কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রীপুজো

Share your experience
  • 24
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    24
    Shares

তিরুপতি চক্রবর্তীঃপশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার চন্দননগর,গুপ্তিপাড়া ও নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী উৎসব জগদ্বিখ্যাত। কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে দেবী জগদ্ধাত্রীর বাৎসরিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়। হিন্দু বাঙালির ধর্মীয় মানসে রাজসিক দেবী দুর্গা ও তামসিক কালীর পরেই স্থান সত্ত্বগুণের দেবী জগদ্ধাত্রী। নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজত্বকাল থেকেই বঙ্গদেশে জগদ্ধাত্রী পূজার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। বরিশালে প্রাপ্ত প্রাচীন জগদ্ধাত্রী মূর্তি, খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকে শূলপাণি রচিত গ্রন্থে জগদ্ধাত্রী পূজার উল্লেখ ও কৃষ্ণচন্দ্রের রাজত্বকালের পূর্বে নদিয়ার বিভিন্ন মন্দির-ভাস্কর্যে দেবী জগদ্ধাত্রীর উপস্থিতি থেকে প্রমাণিত হয়, বঙ্গদেশে জগদ্ধাত্রী আরাধনা কোনও অর্বাচীন প্রথা নয়।

জগদ্ধাত্রী পূজার নিয়মটি একটু স্বতন্ত্র। দুটি প্রথায় এই পূজা হয়ে থাকে। কেউ কেউ সপ্তমী থেকে নবমী অবধি দুর্গাপূজার ধাঁচে জগদ্ধাত্রী পূজা করে থাকেন। আবার কেউ কেউ নবমীর দিনই তিন বার পূজার আয়োজন করে সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর পূজা সম্পন্ন করেন। এই পূজার অনেক প্রথাই দুর্গাপূজার অনুরূপ। দেবী জগদ্ধাত্রীর পূজা অনুষ্ঠিত হয় দুর্গাপূজার ঠিক একমাস পর কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে। কাত্যায়নীতন্ত্র গ্রন্থে কার্তিকী শুক্লা নবমীতে দেবী জগদ্ধাত্রীর আবির্ভূত হওয়ার কথা আছে।

নদিয়া জেলার সদর কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনা করেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। কিংবদন্তী অনুসারে নবাব আলিবর্দির রাজত্বকালে মহাবদজঙ্গ রাজার নিকট থেকে বারো লক্ষ টাকা নজরানা দাবি করেন। নজরানা দিতে অপারগ হলে তিনি রাজাকে বন্দী করে মুর্শিদাবাদে (মতান্তরে মুঙ্গেরে) নিয়ে যান। মুক্তির পর নদীপথে কৃষ্ণনগরে প্রত্যাবর্তনের সময় ঘাটে বিজয়াদশমীর বিসর্জনের বাজনা শুনে তিনি বুঝতে পারেন সেই বছর দুর্গাপূজার কাল উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে। দুর্গাপূজার আয়োজন করতে না পেরে রাজা অত্যন্ত দুঃখিত হন। সেই রাতে দুর্গা জগদ্ধাত্রীর রূপে রাজাকে পরবর্তী শুক্লানবমী তিথিতে জগদ্ধাত্রী  পূজা করার আদেশ দেন।অন্য এক মতে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনা ১৭৬৬ সালে। কেউ কেউ আবার কৃষ্ণচন্দ্রের প্রপৌত্র গিরিশচন্দ্রকে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পূজার প্রবর্তক মনে করেন।আবার অন্য একটি সূত্র থেকে জানা যায়  যে কৃষ্ণচন্দ্র নবাব মিরকাশিমের দ্বারা গ্রেপ্তার হয়ে মুঙ্গের জেলে থাকাকালীন স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন দেবীর পূজা করার। ক্ষীরগ্রামের যোগাদ্যা ও মন্তেশ্বরের চামুণ্ডাপুজোর সেবাইতদের গুরুবংশ মেড়তলার বিখ্যাত তান্ত্রিক কালীশঙ্কর মৈত্রের নির্দেশ মেনে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র জেল থেকে ছাড়া পেয়ে জগদ্ধাত্রীপুজোর আয়োজন করেন।রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রীর ঘোড়াটির সঙ্গে মিল রয়েছে দাবাখেলার ঘোড়ার সঙ্গে।

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির দরজা জগদ্ধাত্রী পূজার সময় আজও খোলা থাকে। পূজা পুরনো প্রথা মেনে হয় শুধুমাত্র নবমী তিথিতে। ১৭৭২ সালে রাজবাড়ির দেখাদেখি কৃষ্ণনগরের চাষাপাড়ায় রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রজারা জগদ্ধাত্রী পূজা শুরু করেন। বুড়িমার পূজা নামে পরিচিত এই পূজা শুরু হয়েছিল ঘটে ও পটে। প্রথম দিকে স্থানীয় গোয়ালারা দুধ বিক্রি করে এই পূজার আয়োজন করতেন। ১৭৯০ সাল নাগাদ গোবিন্দ ঘোষ ঘটপটের পরিবর্তে প্রতিমায় জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনা করেন। এখানকার প্রতিমার বৈশিষ্ট্য হল প্রায় সাড়ে সাতশো ভরি সোনায় গয়নায় দেবীপ্রতিমার অলংকারসজ্জা। কৃষ্ণনগরের বাসিন্দাদের মতে এই দেবী অত্যন্ত জাগ্রতা; তাঁর নিকট মানত করলে সকল মনোষ্কামনাই পূর্ণ হয়। প্রসঙ্গত কৃষ্ণনগরে প্রাচীনকালে গোপ-শ্রেণির প্রাধান্য ছিল।শহরটির প্রাচীন  নাম রেউই যা বলরামের স্ত্রী রেবতী থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়।

এছাড়া কৃষ্ণনগরের উল্লেখযোগ্য বারোয়ারি জগদ্ধাত্রী পূজাগুলি হল প্রীতিসম্মেলনী, বালকেশ্বরী, মালোপাড়া, হাতারপাড়া,বাঘাডাঙা,কাঁঠালপোতা, উকিলপাড়া, ষষ্ঠীতলা, বউবাজার, নেদেরপাড়া, বাঘাডাঙা, পাত্রমার্কেট, কৃষ্ণনগর স্টেশন চত্বর, বেজিখালি, চকেরপাড়া, বাগদিপাড়া, মাঝেরপাড়া, ঘূর্ণি,শিবতলা বারোয়ারী হরিজনপল্লি, তাঁতিপাড়া, কালীনগর ইত্যাদি।

বর্তমানে কৃষ্ণনগরে বারোয়ারি জগদ্ধাত্রী পূজা হয় দুই শতেরও বেশি। কৃষ্ণনগরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো দশমীর সকালে মায়ের মঙ্গলঘট বিসর্জন। শোভাযাত্রা সহকারে সারা শহর পরিক্রমা করে ট্যাবলো সহযোগে কদমতলা ঘাটে প্রতিমার মঙ্গলঘট নিরঞ্জন হয়। তারপর মাঝরাতে বেয়ারা বাহিত হয়ে প্রতিমার নিরঞ্জন হয় জলঙ্গিনদীতে।

ছবি–লেখক


Share your experience
  • 24
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    24
    Shares

Facebook Comments

Post Author: tirupatikoulal

তিরুপতি চক্রবর্তী
তিরুপতি চক্রবর্তী।নদিয়ার শান্তিপুরের এই ক্ষেত্রগবেষক মূলত চিত্রগ্রাহক ও ক্ষেত্রসমীক্ষক।