কবিগানের নানান অঙ্গ ও গায়কীর বৈচিত্র্যময় সঙ্গীত ধারা

Share your experience
  • 141
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    141
    Shares

কবিগানের নানান অঙ্গ ও গায়কী বৈচিত্র্যময় সঙ্গীত ধারা রয়েছে।কবিগান বাংলা লোকসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ৷ আনুমানিক সপ্তদশ শতাব্দী হতে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলা সংস্কতির এই বলিষ্ঠ সজীব ধারা নানা পরিবর্তন ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কতিকে সমদ্ধ করে চলেছে৷ বঙ্গের শ্রেষ্ঠ লোকগান কবিগান তার নিজস্ব গায়কীধারা ও আঙ্গিকতায় সম্পূর্ণরূপে স্বতন্ত্র৷ লিখছেন–কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্য।

 

কবিগানের নানান অঙ্গ কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্য
কবিগানের নানান অঙ্গ কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্য

এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত কবিয়াল শ্যামাপদ ভট্টাচার্যের গৌরচন্দ্রিকার একটি ছন্দ উল্লেখ্য—

“প্রথমেতে দেখাদেখি
উভয়েতে মুখোমুখি
বকাবকি চাপান উতোরে৷
হবে নাকো লাঠালাঠি
শুধু কথা কাটাকাটি
পরিশেষে মিলি পরস্পরে৷৷”

কবিগানের নানান অঙ্গ

কবিয়ালগণ কয়েকটি বিশেষ রীতিনীতি ও পর্যায়ের মাধ্যমে আসরে কবিগান পরিবেশন করে থাকেন৷ রামায়ণ-মহাভারত ও অন্যান্য মহাকাব্য, অষ্টাদশ পুরাণ ও বিভিন্ন উপপুরাণ, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী, বেদ ও উপনিষদ প্রভতি বিষয়কেন্দ্রিক কয়েকটি বিশেষ পর্যায়ভূক্ত হল কবিগানের লড়াই৷ সুতরাং কবিগানের রূপ বিশ্লেষণ করলে আমরা এর কয়েকটি বিশিষ্ট দিক বা ধারা দেখতে পাই৷ কবিগান গবেষকগণ নিজ নিজ যুক্তির মাধ্যমে কবিগানের ঐতিহ্যপূর্ণ অঙ্গকে কয়েকটি পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন৷ ডঃ সুকুমার সেন কবিগানের চারটি বিভাগ অর্থাৎ গায়কী পর্যায়ের উল্লেখ করেছেন— “গুরুদেবের গীত অর্থাৎ বন্দনা, সখীসংবাদ, বিরহ ও খেঁউড়৷ প্রত্যেক বিভাগে দুইটি করিয়া গান অর্থাৎ একটি প্রধান গান আর একটি দুই তিন ছত্রের ছোট গান(টপ্পা)৷ প্রধান গানে আছে ধুঁয়া এবং চিতান অথবা দীর্ঘতর পরধুঁয়া৷”

কবিগানের নানান অঙ্গ–সমালোচকদের মতামত

ডঃ সুশীলকুমার দে মহাশয়ও কবিগানের চারটি পর্যায়ের উল্লেখ করেছেন— মালসী, সখীসংবাদ, বিরহ ও খেঁউড় লহর৷ তিনি তাঁর ‘হিষ্ট্রি অব বেঙ্গলি লিটারেচার ইন দ্য নাইনটিন্থ সেঞ্চুরি’ গ্রন্থে লিখেছেন— “The Kabi-poetry, as it has come down to us related chiefly to four topics, namely MALASI, SAKHI SAMBAD, BIRAHA and KHEUR LAHAR.” ডঃ প্রফুল্লচন্দ্র পাল রচিত “প্রাচীন কবিওয়ালার গান” গ্রন্থে আমরা কবিগানের ষড়ঙ্গের উল্লেখ পাই৷ এগুলি হল— ১) সখীসংবাদ-গোষ্ঠী-গৌরচন্দ্রী, ২) মালসী-ডাকমালসী-লহরমালসী-আগমণী-বিজয়া, ৩) তরজা, ৪) খেঁউড়, ৫) আখড়াই ও ৬) বিচিত্র প্রসঙ্গ৷ সখীসংবাদ হতে আখড়াই পর্যন্ত পঞ্চাঙ্গ হল কবিগানের প্রাচীন ঐতিহ্যপূর্ণ ধারা আর ষষ্ঠ অঙ্গ বিচিত্র প্রসঙ্গ বা বিবিধ বিষয় হল কবিগানের আধুনিক ধারা৷

কবিগানের নানান অঙ্গ–   সখীসংবাদ-গোষ্ঠী-গৌরচন্দ্রী

ভগবান শ্রীকষ্ণ কংস বধার্থে অক্রুরের রথে আরোহন করে মথুরাগমন করেছেন এবং কুব্জাকে বামে লয়ে সেথায় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত আছেন৷ এদিকে কষ্ণবিচ্ছেদে বিরহিণী রাই বন্দাকে দূত হিসাবে মথুরায় পাঠাবেন কষ্ণসংবাদ আনয়ণের জন্য৷ যাত্রার প্রাক্কালে শ্রীরাধা ও সমস্ত সখীগণের শ্রীকষ্ণের প্রতি অভিযোগ-অনুযোগ বিষয়ক কথোপকথন ও বন্দাকর্তক শ্রীকষ্ণকে সংবাদ প্রদানের অনুরোধই হল সখীসংবাদ পর্যায়ভূক্ত৷ সখীসংবাদ প্রকতপক্ষে সখীতে-সখীতে বা শ্রীরাধা-সখীতে পরামর্শদানমূলক কথোপকথন, আর দূতীসংবাদে শ্রীকষ্ণের সহিত দূতীর প্রশ্নোত্তর, পরামর্শ ও সংবাদপ্রদানমূলক কথোপকথন৷

বৈষ্ণব প্রভাব

সুতরাং এই “সংবাদ” নামধারী নাট্যকাব্যগুলির নায়ক একমাত্র শ্রীকষ্ণ ও নায়িকা শ্রীরাধা আর প্রতিনায়িকা ললিতা, বিশাখা, চন্দ্রাবলী প্রভতি সহচরীগণ৷ সখীসংবাদ পর্যায়টি মূলতঃ বিরহকেন্দ্রিক, এই অংশে করুণরসাশ্রিত বিরহ ও মাথুর বিষয়ক গানই সর্বাধিক৷ পদাবলীর বিভিন্ন বিষয় যথা পূর্বরাগ, রূপানুরাগ, খণ্ডিতা, বসন্ত, অভিসার, মান, কলহান্তরিতা, আক্ষেপানুরাগ, কলঙ্কভঞ্জন, প্রেমবৈচিত্র প্রভতি এর অন্তর্ভূক্ত৷ বৈষ্ণব কবি জয়দেব বিরচিত “গীতগোবিন্দম” গ্রন্থের বারো আনা ভাগই সখীসংবাদ৷ তৎকালীন নায়ক-নায়িকার বিরহ ও আসন্ন মিলনের জন্য পবন, হংস, মেঘ প্রভতি দূত নিয়োজনের উল্লেখ আমরা পাই মহাভারত, বিভিন্ন পুরাণ ও দূতকাব্যগুলিতে৷ এই সমস্ত মাথুর ও বিরহ বিষয়ক সখীসংবাদের গানগুলিই অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে শ্রোতারা অত্যন্ত পছন্দ করতেন৷ মথুরাকে কেন্দ্র করে শ্রীরাধা ও শ্রীকষ্ণের বিচ্ছেদ বিষয়ক গানই হল মাথুর৷ কীর্তনের এই বিশেষ বিষয়টিই হল কবিগানের খুব উপভোগ্য পালা— “শ্রীকষ্ণ বনাম বন্দাদূতী”৷

কবিগানের সখীসংবাদ পর্যায় ছাড়া পদাবলী সাহিত্যের ভাবধারা আরও দুটি পর্যায়ে পড়ে— গোষ্ঠী ও গৌরচন্দ্রী৷ শ্রীকষ্ণের বাল্যলীলা, মা যশোদার প্রতি শ্রীকষ্ণের উক্তি, অক্রুর দর্শনে যশোদার খেদ প্রভতি বিষয় এই গোষ্ঠলীলা পর্যায়ভূক্ত৷ বাৎসল্য রসকেন্দ্রিক গোষ্ঠলীলার দুটি ভাগ— পূর্বগোষ্ঠ ও উত্তরগোষ্ঠ৷ গোপবালকগণের সাথে শ্রীকষ্ণকে গোচারণে পাঠিয়ে নানারূপ দুশ্চিন্তাবশতঃ মা যশোদার যে খেদ জন্মাত সেটাই কবিগানের গোষ্ঠবিভাগের পূর্ব পর্যায়৷ গোচারণ শেষে গোধূলিলগ্নে গোপবালকগণের সাথে শ্রীকষ্ণের নন্দালয়ে ফিরে আসা, উৎকণ্ঠিতা মাতা যশোদার গোপালকে জড়িয়ে ধরে স্নেহের আদর-চুম্বন এবং ননী, মাখন ভক্ষণ করানো প্রভতির ভাবসঙ্গীতই হল কবিগানের উত্তরগোষ্ঠ পর্যায়৷

গৌরচন্দ্রী পর্যায়ে কীর্তনের গৌরাঙ্গ বন্দনা বা গৌরচন্দ্রিকাই দেখা যায়৷ কীর্তনীয়ারা সর্বত্র সংকীর্তনের পূর্বে যে গৌরবন্দনা করেন সেটাই গৌরচন্দ্রিকা নামে আখ্যাত হয়৷ আধুনিক কবিগানে বর্তমানে সংক্ষিপ্ত গৌরচন্দ্রিকার পরই কবিগান আরম্ভ করা হয়৷

কবিগানের নানান অঙ্গ -মালসী-ডাকমালসী-লহরমালসী

মালসী গানের জন্ম চণ্ডীমঙ্গল, দুর্গামঙ্গল প্রভতি আখ্যায়িকামূলক মঙ্গলকাব্যোদ্ভূত খণ্ডগীতি হতে৷ পরবর্তীকালে এই মালসীগান দুইভাগে বিভক্ত হয়— উমাসঙ্গীত ও শ্যামাসঙ্গীত৷ কন্যার প্রতি মাতার স্নেহজনিত আক্ষেপ হল উমাসঙ্গীতের প্রকতি আর মাতার জন্য পুত্রের আকুতি, দর্শনাকাঙ্খা, খেদ প্রভতি শ্যামাসঙ্গীতের প্রকতি৷ মালসীগান দুই প্রকারের— ডাকমালসী ও লহরমালসী৷ লহরমালসী ডাকমালসীরই রূপান্তর ও সংক্ষিপ্তাকার এবং লহর অর্থাৎ লড়াইয়ের প্রয়োগ বা উপযোগের জন্য সম্ভবতঃ লহরমালসী নামকরণ করা হয়েছে৷

আগমনী-বিজয়াসঙ্গীত

শাক্ত পদাবলীর উমাবিষয়ক মালসী গানগুলি মূলতঃ চারটি স্তরে বিভক্ত— ১)আগমণী, ২)সপ্তমী, ৩)নবমী ও ৪)বিজয়া৷ বৎসরান্তে কন্যা উমা পিতগহে এসেছেন, সুতরাং মাতা মেনকার আনন্দের সীমা নাই৷ আগমণী সঙ্গীতে উমার আগমণ উপলক্ষ্যে মেনকার এই আনন্দোচ্ছ্বাসই ব্যক্ত দেখা যায়৷ দ্বিতীয় স্তর সপ্তমীর গানগুলিতে কন্যার গহে অবস্থিতির দরুন মাতার নিশ্চিন্তভাব ও প্রফুল্লতা ফুটে উঠে৷ নবমীকে কেন্দ্র করে ততীয় স্তরে আসন্ন বিদায় বেদনা ও উৎকণ্ঠার ভাব পরিব্যপ্ত৷ চতুর্থ স্তরের গানগুলিতে বিজয়াদশমীকে কেন্দ্র করে নগনন্দিনী উমার স্বাভাবিক বিদায় ও পুণরায় বৎসরেক কন্যাবিচ্ছেদের বেদনার কারণে মাতা মেনকার আক্ষেপ ও হতাশা ফুটে উঠে৷ তরজা বিষয়ক বিস্তারিত রচনা পূর্বেই প্রকাশিত হয়েছে৷

কবিগানের নানান অঙ্গ-   খেঁউড়

কবিগানের চতুর্থ অঙ্গ খেঁউড়কে অশ্লীল রসগান বলা হয়৷ তরজার মত খেঁউড়গানও অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং “খেতুর” হতে “খেঁউড়” শব্দের উৎপত্তি হয়েছে— খেতুর>খেউড়>খেঁউড়৷ “খেঁউড়” শব্দটি অনেক স্থলে সংক্ষিপ্তাকারে “খেঁড়ু” ও “খাঁড়” রূপেও ব্যবহত হয়৷ পুরাণোল্লিখিত চরিত্রের উল্লেখ খেঁউড় গানে খুব কমই দেখা যায়৷

আখড়াই

আখড়া অর্থে আমরা বুঝি একটি দল যাতে তিন-চারজন থেকে সাত-আটজন পর্যন্ত গায়েন, বায়েন, দোহারের সম্মিলিত সঙ্গীতানুশীল৷ চতুর্দশ শতাব্দী হতে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তীকাল পর্যন্ত বিষ্ণুপুরে, নবদ্বীপ-শান্তিপুরে, সপ্তগ্রামে ও ত্রিপুরায় বহু বিখ্যাত সঙ্গীত চর্চার আখড়া ছিল৷ “আখড়াই” শব্দটি “আখড়া” শব্দ থেকে আগত এ বিষয়ে আমরা জ্ঞাত৷ বাংলা অভিধানে “আখেট” বা “আখেটিক” শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়, যার অর্থ নত্যগীতাদির চর্চা বা স্থান৷ সুতরাং এইভাবে আখেট>আখেড>আখড>আখড়>আখড়া হতে “আখড়াই” শব্দের উৎপত্তি হয়েছে৷ গান্ধর্ববিদ্যার অনুশীলনকেও এক কথায় আখড়াই বলা হয়৷

কবিগানের আসরে কবিয়াল
কবিগানের আসরে কবিয়াল

বিচিত্র প্রসঙ্গ

কবিগানের এই ষষ্ঠ অঙ্গটি উপরোক্ত প্রাচীন পঞ্চাঙ্গগুলি থেকে সম্পূর্ণভাবে পথক৷ স্বদেশ, সমাজ, সমকালের দিকসমদ্ধ এই অঙ্গটি চিরনতুন, স্বতউদ্ভূত ও সদ্যোদ্ভূত৷

 আরও পড়ুন  গোপাল উড়ের টপ্পা গান ও বিদ্যাসুন্দর পালা

যাইহোক, আধুনিক কবিগানে উপরোক্ত প্রাচীন পর্যায়গুলি আর গাওয়া হয় না৷ অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীতে সখীসংবাদ, মালসী, গোষ্ঠ পর্যায়গুলি গাইতেই কবিয়ালদের ভোর হয়ে যেত এবং তারপর গৌরচন্দ্রিকা শেষে কবিগানের বিষয় শুরু করতেন৷ কিন্তু বর্তমানের কর্মব্যস্ত শ্রোতবর্গের সময়াভাবের কথা বিবেচনা করে কবিয়ালগণ কম সময়ের মধ্যে আসল তত্ত্ব ও তথ্য পেশ করেন সকলের চাহিদানুযায়ী৷ সমসাময়িক গণজীবন, মানবের বন্দনা, কালের বর্তমান গতিপ্রকতি ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলীই হল আধুনিক পর্যায়ের কবিগানের বিভিন্ন দিক, আর সেইজন্য কবিগান হল এক পরিপূর্ণ লোকসাহিত্য৷

(চলবে)

ঋণগ্রহণঃ “প্রাচীন কবিওয়ালার গান”
ডঃ প্রফুল্লচন্দ্র পাল

 শুনুন কবিগান


Share your experience
  • 141
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    141
    Shares

Facebook Comments

Post Author: গণেশ ভট্টাচার্য

গণেশ ভট্টাচার্য
গনেশ ভট্টচার্য --বাঁকুড়ার প্রখ্যাত কবিয়াল।কবিগানকে তিনি লোকশিক্ষার মাধ্যম করেছেন।কবিগানের পাশাপাশি তিনি রচনা করেছেন এই গানের ইতিহাস।দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংবর্ধিত হয়েছেন।