খেলারাম-লোককবি থেকে লোকদেবতা ও ধর্মরাজ প্রসঙ্গ

Share your experience
  • 326
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    326
    Shares

খেলারাম-লোককবি থেকে লোকদেবতা ও ধর্মরাজ প্রসঙ্গ।নতুন তথ্যাদির আলোকে ধর্মমঙ্গলের প্রাচীন কবি খেলারাম চক্রবর্তী ও লোকদেবতা খেলারাম নিয়ে লিখছেন–স্বপনকুমার ঠাকুর।

খেলারাম ধর্মরাজ

রাঢ়ের জাতীয় কাব্য ধর্মমঙ্গলকাব্য। ড.মিহির চৌধুরী কামিল্যা তাঁর রাঢ়ের আঞ্চলিক দেবতাঃ লোকসংস্কৃতি গ্রন্থে ধর্মঠাকুর প্রসঙ্গে জানিয়েছেন যে কবি মানিকরাম গাঙ্গুলী তাঁর ধর্মমঙ্গলকাব্যে ২০টি পৃথক নামের ধর্মশিলার বন্দনা করেছেন।ময়ূর ভট্টের শ্রীধর্মপুরাণ গ্রন্থে ৫২টি পৃথক নামের ধর্মদেবতার উল্লেখ রয়েছে।ড. অমলেন্দু মিত্র মশাই তাঁর গ্রন্থে বীরভূমজেলায় ৯১টি ধর্মশিলার সন্ধান দিয়েছেন ।ড.কামিল্যা তাঁর গ্রন্থে ১৩৭টি পৃথক নামের ধর্মঠাকুরের তালিকা তৈরি করেছেন যেখানে খেলারাম রায় বা খেলা রায় নামে বর্ধমান বীরভূম মেদনীপুর মিলিয়ে মোট পাঁচটি ধর্মশিলার উল্লেখ রয়েছে।

কবি খেলারাম চক্রবর্তী

ধর্মমঙ্গলের আদি কবি খেলারাম চক্রবর্তী। একটি বিতর্কিত বিষয় নিঃসন্দেহে।খেলারাম সম্পর্কে আলোচনার সূত্রপাত করেন প্রাচীন সাহিত্য রসিক হারাধন দত্ত। সুকুমার সেনের বাঙ্গালাসাহিত্যের ইতিহাস দ্বিতীয় খণ্ড থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে জানা যায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলী।১৩২০ বঙ্গাব্দে জন্মভূমি পত্রিকায় প্রকাশিত দত্ত মশাই লিখিত “গড়মান্দারণ ও জাহানাবাদের ইতিবৃত্ত প্রবন্ধে লেখক জানিয়েছেন যে ঘনরাম প্রণীত ধর্মমঙ্গলের পূর্বে খেলারাম গৌড়কাব্য রচনা করেছিলেন। হারাধন দত্ত খণ্ডিত গৌড়কাব্যটি আবিষ্কার করেছিলেন।

দ্বিতীয়ত– ময়নার গড় থেকে ধর্মপুত্র লাউসেন যখন গৌড় যাত্রা করেন তখন ধর্মরাজ যা বলেছিলেন কবি খেলারাম তা বর্ণনা করেছেন।

তৃতীয়ত--বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে যে শৈলেশ্বর শিবের কথা আছে হারাধনবাবুর মতে খেলারামের কাব্যে উল্লিখিত শৈলেশ্বর শিব বা নেড়া দেউল একই।

স্থিত শৈলেশ্বর শিব বঙ্গের অঞ্চলে।
সুরম্য সরসী এক তার মাঝে ঝলে।।
কমল কুমুদ আদি নানা ফুল ফল।
বিকশিয়া ভূষে তার নীল উরঃস্থল।।
শুন বাছা লাউসেন বলি রে তোমায়।
এওজাৎ দিও নেড়া দেউল তলায়।।

চতুর্থত-খেলারামের গৌড়কাব্য রচনার সূচনাকাল “ভুবন শকে বায়ু মাস শরের বাহন” অর্থাৎ ১৪৫৯ শকাব্দ। শ্রী বসন্ত কুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে খেলারামের কাব্যের রচনাকাল ১৬৯২ খ্রিষ্টাব্দ।

পঞ্চমত– কাব্যটি আবিষ্কৃত হয়েছিল হুগলি জেলার বদনগঞ্জ নামক গ্রামের সন্নিকটে শ্যামবাজারে জনৈক ধীবর জাতির ধর্মপণ্ডিতের দলুরায় নামে ধর্মশিলার সিংহাসন থেকে।

 খেলারাম অনুসন্ধান  ও বাংলাসাহিত্যের ইতিহাস

ড.সুকুমার সেনের নির্দেশে প্রখ্যাত গবেষক পঞ্চানন মণ্ডলের অনুসন্ধানের ফলে জানা যায় যে শ্যামবাজারের অদূরবর্তী ভাবুরসে পশ্চিমপাড়া গ্রামে একখণ্ড পতিত ভূমি খেলারামের বাস্তু বলে নির্দিষ্ট হয়ে থাকে।কিন্তু এই খেলারামের সঙ্গে কবি খেলারামের কোন যোগ আছে কিনা তা জানা যায় না।ড.সেন সুস্পষ্ট করে লিখেছেন–“এ খেলারাম কে বা কি ছিলেন–ব্রাহ্মণ না মালী না ধীবর,ধর্মমঙ্গল কাব্যের রচনার অথবা গানের সঙ্গে তাঁহার কোন সম্পর্ক ছিল কিনা কেহ কিছু অবগত নহে”। পৃ-১২৯
ড.সেন হারাধন দত্ত আবিষ্কৃত গৌড়কাব্যের প্রামাণিকতা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এবং “স্থিত শৈলেশ্বর শিব বঙ্গের অঞ্চলে ইত্যাদি চার ছত্র হারাধন বাবুর রচনা এমন কি গৌরকাব্য নামটিও হারাধনবাবুর দেওয়া বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।

 খেলারাম -অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায়

মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্যের তথ্য ও কালক্রম প্রণেতা বিশিষ্ট গবেষক অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায় সুকুমার সেনের মত প্রায় মেনে নিয়েও দুটি নতুন তথ্য দিয়েছেন। এক -সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দশকে রচিত যাদুনাথের ধর্মপুরাণে এক খেলারামের অস্তিত্ব পাওয়া যায়-

বন্দিয়া পণ্ডিত রাম যাদুনাথ ভণে।
খেলারামে ধর্মরাজ রাখিবে কল্যাণে।। পৃ-২৫৬

তবে এই খেলারাম ধর্মঠাকুরও হতে পারেন।

দুই–অষ্টাদশ শতকের কবি মাণিকরাম গাঙ্গুলী তাঁর ধর্মমঙ্গলকাব্যে সুরিক্ষার পাটের বন্দীদের তালিকায় প্রচ্ছন্ন ভাবে যে কয়েকজন পূর্ববর্তী কবিদের নাম পাওয়া যায় যেমন কৃত্তিবাস নরোত্তম নিধিরাম কৃষ্ণদাস মুকুন্দরাম কাশীরাম চণ্ডীদাস প্রভৃতির সঙ্গে খেলারামের নামও পাওয়া যায়। অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় খেলারামকে রূপরামের ধর্মমঙ্গলপালাগানের গায়েন বলেই অনুমান করেছেন।

খেলারাম ও খেলারামঠাকুর

এ পর্যন্ত পড়ে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে খেলারাম চক্রবর্তী– কবি বা গায়েনের সঙ্গে খেলারাম ঠাকুরের সম্পর্ক কোথায়? বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনার দাবী রাখে ।প্রথমেই জানিয়ে রাখি ড. মিহির চৌধুরী কামিল্যা তাঁর প্রাগুক্ত গ্রন্থে যে পাঁচটি ধর্মশিলার উল্লেখ করেছেন তার নাম খেলা রায় বা খেলারাম রায়।  শুধু খেলারাম নন।

 খেলারা্মের থান কাটোয়া মহকুমায়

কিন্তু -খেলারাম নামে শুধু কবি বা প্রাচীন গায়েন নয়,ধর্মরাজ শিলা রয়েছে যা কোথাও ধর্মরাজের এক ভাই হিসাবে সুপরিচিত ।কোথাও আবার প্রধান বা স্বতন্ত্র রূপে পূজিত হচ্ছেন। অনুসন্ধানে কাটোয়া মহকুমাতেই অন্তত আটটি খেলারাম নামে ধর্মরাজের সন্ধান পেয়েছি। এগুলি কিন্তু খেলারাম রায় নয়।তালিকাটি নিম্নে প্রদত্ত হলো

ধর্মশিলা      গ্রাম                        থানা
খেলারাম    চাণ্ডুলি               কাটোয়া
খেলারাম    ঘোড়ানাশ মুস্থুল     কাটোয়া
খেলারাম     দেবকুণ্ড              কাটোয়া
খেলারাম     গুসুম্বা                 মঙ্গলকোট
খেলারাম     গাঁফুলিয়া             কাটোয়া
খেলারাম     কুরুম্বা গোপালপুর    মঙ্গলকোট
খেলারাম     ভালশুনি                   কাটোয়া
খেলারাম      ধান্যরুখি              মঙ্গলকোট

  ধান্যরুখির খেলারামঠাকুর

তবে  এই সমস্ত গ্রামে খেলারাম থাকলেও খেলারামের আদি থান স্থান হিসাবে লোকবিশ্বাসে বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে মঙ্গলকোট থানার ধান্যরুখি গ্রামে। বলা হয় আদি খেলারামের পাট ধান্যরুখি গ্রামে।

দ্বিতীয়ত--কাটোয়া অঞ্চলে খুবই জাঁক জমক বোঝাতে ব্যবহৃত হয় তুলোরাম খেলারাম কাণ্ড বাগধারাটি। এখানে তুলোরাম ধর্মশিলা। তুলো রায় নামে এক ধর্মশিলার সন্ধান পাওয়া যায় বীরভূমজেলার সিউরিতে। যদিও এই তুলোরাম ধর্মশিলা আমরা মনে করি মনে করি ধান্যরুখিতেই আছে।

খেলারাম একসময় জনপ্রিয় লোকদেবতা ছিলেন। ব্যক্তিনামে অনেক গ্রামে খেলারামের সন্ধান পাওয়া যায়।ক্ষেত্রসমীক্ষায় জানা গেছে খেলারামের কাছে মানত করে এই সন্তানের জন্ম বলেই খেলারাম নাম হয়েছিল। যেমন পঞ্চানন বা জটাধারী্র দোর ধরে জন্ম বলে অনেকের নাম সেই লোকদেবতার নামে। সুতরাং খেলারাম রায় নয়, খেলারাম ধর্মঠাকুরের কেন্দ্রস্থল নিঃসন্দেহে কাটোয়া অঞ্চল।

ধান্যরুখির খেলারাম প্রসঙ্গে আলোচনার পূর্বে আরও তিনটি জরুরি তথ্য জানানো প্রয়োজন।

প্রথমত-হারাধন বাবু উল্লিখিত শ্যামবাজার শুধু বদনগঞ্জে নয়, ধান্যরুখির পাশেই রয়েছে আরেক শ্যামবাজার।গ্রামটির পুরো নাম বড়া শ্যামবাজার।এই গ্রামের ধর্মরাজ বিখ্যাত।পুজো হয় জাঁক করে। এবং ধান্যরুখির খেলারামের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে।

দ্বিতীয়ত-গোঘাটের শ্যামবাজারের দুলু রায়ের খট্টা থেকে হারাধনবাবু গৌড়কাব্য আবিষ্কার করেছিলেন বলে দাবী করা হয় ।এবং মিহিরবাবুর তালিকায় উল্লিখিত একটি মাত্র দলু রায় শিলা গোঘাট সংশ্লিষ্ট উক্ত শ্যামবাজারের।কিন্তু ধান্যরুখি সংলগ্ন শ্যামবাজারে অন্যতম ধর্মশিলা এই দলুরায়। বলা হয় ইনি ধর্মরাজদের বড় ভাই।

তৃতীয়ত- হারাধনবাবু যে শৈলেশ্বর শিবের কথা উল্লেখ করেছেন তাও রয়েছে ধান্যরুখি থেকে আট কিমি দক্ষিণে চৈতন্যপুর গ্রামে।এই শৈলেশ্বর অনাদিলিঙ্গ।উচ্চতা প্রায় কুড়ি ফিট। সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী। চৈতন্যপুর সুপ্রাচীন জনপদ।এই গ্রাম থেকে মিলেছে খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের বিরল আভিচারিক বিষ্ণুমূর্তি।কথিত আছে রাঢ় ভ্রমণকালে দিব্যোন্মাদ মহাপ্রভুর চৈতন্য এই জনপদে পরিক্রমা কালীন ফিরে পেয়েছিলেন বলেই স্থাননামটি চৈতন্যপুর নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। সবমিলিয়ে এই মিল শুধু কাকতালীয় নাকি অন্য কিছু নির্দেশ করে?

 খেলারাম প্রকৃত দাবীদার

খেলারাম ধর্মঠাকুরের সঙ্গে যদি খেলারাম চক্রবর্তীর কোন যোগ থাকে তাহলে গোঘাট শ্যামবাজার নয়,তার প্রকৃত দাবীদার নিঃসন্দেহে মঙ্গলকোটের শ্যামবাজার ধান্যরুখি গ্রাম।এখন প্রশ্ন হলো খেলারাম ঠাকুরের সঙ্গে কবি বা গায়েন খেলারাম চক্রবর্তীর সঙ্গে কী কোন যোগ পাওয়া যায়? এবার সেই প্রসঙ্গেই আমাদের আলোচনা সম্প্রসারিত হবে।

 তুলোরাম খেলারাম

ধান্যরুখি অজয় তীরবর্তী প্রাচীন জনপদ। স্থাননামটির অর্থ হলো ধানক্ষেত।রুখ অর্থ বৃক্ষ।যেমন চর্যাপদে রয়েছে –রুখের তেন্তিলি কুম্ভীরে খাঅ”।গ্রামে আরও দুটি ধর্মরাজ পূজিত হয়। একটির সেবাইত পালেরা। এখানে বেশ কয়েকটি ধর্মশিলা রয়েছে যেমন বাঁকা রায় কালু রায় ইত্যাদি। খেলারামের পাশে আরেকটি ধর্মশিলা গাছতলায় পূজিত হন।এই ধর্মশিলার প্রকৃত কি নাম ছিল তা জানা যায় না।অনুমান করি ইনি সেই তুলোরাম।খেলারামের ভাই নয়, বন্ধু। এ নিয়ে অসাধারণ তাৎপর্যপূর্ণ এক লোকশ্রুতি আছে।

 ব্রাত্য খেলারাম ও ইতিহাসের ইঙ্গিত

ধান্যরুখি গ্রামে একসময় খেলারাম ব্রাত্য ছিলেন।অর্থাৎ সমাজের উচ্চবর্ণের দল ধর্মরাজকে মানলেও খেলারামকে এক ঘরে করে রেখেছিলেন। কেন এমনটি হয়েছিল এর কোন সদুত্তর পাওয়া যায় না।এমন কী এই খেলারামের সঙ্গে অন্য কারুর সম্পর্ক থাকুক তারা তা চাইতেন না।লোকগাথাটি তারই সাক্ষ্য দেয়।পালেদের ধর্মরাজের সঙ্গে থাকতেন এই খেলারামের বন্ধুটি।রাতে ইনি লুকিয়ে লুকিয়ে খেলারামের কাছে চলে আসতেন।খেলারামকে কেউ সহ্য করতে পারতো না। নিষিদ্ধ ছিল খেলারামের সঙ্গে যেন কোন সম্পর্ক না থাকে।একদিন লুকিয়ে এসে খেলারামের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে সকাল হয়ে গেল।গ্রামের সকলে দেখে ফেললো।সেই থেকে এই ধর্মরাজকে ব্রাত্য করে দেওয়া হলো।এখন তিনি একাকী থাকেন।তবে বন্ধু খেলারাম তাঁকে ভোলেনি।আজও খেলারামের পুজোর সময় তাঁর বিশেষ পূজা হয়।পাঁঠাবলি হয়।তবে তিনি ব্রাত্যই রয়ে গেলেন। আমাদের ধারনা ইনিই সেই তুলোরাম ধর্মঠাকুর বাগধারায় যা বলা হয়েছে তুলোরাম খেলারাম কাণ্ড। এবং অতীতে যে এই দুই ধর্মরাজের বিরাট জাঁক করে পুজো হতো তাও বাগধারাটি থেকে বোঝা যায়।

 পুজো

খেলারামের পুজো কোন ব্রাহ্মণে করেন না।সমাজের উচ্চবর্ণ  কর্তৃক তিনি পরিত্যক্ত।গ্রামের মধ্যস্থলে পুর্বমুখী দালানমন্দিরে খেলারামের অধিষ্ঠান।খেলারাম বলতে ফুট তিনেক উঁচু মাটির ঘোড়া।খেলারামের নিত্যসেবা হয়।দেয়াসিন কোটাল সম্প্রদায়।মন্দিরের দরজা জানলা সবসময় খোলা থাকে।খেলারামের নির্দেশ তিনি খোলা অবস্থাতেই থাকবেন।বোঝাই যায় আগে খেলারামের অধিষ্ঠান ছিল খোলা আকাশের নীচে পরে মন্দির করে দিয়েছে।বাৎসরিক পুজো হয় জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমায়।শ্যামবাজারের যাত্রাসিদ্ধিরায় ভিখারি রায় কালুরায় চাঁদ রায় মুক্তি রায় দলু রায়ের সঙ্গে। মুক্তস্নানের দিন খেলারামের বিয়ে আরেক জনপ্রিয় লোকানুষ্ঠান।

ষষ্ঠীর দিন ঘট স্থাপনা করা হয় গঙ্গাজল দিয়ে।সকাল থেকে প্রত্যহ তিনবার করে ঢোল বাজে।একাদশী থেকে শুরু হয় ঢাকের বাজনা।একাদশী থেকে চতুর্দশী পর্যন্ত শুরু হয় খেলারামের গ্রামপ্রদক্ষিণ।তেওড়া রসুই আতকুল লক্ষ্মীপুর চুরপুনি প্রভৃতি গ্রামে দেয়াসিন ঘোরা মাথায় করে যান। বৃত্তিধারী নির্দিষ্ট বাড়িতে খেলারামের বিশেষ পূজার্চনা ও ভোগ হয়।ত্রয়োদশীর রাত্রিতে শ্যামবাজারের ভিখারি রায়ের সঙ্গে খেলারামের মিলন হয়। সন্ন্যাসীর সংখ্যা শতাধিক।শ্যামবাজারের ধর্মরাজের পুজোয় বানফোঁড়া থাকলেও খেলারামের বানফোঁড়া নেই।এখানে ভাঁড়াল পোরা হয় মদ দিয়ে নয় গঙ্গাজলে।

 গায়েন

আগেই বলা হয়েছে খেলারাম নামে এক জন গায়েনের সন্ধান পাওয়া যায়।তিনি ছিলেন ধর্মমঙ্গল পালা দলের সর্বাধিনায়ক এবং সমকালে জনপ্রিয় মূল গায়েন।ইনি রূপরামকে হাতে যন্ত্র দিয়ে নাটগীত শিখিয়েছিলেন।রূপরাম তাঁর কাব্যে শ্রদ্ধার সঙ্গে খেলারামের কথা বলেছেন-

খেলারাম গাএন করিল বহু হিত।
হাতে যন্ত্র দিঞা শিখাইল নাটগীত।।
ধর্মের চরণে মাগিঞা নিএ বর।
খেলারামের কল্যান করিবে মায়াধর।।
অনাদ্যমঙ্গল দ্বিজ রূপরাম গায়।
হরিধ্বনি বল সভে পালা হল্য সায়।।

আরও পড়ুন- যন্ত্রে পূজা,কালীযন্ত্র এবং নাশিগ্রামের পদ্ম অলঙ্কৃত নেড়া মা

ধান্যরুখির খেলারাম পরিত্যক্ত
ধান্যরুখির খেলারাম পরিত্যক্ত

 আমাদের  অনুমান

আমাদের মনে হয় কবি বা গায়েন খেলারামের আরাধ্য দেবতা ছিলেন এই খেলারাম ধর্মঠাকুর। এবং তিনি শ্যামবাজার ধান্যরূখিতে জন্মেছিলেন। খেলারামের দেয়াসীন তথাকথিত অন্ত্যজ কোটাল বা পদ্ধানরা।হয়তো তাঁদের বংশের কোন মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন বলে শুধু গ্রাম ত্যাগ করতে বাধ্য হননি,তাঁর আরাধ্য ধর্মরাজ খেলারাম ঠাকুরও ব্রাত্য হয়েছিল অতীতের গ্রামবাসীদের কাছে। প্রসঙ্গত মনে রাখা দরকার কবি রূপরাম চক্রবর্তীও ছিলেন হাড়ির মেয়ের প্রণয়াসক্ত ও বিবাহ করেছিলেন। ফলত তিনিও বাড়ি বা সমাজ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন।এ বিষয়ে অম্বিকাচরণ গুপ্ত মশাই লিখেছেন–“রূপরাম পতিত ব্রাহ্মণ হইলেন,অদ্যাপিও তাঁহার বংশধরেরা হড্ডিপ জাতি যাজন করিয়া থাকেন”।বাসাই ২ পৃ-১৩৬ রূপরামের মতো হয়তো একই ভাগ্যবিড়ম্বিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন খেলারাম গায়েন বা কবি। গ্রাম থেকে হয়তো নির্বাসিত হয়েই তিনি হুগলির গোঘাট অঞ্চলে বসত করা শুরু করেছিলেন।

ছবি–অপূর্ব ব্যানার্জী


Share your experience
  • 326
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    326
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ড.স্বপনকুমার ঠাকুর

DR. SWAPAN KUMAR THAKUR
লেখক-গবেষক ও অভিজ্ঞ ক্ষেত্রসমীক্ষক। কৌলাল অনলাইন ওয়েবসাইট ও প্রিন্ট কৌলাল পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক। ড. ঠাকুর পেশায় শিক্ষক। প্রিয় বিষয় রাঢ়-বাংলার আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি । বিবিধ পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখেন।রচনা করেছেন ১৫টি বই ;বাঙ্গলার ইতিহাসে কাটোয়া,ইন্দ্রাণীর ইতিকথা, রাঢ় কথাঃমননে ও সমীক্ষণে,বঙ্গে বর্গিহাঙ্গামা ইতিহাস ও কিংবদন্তী,বাংলার মুখ,বাংলার লোক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি, রাঢ় বাংলার কবিগান,বাংলার কৃষিকাজ ও কৃষিদেবতা ইত্যাদি। পুরষ্কার ও সংবর্ধনা পেয়েছেন একাধিক সারস্বত প্রতিষ্ঠান থেকে যেমন কলকাতা প্রণয়-স্মারক পুরষ্কার, নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদ,কলিকাতা লিটিল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র থেকে পেয়েছেন সারস্বত সন্মাননা।

2 thoughts on “খেলারাম-লোককবি থেকে লোকদেবতা ও ধর্মরাজ প্রসঙ্গ

Comments are closed.