মদনমোহন রাধা বিহীন একক কৃষ্ণ মূর্তি ও জন্মাষ্টমী উৎসব

Share your experience
  • 167
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    167
    Shares

কোচবিহার রাজবংশের গৃহদেবতা  মদনমোহন বিগ্রহ।পূর্বভারতের অন্যতম বৈষ্ণবধর্মের প্রচারক অসমের শঙ্করদেবের প্রভাবে এই বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে অনেকেই মনে করেন।মদনমোহন মূলত কৃষ্ণের একক বিগ্রহ।রাধা নেই।ইতিহাস ও জন্মাষ্টমী উৎসব নিয়ে লিখছেন–আবির ঘোষ।

 

মদনমোহন মন্দির কোচবিহার
মদনমোহন মন্দির কোচবিহার

শঙ্করদেব ও কোচবিহারের রাজবংশ

কোচবিহার রাজ্যের ( পূর্বে এই স্থানকে বেহার বা কামতাপুর বলা হতো এবং এর রাজধানী ছিলো হিঙ্গুলাবাস ) সূচনাকালে কোচবংশীয় রাজগণ শৈব ভাবনায় ভাবিত হলেও কামরূপের দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য মহারাজা নরনারায়ণের ( রাজত্বকাল :- ১৫৫৪ – ১৫৮৭ খ্রিস্টাব্দ ) সময়ে উত্তর – পূর্ব ভারতের বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শঙ্করদেব অসম রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে কোচবিহারের রাজ্যে আশ্রয়প্রার্থী হন ।

কোচবিহার রাজপ্রাসাদে শঙ্করদেব ও তাঁর শিষ্যদের যাতায়াত আরম্ভ হয় । প্রথম জীবনে মহারাজা নরনারায়ণ কন্ঠভূষণ উপাধিধারী এক ব্রাহ্মণের কাছ থেকে শৈব মন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন , পরে শ্রীশ্রী শঙ্করদেবের প্রভাবে বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষা গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করলেও সেটা কার্যকর হয়নি , পরে মহারাজা নরনারায়ণ শঙ্করদেবের শিষ্য মাধবদেবের কাছে বৈষ্ণব মন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন ।

অসমের বৈষ্ণব ধর্মগুরু মহাপুরুষ শঙ্করদেব
অসমের বৈষ্ণব ধর্মগুরু মহাপুরুষ শঙ্করদেব

মদনমোহন প্রতিষ্ঠা

Sovial History of Kamrupa Vol – ll (Page :110 – 111), by Nagendra Nath Basu (1926) গ্রন্থে দেখা যায় যে , দুর্গাপ্রসাদ লিখেছেন , ” শঙ্করদেব রাজাকে একদিন বললেন যে ‘ তোমার রাজ্যে ভগবান বিষ্ণুর কোনো মন্দির নেই । যেখানে বিষ্ণুর মন্দির নেই , সেখানে আমি কুশাগ্রভাগ পরিমাণ জলও গ্রহণ করতে পারি না। যদি তুমি বিষ্ণুর মূর্তি স্থাপন করতে পারো , তবে এখানে অন্ন – জলগ্রহণ করতে পারি ‘ এই কথা বলে শঙ্করদেব কাগজকুটা গ্রামে চলে যান । তখন মহারাজা নরনারায়ণ স্বর্ণকার নিয়োগ করে সোনার বিষ্ণুমূর্তি তৈরি করান যার নাম হয় লক্ষীনারায়ণ বা বংশীধারী একক শ্রীকৃষ্ণ বা মদনমোহন । ”
শঙ্করপন্থী বৈষ্ণবদের মতে , শ্রীকৃষ্ণের সাথে তার শক্তিরূপিনি রাধা পূজিত হন না এবং একের মধ্যেই দুই রূপ বলে এখানে একক শ্রীকৃষ্ণ মদনমোহন নামে পরিচিত ।

কোচবিহার রাজবংশের গৃহদেবতা শ্রীশ্রী মদনমোহন ঠাকুর
কোচবিহার রাজবংশের গৃহদেবতা শ্রীশ্রী মদনমোহন ঠাকুর

রাজা নরনারায়ণ পন্ডিতদের সঙ্গে পরামর্শ করে মাঘ মাসের উত্তরায়ণ সংক্রান্তির পূর্ণিমা তিথিতে মূর্তি প্রতিষ্টা কার্য সুসম্পন্ন করলেন। মহাপুরুষ শঙ্করদেব এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলেও অনন্ত কন্দলি নামে এক উচ্চ শিক্ষিত ব্রাহ্মণকে দিয়ে সমগ্র অনুষ্ঠান করান। কথিত আছে , মহারাজা নরনারায়ণ বৃদ্ধ বয়সে পুত্রলাভে রাজকুমারের নামও রেখেছিলেন কুমার লক্ষীনারায়ণ।

১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে বাংলার তৎকালীন মোগল সুবেদার নবাব মীরজুমলা আসাম অভিযানের পথে কোচবিহার রাজ্য আক্রমণ করেন । সেই সময় কোচবিহারের মহারাজা ছিলেন প্রাণনারায়ণ । নবাব মীরজুমলা অনেক মন্দির ধ্বংস করেন এবং সম্ভবত মহারাজা নরনারায়ণ স্থাপিত শ্রী শ্রী বিষ্ণুমূর্তি বিধ্বস্ত করেন , তবে এই ঘটনা বিষয়ে সব ঐতিহাসিক একমত হতে পারেন নি।

মুন্সী জয়নাথ ঘোষ লিখিত ” রাজোপাখ্যান ” গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে – কোচবিহারের দশম মহারাজা রূপনারায়ণ অপূর্ব শ্রী শ্রী মদনমোহন ঠাকুর স্থাপন করে যথেষ্ট সেবার ব্যবস্থা করেছিলেন । ঐতিহাসিক প্রশাসক হরেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী তাঁর ” The Cooch – Behar State and its Land Revenue Settlement ” ( 1903 ) গ্রন্থে বলেছেন যে , মহারাজা রূপনারায়ণ শ্রীশ্রী মদনমোহনের অপূর্ব মূর্তি প্রস্তুত করে মহা আড়ম্বরের সঙ্গে পূজার ব্যবস্থা করেন ( পৃষ্ঠা : ২৪২ ) । কিন্তু অন্যত্র ( পৃষ্ঠা : ৬৯৮ ) কোচবিহার রাজবংশের ৬ নং মহারাজা প্রাণনারায়ণ কর্তৃক মূর্তি স্থাপনের কথা আছে ।

লক্ষ্মীনারায়ণ

দুর্গাদাস মজুমদার মহারাজা রূপনারায়ণের রাজত্ব – বিবরণে লিখেছেন —

” লক্ষীনারায়ণ আর মদনমোহন।
কায় ছারি পুন কায় করিল গ্রহণ ।।
সেহি প্রায় হয়াছেন দন্ড হনুমান ।
টোপ আর ঘটখানি আছয় পুরাণ ।। ”

এই কথার মর্ম বিশ্লেষণে বলতে পারি যে শ্রী শ্রী লক্ষীনারায়ণ আর শ্রী শ্রী মদনমোহন একই বিগ্রহ হলেও ভিন্ন নামে পরিচিত । যুগল আবির্ভাব নয় । সে সময় নতুন মূর্তি স্থাপনের কথাও আছে । তখন কোচবিহার রাজ্যে দুটো বিগ্রহ ছিলো , আর সব পূর্বের মতেই ছিলো। তবে মজার কথা হল কালের গতিতে কোচবিহারবাসীরা সব নাম ভুলে শ্রীশ্রী মদনমোহন ঠাকুরের নামেই অর্ঘ্য দিয়ে থাকেন ।

ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিযুক্ত কোচবিহার রাজ্যের ডেপুটি কমিশনার মিঃ ব্রেভারিজ ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা পার্বণ বাবদ ব্যয়ের যে তালিকা দেন , সেখানে শ্রী শ্রী মদনমোহন ঠাকুর মহারাজা প্রাণনারায়ণ ( রাজত্বকাল ১৬২৫ – ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দ ) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত । মহারাজা প্রাণনারায়ণকে ” Builder of temples ” বলে অভিহিত করা হয়েছে । ধর্মপ্রাণ ,পন্ডিত এবং সংগীতপ্রিয় এই মহারাজা একাধিক মন্দির নির্মাণ , সংস্কার , পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন করেছিলেন ।

কামরূপের দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য ও কোচবিহারধিপতি মহারাজা নরনারায়ণ
কামরূপের দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য ও কোচবিহারধিপতি মহারাজা নরনারায়ণ

মদনমোহন রাধা ছাড়া একক কৃষ্ণ বিগ্রহ

কোচবিহার মদনমোহন বাড়িতে কোচবিহার রাজবংশের গৃহদেবতা মদনমোহনের যে অষ্টধাতুর বিগ্রহটি রয়েছে তা শ্রীকৃষ্ণের কিশোর বয়সের ত্রিভঙ্গমুরারী রূপ । সেদিক থেকে এই বিগ্রহের পাশে শ্রী রাধিকা থাকা ছিলো স্বাভাবিক , কিন্তু মদনমোহন এখানে রুপোর সিংহাসনে একাই বিরাজমান তাঁর পাশে শ্রীরাধিকা নেই। তাই এখানে রাধা বিনা হোলি খেলে মদনমোহন , রাধা বিনাই করে রাসলীলা । এই রাধা না থাকার পেছনে বিভিন্ন কাহিনী রয়েছে , আজ আমরা জানবো সেই সব কথা —

মদনমোহনের সঙ্গে রাধা নেই কেন?

( ১ ) প্রসঙ্গত , কোচবিহার রাজবংশ ছিলো শৈব বংশ ; কথিত আছে তাঁরা দেবাদিদেব মহাদেবের বংশধর । এই বংশের রাজারা শিবের উপাসক হলেও মা ভবানী  দুর্গা হচ্ছেন এই বংশের কুলদেবী । মহাপুরুষ শ্রী শ্রী শঙ্করদেবের প্রভাবে কোচবিহার রাজবংশের দ্বিতীয় মহারাজা নরনারায়ণ ( রাজত্বকাল ১৫৫৪ – ১৫৮৭ খ্রিস্টাব্দ ) বৈষ্ণবধর্মে আকৃষ্ট হয়ে রাধা বিনা শ্রীশ্রী মদনমোহন প্রতিষ্টা করেন । গৌড়ীয় বৈষ্ণবমতে শ্রীকৃষ্ণের সাথে পৃথক ভাবে শ্রীমতী রাধিকার পুজো হয় । আর মহাপুরুষ শঙ্করদেবের মতে , ” একের মধ্যে দুইরূপ বিদ্যমান , শ্রীরাধা কৃষ্ণের মধ্যেই রয়েছে তাঁকে ভিন্নরূপে দেখার দরকার নেই । ” শঙ্করপন্থী বৈষ্ণবদের মতে নারায়ণের ও শ্রীকৃষ্ণের সাথে তাঁর শক্তিরূপিনি লক্ষী বা রাধা পূজিত হন না । এখানে একক ত্রিভঙ্গমুরারী মূর্তির নিয়মিত পূজিত হন।

ভৈরব মদনমোহন

( ২ ) আবার অনেকের ব্যাখ্যায় , তন্ত্রমতে ভারতে চারটি সিদ্ধপীঠ রয়েছে – জ্বালামুখী , কামাখ্যা , কন্যাকুমারী ও পুরীধামের বিমলা । এর মধ্যে পুরীর জগন্নাথ দেবের শ্রীক্ষেত্রে বিমলা পীঠের পুজো পদ্ধতির সঙ্গে কোচবিহারে শ্রী শ্রী মদনমোহনের পুজোপদ্ধতির অনেক মিল রয়েছে । প্রাচীন কোচবিহার রাজ্য কামরূপের কামাখ্যা সিদ্ধপীঠের অন্তর্গত রত্নপীঠে অবস্থিত । আর একসময় কোচবিহার রাজারা ছিলেন কামাখ্যা মায়ের আশীর্বাদপ্রাপ্ত , সেদিক থেকে দেখলে কোচবিহার রাজ্যে দেবী ভবানী দুর্গা ও দেবী কামাখ্যা একই এবং তিনি হলেন ভৈরবী ও শ্রী শ্রী মদনমোহন হচ্ছেন ভৈরব ।

যেমন শ্রীক্ষেত্র পুরীধামে জগন্নাথ দেব হলেন দেবী বিমলার ভৈরব , সেখানে জগন্নাথের সাথে লক্ষী বা রুক্মিণী নেই , ঠিক তেমনি মদনমোহনের রাধা নেই।
বৈষ্ণব মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শঙ্করদেব এই তত্ত্বটি জানতেন । তাই কামরূপ সিদ্ধপীঠে কোথাও তিনি মদনমোহনের সাথে রাধা রাখেননি। যেখানে সিদ্ধপীঠ নেই সেখানেই একমাত্র মদনমোহনের সঙ্গে রাধাকে দেখতে পাওয়া যায় ।

বৈদিক মতে পুজো

তবে শ্রীরাধা না থাকার কারণ যাই হোক না কেনো , কোচবিহারে শ্রীশ্রী মদনমোহন ঠাকুরের নিত্য পুজো হয় বৈদিক মতে । হয়তো সেই কারণেই দোল থেকে রাসযাত্রা — প্রায় সব উৎসবই হয় প্রথা অনুযায়ী ।

রাধা বিনা মদনমোহন ঠাকুর এতো যুগ ধরে কোচবিহারবাসীর প্রাণের ঠাকুর হয়ে রয়েছেন। শ্রী শ্রী মদনমোহন এখানে একমেবদ্বিদ্বিতীয়ম — তিনি একমাত্র নায়ক ।

কথিত আছে , শ্রী শ্রী চৈতন্যেমহাপ্রভু নবদ্বীপ ছেড়ে শ্রীক্ষেত্রে চলে এসেছিলো এবং সেখানেই তিনি দেহত্যাগ করেন । এখানেও শ্রীমন্ত মহাপুরুষ শঙ্করদেবও আসাম থেকে কোচবিহারে চলে আসেন এবং এখানেই তাঁর তিরোধান হয়।

 দধিকাদা উৎসব
দধিকাদা উৎসব

মদনমোহন ঠাকুরের জন্মাষ্টমী ও দধিকাদা উৎসব

মদনমোহন ঠাকুর প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয় মদনমোহনবাড়িতে। জন্মাষ্টমীর দিন দিনের বেলাতে দৈনন্দিন পুজো হয়ে থাকে মদনমোহনের। রাতে সাড়ে ৮টা থেকে বিশেষ পুজো শুরু হয়। রাত ১২টা পর্যন্ত ওই পুজো চলে। পরদিন নন্দউৎসব উপলক্ষে মদনমোহন ঠাকুরবাড়ি চত্বরে দধিকাদা উৎসব হয়ে থাকে । দধিকাদায় পাঁচটি ফল নিয়ে খেলতে হয়। ওই খেলা হয় কাদার মধ্যে। মন্দিরের সামনের একটি অংশ কাদা করে নেওয়া হয়। সেখানে নারকেল, বাতাবীলেবু, আপেল, মোসাম্বি, ন্যাসপাতি নিয়ে যাওয়া হয়। বাজতে থাকে ঢাক। পুরোহিতও থাকেন সেখানে।

আরও পড়ুন- বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির সুপ্রাচীন মনসাপুজো ও ঐতিহ্যবাহী মেলা

প্রচুর মানুষ ভিড় করে। ঢাকের আওয়াজ শুরু হতেই আসরে নেমে পড়েন তিন জন সুদেব কার্জি, অনাথ কার্জি এবং উৎপল দাস। এক জন একটি করে ফল নেন আর কাদার মধ্যে ঢুকিয়ে চেপে ধরেন। আরেকজন ওই ফল কেড়ে নিতে জীবন পণ করে লড়তে শুরু করেন। দু’জনের লড়াই তুঙ্গে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ঢাকের আওয়াজও। তিন জন ঘুরে ঘুরে ওই খেলা খেলেন। তাতে ফল চেপে রাখতে পারেননা কেউই। উল্টো দিকের আরেক জন ফল ছিনিয়ে নিয়ে জয়ী হয়ে যায় । ফলে জয়ী হয় তিন জনই। আবার হেরে যান তিন জনই।

কৌলালের তথ্যচিত্র দেখুন–

 

 


Share your experience
  • 167
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    167
    Shares

Facebook Comments

Post Author: আবির ঘোষ

আবির ঘোষ
আবির ঘোষ।থাকেন কোচবিহারের জেলার সদর শহরে।নেতাজি মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় M.A করছেন। ভালো লাগে কোচবিহারের ঐতিহ্য নিয়ে লেখালিখি করতে এবং কোচবিহারের স্থানীয় কিছু পত্র - পত্রিকায় লেখালিখি প্রকাশিত হয়েছে।