মেধসাশ্রম গড়চণ্ডীধাম তথা শ্যামরূপার লোক- ইতিহাস

Share your experience
  • 302
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    302
    Shares

বর্তমান শ্যামরূপা চণ্ডী মন্দির

ডা.তিলক পুরকায়স্থ

কোন এক দুর্গাপূজায়, ষষ্ঠীর দিন দুপুরে হঠাৎ করে বেরিয়ে পড়লাম পানাগড় ইলামবাজার রোড ধরে, অজয় নদের ধারে গড় জঙ্গলে।গড় জঙ্গলের কথা এত শুনেছি, কিন্তু আগে যাওয়া হয়নি।এক ঢিলে অনেক পাখি মারা হবে, গড় জঙ্গল ভ্রমণ, সঙ্গে মার্কণ্ডেয় পুরাণে লিখিত, রাজা সুরথের পূজিত প্রথম দুর্গা পূজার স্থান দর্শন, সবচেয়ে আনন্দদায়ক ব্যাপার হবে শ্যামারূপা চণ্ডী ও ইছাই ঘোষের ঐতিহাসিক দেউল ঘুরে দেখা।
এন এইচ ১৯ ধরে দুর্গাপুর, মুচিপাড়া পৌঁছলাম।এখান থেকে কল্পনা ইন এর পাশ দিয়ে বাঁ দিকে চলে গেছে অজয় নদ পেরিয়ে জয়দেবের রাস্তা।অতি চমৎকার রাস্তা, বিশেষ করে মলান দীঘি থেকে পুরো রাস্তার দুই দিকেই ঘন সবুজ শালের জঙ্গল আপনার মন কেড়ে নেবে।অজয় নদ পৌঁছানোর অনেক আগে ডানদিকে পথনির্দেশ আছে, গড় জঙ্গলের।এখান থেকে ডানদিক ঘুরতে হবে। বোলপুর বা পানাগর /  দুর্গাপুর থেকে বাসে এলে, গড় জঙ্গল বললে আপনাকে এইখানে নামিয়ে দেবে।কিন্তু নিয়মিত যান চলাচল নেই বলে, বাকি রাস্তাটা হেঁটেই যেতে হবে।হাঁটতে ভালোই লাগবে, গ্রামের লোকেরা তো হেঁটেই যাতায়াত করে। আমরা অবশ্য গাড়ি নিয়ে চলেছি।
এখনও এখানকার জঙ্গল, দুর্ভেদ্য না হোক তবুও যথেষ্ট গাছ গাছালিতে ভরা এবং রোমাঞ্চকর।
শাল, শিরীষ, অর্জুন আরো কত নাম না জানা গাছগাছালিতে ঢাকা , লাল মোরামের চমৎকার এই পথ দিয়ে চলেছি গড় জঙ্গল।ঝাঁকে ঝাঁকে ফিঙে, বুলবুলি আর গাছের কোটরে উঁকি দিচ্ছে টিয়ার টুকটুকে সবুজ ছানা।কোনো কোনো জায়গায় ভর দুপুরেও সূর্যরশ্মির প্রবেশ নিষেধ।বেশ একটা রোমাঞ্চকর আলো আঁধারির পরিবেশে পৌঁছলাম মেধা মুনির পৌরাণিক কাহিনী আশ্রিত আশ্রমে।
্ক
বর্তমান শ্যামরূপা চণ্ডী

 

মেধা মুনি বা মেধসাশ্রমে গড়চণ্ডীধামের কাহিনী যা ওখানে লিখিত আছে, তা এরূপ।
” মহাপুরান দেবী ভাগবত ও মার্কণ্ডেয় পুরাণে পঞ্চম স্কন্ধে সুস্পষ্ট বিবরণ আছে, পূর্ব কালে, বোলপুর সুপুর ছিল  সুরথ রাজার রাজধানী, বোলপুর সুপুর হইতে তিন যোজন ব্যবধানে অর্থাৎ ৩৯ কিমি, পশ্চিমে অজয় নদের দক্ষিণ তীরে, শাল অরণ্যে শবর কিরাত ভূমিতে, মহামুনি মেধস তপোভূমির অবস্থান। রাজা সুরথ রাজ্য হারিয়ে, সমাধি বৈশ্য সংসার হইতে বিতাড়িত হইয়া, মেধসাশ্রমেনিরাপদে থাকার জন্য আশ্রয় নিয়েছিলেন।মেধা মুনির আদেশে রাজা ও সমাধি বৈশ্য, মৃন্ময়ী দুর্গাদেবী প্রতিমা নির্মাণ করিয়া শ্রী শ্রী দুর্গাপূজা শুরু করেন।রাজার রাজ্য লাভ, সমাধি বৈশ্যর আত্মজ্ঞান লাভ হয়। বঙ্গপ্রদেশে রাঢ় বাংলায় মেধসাশ্রমে সর্ব প্রথম শ্রী শ্রী দুর্গাপূজা শুরু হইয়াছিল।রাঢ় বাংলার মহাতীর্থ ভূমি, মেধসাশ্রম, শ্রী শ্রী গড় চণ্ডী শ্রী শক্তি মহামায়া ধাম।”
সাধুবাবারা রক্তবর্ণের আভরণ ও টিকা নিয়ে ব্যাস্ত পুজোর আয়োজনে।বর্তমান মন্দিরের পেছনেই আদি মেধা মুনির আশ্রমের খণ্ডহর।সেখান থেকে সামান্য দূরেই এক অতি প্রাচীন ঢিবি।বোর্ডে লেখা আছে এখানেই রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে প্রথম দুর্গা পুজো করেন।
 অবশ্য এর সত্যাসত্য নিয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়, কারণ এটি বিশ্বাস ও ভক্তি দিয়ে, পুরাণ কথা অনুসারে , মেধাশ্রমে সাধুদের অন্তরের বিশ্বাস। এই বিশ্বাস ও লোককথার মধ্যে ইতিহাসকে খুঁজতে না যাওয়াই ভালো।
গড় জঙ্গলের দুর্গাপুজোর একটি লোকমুখে প্রচলিত আখ্যান যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। একসময় অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে নাকি সারা পাহাড় জঙ্গল কাঁপিয়ে পর পর তিনবার তোপ ধ্বনির আওয়াজ শুনতে পাওয়া যেত। সেই দৈবিক আওয়াজ শুনেই একদা এখানে পশুবলি শুরু হত।
আবার ফিরে এলাম মেধাশ্রমে।তখন সদ্য মন্দিরের দরজা খুলেছে দুর্গা মা দর্শনের জন্য।মেধাশ্রম থেকে গেলাম মহামান্ডলিক  ইছাই ঘোষের আরাধ্য দেবী শ্যামা্পারূ চণ্ডী মন্দিরে।জনশ্রুতি রাজা লক্ষণ সেনও এই মায়ের মন্দির নিয়মিত পুজো দিতে আসতেন।পূজারীর কথা অনুসারে, অতীতের জীর্ণ মন্দিরের উপর এই নতুন মন্দিরটি নির্মাণ হয়েছে। দুর্গা এবং কালী পূজাতে অসংখ্য ভক্ত সমাগম হয়।
রাজা-সুরথের-পূজিত-প্রথম-দুর্গা-পূজার-বেদি।.
একদা এই মন্দিরটি পুনর্নিমান করেছিলেন, বর্ধমানের রাজা। তখন রাজকোষ থেকেই পুজো ও পুরোহিতের দক্ষিণার ব্যবস্থা ছিল। পরে এই মন্দিরটির দায়ভার, বর্ধমানের রাজাদের কাছ থেকে হেতমপুর রাজাদের হাতে ন্যস্ত হয়। হেতমপুর রাজ, গড়জঙ্গলের, বিষ্ণুপুর গ্রামের জনৈক হরিপদ রায়কে দেবোত্তর জমিসহ মন্দিরের পুরোহিত নিয়োগ করেন।ওনার বংশধরেরাই এখনও এই মন্দিরের পুজোর পৌরোহিত্য করছেন। তবে বর্তমান মন্দিরটি অর্বাচীন। পুরানো মন্দিরের স্থ্যনেই, এই মন্দির নির্মাণ হয়েছে ১৯৬০ সালে। নির্মাতা ডি এস পির প্রাক্তন উচ্চ আধিকারিক শ্রীকরুণা কেতন রায় মহাশয়। বর্তমানে মন্দির গাত্রে প্রোথিত শ্বেত পাথরের দশ ভুজা মূর্তিটি কিন্তু আদি মূর্তি নয়। শোনা যায় ইছাই ঘোষের পূজিত আদি মূর্তিটি স্বর্ণ নির্মিত ছিল। ইছাই ঘোষের মানস কন্যা( পালিত ?)র বিয়ে হয়েছিল শিখরভূম বা পাঞ্চেত রাজ কল্যাণ শেখরের সঙ্গে।  ইছাই ঘোষের মৃত্যুর পরে, কে আর দেবীর পুজো করবে এই আশঙ্কা থেকে নাকি মন্দিরের পুরোহিত মায়ের মূর্তিটি স্থানীয় দীপ সায়রের জলে ভাসিয়ে দেন। আরেকটি মত হচ্ছে, ইছাই ঘোষের মেয়ে জামাই দেবী মূর্তিটি নিয়ে যাবার সময় বরাকর নদীর বানে মূর্তিটি ভেসে যায়। পরে দেবীর স্বপ্নাদেশ অনুসারে রাজা কল্যাণ শেখর মায়ের শিলারূপী মন্দির নির্মাণ করেন। রাজার নামে সেই স্থানের নাম হয় কল্যানেশ্বরী এবং মন্দিরের নাম হয় মায়ের থান বা মাইথন।
তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে গড়জঙ্গলের নাম সেন পাহাড়ি কি করে হয় ? বলা হয় বখতিয়ার খিলজীর নদীয়া আক্রমণের সময়, জ্যোতিষীর পরামর্শে লক্ষণ সেন কোন রকম যুদ্ধ না করে বাড়ির খিরকির দরজা দিয়ে পালিয়ে এসে গড় জংগলে কিছুদিন আত্মগোপন করে ছিলেন। তাই অনেকেই এই জায়গাটিকে সেন পাহাড়ি বলে উল্লেখ করেন।
ইছাই ঘোষের মা চণ্ডী বা মা ভবানীর, শ্যামারূপা চন্ডীর নামকরণ নিয়ে অনেক কাহিনী শোনা যায় ।
 কেউ কেউ বলেন তিনি দেবী কালিকা, কেউ বলেন শ্রী কৃষ্ণের রাধিকা। আবার অনেকে বলেন দেবী হচ্ছেন সুহ্মেশ্বরী ,শ্যামলা নামক এক আদিম জনজাতির পূজিত দেবী। তবে পুরোহিত এবং ভক্তদের মুখে প্রচলিত এক জনপ্রিয় কাহিনী আপনাদের জানাচ্ছি । এই নামকরণের সঙ্গে নাকি যুক্ত আছে অজয়ের পার্শ্ববর্তী বর্তমান জয়দেব গ্রামের  , কবি জয়দেব, রাজা লক্ষ্মণ সেন এবং এক তন্ত্র সাধক কাপালিকের কাহিনী।
রাজা লক্ষ্মণ সেন তখন সেন পাহাড়িতে লুকিয়ে আছেন। ওনার সভাকবি জয়দেব আছেন তাঁর সঙ্গে। আর ইছাই ঘোষের মন্দিরে এক দুরাচারী তান্ত্রিক আশ্রয় নিয়েছেন। মাঝে মধ্যে নাকি সেই তান্ত্রিক মায়ের পুজোর নামে নরবলি দেন।
মেধসাশ্রমের বর্ণনা
মেধামুনির আশ্রমের খণ্ডহর
মেধামুনির আশ্রমের প্রতিষ্ঠিত জগদ্ধাত্রী প্রতিমা
রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্যের পূজিত প্রথম দুর্গাপুজোর বেদির পাশে লেখা প্রথম দুর্গাপুজোর স্থান
জয়দেব ও কাপালিকের মধ্যে নরবলি নিয়ে প্রচন্ড কলহ হয়। দুজনেই লক্ষণ সেনের কাছে গিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে নালিশ করেন। কার পুজোতে দেবী খুশি হবেন, সেই নিয়ে দুজনই প্রমাণ দেবার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। কাপালিকের আকুল আহ্বান সত্ত্বেও পাষাণ মূর্তির কোন হেলদোল হোল না। কিন্তু জয়দেবের মধুর সংগীতে নাকি দেবীর শিলা মূর্তির মধ্যে কৃষ্ণ ও দেবী চন্ডিকার( লোকমুখে রূপা , দুর্গার এক রূপ) মূর্তি ফুটে ওঠে। কাপালিক পরাজয় স্বীকার করে দেশান্তরী হয়ে যান। লোকমুখে দেবীর নাম হয় শ্যামরুপা চণ্ডী।
(ক্রমশ)
তথ্যসূত্র:- 
১) গৌড় কাহিনী, শ্রী শৈলেন্দ্র কুমার ঘোষ। ডি এম লাইব্রেরি, ৪২ কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিট, কলকাতা ৬ ।
২)পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি, প্রথম খন্ড, বিনয় ঘোষ। প্রকাশ ভবন, কলিকাতা ৭০০০১২।
৩)মিথ পঞ্চদশ, মন্দিরের মিথ, মিথের মন্দির, কৌশিক দত্ত। পার্চমেন্ট।
৪) গড়ের মা, তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রাম-ডানজোনা, পোষ্ট:- রামপুর, থানা – মহাম্মদ বাজার, জেলা- বীরভূম, ৭৩১১২৭  ।
ছবি- লেখক


Share your experience
  • 302
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    302
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।

1 thought on “মেধসাশ্রম গড়চণ্ডীধাম তথা শ্যামরূপার লোক- ইতিহাস

Comments are closed.