খুটা খ্যাটা-পশুপালনে দুটি দেশজ সরঞ্জাম ও আনুষঙ্গিকতা

Share your experience
  • 142
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    142
    Shares

খুটা খ্যাটা পশুপালনে দুটি দেশজ  উপকরণ।মূলত পশুপালনে ব্যবহৃত হয়।যদিও উচ্চারণের তারতম্যে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে এর আলাদা আলাদা নামকরণ দেখা যায় যেমন রাঢ় অঞ্চলে একে বলে খুঁটো ও খেঁটে।বিস্তারিত লিখছেন–কৌশিক বিশ্বাস।

খুটো খ্যাটা
খুটো খ্যাটা

খ্যাটা কছে খুটা তোর
মাথাত দিমু বারি
মোর গরুটা ব্যান্ধে দিমু
থাকবি না আর চাড়ি।।

পশু পালনে দেশজ সরঞ্জাম

এইরকম কত লৌকিক কথা, গান যে বাংলার লৌকিক ইতিহাসের আঙিনায় জনশ্রুতি হয়ে আছে তা আজকের আলোচিত পশুপালনের দুটি দেশজ সরঞ্জামের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আস্তে আস্তে দেশীয় সরঞ্জামের জায়গা নিয়েছে অত্যাধুনিক নানা যন্ত্রপাতি। হারিয়ে যেতে বসেছে এইসব শুরুর দিকের সরঞ্জাম যা গ্রামীণ মানুষ খুব সহজেই হাতের কাছে পাওয়া বাঁশ দিয়ে খুব সহজেই এইসব সরঞ্জাম তৈরী করতো। বুচানন সাহেব তার ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে এইসব দেশজ সরঞ্জাম, শিল্পসামগ্রী, ও শিল্পের উল্লেখ করেছিলেন। তার মধ্যে ছিল মাদুর, ঘানি, ঢেঁকি ইত্যাদি।

খুটা খ্যাটা

কিন্তু আজকের এই সরঞ্জাম মানে খুটা আর খ্যাটা এটির উল্লেখ এর আগে জনশ্রুতি, লোকভাষা, লোককথায় এর ব্যবহার ছাড়া আগে পাওয়া যায়নি। এইরকম অনেক গ্রামীণ সরঞ্জাম থেকে গেছে বৃহত্তর আধুনিক সমাজের লোকচক্ষুর অন্তরালেই। কৃষিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাষবাস আর পশুপালন অন্যতম জীবিকা অর্জনের ভিত্তি। আর এই দুটি ভিত্তির উপরই নির্ভর করে আবর্তিত হয়েছে গ্রামীণ লোকসমাজ ও লোকসাহিত্য। তাই প্রতিটি কৃষি সরঞ্জামের সাথে যুক্ত হয়েছে এইসব সরঞ্জাম কেন্দ্রিক বিভিন্ন লোককথা।

খুটা  তৈরি

আলোচিত দুটি সরঞ্জাম খুটা আর খ্যাটা ঠিক সেইরকম একটি সরঞ্জাম।খুটা একটি বাঁশকে কেটে লম্বা করে ফেড়ে তা এক একটি ছোট অংশে অর্থাৎ হাফ হাত আকারের তৈরী করা হয়। বাশের অংশটি ভাল করে দাউল দিয়ে চেঁছে মসৃন করে নীচের অগ্রভাগ ছুঁচাল রাখা হয় যাতে এর উপরে মাথার অংশে আঘাত পড়লে সহজেই মাটিতে পোঁতা যেতে পারে। এর উপরের অংশ মানে মাথার দিকটি বড় ও চওড়ায় প্রশস্ত রাখা হয় যাতে গবাদি পশুর দড়ি সহজেই বাধা যেতে পারে। মাথার দুদিকে কান রাখা হয় যাতে কোনভাবেই শক্ত করে বাধার পর দড়ি খুলে না যায়। এটিকে দেশীয় প্রযুক্তিতে পেরেক বলা যেতে পারে ।

খ্যাটা তৈরি

খ্যাটা একটি গোটা বাঁশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ দিয়ে বানানো হয়। তিনটি গিড়ালের আকারে একটি বাঁশের খন্ড নিয়ে তাকে দাউল দিয়ে কাটতে হবে। তারপর দুই গিড়াল মাপের মতো ঠিক রেখে তিন নম্বর গিড়াল বা গিটের আগে দাউল দিয়ে কেটে নিতে হবে। তারপর এই দুই গিড়ালের পর বাকি অংশে দাউল দিয়ে কেটে মুষ্টিবদ্ধ হাতে ধরা যাবে এমনভাবে হাতল তৈরী করতে হবে। সেটাকে পরিশেষে ভাল মতো চেঁছে নিতে হবে যাতে হাতে চাঁছ না ফোটে। এভাবেই খ্যাটা বানানো হয় যা দেশীয় প্রযুক্তিতে হাতুড়ির মতোই ব্যবহৃত হত।

খুটা খ্যাটা গবাদি পশু চারণে

মাঠে গবাদিপশু চারণের কাজে গ্রামীণ জীবনে এই দুটি সরঞ্জামের ব্যবহার একসময় ছিল বহুল প্রচলিত। শক্ত, দেহসৌষ্ঠব মানুষকে গ্রামীণ লোকসমাজে খ্যাটার সাথে তুলনা করা হত। গ্রামে অনেকের ডাকনাম বা লোকনামও খ্যাটা ছিল। মাঠে এই দুটি সরঞ্জাম দিয়ে পশুচারণ চলতো। আজ সবই হারিয়ে যেতে বসেছে স্মৃতির পাতায়!

আরও পড়ুন- ক্ষুরধার দেওয়া- দিনাজপুরের এক বিলুপ্তপ্রায় লোকজীবিকা

তথ্যসূত্র : ১) সখেন বর্মনের সাক্ষাৎকার।
২) লেখকের নিজস্ব ক্ষেত্র অনুসন্ধান ও ছবি সংগ্রহ।

 লোকপ্রযুক্তি নিয়ে কৌলালের একগুচ্ছ তথ্যচিত্র দেখুন


Share your experience
  • 142
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    142
    Shares

Facebook Comments

Post Author: koushaikbiswaskoulal

কৌশিক বিশ্বাস
কৌশিক বিশ্বাস--তরিকুল্লাহ সরকার উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক। আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধ লেখক। বৌদ্ধ ইতিহাস, ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখক।