বেশিরভাগ জায়গায় হয় উত্তরায়ণের সূচনায় অর্থাৎ পৌষ সংক্রান্তির মেলা। কিন্তু পশ্চিম বর্ধমানের, কাল্লা গ্রামের খেলাই চণ্ডী মেলা অনুষ্ঠিত হয় আষাঢ় সংক্রান্তিতে, অর্থাৎ দেবলোক ঘুমিয়ে পড়ার আগে তাঁদের উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য নিবেদন।

খেলাইচণ্ডী বৃক্ষ
খেলাইচণ্ডী বৃক্ষ

নানা নামের চণ্ডী

পশ্চিম বর্ধমানের গ্রামগুলিতে করম পুজো, ধরম পুজো, ধৰ্ম পুজো, মনসা পুজো, ভাদু, টুসু, ইতু ইত্যাদি অসংখ্য পুজো প্রথার সঙ্গে প্রচলিত অগুনতি লৌকিক দেব দেবীর পুজো। যেমন ওলাই চন্ডী, মঙ্গল চন্ডী, উরণচন্ডী, উদ্ধার চন্ডী, নাটাই চন্ডী, অলকা চন্ডী এমন কি হাড়ি ঝি চন্ডী অবধি আছেন। এখন অবধি প্রায় ১০৩ টি চন্ডীর খোঁজ পাওয়া গেছে। কোথাও তিনি গ্রাম দেবী, কোথাও কূল দেবী আবার কোথাও গৃহ দেবী।

সাধারণত নানা রকম প্রতীকে চন্ডী পুজো হয়- ১) খোদিত শিলা মূর্তি , ২) অ- খোদিত শিলা খন্ড, ৩)মাটির ঢেলা, ৪) লাল ঘোড়া, ৫) বৃক্ষ পুজো , ৬) মাটির মূর্তি, ৭)) ধাতু মূর্তি, ইত্যাদি।

এই চণ্ডী কিন্তু মহিষাসুরমর্দিনী চণ্ডী নন। ইনি আদতে পশুমাতা বনদেবী বা অভয়া।চন্ডীমঙ্গল কাব্যের আখেটিক বা ব্যাধ খণ্ডের বর্ণনা অনুসারে তিনি দ্বিভুজা, মঙ্গলঘট স্থাপন করে তার উপরে ধান- দূর্বা রেখে দেবীর পূজা করা হয়।

আবার চন্ডীর উৎপত্তি নিয়ে অন্য একটি মত হচ্ছে উনি আদিতে ওঁরাও দের শিকারের দেবী চাণ্ডী।তখন বর্তমানের বাঙালি জাতির উদ্ভব হয়নি। সেই সময়ের প্রোট অস্ট্রোলয়েড সম্প্রদায়ের অন্যতম হচ্ছে ওঁরাও সম্প্রদায়। আজকের বাংলার কৃষক সম্প্রদায়ের বড় অংশ এই ওঁরাও বংশোদ্ভূত। এঁরা সম্ভবত উড়িষ্যা থেকে আগত এবং তখন এঁদের নাম ছিল উড্র । শিকারের সময় এঁদের সঙ্গে থাকত চান্ডী শিলা। যখন বহিরাগত আর্যরা প্রাক-আর্য দেব দেবীদের আর্যিকরণ করা শুরু করেন, তখন সৃষ্টি হয় মার্কণ্ডেয় পুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ ইত্যাদি। খুব সম্ভবত ওঁরাওদের পূজিত এই চান্ডী দেবী , পরবর্তীতে হয়ে যান ব্রাহ্মণ‍্য‍ সম্প্রদায়ের পূজিত চন্ডী দেবী।

ঠিক যেভাবে শবরকুমারী রূপিনী বীণাবাদিনী সর্ববিষ হরণকারী বৌদ্ধ জাঙ্গুলী দেবী, হয়ে গেলেন হিন্দু সমাজে দেবী মনসা। উচ্চ বর্ণের চন্ডীর পুজো পদ্ধতির সঙ্গে গ্রামে গঞ্জে গাছতলায় প্রতিষ্ঠিত এই লৌকিক চন্ডী দেবীর পুজোর মধ্যে মিলের থেকে অমিলই বেশি। ভক্তদের দ্বারা লাল ঘোড়ার ছলন দেওয়া কিন্তু লৌকিক পুজোর অন্যতম অংশ।আসি কাল্লা গ্রামের আষাঢ় সংক্রান্তির খেলাই চন্ডী মেলাতে।

খেলাইচণ্ডী পাথর
খেলাইচণ্ডী পাথর

খেলাইচণ্ডী- কাল্লাগ্রামে

আসানসোল মহকুমার , রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা কোল ইন্ডিয়ার এক বিখ্যাত হাসপাতাল- কেন্দ্রীয় চিকিৎসালয়, কাল্লা। এই হাসপাতালের পিছনেই, বহুযুগ ধরে গাছতলায় প্রতিষ্ঠিত ছিল এক অপরূপ চণ্ডী শিলা। পরে হাসপাতালের কর্তৃপক্ষের তরফে জায়গাটিকে বাঁধিয়ে দেওয়া হয়। তবে নিকটেই হাসপাতালের মর্গের উপস্থিতির কারণে, পরে এই চণ্ডী শিলাকে এখান থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে, নিকটবর্তী কাল্লা গ্রামের প্রাচীন শিব মন্দিরের হাতায় , পুনরায় একটি গাছের নিচে স্থাপনা করা হয়। কিন্তু আদি শিলামুর্তির স্থানটি লোকমুখে আগের মতন, বর্তমানেও খেলাই চন্ডীর থান নামে পরিচিত। এই খেলাই চন্ডীর থানেই, প্রতিবছরের মতন, গতবছরও আষাঢ় সংক্রান্তিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে সার্বজনীন গ্রাম্য লোকদেবী খেলাই চন্ডীর পুজো।

খেলাইচণ্ডী কত দিনের পুরাতন

এই পুজো কত প্রাচীন সে সম্মন্ধে কোন পাথুরে প্রমান না থাকলেও, বর্তমান পুরোহিত মশাই শ্রী অচিন্ত‍্য‍ মুখার্জি এবং স্থানীয় বাসিন্দারা একমত, কম করে পুজো অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২০০ বছর ধরে। তবে চণ্ডী শিলাটি দেখে তো মনে হয় এই শিলা মূর্তি বহু প্রাচীন, এমন কি এই শিলা মূর্তিটি চান্ডী শিলা হলেও আশ্চর্য হব না।

খেলাইচণ্ডীর পুজো
খেলাইচণ্ডীর পুজো

খেলাইচণ্ডী- থান

খেলাই চন্ডীর থানে ত্রিশূল, শিবলিঙ্গ , ছলনের লাল ঘোড়া এসব রাখা আছে। পিছনে আছে এক অপূর্ব পদ্মপুকুর। মায়ের পুজোর জন্য তাতে ফুটে রয়েছে শ্বেত পদ্ম। সকাল থেকে দুপুর অবধি চলে খেলাই চন্ডীর পুজো ও ভোগ। আবার একটু দূরে মায়ের শিলা মুর্তিকেও পুজো করা হয়।

খেলাইচণ্ডী -ভোগ

এই পুজোর উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, মাটির কলসিতে তৈরি করা , মায়ের অন্নভোগ বা জুড়ি পায়েস । ৪০ সের দুধ, গোবিন্দভোগ চাল ও গুড় জ্বাল দিয়ে তৈরি জুড়ি পায়েস। কি তার সুগন্ধ এবং স্বাদ- লিখিতভাবে সেই স্বর্গীয় অনুভূতি প্রকাশ করা সম্ভব নয়। জুড়ি পায়েস ছাড়া, মিষ্টি, ফলপ্রসাদি ইত্যাদি দিয়ে পুজোর ভোগ দেওয়া হয়েছে। বছর ত্রিশ আগে অবধি, বলি প্রথা চালু ছিল।

আরও পড়ুন  পান খাওয়া বা বাঙালির তাম্বুলবিলাস বঙ্গসংস্কৃতির ঐতিহ্য

পুজোর অন্যতম সেরা অংশ লাগল, জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে অন্নভোগ বিতরণ। আমার খ্রিস্টান ড্রাইভার কে ডেকে শুধু অন্নভোগ নয়, তার বাড়ির লোকেদের জন্যও পুজোর প্রসাদ প্যাকেট করে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হল। আবার প্রমান পেলাম, সবার উপরে মানুষ সত্য , তাহার উপরে নাই !

 

দেখুন–

 

তথ্যসূত্র
১) বাংলার সংস্কৃতি: লুপ্ত ও লুপ্তপ্রায়। পালযুগ. গুপ্তযুগ. সেনযুগ থেকে অদ্যাবধি। নারায়ণ সামাট। দেশ প্রকাশন।
২) বর্ধমান সীমান্তের একটি অন-আর্য দেবী: মুক্তাইচন্ডী। অশোক দাস। ( আজকের যোধন, জুলাই-আগষ্ট, ২০০০ সংখ্যা থেকে সংগৃহীত।)

ছবি: লেখক


Share your experience
  • 1.5K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.5K
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।