খড়দহের শ্যামসুন্দর- জড়িয়ে আছে ইতিহাস কিংবদন্তি ও নানা উৎসব

Share your experience
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

খড়দহের শ্যামসুন্দর।অপূর্ব এক কৃষ্ণবিগ্রহ।শুধু খড়দহের অধীশ্বর নন।বাংলার বিভিন্ন স্থানের মানুষ এই বিগ্রহ দর্শন করতে যান।সারা বছর ধরে শ্যামসুন্দর রাধারানিকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয় বিচিত্র উৎসব।আবার এই দেবতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস কিংবদন্তি লোকশ্রুতি।লিখছেন–অর্ঘ্য রায় চৌধুরী।

 

খড়দহের শ্যামসুন্দর
খড়দহের শ্যামসুন্দর

শ্রী শ্রী রাধা শ্যামসুন্দর জিউ হলেন খড়দহের গ্রামদেবতা।খড়দহ এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলে এমন কেও নেই যে শ্যামসুন্দরের মন্দির চেনে না বা যায়নি।বাইরের থেকে কোন আত্মীয় বা পরিজন এলে তাঁদের প্রথম আবদার শ্যামের মন্দিরে নিয়ে যাওয়া।এমনই এনার মাহাত্ম্য যে স্থানীয় বিহারি এবং ওড়িয়ারাও বিভিন্ন পালা পার্বণে পুজোর ডালি নিয়ে আসেন।

খড়দহের শ্যামসুন্দর

খড়দহের এই ভূমি শ্রীমন্নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর পদধূলি ধন্য।একচক্রার নিতাই এখানেই নিজের ভদ্রাসন স্থাপিত করেন নিজের দুই স্ত্রী জাহ্নবা এবং বসুধাকে নিয়ে।পুত্র বীরভদ্র এবং কন্যা গঙ্গামণির জন্মস্থান এখানেই।শ্যামসুন্দরের মন্দিরে তাঁর কুলদেবী ত্রিপুরাসুন্দরী এবং অনন্তদেবও আছেন।শোনা যায় গৌরাঙ্গদেবের আদেশে বিবাহ এবং সংসারধর্ম দুইই পালন করেন শ্রীমন্নিত্যানন্দ মহাপ্রভু।খড়দহে যখন আসেন তখন এখানে কুলীন বংশীয় শিরোমণি ব্রাহ্মণদের বাস ছিল।খড়দহে এখনও কুলীনপাড়া আর শিরোমণি পাড়া নামে দুটি অঞ্চল আছে।এই নিয়ে প্রচলিত রয়েছে নানা লোকশ্রুতি। কয়েকজন ব্রাহ্মণ  ঘাটে বসে ছিলিম টানছিল।

খড়দহ ও নিত্যানন্দ

নিত্যানন্দ বাসের জন্য কিছু ভূমি প্রার্থনা করলেন এবং তাঁদেরই একজন অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে একটি জ্বলন্ত কণা গঙ্গায় ছুঁড়ে দিয়ে বললেন ওখানেই বাড়ি তৈরি করতে।নিত্যানন্দের যোগবলে ততদূর পর্যন্ত একটি চড়া তৈরি হয় যায় এবং সেখানেই তিনি বসবাস করতে শুরু করেন।নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর বাসভবন বর্তমানের কুঞ্জবাটী নামেই পরিচিত।তবেই সেখানে বর্তমানে দালান রীতির গৌর-নিতাই মন্দির ছাড়া আর কিছুই।শ্যামের মন্দিরের গলির উল্টোদিকেই কুঞ্জবাটী।শ্যামসুন্দরের দর্শন করার পর অনেকেই সেখানে যান।নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর বংশধরেরা বর্তমানে বড় বাড়ি,মেজ বাড়ি এবং রথের বাড়ি এই ভাগে বিভক্ত।এই তিন বাড়িতেই শারদীয়া দুর্গাপূজা হয় এবং এখানে লক্ষ্মী সরস্বতীর বদলে থাকেন দুর্গার দুই সখী জয় এবং বিজয়া।নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর বাসস্থান আজ একটি শ্রীপাট এবং বৈষ্ণব পন্থার গুরুত্বপূর্ণ পীঠস্থান।

খড়দহের শ্যামসুন্দর ও বীরভদ্র

তিন ঠাকুরেরা হলেন-বল্লভপুরের শ্রী শ্রী রাধাবল্লভ জিউ,খড়দহের শ্রী শ্রী রাধা শ্যামসুন্দর জিউ এবং সাঁইবোনার শ্রী শ্রী রাধা নন্দদুলাল জিউ।এদের প্রতিষ্ঠার পিছনে শ্রীমন্নিত্যানন্দ তনয় বীরভদ্রের অবদান রয়েছে।আরেকটি কথা বলতে ভুলে গেলাম,খড়দহে আগে অসংখ্য বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন তাঁদের নিত্যানন্দ মহাপ্রভু বৈষ্ণব মন্ত্রে দীক্ষা দেন।সেইসব বৌদ্ধরা নেড়া-নেড়ি নামেই পরিচিত ছিল।নেড়া-নেড়ি এবং নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর কে বেশ কিছু গল্পকথাও শোনা যায়।ফিরে আসা যাক তিন ঠাকুরে কথায়।গৌড়েশ্বরের প্রসাদের থাকা একটি কষ্টিপাথরের থেকে প্রভুর বিগ্রহ তৈরি করার নির্দেশ পান বীরভদ্র প্রভু।

খড়দহের শ্যামসুন্দর রাধারানি
খড়দহের শ্যামসুন্দর রাধারানি

লোকশ্রুতি

সপার্ষদ গৌড়ে উপস্থিত হলে নবাব তাঁকে বন্দী করলেন এবং নিষিদ্ধ মাংস খাইয়ে জাত নষ্ট করার চেষ্টা করলেন।একটি ঢাকা দেওয়া খাবারের থালা আনা হল এবং ঢাকা খুলতেই দেখা গেল মাংসের বদলের কেবলই ফুল পড়ে আছে।অতঃপর সুরা আনিয়ে খাওয়ানো হল।কিন্তু সুরার জায়গায় চলে এল দুধ।অতঃপর নবাব ক্ষমা চেয়ে বীরভদ্রের কাছে তাঁর রুগ্ন জামাতা কে সুস্থ করে দিতে বললেন।বীরভদ্র দৈবক্ষমতায় তা করলেন এবং সেই কষ্টিপাথরটি চেয়ে নিলেন।সেই কষ্টিপাথর দিয়ে পরবর্তী কালে তিন ঠাকুরের বিগ্রহ তৈরি হল।বীরভদ্রের ধ্যানবলে দর্শন করা তিন রূপ থেকেই এই তিন বিগ্রহ তৈরি হয়।

শোনা যায় বীরভদ্র কষ্টিপাথরটি গঙ্গায় ভাসিয়ে দেন প্রথমে তা আকনা এবং অবশেষে খড়দহের ঘাটে আসে।এই তিন বিগ্রহের মধ্যে রাধাবল্লভ চলে যান বল্লভপুর রুদ্ররাম পণ্ডিতের কাছে এবং রাধা নন্দদুলাল চলে যান সাঁইবনে লক্ষণ পণ্ডিতের কাছে।এই তিন বিগ্রহই সত্যম শিবম্ সুন্দরম্ প্রতীক।মাঘী পূর্ণিমায় এই তিন ঠাকুরের একযোগে দর্শন করা হয়।অতঃপর আমাদের খড়দহতেও অনেক ভক্ত আসেন শ্যামসুন্দরের দর্শনে।

খড়দহের শ্যামসুন্দর বিগ্রহ

শ্রী শ্রী রাধা শ্যামসুন্দরের আদি মন্দির হল কুঞ্জবাটী।বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন অদ্বৈত আচার্য্যের জ্যেষ্ঠ পুত্র অচুত্যানন্দ গোস্বামী।জাহ্নবা দেবীর ইচ্ছায় প্রতিষ্ঠিত হয় অষ্টধাতু রাধিকা বিগ্রহও প্রতিষ্ঠা হয়।বর্তমানে তিনি একটি সুবৃহৎ আটচালা মন্দিরে আছেন।গর্ভগৃহের রাধা শ্যামসুন্দরের বিগ্রহ ছাড়াও আছে বাসুদেব,ত্রিপুরাসুন্দরী,নীলকণ্ঠ মহাদেব,জগন্নাথ,অনন্তদেব সহ আরও কিছু দেব বিগ্রহ।এই আটচালা মন্দিরও বহুবার সংস্কার করা হয়েছে।বছর দুয়েক আগে ট্রাষ্টি বোর্ড শেষ সংস্কার করে।মন্দিরের গলিতেই আরেকটি আটচালা মন্দিরে শ্রী শ্রী রাধা মদনমোহন জিউ আছেন।

ঠাকুর রামকৃষ্ণ ও সারদাদেবী

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এখানে বহুবার এসেছেন।তাঁর মতে দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী এবং কালীঘাটের দক্ষিণা কালীর মত খড়দহের শ্যামসুন্দরও সদা জাগ্রত বিগ্রহ।শ্রীমা সারদাদেবীও এসেছেন একবার।মন্দিরে মঙ্গলারতী,নিত্যপুজো,সন্ধ্যা আরতি এবং শীতলভোগ দেওয়া হয়।প্রসাদ গ্রহণের বন্দোবস্ত আছে (বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিতে প্রসাদ গ্রহণ এবং ভক্তদের সেবা দেওয়া বন্ধ আছে।)।বিষদ জানতে মন্দিরের অফিসে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

খড়দহের শ্যমসুন্দরের উৎসবাদি

এবারে আসি উৎসবের কথায়।শ্যামসুন্দরের রাসমঞ্চ এবং দোলমঞ্চ দুইই আছে।রাসমঞ্চের জন্যই স্থানীয় অঞ্চলটি রাসখোলা নামে পরিচিতহয়।দোল পূর্ণিমার দিন ভোরে রাজবেশ ধারণ করে শ্যামসুন্দর এবং রাধিকা আসেন দোলমঞ্চে।সারাদিনই প্রভুর পায়ে ফাগ নিবেদন করেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্তেরা।দুপুরে দোলমঞ্চেই স্নান ও ভোগরাগ হয়।সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়লেই প্রভু পালকি চড়ে সব খড়দহবাসীদের সঙ্গে আবির খেলতে খেলতে ঘরে ফেরেন।পথে দুই একটি বাড়ির সামনে ডালি নিতে দাঁড়ান।”কালো অঙ্গ লাল হবে তবে কি আসবে যাবে”,”আজ হোলি খেলব শ্যাম তোমার সনে”,”হরিবোল” এবং হরিরলুটের বাতাসায় ফাল্গুনী পূর্ণিমার বিকেল হয়ে ওঠে মোহময়।

খড়দহ ও দুর্গা
খড়দহ ও দুর্গা

দোলযাত্রা

দোলের আগের দিন ঠিক রাত আটটায়শ্যামের ঘাটে শ্যামসুন্দর আসেন চাঁচের জন্য।চাঁচরে আগুন লাগতেই সমবেত ভক্তবৃন্দের উপর আবির ছুঁড়ে দেওয়া হয় এবং “হরিবোল” ধ্বনিতে মুখরিত হয় চারিদিক।খড়দহের চার দিনের রাসোৎসব।রাস পূর্ণিমার সন্ধ্যায় পালকি চেপে শ্যাম যান রাসমঞ্চে।সারা রাত সেখানে অবস্থান করেন এবং ভোরে ফিরে আসেন।বাকি দুই দিনও একই ভাবে।এই তিন দিন শ্যামসুন্দর যথাক্রমে রাখাল,রাজ এবং নটবর বেশ ধারণ করেন।রাসের কটা দিন রাসমঞ্চের সামনে একটি মেলাও বসে।চতুর্থদিন গোষ্ঠ উৎসব এবং শ্রীরাধিকার মুখে মিষ্টি দিয়ে মানভঞ্জন করে রাসোৎসব শেষ হয়।

আরও পড়ুন- জগন্নাথ মদনমোহন-নীলাচলের ধর্মীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে

ঝুলনযাত্রা

ঝুলনের তিন দিন মন্দিরের বারান্দাতেই হিন্দোলে বসিয়ে যুগলের সেবা হয়।নাট মন্দিরে অনেক রাত পর্যন্ত চলে নৃত্য,গীত এবং নাটক।ঝুলন পূর্ণিমায় ভক্তরা রাখি দিয়ে পুজো দেন।দীপান্বিতা অমাবস্যার দিন শ্যামসুন্দর ধারণ করেন কালীর বেশ আর
কোজাগরী পূর্ণিমায় হয় শরৎরাস।বুদ্ধ পূর্ণিমায়ফুলদোল এবং নিত্যানন্দ ত্রয়োদশীর দিন প্রভুযান কুঞ্জবাটীতে,সেখানে হয় ৬৪ মহন্তের ভোগ।এছাড়া পয়লা বৈশাখ আর অক্ষয় তৃতীয়ার দিনঅনেকেই আসেন নতুন খাতা পুজো দিতে আর জন্মাষ্টমী এবং রাধাষ্টমী তো আছেই।তবে কোন উৎসব না থাকলেও বিকেলে এখানে এসে প্রণামকরতে বা দুদণ্ড বসে বেশ লাগে।

দেখে নিন বিখ্যাত তিন বিগ্রহ সম্পর্কে তথ্যচিত্র–

 

 


Share your experience
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

Facebook Comments

Post Author: অর্ঘ্য রায় চৌধুরী

অর্ঘ্য রায় চৌধুরী
অর্ঘ্য রায় চৌধুরী ছাত্র।সি.বি.এস.সি দ্বাদশ শ্রেণীর পরীক্ষা দিয়েছেন।ছবি তোলার সুবাদে বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহ আছে তবে মূলত বন্যপ্রাণী,পাখি এবং দেশের সাংস্কৃতিক ও লৌকিক ঐতিহ্য নিয়ে আগ্রহ বেশি।ভবিষ্যতে বাংলার পরিযায়ী পাখি এবং ভারতের অন্যান্য লৌকিক দেব-দেবী নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে আছে।