রাঢ়ের কৃষিসংস্কৃতি মুট আনা

Share your experience
  • 66
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    66
    Shares

সম্পর্ক মন্ডলঃকার্তিক মাস মানেই বাংলার রূপবৈচিত্রে শীতের আহ্বান শোনা শুরু হয়ে যায়। তিথি, রীতি, ব্রত আর পার্বণের আবহে সারাটা কার্তিক মাস যেন মেতে থাকে। কাতিক মাস হল কালীপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো বা রাস যাত্রার মতো বিভিন্ন উৎসব ও অলক্ষী ব্রত, ভূত চতুর্দশী ব্রত বা ভাতৃদ্বিতীয়া ব্রতের সমাহার। উত্তর রাঢ় বাংলায় কার্তিক মাসের সংক্রান্তিতে যেমন বেলপুকুর ব্রত, সন্ধ্যামণি ব্রতের চল দেখা যায়, তেমনই দেখা যায় গোটা অঘ্রাণ মাস জুড়ে থুয়া ব্রত বা রাসপূর্ণিমাতে কাত্যায়নী ব্রত। কার্তিক সংক্রান্তি থেকে গোটা অঘ্রাণ মাসে এই বেলপুকুর ও সন্ধ্যামণি ব্রত মূলত অবিবাহিত মেয়েরাই পালন করে। সন্ধ্যামণি ব্রতের ক্ষেত্রে সন্ধ্যামণি ফুল, সোনা, দূর্বা ঘাস প্রভৃতি সামগ্রীর সাথে এই ব্রত পালন করতে হয় এবং আকাশে তারা উদয় না হওয়া অবধি কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলা যায় না।বেলপুকুর ব্রতের ক্ষেত্রে অবিবাহিত মেয়েরা বাড়ির মাঝ উঠোনে একটি ছোট্ট পুকুর কাটে এবং সেই পুকুরকে কেন্দ্র করে এই ব্রত পালন করা হয়। তবে এই কাত্তিক সংক্রান্তিতে ব্রতগুলির কথা বাদ দিলে যদি প্রথমে আছে সেটি হলো উত্তর রাঢ়ের মুট পুজো।

এই পুজোতে মূলত কৃষিজীবী পরিবারগুলিই অংশগ্রহণ করে। সেই প্রাচীন বাংলার আদি অস্ট্রেলীয় সমাজের রীতি থেকে নেওয়া, এই পুজো হল প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানকে শ্রদ্ধা জানানোর পুজো। এই মুটপুজোতে কার্তিক সংক্রান্তির ভোরে প্রতিটি কৃষিজীবী পরিবারের একজন সদস্য স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্রে তাদের ধানের জমিতে উপস্থিত হয়, ওই সদস্যটি সাথে নিয়ে যায় একটি কাস্তে, সুপুরি, দূর্বাঘাস, সন্দেশ, একটি ধূপকাঠি ইত্যাদি। বলা হয়, যে জমিতে নবান্নের জন্য ধান লাগানো হয় সেই জমির ঈশান কোণে উপস্থিত হয়ে ওই সদস্যটি আড়াই গোছ ধানকে কেটে একটি শুদ্ধ বস্ত্রে বেঁধে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয

ধান কাটার পূর্বে তার সাথে নিয়ে যাওয়া গঙ্গাজল প্রথমে ধান গাছের গোড়ায় অর্পণ করে, সুপারি ও দূর্বাঘাসকে দেয়, তারপর সন্দেশটিকে ধান গাছের গোড়ায় দিয়ে আড়াই গোছ ধানকে কাটা হয়। ধান কেটে ধানের শিষগুলিকে সামনের দিকে রেখে ও গোড়াটিকে পিছন দিকে রেখে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সময় মাঠ থেকে বাড়ি পর্যন্ত সে কাউকে কথা বলতে পারে না ।তারপর বাড়িতে পৌঁছালে বাড়ির মূল চৌকাঠে দাঁড়িয়ে শঙ্খধ্বনি উলুধ্বনি সাথে তাকে বরণ করে, একটা পিঁড়ের ওপর দাঁড়াতে হয়।

সেখানে বাড়ির গৃহকর্ত্রী তার পা ধুইয়ে দেয় জল দিয়ে, তারপর উলুধ্বনি দিতে দিতে এবং সেই জল মাটিতে ছেটাতে ছেটাতে তাকে বাড়ির ভিতর অব্দি নিয়ে আসা হয়। বাড়ির ভিতরে এসে ঠাকুর ঘরে এসে উপস্থিত হয় এবং ঠাকুর ঘরে তার কেটে আনা আড়াই গাছি ধানকে মুট হিসাবে জলচৌকির স্থাপন করে। এই স্থাপন করা মুটের নিচে অর্ঘ্য সাজিয়ে একজন ব্রাহ্মণ পুজো করে। ধান্য দেবতা ও ধনের দেবতাকে শ্রদ্ধা রেখে এই পুজো সম্পন্ন হয় বলে মা লক্ষ্মী, পেঁচা ইত্যাদি প্রতীকী আলপনাতে সেজে ওঠে গ্রামের গৃহস্থ বাড়িগুলি বারান্দা, উঠোনগুলি।

উত্তর রাঢ় তথা কেতুগ্রাম থানাতে কার্তিক সংক্রান্তিতিথিতে নবান্নের প্রাক আবাহন সুর যেন বেজে যায়। ক্ষেত্রসমীক্ষা চালিয়ে দেখা গ্যাছে, উত্তর রাঢ়ে নবান্নের চাল হিসাবে সবার প্রিয় হল গোবিন্দভোগ এবং লঘু, তাই মুটপুজোতে কারও বাড়িতে লম্বা শিষওয়ালা গোবিন্দভোগ ধান বা খাটো শিষযুক্ত লঘু ধান মুটের গোছা হিসাবে পুজো হয়। এই দিন মূলত ধানের পুজো বলেই গ্রামে গ্রামে ধানা ভাঙানো, ধান সিদ্ধ বা রোদে ধান শুকাতে দেওয়া হয় না। সমীক্ষা চালিয়ে আরও দেখা গ্যাছে, কার্তিক সংক্রান্তিতে কৃষিজীবী পরিবারের মধ্যে এই পুজো হয় সদগোপ পরিবারগুলিতে কিন্তু শুঁড়ি সম্প্রদায়দের মধ্যে এই পুজো না সম্পন্ন হলেও তাদের বাড়িতে পয়লা অঘ্রাণ ভোরে স্নান করে মু্ট আনা হয়।

আবার ধর্মরাজ ঠাকুরের পূজারী তথা দেওয়াশিনদের আনা মু্টের পুজো হয় ধর্মরাজ ঠাকুরের ঘরে। তবে কেতুগ্রাম অঞ্চলের গঙ্গাটিকুরিতে অনেকের বাড়িতে মুটের বদলে ঘটে পুজো হয়, এর কারণে সন্ধানে দেখা গ্যাছে, ৪/৫ কিমি দূরের মাঠ থেকে হেঁটে হেঁটে বাচ্চা ছেলেদের মু্ট আনার অসুবিধা হয় বা বারবার বন্যাতে ধান নষ্ট হলে, অনেককাল আগে থেকেই কিছু কিছু বাড়িতে মুঠের বদলে ঘটে পুজো শুরু হয়। সর্বোপরি বলা যায়, আদি অস্ট্রেলীয় সভ্যতার দান হিসাবে প্রকৃতির সরঞ্জাম দিয়ে প্রকৃতি পুজোর এই রীতিতে গ্রাম বাংলার হেমন্তের আদিম সুরকে শ্রদ্ধা জানানো হয়, যা এই রাঢ়দেশ জুড়ে ক্ষয়িষ্ণুভাবে আজও রক্ষিত

ছবি–অপূর্ব ব্যানার্জি,শুভঙ্কর সিনহা।


Share your experience
  • 66
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    66
    Shares

Facebook Comments

Post Author: সম্পর্ক মণ্ডল

Samparka Mondal
সম্পর্ক মণ্ডল বর্ধমানজেলার গঙ্গাটিকুরি গ্রামের ভূমিপুত্র।এই গ্রামেই জন্মেছিলেন বিখ্যাত রসসাহিত্যিক পাঁচু ঠাকুর।সম্পর্ক কবি।প্রিয় বিষয় গ্রামবাংলার মানুষ আর গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি।সম্পাদনা করেন একটি সাহিত্য পত্রিকা।