কবিতীর্থ দামিন্যা-কবিকঙ্কণ মুকুন্দ চক্রবর্তীর স্মৃতি জড়ানো জনপদ

Share your experience
  • 382
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    382
    Shares

কবিতীর্থ দামিন্যা
কবিতীর্থ দামিন্যা-সিংহবাহিনী

কবিতীর্থ দামিন্যা-কবিকঙ্কণ মুকুন্দ চক্রবর্তীর স্মৃতি জড়ানো জনপদ।দামিন্যা’ নামে সত্যিই শিহরণ জাগে। মনের কল্পরাজে ভেসে ওঠে ষোড়শ শতাব্দীর কোন এক গ্রাম।কেমন আছে সেই দামিন্যা? লিখছেন–মানব মণ্ডল।

গন্তব্য কবিতীর্থ দামিন্যা

কাশফুল এখনো শুকোয় নি। পার্বতী কৈলাসে ফিরেছেন যাবার মাত্র কয়েকদিন হল। হেমন্তের স্পর্শে আচমকাই বাতাসে ছড়িয়ে গিয়েছে একরাশ শুষ্কতা। বাইক নিয়ে ঘোরা-ঘুরির পক্ষে সময়টা আদর্শ। তাই আবারো বেরিয়ে পড়া গেল। গন্তব্য কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের জন্মভিটা দামিন্যা গ্রাম। ‘দামিন্যা’ নামে সত্যিই শিহরণ জাগে। মনের কল্পরাজে ভেসে ওঠে ষোড়শ শতাব্দীর কোন এক গ্রাম।

কবিতীর্থ দামিন্যার পথে

দামিন্যার বর্তমান অবস্থান পূর্ব-বর্ধমান জেলায় হলেও আসলে এই গ্রাম হুগলী ও পূর্ব-বর্ধমানের সীমানায় অবস্থান করছে। তারকেশ্বর থেকে দূরত্ব মাত্র ২০ কিলোমিটার হলেও পথে পেরোতে হয় দু-দুটি নদী– দামোদর ও মুণ্ডেশ্বরী। দামোদর পেরিয়ে পশ্চিমদিকে যাবার ব্যবস্থা বেশ ভালোই। তারকেশ্বর থেকে সাহাপুর হয়ে কাঁড়ারিয়া সেতু ধরলেই দামোদর পেরিয়ে দেউলপাড়া আসা যায়। সেখান থেকে উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত দামোদরের স্বাভাবিক বাঁধ ছেড়ে পুনরায় পশ্চিমের রাস্তা ধরলেই ঢুকে পড়া যায় দো-আব অঞ্চলে। অর্থাৎ দামোদর ও মুণ্ডেশ্বরীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে। ডিহিবাতপুর, রনবাগপুর হয়ে রাস্তা সোজা চলে গেছে মুণ্ডেশ্বরীর খেয়া-ঘাটে।

মুণ্ডেশ্বরী

সেখানে গিয়ে দেখি নদীর সুবিশাল খাতে কিছুটা শুকিয়ে যাওয়া কাশফুলের সমারোহ। বালির মধ্য দিয়ে মোটরচালিত দ্বি-চক্রযান চলেছে সেকেন্ড গিয়ারে। মাঝে মাঝে এখানে সেখানে জমে আছে মুণ্ডেশ্বরীর জল। এখান থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার উত্তরে বেগর মুখ থেকে মুণ্ডেশ্বরীর উৎপত্তি। মুণ্ডেশ্বরীকে বর্তমানে দামোদরের একটা শাখা নদী বলা চলে। বেগর মুখের পর দামোদরের বিপুল জলরাশির অনেকটাই মুণ্ডেশ্বরীর পথে প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণ পশ্চিমে গিয়ে পড়ে রূপনারায়ণে। খানাকুলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বন্যার কারণ এই মুণ্ডেশ্বরী। সম্প্রতি আবার বেগর মুখে মুণ্ডেশ্বরীর খাত কিছুটা বুজে যাওয়ার কারণে দামোদরের বেশীরভাগ জল চাঁপাডাঙা আমতা খাতে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে সাম্প্রতিক অতীতে বন্যায় দামোদর তীরবর্তী পুরশুড়া এবং উদয়নারায়ণপুর বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে

যাই হোক মুণ্ডেশ্বরীতে খেয়া পেরিয়ে চললাম আরও পশ্চিমে। চক-বেশে গ্রাম থেকে কয়েক কিলোমিটার পশ্চিমে যেতেই পেয়ে গেলাম কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম রোড। বলাই বাহুল্য, এই রাস্তা ধরে উত্তরে ১০ কিলোমিটার গেলেই পৌঁছে যাওয়া যায় দামিন্যা গ্রামে।

কবিতীর্থ দামিন্যা বর্তমানে

কবিকঙ্কণের গ্রামে যখন পৌঁছলাম তখন বেলা প্রায় এগারোটা। প্রথমেই চোখে পড়ল একটি খেলার মাঠ আর তারই পাশে বন্যাদুর্গতদের জন্য সদ্য তৈরী হওয়া Flood Centre। বুঝলাম যে মুণ্ডেশ্বরী এখানে মাঝে মাঝেই ভীষণ ধ্বংসলীলা চালায়। তখন এই ত্রাণশিবিরই হয়ে ওঠে মানুষগুলোর নিরাপদ আশ্রয়স্থল। স্থানীয় মানুষকে জিজ্ঞেস করে সহজেই পৌঁছে যাওয়া গেল কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম সংগ্রহশালার সামনে। কবির বাস্তুভিটের ওপরই তৈরী হয়েছে এই সংগ্রহশালা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যে এটি বর্তমানে তালা-বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। চারপাশে একাধিক মাটির দোতলা বাড়ি চোখে পড়ল। সমগ্র পাড়াটিতেই কবির উত্তরপুরুষের বাস।

কবিকঙ্কণ প্রতিষ্ঠিত সিংহবাহিনী

একাধিক বাড়িতে শোনা যায় নিত্য পুজোর মন্ত্রোচ্চারণ ও চণ্ডীপাঠ। কবিকঙ্কণ প্রতিষ্ঠিত সিংহবাহিনী এখনো এই গ্রামে নিত্যপুজা পাচ্ছেন কবির বংশধরদের দ্বারা। কবির বংশধরেরা বর্তমানে ভট্টাচার্য পদবীধারী। কবির উত্তরপুরুষদের সাথে আলোচনায় জানা গেল যে বর্ধমানের মহারাজার কাছ থেকে তাঁরা এই পদবী পান। আদিতে স্বয়ং মুকুন্দরামের পদবী কি ছিল তা জানা যায় না। তবে মুকুন্দরাম ষোড়শ শতাব্দীর প্রাক্কালে এই গ্রামেই বাস করতেন। এই গ্রামে কবির ছ-পুরুষের বাস। কবিকঙ্কণ বিরচিত ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে কবি আত্মপরিচয় দিচ্ছেন এইভাবে–

“ সহর সেলিমাবাজ তাহাতে সজ্জন রাজ

নিবসে নেউগি গোপীনাথ

তাহার তালুকে বসি দামিন্যায় চাষ চষি

মিরাস পুরুষ ছয় সাত।” [১]

কবির স্মৃতি কবিতীর্থ দামিন্যায়
কবির স্মৃতি কবিতীর্থ দামিন্যায়

কবিতীর্থ দামিন্যা ও কবির কথা

 সেলিমাবাদ পরগণার দামুন্যা গ্রামে তালুকদার গোপীনাথ নিয়োগীর অধীনে কবির বংশ ছয়-সাত পুরুষ ধরে চাষবাস করছেন। তারপর রাজা মানসিংহের বঙ্গদেশ বিজয়ের সময় ডিহিদার মাহমুদ শরীফ ভীষণ অত্যাচারী হয়ে ওঠেন। সাধারণত কুড়ি কাঠায় এক বিঘা হয়। কিন্তু মাহমুদ শরীফের দলবল ১৫ কাঠায় এক বিঘে ধরে খাজনা আদায় করতে থাকে। খাজনা না দিতে পারায়—

 প্রভু গোপীনাথ নন্দী বিপাকে হইলা বন্দি

 হেতু কিছু নাহি পরিত্রাণে ।” [২]

এই অবস্থায় দামুন্যা গ্রাম ছেড়ে সবাই পালাতে থাকে। কবিকঙ্কণও স্ত্রী, শিশুপুত্র ও ভাই ‘রামা-নন্দী’কে সঙ্গে নিয়ে দামুন্যা ত্যাগ করেন। দারকেশ্বর ও আমোদর নদী পেরিয়ে কবিকঙ্কণ—-

“ উপনীত কোঁচড়িয়া নগরে”।[৩]

এটি বর্তমানে মেদিনীপুরের গুছুড়ে গ্রাম। এখানেই বিশ্রাম করার সময় কবির শিশুপুত্র ক্ষুধায় কাতর হয়ে ওঠে। কবি চণ্ডীর স্বপ্নাদেশ পান। কবির ভাষায়–

 মাতা করিল পরম দয়া দিলা চরণের ছায়া

আজ্ঞা দিলা রচিতে কবিত্ব

হাথে লইল পত্র মসী আপনি কলমে বসি

নানা ছন্দে লিখিল সঙ্গীত।”[৪]

কবির কথা

তারপর সেখান থেকে শিলাবতী বা শিলাই নদী পার হয়ে কবি পৌঁছে যান অধুনা মেদিনীপুর জেলার আরড়ার গড়ে। এই অঞ্চলকে তখন বলা হত ব্রাহ্মণভূম। ব্রাহ্মণভূমের রাজা বাঁকুড়া রায় কবিকে আশ্রয় দেন এবং বাঁকুড়া রায়ের পুত্র রঘুনাথ রাও এর গৃহশিক্ষক হিসেবে কবি নিযুক্ত হন। এবং সম্ভবত রাজা বাঁকুড়া রায়ই কবিকে চক্রবর্তী উপাধি দেন। চণ্ডীমঙ্গলের কোন পুথিতেই কবির নামের সাথে ‘রাম’ কথাটি খুঁজে পাওয়া না গেলেও লোকমুখে কবির নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘মুকুন্দরাম’।

চণ্ডীমঙ্গলের রচনাকাল এবং বিতর্ক

বাঁকুড়া রায়ের প্রয়াণের পর তাঁর পুত্র রঘুনাথ রায় রাজা হলে তাঁর সময়ই কবিকঙ্কণ রচনা করেন সুপ্রসিদ্ধ ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্য। চণ্ডীমঙ্গলের মূল পুথি কোনটি তা নিয়ে আজও বিতর্কের শেষ নেই। দামিন্যায় ভট্টাচার্য বাড়িতে রাখা পুথিটি মূল পুথি কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সুকুমার সেন। আবার তাঁর অভিযোগের জবাবে ঐ পুথিটিকেই মূল পুথি হিসেবে প্রতিপন্ন করতে চেয়েছেন গবেষক প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়। চণ্ডীমঙ্গল ঠিক কবে লেখা হয়েছিলে সে নিয়েও বিতর্কের শেষ নেই। চণ্ডীমঙ্গলের একটি পদ ধরলে–

“ শাকে রস রস বেদ শশাঙ্ক গণিতা

কতদিনে দিলা গীত হরের বনিতা।”[৫]

অর্থাৎ কবির দামুন্যা ত্যাগের সময় ১৪৯৯ শকাব্দ অর্থাৎ ১৫৪৪ খ্রিষ্টাব্দ। কিন্তু মানসিংহ বাংলার অধিপতি হন ১৫৯০ সালে, সেক্ষেত্রে ‘মানসিংহের কালে’ কবির দামুন্যা ত্যাগ স্বীকার করা যায় কি? সুকুমার সেন সম্পাদিত ‘চণ্ডীমঙ্গল’, আশুতোষ ভট্টাচার্যের ‘বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস’, অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’ প্রভৃতি গ্রন্থে চণ্ডীমঙ্গলের রচনাকাল নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা থাকলেও এটি এখনো বাংলা সাহিত্যের একটি অমীমাংসিত সমস্যা।

কবিতীর্থ দামিন্যাতে কী কবি পুনরায় ফিরেছিলেন?

দামুন্যা গ্রামে বসবাসকারী কবির উত্তরপুরুষগণ এবং বহু গবেষকই মনে করেন যে কবিকঙ্কণ পুনরায় ফিরেছিলেন নিজের গ্রামে। তারপরই সম্ভবত গ্রামে সিংহবাহিনী দেবীকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। শ্রদ্ধেয় বিনয় ঘোষ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি’ রচনাকালে গিয়েছিলেন ছোট বৈনান গ্রামে। সেখানে কবির উত্তরপুরুষের কয়েকঘর বসবাস করেন। সেই গ্রামে কবি সিংহবাহিনীর যে মূর্তি দেখেছিলেন তিনি চতুর্ভুজা।[৬] কিন্তু বর্তমান দামুন্যা গ্রামে সিংহবাহিনীর মন্দিরে আমরা যে মূর্তিটি দেখলাম তিনি দশভুজা। সিংহবাহিনীর আসল মূর্তি কোনটি তা নিয়েও যথেষ্ট বিতর্ক আছে। .

তেলো-ভেলোর মাঠ

দামুন্যা থেকে আমরা কবির দেশত্যাগের পথ ধরেই পৌঁছে গেলাম ভেলো বা ভালিয়া গ্রামে। এই গ্রামেই আছে বিখ্যাত তেলো-ভেলোর মাঠ। এখানেই সারদা মা একবার ডাকাতের কবলে পড়েন। মায়ের স্মৃতিতে এখানে গড়ে উঠেছে সারদা মায়ের মন্দির। এছাড়া সেই ডাকাতে কালী এখনো আছেন মাঠের ধারে।

শুধু সারদা মা ই এখানে ডাকাত দলের হাতে আক্রান্ত হন এমনটা কিন্তু নয়। বোধ হয় এই অঞ্চল অনেক আগে থেকেই ডাকতির জন্য বিখ্যাত থুড়ি কুখ্যাত ছিল। চণ্ডীমঙ্গল কাব্যেও দেখি, কবিকঙ্কণ যখন দামুন্যা ছেড়ে চলে আসছেন তখন এই ভালিয়া গ্রামেই জনৈক রূপ রায় তাঁর সর্বস্ব কেড়ে নেন। কিন্তু যদু কুণ্ডু নামক তেলি জাতিয় এক ব্যক্তি কবিকে আহারদি ও আশ্রয় দিয়ে রক্ষা করেন। কবি লিখছেন—

ভেলিঞাতে উপনীত রূপ রায় নিল বিত্ত

যদু কুণ্ড তেলি কৈল রক্ষা। ”[৭]

আরও পড়ুন- মুক্তাই চন্ডী মাতা – পশ্চিম বর্ধমানের এক জনপ্রিয় লৌকিক দেবী

কবিতীর্থ দামিন্যা- স্মৃতি

বিস্তীর্ণ মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে আমার সফর সঙ্গী সুলেখক সীমান্তবাবু বলে উঠলেন—“ এই জায়গায় কবিকঙ্কণ বিপদে পড়েছিলেন, এখানেই আবার সারদা মাকে ডাকাতে ধরে। সেই ডাকতে কালীর মন্দিরের সংস্কারের পর উদ্বোধন করেছেন রামকৃষ্ণ মিশনের কোন এক মহারাজ। আর আজ এই জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখছি দুর্গাপুজোর বিসর্জন উপলক্ষে চলছে দেদার হই হুল্লোড়। মদ্যপানও চলেছে। সত্যিই কাল—–মহাকাল কীভাবে বয়ে চলে।”ভালিয়া থেকে মায়াপুরগামী রাস্তা ধরে দক্ষিণ দিকে এলেই উঠে পড়া যায় অহল্যাবাঈ রোডে। সেই রোড ধরেই ফিরে এলাম যে যার বাড়ি, সঙ্গে নিয়ে এলাম দামিন্যার অসাধারণ কিছু স্মৃতি।

তথ্যঋণ

১. কবিকঙ্কণ বিরচিত চণ্ডীমঙ্গল, সুকুমার সেন সম্পাদিত, সাহিত্য আকাদেমি, পৃষ্ঠা ৩

২. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩

৩. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৪

৪.প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৪

৫.প্রাগুক্ত, ভূমিকা, পৃষ্ঠা ৩৮

৬ পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি, বিনয় ঘোষ, দীপ প্রকাশন, পৃষ্ঠা ১৫০

৭.কবিকঙ্কণ বিরচিত চণ্ডীমঙ্গল, সুকুমার সেন সম্পাদিত, সাহিত্য আকাদেমি, পৃষ্ঠা ৪

ছবি-লেখক


Share your experience
  • 382
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    382
    Shares

Facebook Comments

Post Author: manabkoulal

মানব মণ্ডল
মানব মণ্ডল।পেশায় শিক্ষক।ভালোবাসেন ক্ষেত্রগবেষণা করতে।