ক্ষুরধার দেওয়া- দিনাজপুরের এক বিলুপ্তপ্রায় লোকজীবিকা

Share your experience
  • 304
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    304
    Shares

"<yoastmark

ক্ষুরধার দেওয়া ,কাঁইচি শানানো সারা বাংলার মতো উত্তরবঙ্গের দিনাজপুরের এক শ্রেণীর মানুষের পেশা ছিল।সময়ের আবর্তন চক্রে ও উন্নত প্রযুক্তির দাপটে হারিয়ে গেছে এই লোকজ প্রযুক্তি।লিখছেন–কৌশিক বিশ্বাস

ক্ষুরের ধার

বিশ্বকর্মার আঠারো সন্তানদের তালিকায় যে এরা পড়ে না, এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। অন্তত লৌকিক গাথার সূত্র ধরে তো বটেই। লোহার, কামার বা কর্মকার সম্প্রদায়ের মধ্যেও এই পেশার উল্লেখ নেই। ষাটের দশকে পার্শ্ববর্তী বিহার থেকে প্রচুর মানুষের আগমন শুরু হয়েছিল বর্তমান দক্ষিণ দিনাজপুরে এবং তা ছিল নিতান্তই পেশার তাগিদে। এদের মধ্যে কিছু মানুষ পেশা হিসেবে সেসময় বেছে নিয়েছিলেন ক্ষৌরকর্মকে । এইসব পেশার বেশিরভাগ মানুষেরই পদবী ছিল ‘হাজম’।

ক্ষুরধার দেওয়া ক্ষৌরকার

পরবর্তীতে তাঁরা ‘শীল’ পদবী গ্রহণ করেছিলেন। আগে গ্রামীণ সমাজে এরকম একটি মূলপেশা সৃষ্টি করত বিভিন্ন অনুসারী পেশার। বর্তমান আলোচিত পেশাটিও এইরকমই একটি অনুসারী পেশা। এখনো অবধি এই পেশার সাথে যুক্তদের কোন পোশাকি নাম নেই। তবে এরা কিন্তু শুধুমাত্র ক্ষৌরকারদের ক্ষুর বা ক্ষৌরই ধার করেন আর এদের পেশা চিরকালই আবর্তিত হয়েছে ক্ষৌরকারদের উপর ভিত্তি করেই। বাঙালী জীবনে ওতপ্রোতভাবে সামাজিক, ধর্মীয়, ও লৌকিক কাজে ক্ষৌরকারদের প্রয়োজন হয়।

ক্ষুরধার দেওয়া–গ্রামীণ হাট বাজারে

এই ক্ষৌরকারদের মূল সরঞ্জাম ক্ষৌর। কয়েক দশক আগে ব্লেডের ব্যবহার সেভাবে ছিল না বললেই চলে। ফলত, ক্ষুর ধার করা ছিল অবশ্যম্ভাবী। ঠিক তখন থেকেই এই ক্ষুর ধার করার পেশা হয়ে উঠেছিল ওইসব মানুষদের কাছে হয়ে উঠেছিল জীবিকা নির্বাহের জন্য একমাত্র উপায়। দক্ষিণ দিনাজপুরের বিভিন্ন গ্রামীণ হাটে এখনো বিনয় শীল, খগেন শীলদের মতো লোকেরা বংশ পরম্পরায় এ কাজ করে চলেছেন। যদিওবা এখন আর তাদের প্রজন্মরা কেউ এই পেশায় আসতে চাইছে না। ব্লেডের বহুল ব্যবহার ক্ষুরের ব্যবহারকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করেছে। তাই ক্ষুর ধার করে সংসার প্রতিপালন তো দূরের কথা জীবন যাপন করাই দুর্বিষহ ব্যাপার। বয়সে প্রবীণ খগেনবাবু এখনো প্রতিদিন সাইকেলে করে এই ধার করা যন্ত্রটি নিয়ে ঘুরে বেড়ান গ্রামের হাটে হাটে।

ক্ষুরধার দেওয়ার যন্ত্র

যন্ত্রটি বলা যেতে পারে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরী। একটি গোলাকার লোহার দন্ডেরএকদিকে পাথরের একটি গোল চাকা থাকে। আর পুরো লোহার দন্ডটি একটি কাঠের গোলাকার খাম্বা দিয়ে আচ্ছাদিত। এই খাম্বার মাঝখানটা একটু নীচু রাখা হয় যাতে সাইকেলের চেন সেট হতে পারে। সাইকেলের চেনের প্রান্তে চেন টানার জন্য একটি গোলাকার ধাতব আংটি লাগানো থাকে। এই দাতব দন্ড যার একপ্রান্তে পাথরের চাকা থাকে তার কিন্তু দুটো দিকেই খানিকটা লোহা বের করা থাকে যাতে সেটা হাটে গিয়ে মাটিতে প্রতিস্থাপন করার সময় দুটো খুটির দুদিকে লাগানো যায়। এই খুটিটি কাঠের প্রায় দেড় ফুট উচ্চতার হয়। এইবার এই চেন ধরে টানলেই পাথরের চাকা ঘুরতে থাকে এবং এতে ক্ষুর ধরে তা ধার করা হয়। শুধু এই ধারের কাজে যন্ত্রটি ছাড়া একটি ছোট্ট বাটিতে জল ও এক টুকরো চামড়ার বেল্ট এরা ব্যবহার করেন।

বিলুপ্তপ্রায় পেশা

বর্তমান সময়ে ক্ষুরের ব্যবহার উঠে যাবার ফলে এই পেশা প্রায় বিলুপ্তির পথে। মাত্র ১০ টাকার বিনিময়ে একটি ক্ষুর ধার করে সংসার প্রতিপালন করা ক্রমেই এই পেশার প্রতি নতুনদের আগ্রহ কমিয়ে এনে তলানিতে এসে দাঁড় করিয়েছে। খগেনবাবু, বিনয়বাবুদের মতো যারা এই পেশায় কয়েক দশক থেকে যুক্ত আছেন তাঁরা শুধুমাত্র বাপ- ঠাকুরদার পারিবারিক জীবিকার স্মৃতি রক্ষার জন্য কাজ করে চলেছেন। পুরাতন দিনগুলো এখনো চোখে জল এনে দেয়। একসময় একাজ করাই তাদের সন্তানদের দুধেভাতে রাখতে পারতেন জীবন সায়াহ্ন আসা এই অশীতিপর বৃদ্ধ! আজ আর সেই দিন নেই। পড়ে থাকা ক্ষুরের মতো এই মানুষগুলির জীবন আজ ধারহীন। তাই দিনাজপুরের এই বিলুপ্তপ্রায় আজব পেশা আজ গুটিকয় মানুষের হাত ধরে এগিয়ে চলেছে স্মৃতিচিনহের পথে!

আরও পড়ুন-রানীপুতুল বা মেয়েপুতুল বাংলার লোকশিল্পের এক ঐতিহ্যবাহী ধারা

তথ্যসূত্র : ক) A Geographical,statistical and historical description of the district or zilla of Dinajpur in the province or subah of Bengal, Doctor Francis Buchanan

খ) বিনয় শীল, খগেন শীলের সাথে সাক্ষাৎকার।

গ) কামারপাড়া হাট সহ কিছু গ্রামীণ হাটে লেখকের নিজস্ব ক্ষেত্র অনুসন্ধান।

 দেখুন বেলের মালাশিল্প

 


Share your experience
  • 304
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    304
    Shares

Facebook Comments

Post Author: koushaikbiswaskoulal

কৌশিক বিশ্বাস
কৌশিক বিশ্বাস--তরিকুল্লাহ সরকার উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক। আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধ লেখক। বৌদ্ধ ইতিহাস, ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখক।