মশণ্ডা চণ্ডী-রানাঘাটের এই গ্রাম্যদেবীর বার্ষিক পুজো হয় বুদ্ধপূর্ণিমায়

Share your experience
  • 833
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    833
    Shares

মশণ্ডা চণ্ডী নদিয়ার রানাঘাটের মশণ্ডা গ্রামের অধিশ্বরী।তিনি গ্রাম্যদেবী।দেবীর বার্ষিক পুজো হয় বৈশাখী বুদ্ধ পূর্ণিমায়।দেবীর আবির্ভাব পুজোর বৈচিত্র্য নিয়ে লিখেছেন–শুভদীপ সিনহা।

 

"<yoastmark

মশণ্ডা চণ্ডী সন্ধানে

বাংলার প্রকৃতির মতই তাঁর সংস্কৃতিও সমান বৈচিত্র্যময়। কোভিড ১৯ এঁর করাল গ্রাসে সমগ্র পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে গেলেও বাংলার বৈচিত্র্যময় লোকসংস্কৃতি সাগরে অবগাহন করলে অরূপরতন পাওয়া খুব একটা কঠিন কাজ নয়। কর্মসূত্রে বিভিন্ন স্থানে বদলী হওয়ার সুবাদে বিভিন্ন স্থানের লোকসংস্কৃতি, মানুষদের সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য হয়েছে। প্রত্যেকের কাছ থেকেই পেয়েছি অকুন্ঠ ভালবাসা আর সাহায্য। আমার পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রাচীন মন্দির ও লৌকিক দেবদেবী নিয়ে লেখা ফেসবুক ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লিখে থাকলেও জানার যেমন শেষ হয় না তেমনি সেই জানার আনন্দকে অন্যদের সাথে ভাগ করে নেওয়ার আনন্দও আলাদা। সেরকম একটি স্থানের ভ্রমণের কথা আজ আপনাদের কাছে আজ বলব।

মশণ্ডা গ্রাম

এই স্থানটির নাম শুনেছিলাম আমার সহকর্মী শ্রী লালুপ্রসাদ দত্তের কাছে। ওর বাড়ি শান্তিপুর লাইনের হাবিবপুরে। ওর সাথে কথাপ্রসঙ্গে উঠে এল স্থানীয় মশুন্ডা চন্ডী মন্দিরের কথা। সেটা শুনে আমার যাওয়ার ইচ্ছা বেড়ে গেল। সেইমত গত শীতের সময় ঠিক করলাম একবার দেখেই আসি। যেরকম ভাবা সেরকম কাজ। এক শনিবার দেখে আমি হাজির হলাম রানাঘাটে। স্টেশন থেকে নেমে আগে থেকেই একটা টোটো ভাড়া করা ছিল, সেখানে চড়ে বসলাম। যারা আসতে চান তাঁদের বলি, আপনারাও রানাঘাটে নেমে টোটো ভাড়া করে নেবেন। কারণ ওখানে সরাসরি বাস বা অটো যায় না।

রাণাঘাট থেকে মাঝের মাঝদিয়া হয়ে যাওয়াটাই সুবিধা। জায়গাটি চূর্ণী নদীর তীরে। দুরত্ব প্রায় ৮ কিমি। রাস্তায় অনুকূল ঠাকুরের একটা আশ্রমও পড়ে। যাই হোক টোটো চলা শুরু করল। তখন বেশ শীত শীত ছিল। শীতের সকালটা বেশ মনোরম লাগে ওদিকে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটা জায়গাতে চা খেলাম। তারপর টোটো চেপে মোট ৩৫-৪০ মিনিটে পৌছে গেলাম মশুন্ডা চন্ডী মন্দির।

 মশণ্ডা চণ্ডীর থান

নদীয়া জেলার রাণাঘাট থানার অন্তর্গত নগাড়া মশুন্ডা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় মা মঙ্গলচন্ডী মন্দিরের অবস্থান। এই মন্দিরের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় যে, আজ থেকে আনুমানিক ২০০ বছর আগে মশুন্ডা গ্রামের কোন এক কৃষক তাঁর জমিতে লাঙ্গল দিয়ে কর্ষণ করছিল সেই সময় সে একটি শিলাপ্রস্তর দেখতে পায়। তখন সেই কৃষক জমির পাশে একটি বটগাছের নীচে ঐ শিলাটিকে রেখে নিজের কাজ সম্পন্ন করে চলে যায়। সেদিন রাতেই মা মঙ্গলচন্ডী তাঁকে স্বপ্নে দেখা দেন এবং প্রত্যেক বুদ্ধ পূর্ণিমায় ঐ গাছের নীচে উক্ত শিলাখন্ডটিকে পূজা করার আদেশ দেন।

মশণ্ডা চণ্ডীর আবির্ভাবের লোককাহিনী

মশণ্ডা গ্রামের চণ্ডীর আবির্ভাব সংক্রান্ত লোককাহিনীটি বেশ চমৎকার।সকালে কৃষকটি যখন গ্রামবাসীকে তাঁর স্বপ্নের কথা বলেন তখন অনেকেই তাঁর কথা বিশ্বাস করতে চায় না। এরপর সবাই মিলে বটগাছের নীচ থেকে উক্ত শিলাটিকে স্থানান্তরের চেষ্টা করে কিন্তু তারা কোনভাবেই সফল হয় না। এরপর তারা রাগের চোটে বটগাছের ডালপালা কেটে নেয়। অদ্ভুত ব্যাপার সেই দিন রাত থেকেই তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তাঁদের নানারকম ক্ষতি হতে থাকে। এরপর থেকেই গ্রামবাসীরা ঐ শিলাখন্ডকে দেবী চন্ডীর প্রতীক বলে মনে করতে শুরু করে এবং প্রত্যেক বুদ্ধ পূর্ণিমায় ঐ শিলাখন্ডের পূজা করা শুরু করে।

এরপর থেকে ঐ বটগাছের আশেপাশের গাছগুলিও অক্ষত থাকে এবং দেবী পূজার প্রসার হতে থাকে। এখানে মায়ের পূজার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল পাঁঠাবলি এবং এই বলির রক্ত দিয়েই মায়ের পূজা দেওয়া হয়। এইভাবে কেটে যায় প্রায় দেড়শো বছর। কালক্রমে জিতেন্দ্রনাথ মুখার্জী নামে গ্রামেরই এক সহৃদয় বিত্তশালী ব্যক্তি ওই দেবীশিলাকে কেন্দ্র করে একটি ছোট মন্দির স্থাপন করে দেন। সেই মন্দিরেই বর্তমানে দেবী পূজিত হন। এই গ্রামের পুরোহিতরাই বংশপরম্পরায় দেবীর পূজা করে থাকেন।

মশণ্ডা চণ্ডী- বার্ষিক পুজো

বুদ্ধপূর্ণিমার দিন শুধু নপাড়া মশুন্ডা গ্রাম পঞ্চায়েতের লোকই নয়, আশেপাশের গ্রাম থেকেও বহু মানুষের আগমন হয় দেবীর কাছে নিজের মনোবাসনা জানানোর জন্য এবং পরিবারের সকলের মঙ্গল কামনার জন্য। এই তথ্যগুলি আমি বর্তমান পুরোহিত মলয় কুমার ভট্টাচার্য্য এবং উজ্জ্বল ভট্টাচার্য্যের কাছ থেকে পেয়েছি। বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন আমরা জানি একাধারে ধর্ম পূজা ও গন্ধেশ্বরী পূজা- বাংলার এই দুই বিখ্যাত লৌকিক দেবদেবীর পূজা হয়। এঁর সাথে মশুন্ডা চন্ডীর কোন মিল আছে কিনা, তা জানতে গেলে আরেকটু গবেষণার দরকার আছে।

আরও পড়ুন —বিপত্তারিণী মা চণ্ডী দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার রাজপুরের ঐতিহ্য

মশণ্ডা চণ্ডী ও বৌদ্ধ প্রভাব

মশণ্ডা চণ্ডীর উপর কী বৌদ্ধ প্রভাব পড়েছে? অথচ তান্ত্রিক দেবীর মত দেবীর কাছে পাঁঠাবলিও হয়। দেবী মশুন্ডা চন্ডীর উপর বৌদ্ধ প্রভাব পড়েছে কিনা সেটাও প্রশ্ন। দেবীর পূজা মঙ্গলচন্ডীর ধ্যান মন্ত্রে হয়। আমাদের বাংলার প্রায় সর্বত্রই বৃক্ষ পূজা ও শিলামূর্তির পূজার যে রীতি দেখা যায়, মশুন্ডা চন্ডীর পূজাও তারই একটি অংশ বলে আমার মনে হয়। যাই হোক, দর্শন শেষ করে মনে একটা তৃপ্তি নিয়ে ফিরে এলাম আবার রাণাঘাট। আমাদের আশেপাশেই কত দেখার জায়গা আছে অথচ আমরা জানি কতটুকু। লকডাউন উঠলে আপনারাও আসুন। ভাল লাগবে।

দেখুন–

 

 


Share your experience
  • 833
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    833
    Shares

Facebook Comments

Post Author: শুভদীপ সিনহা

শুভদীপ সিনহা
শুভদীপ সিনহা।সরকারি আধিকারীক।ক্ষেত্রসমীক্ষক ও লোকসংস্কৃতি চার্চায় বিশেষ আগ্রহী।