মরিন্দা তাল ভ্রমণ

Share your experience
  • 22
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    22
    Shares

মরিন্দা তাল ১

আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

ভূমিকা

মরিন্দা তাল গাড়োয়াল হিমালয়ের অসংখ্য গ্লেসিয়াল লেক, অর্থাৎ হিমবাহ থেকে উৎপন্ন লেকের মধ্যে একটি। হর-কি-দুন ভ্যালি থেকে বরাসু পাসের রাস্তায় তিন কিলোমিটার গেলে এই সুন্দর গ্লেসিয়াল লেকটির কাছে পৌঁছনো যায়। যাঁরা হর-কি-দুন ভ্যালি যাচ্ছেন, তাঁরা সেখান থেকে ঘণ্টা আড়াই ট্রেক করে মরিন্দা তালে ঘুরে আসতে পারেন।

গ্লেসিয়াল লেক

গ্লেসিয়ার, অর্থাৎ হিমবাহ দ্বারা সৃষ্ট লেককে বলে গ্লেসিয়াল লেক। হিমবাহ যখন পাহাড় থেকে নামে, তখন ভূমিক্ষয় করে নীচু গর্তমতো তৈরী করে, যদিও গর্ত বললে জিনিসটা ঠিক বোঝানো যায় না। বিশাল আয়তনের এই মহাগর্তগুলি হিমবাহ-গলা জলে ভর্তি হয়ে যে প্রাকৃতিক হ্রদটি তৈরী হয়, তাকেই বলে গ্লেসিয়াল লেক।গ্লেসিয়ার অর্থাৎ হিমাবাহের বরফগলা জলে পুষ্ট বলে গ্লেসিয়াল লেকগুলি মিষ্টি জলের (freshwater) হ্রদ।

অনেক ধরণের গ্লেসিয়াল লেক হয় – হিমবাহ দ্বারা ভূমিক্ষয়ের ফলে তৈরী Glacial erosion lake, ice-blocked lake, moraine-dammed lake, supra-glacial lake, sub-glacial lake ইত্যাদি।

পৃথিবীর বহু দেশেই গ্লেসিয়াল লেক আছে। আইসল্যাণ্ড গ্লেসিয়াল লেকের জন্য বিখ্যাত।বিশ্বের বৃহত্তম গ্লেসিয়াল লেক হল উত্তর আমেরিকার কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে অবস্থিত গ্রেট লেক সমূহ (The Great Lakes/The Great Lakes of North America/The Laurentian great Lakes) যার মধ্যে আছে লেক সুপিরিয়র, লেক মিশিগান, লেক হুরন, লেক এরি ও লেক অন্টারিও। এর মধ্যে লেক সুপিরিয়র বিশ্বের বৃহত্তম মিষ্টি জলের (freshwater) হ্রদ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন রাজ্যের সিয়াটল শহরের মধ্যে অবস্থিত লেক ইউনিয়ন একটি বিখ্যাত গ্লেসিয়াল লেক।

মরিন্দা তাল ২
মরিন্দা তাল ৩

হিমালয় অঞ্চলের গ্লেসিয়াল লেক

হিমালয়-কারাকোরাম-হিন্দুকুশ অঞ্চলে কয়েক হাজার গ্লেসিয়াল লেক আছে। সব গ্লেসিয়াল লেকের মত এই গ্লেসিয়াল লেকগুলিও যখন তখন হড়কা বান, যাকে বলা হয় GLOFবা Glacial Lake Outbursts Flood, ঘটাতে পারে। এই GLOF-য়ের কাছাকাছি সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত উদাহরণ হল ২০১৩ সালের কেদারনাথের কাছের চোরবালি তালের বিধ্বংসী বন্যা, যাতে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

মরিন্দা তাল

গোবিন্দ পশু বিহার জাতীয় উদ্যানের ভিতরে ৩৭৯৭ মিটার বা ১২,৩৪০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত মরিন্দা তাল (latitude 31.16648093, longitude 78.42867348) একটি গ্লেসিয়াল লেক, এবং পাহাড়ের গা বেয়ে নামা হিমবাহের জলে পুষ্ট হ্রদ। তবে লেক বললেই যে একটা দিগন্ত বিস্তৃত জলাশয়ের ছবি মনের চোখে ভেসে ওঠে, মরিন্দা তাল সেরকম কিছু নয়। দু’পাশে আকাশছোঁয়া পর্বতশ্রেণী, মধ্যিখানে অনেকটা একটি নদীর বাঁকের মত স্বচ্ছ জলাশয়। পিছনে, অর্থাৎ হর-কি-দুনের দিকে স্বর্গারোহিণীকে দেখা যাচ্ছে। সামনে তাকালে চোখে পড়ে রাটা ডো পেরিয়ে বরাসুর পাসের দিকে গাড়োয়াল ও হিমাচল প্রদেশের সীমান্তের বরফে মোড়া পর্বত শ্রেণী। পাহাড়ের গা বেয়ে ছোট ছোট অনামী গ্লেসিয়ার এসে পড়ে লেকের জলে। সিজনে অর্থাৎ জুলাই-আগস্টে এখানে প্রচুর ব্রহ্মকমল ফোটে।

মরিন্দা তাল ৪

লেখকের যাত্রা

২০১৮ সালের অক্টোবর মাসের শেষের দিকে হর-কি-দুন হয়ে বরাসু পাসের দিকে যাওয়ার পথে মরিন্দা তালে গিয়েছিলাম।

দেরাদুন থেকে ২১০ কিলোমিটার দূরে সাঁকরি, যা ঐ অঞ্চলের শেষ শহর। সাঁকরি থেকে আরও ১১ কিলোমিটার দূরে তালুকা পর্যন্ত ফোর হুইল ড্রাইভ গাড়ি চলার রাস্তা আছে। তালুকা থেকে মরিন্দা তাল হাঁটাপথে ৩১ কিলোমিটার।

আমরা তালুকা থেকে প্রথমদিন ১২ কিলোমিটার হেঁটে চিলুরগাঢ় পৌঁছে নাইটহল্ট করি। পরের দিন ওসলা হয়ে ১৬ কিলোমিটার হেঁটে হর-কি-দুনে রাত্রিবাস। তৃতীয় দিন রাটা ডো-র পথে ৩ কিলোমিটার হেঁটে মরিন্দা তাল। পুরো রাস্তাটাই টনস নদীর প্রধান উপনদী সুপিনের ধার দিয়ে।

হর-কি-দুন থেকে ঘণ্টা তিনেক হাঁটার পর আমরা পৌঁছে গেলাম মরিন্দা তাল। হর-কি-দুন থেকে মরিন্দা তালের দূরত্ব ৩ কিলোমিটার। তার মানে তিন কিলোমিটার আসতে আমাদের তিন ঘণ্টা লেগে গেল। হর-কি-দুন ৩৬০০ মিটার বা ১১,৭০০ ফুট উঁচু, মরিন্দা তাল ৩৭৯৭ মিটার বা ১২,৩৪০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। তার মানে এই তিন কিলোমিটারে আমরা প্রায় দুশো মিটার বা ৬৫০ ফুট চড়েছি। ৬৫০ ফুট শুনে তাচ্ছিল্য করাটা বোকামি, কারন প্রথমতঃ এই উচ্চতাটা সমানভাবে নেই, অনেক জায়গাতেই পথটা মোটামুটি সমতল দিয়ে গেছে, আবার হঠাৎ হঠাৎ পথে পড়েছে তীব্র চড়াই। আর দ্বিতীয়তঃ, পুরো পথটাই প্রায় ১২,০০০ ফুট বা তার উপরে।

যাই হোক, মরিন্দা তালে পৌঁছে আমরা আমরা বসলাম। একটানা তিনঘণ্টা হেঁটেছি, এবার একটু রেস্ট। তাছাড়া মরিন্দা তালও একটি দ্রষ্টব্য স্থান। হর-কি-দুন হয়ে মরিন্দা তাল পর্যন্ত একটি ট্রেকিংও হয়।

আমরা লেকের ধারে একটা বিশাল পাথরের আড়ালে ছায়ায় বসলাম। আকাশ ঝকঝকে পরিস্কার বলে রোদের তেজ প্রচণ্ড। তাছাড়া হাই অল্টিচ্যুডে আল্ট্রা ভায়োলেট রে খুব বেশি বলে সরাসরি গায়ে রোদ লাগলে কষ্ট হয়, চামড়া পুড়ে যায়। তাই হাই অল্টিচ্যুডে রোদ থেকে বাঁচার জন্য ফুল স্লিভ জামাকাপড়, সানগ্লাস, মাথা ঢাকা টুপি, সান স্ক্রিন লোশন ইত্যাদি ব্যবহার করার বিধি।

এই শেষ অক্টোবরে জলের ধারে স্নো জমে আছে। সিজনে অর্থাৎ জুলাই-আগস্টে এখানে প্রচুর ব্রহ্মকমল ফোটে। তাছাড়া তখন লেকের ধারের মাটি সবুজ ঘাসের কার্পেটে ঢেকে যায়। এখন ব্রহ্মকমলও নেই, আর ঘাসগুলিও মরে গিয়ে ব্রাউন হয়ে গেছে।

আমরা কিছুক্ষণ মরিন্দা তালের পাশে বসে রইলাম। কী অসাধারণ সুন্দর দৃশ্য চারধারে‍! এক কথায় স্বর্গ। অবশ্য হিমালয়ের সবটাই তো স্বর্গ।

মরিন্দা তাল ৫
মরিন্দা তাল ৬
মরিন্দা তাল ৭
মরিন্দা তাল ৮

কী ভাবে যাবেন

দেরাদুন থেকে পুরোলা অবধি বাস চলে। আর পুরোলা থেকে সাঁকরি গাড়ি। আর ইচ্ছে করলে দেরাদুন থেকে সাঁকরি গাড়িতে আসা যায়। ২১০ কিলোমিটার পথ, সাত-আট ঘণ্টা লাগে। সাঁকরি থেকে তালুকা ১১ কিলোমিটার গাড়িতে যাওয়া যায়। তারপর হাঁটা।

কোথায় থাকবেন

সাঁকরিতে GMVN-য়ের ট্যুরিস্ট রেস্ট হাউজ ও প্রাইভেট হোটেল আছে। তালুকায়, সীমায় ও হর-কি-দুনে ফরেস্ট রেস্ট হাউজ আছে। হর-কি-দুনেGMVN-য়ের ট্যুরিস্ট রেস্ট হাউজও আছে।

ট্রেকিংয়ের ব্যবস্থা

সাঁকরি থেকে অনেক ট্রেকিং কোম্পানিই ট্রেকিংয়ের ব্যবস্থা করে। নেটে দেখতে পারেন। আমি Himalayan Hikers নামের একটি কোম্পানির সঙ্গে গিয়েছিলাম।

লেক ইউনিয়ন, সিয়াটল

 

(ফটো — লেখক)

 

 

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 22
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    22
    Shares

Facebook Comments

Post Author: আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

asish chottopadhyay
আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৫৬) দুর্গাপুরের একজন প্রতিথযশা স্ত্রীরোগবিশেজ্ঞ। দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার হাসতালে ৩২ বছর অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চাকরি করার পর এখন উনি সম্পূর্ণ ভাবে গরীব ও দুস্থ রোগীদের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত রেখেছেন। দেশভ্রমণ, ফটোগ্রাফি এবং বিভিন্ন বিষয়ে ইংরেজি ও বাংলায় লেখালেখি করা ওঁর নেশা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং বইতে ওঁর তোলা ফটো প্রকাশিত হয়েছে। বাংলায় লেখা ওঁর দুটি ব্যতিক্রমী উপন্যাস, একটি ছোটগল্প-সংগ্রহ, একটি কবিতার বই , একটি ছড়ার বই ও দুটি ভ্রমণকাহিনী আছে, যার মধ্যে একটি উপন্যাস (চরৈবেতি) দুবার আনন্দবাজার পত্রিকার বেস্ট সেলার লিস্টে স্থান পেয়েছিল। ইংরেজিতে ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান ও মেলা নিয়ে লেখা ওঁর শতাধিক ব্লগের প্রায় দেড় লক্ষ ভিউ আছে। বাংলার মন্দিরের উপর ওঁর ইংরেজিতে লেখা একটি গবেষণাধর্মী প্রায় দুহাজার রঙিন ফটোসমৃদ্ধ ফটোগ্রাফিক ই-বুক আছে, যেটি সাধারণ মানুষ, যাঁরা মন্দির ভালোবাসেন কিন্তু খুব পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখা পড়তে চান না, তাঁদের জন্য লেখা।।