মাকড়া মেলা- প্রধান আকর্ষণ মাকড়া সিন্নির নামে টুসুগান

Share your experience
  • 234
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    234
    Shares

মাকড়া মেলা- প্রধান আকর্ষণ মাকড়া সিন্নির নামে টুসুগান।মেলা গ্রামীণ অনাড়ম্বর লোকজীবনে নিয়ে আসে ক্ষণিকের আড়ম্বর এবং তাৎক্ষণিকভাবে অনাবিল ভাবের আবেশ। এরকম প্রায় পাঁচ শত বছরের প্রাচীন এক মেলা বসে বাঁকুড়ার খাতড়া মহকুমার হিড়বাঁধ ব্লকের দেউলী গ্রামে (জে.এল. নং-০২৫)। মাকড়া মেলার নামকরণ হয় ওই মেলার পূজিত মাকড়া সিন্নি নামক লোকদেবী থেকে। এই মেলার প্রধান আকর্ষণ টুসু গান। লিখছেন–সুমিত মহন্ত।

মাকড়া মেলা
মাকড়া মেলা

দেবী দুর্গার আগমনের থেকে বেশী আগ্রহের সাথে টুসুপরবের জন্য এই অঞ্চলের মানুষ সারাবছর উন্মুখ থাকে। এই এলাকার মানুষের টুসু গানে শোনা যায় মাকড়া মেলায় গমনের বর্ণনা-

মাকড়া যাওয়ার বড় হুটগুটি
লিঘা ভাঙ্গে রইল চাক দুটি।

এই গানে প্রাচীন মাকড়ি ভাষায় মেলার প্রাচীনত্বের ইঙ্গিত নিহিত রয়েছে।

মাকড়া মেলা- ইতিহাস

আনুমানিক ৫০০ বছর পূর্বে শিলাবতীর তীরবর্তী এই পুরাভূমি ঘনজঙ্গলে আবৃত ছিল। তখন দেউলী, মলিয়ান ও তেঁতুলিয়া গ্রামের মানুষেরা এই জঙ্গলাকীর্ণ নির্জন শিলাবতীর তীরে বাঈজী নাচ দেখতে আসতেন। মাসের নির্দিষ্ট দিনে মোরগ লড়াই হত। পরবর্তীকালে দেউলী গ্রামের ভূমিজরা এই মেলা প্রচলন করে। তখন রাজতন্ত্র। খাতড়ার রাজার মনোনীত দেউলী গ্রামের ভূমিজরা এই অঞ্চলের তাবেদার ছিল। তারা প্রচুর জমিজমা ভাগ পেত। ব্রিটিশ আমলে দেউলী গ্রামে বারোজন ভূমিজের সঙ্গে খাতড়ার রাজার সহৃদয়তার সম্পর্ক ছিল। অবশ্য কালক্রমে সেইসব ভূমিজরা তাদের জমিজমা অচিরেই বিনষ্ট করে ফেলে। মেলাটি পরিচালনা করার জন্য এগিয়ে এসেছিল ভূমিজপুত্ররা।

এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন – যোগিন্দ্র লায়া, দীপু সর্দার, যুগল সর্দার প্রমুখরা। প্রারম্ভে শুধু মেলা ও মোরগ লড়াই উভয়ই চলত সমান্তরালে। পরে দেউলী গ্রামের পেলারাম গোস্বামী যিনি দেউলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা তাঁর উদ্যোগে প্রথম মোরগ লড়াই বন্ধ করে হরিনাম সংকীর্তনের সূচনা হল। তখন মেলা চলাকালীন বীরভূম ও জয়দেবের থেকে বিভিন্ন ধরণের সাধুরা আসতেন। তাঁরা শিলাবতী নদীর ধারে শ্মশানে বিচিত্র ভঙ্গিতে ধ্যান করতেন।

মাকড়া মেলা- পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন

শিলাবতীর কোলে শ্মশানের ঠিক পাশেই অধিষ্ঠিত এই মেলার আরাধ্য অনার্যদেবী মাকড়া সিন্নি। এক প্রাচীন বৃক্ষের ছায়াতলে হাতি ঘোড়া বিশিষ্ট এই লোকদেবী শুধুমাত্র দেউলী গ্রামের লায়া পদাধিকারী ভূমিজদের নিকট পূজিত হন। এই মাকড়া সিন্নি দেবীর পাশেই রয়েছে বিক্ষিপ্ত ভাবে কয়েকটি ভগ্ন জৈন মূর্তি যা জৈনসভ্যতার উজ্জ্বল অভিজ্ঞান। একদা এই শিলাবতীর জলপথে জৈনবণিকরা বাণিজ্য করতে আসত। গবেষকদের মতে প্রাচীনকালে শিলাবতীর নাম ছিল কেতুমতী। তখন এই শিলাবতী নদীর তীরে বেশ কিছু বিশ্রামাগার জৈনরা নির্মাণ করেছিল।

হয়তো এই ভগ্ন মূর্তিগুলো সেই লুপ্তপ্রায় জৈনসভ্যতার নিদর্শন। সাতদিন ব্যাপী মেলা চলাকালীন এখানে চব্বিশ প্রহর হয় আটচালাতে। আটচালার পাশে রয়েছে নবনির্মিত শিবমন্দির। কিন্তু তার অন্তঃপুরে রয়েছে সুপ্রাচীন শিবলিঙ্গ যা পাতাল শিব নামে লোকমুখে পরিচিত। এই শিবলিঙ্গটি মাটির অনেক গভীর পর্যন্ত প্রোথিত। এরকম শিবলিঙ্গ এই অঞ্চলে বিরল। একদা এই অঞ্চলে শৈব ধর্মের প্রাধান্য ছিল। তার বহু পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ আমরা পেয়েছি। এই শিবলিঙ্গ তাদের মধ্যে অন্যতম।

মাকড়া মেলা ও টুসু পরব

এই মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ টুসু পরব। টুসু রাঢ় অঞ্চলের লৌকিক শস্যোৎসব। এই অঞ্চলের অগ্রহায়ন মাসের সংক্রান্তিতে টুসু পাতা হয় ঘরে ঘরে। একটি গর্ত করে তার মাটি দিয়ে কাঁচ বীজ, ইতু ঠাকুর ভাসানোর ফুল, গাঁদাফুল প্রভৃতি নৈবেদ্য দিয়ে টুসুকে সাজানো হয়। ধূপ, তুলসি পাতা, গাঁদা ফুল দিয়ে রোজ সন্ধ্যায় পুজো করা হয় এবং গীতবাদ্য সহযোগে টুসু গান গাওয়া হয়। এভাবে এক মাস ধরে চলত টুসু বন্দনা। মকরের পূর্বে বাঁউড়ির দিনে সারারাত জেগে টুসু গান হয়। যুবতী থেকে বৃদ্ধা সকলেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে টুসু গানে।

মকরের দিন ভোর থেকেই মকর ডুব দিয়ে নতুন জামাকাপড় পরার ধুম লেগে যায় শিলাবতীর কোলে। মাদল, ধামসা প্রভৃতি বাদ্যসহযোগে টুসুগান করতে করতে এগিয়ে আসে এই অঞ্চলের সাঁওতাল, ভূমিজ, ডোম প্রভৃতি জাতির মানুষ। শিলাবতীর বুকে তাদের প্রিয়তম টুসুকে ভাসানো হয়। তাঁদের টুসুগানে ভেসে আসে কোনো এক বিশেষ যুগের খাতড়া মহকুমা শহরের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট এইভাবে

খাতড়া থানার হাট লাগে ভারী
খাতড়া থানার ধারে ধারে
লোক বসে সারি সারি
আলু, বেগুন, কফি, মুলো
কত কাঁচা তরকারী।
খাতড়া থানার হাট লাগে ভারী

সে তো হাট দেখে বলিহারি।

মাকড়া মেলা্র বৈশিষ্ট্য

এই মেলায় আগত গোয়ালা সম্প্রদায় মানুষদের মধ্যে বিবাহের জন্য পাত্র পাত্রীর পাকা দেখা কাজটি সম্পন্ন হত নির্বিঘ্নে। বলা বাহুল্য, আদিবাসীদের বিবাহের এই আদিম রীতি এই মেলায় দেখা যায়। মেলার প্রাচীন ঐতিহ্যকে বহন করতে সাহায্য করেছে এই আদিম বিবাহপ্রথা।

 আরও পড়ুন-পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্প এবং মৃৎশিল্পীদের বারোমাস্যা

মাকড়া মেলা বাঁকুড়ার অন্যতম অন্যতম প্রাচীন মেলা। যে মেলার পুজো মণ্ডপে লৌকিক অনার্য দেবী বৃক্ষ ও পোড়ামাটির হাতি ঘোড়ার সঙ্গে প্রাচীন পদ্ধতিতে পূজিত হন, যার মধ্যে আমরা খুঁজে পাই সুপ্রাচীন অনার্য সংস্কৃতিকে। অন্যদিকে হরিনাম সংকীর্তনের মধ্যে উচ্চারিত হয়েছে মধ্যযুগের ভক্তিস্তোত্র। এককথায়, মাকড়া মেলা হল প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলার এক অপূর্ব সমণ্বয় এবং আর্য ও অনার্য মিশ্রসংস্কৃতির স্বর্ণফসল।

গ্রন্থপঞ্জীঃ-
১। সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। দক্ষিণ পশ্চিম রাঢ় পরিক্রমা। প্রথম প্রকাশঃ জানুয়ারী, ২০১৬। পৃঃ-৯৬।

 লৌকিক দেবদেবী নিয়ে কৌলালের ভিডিও দেখুন-


Share your experience
  • 234
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    234
    Shares

Facebook Comments

Post Author: সুমিত মহন্ত

সুমিত মহন্ত
সুমিত মহন্ত জন্মগ্রহণ করেন বাঁকুড়া জেলার তিলাবনী গ্রামে। বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর পড়াশুনো শেষ করে বর্তমানে পুরাতত্ত্ব গবেষণায় মনোনিবেশ করেছেন। ওনার স্বরচিত কবিতা, ছোটগল্প, নাটক প্রভৃতি লেখা বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখায় তার বিশেষ আগ্রহ আছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা তার অন্যতম ভালো লাগার বিষয়।