মহাদেবকে চিঠি !কালনার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর রীতি

Share your experience
  • 2.7K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.7K
    Shares

মহাদেবকে চিঠি! শুনে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।এমন প্রথা চলে আসছে কালনার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোতে।নামে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের পুজ হলেও এই পুজো শুরু করেছিলেন বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার।বিজয়াদশমীর দিনে আজও পরিবারের প্রবীণ কর্তা মহাদেবকে চিঠি লেখেন যে মেয়েকে পতিগৃহে পাঠাচ্ছেন।আবার আগামী বছর নিয়ে আসবেন।লিখছেন--শুভদীপ রায় চৌধুরী

মহাদেবকে চিঠি লেখার রীতি কালনার চট্টোয়াপধ্যায় পরিবারে
মহাদেবকে চিঠি লেখার রীতি কালনার চট্টোয়াপধ্যায় পরিবারে

বনেদিবাড়ির দুর্গাপুজো

বাংলার দুর্গাপুজো ষোল শতকে শুরু করেন তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ। প্রায় আটলক্ষ টাকা খরচ করে আবার সাবর্ণরা সপরিবার দুর্গাপুজো শুরু করলেন ১৬১০সালে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে ঐশ্বর্যের প্রতিযোগিতায় কংসনারায়ণের পর রাজশাহীর রাজা জগৎনারায়ণ বাসন্তীপূজা করেন প্রায় নয়লক্ষ টাকা খরচ করে। কলকাতার বহু প্রাচীন বনেদিবাড়িতে আজও সাড়ম্বরেই পুজো হয় যেমন কৃষ্ণচন্দ্র মিত্র, নবকৃষ্ণ দেব, রামহরিঠাকুর, বারাণসী ঘোষ, দর্পনারায়ণ ঠাকুর, মতিলাল শীল, রামদুলাল সরকার প্রমুখের বাড়িতে জাঁকিয়ে দুর্গোৎসব হত।শুধু কলকাতা নয়,জেলাস্তরে বহু বনেদি বাড়িতে সাড়ম্বরে দুর্গাপুজো হয় যেমন পূর্ববর্ধমান জেলার কালনার প্রাচীন চট্টোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপুজো

মহাদেবকে চিঠি! কালনার চট্টোপাধ্যায় পরিবারের বৃত্তান্ত

বস্তুতপক্ষে এই পুজো চট্টোপাধ্যায় পরিবারের পূর্বপুরুষ শ্রী চরণদাস চট্টোপাধ্যায় তাঁর মামার বাড়ির তরফে এই পুজোর দায়িত্ব পেয়েছিলেন মূলত এই পুজো বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের।আনুমানিক অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কালনার বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়িতে দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হত। এই পরিবারের বংশধররা ছিলেন তৎকালীন সময়ে বর্ধমানের রাজপরিবারের কোষাধ্যক্ষ এবং কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবার, সেই সূত্রে দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন নিজেদের বসতবাড়িতে। তার পরবর্তীকালে ব্রিটিশ আমলে যখন সতীদাহপ্রথা রদ হচ্ছে তখন সেই সময় এই পরিবারের দুই পুত্রবধূ অন্নবালাদেবী ও পুণ্যবালাদেবীকে বৈধব্য জীবনে আসতে হলেও সতী হতে হয়নি, সেই বছর খুব ধুমধাম করে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারে দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়।

এর পরবর্তীকালে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের নগেন বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন চরণদাস চট্টোপাধ্যায়ের মামা, এবং তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। চরণদাস চট্টোপাধ্যায়রা সেই সময় থাকতেন মেমারি অঞ্চলের একটি গ্রামে এবং খুব ছোটোবেলাতেই চরণদাস মহাশয় পিতামাতাকে হারিয়েছিলেন এবং তাঁর মামা নগেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালনা বাড়িতে চলে আসেন, সেই থেকেই বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের পুজোর দায়িত্ব পান চট্টোপাধ্যায় পরিবারের সদস্যরা। এই চট্টোপাধ্যায় পরিবারের সদস্যরাই বর্তমানে নিষ্ঠার সাথে দেবীর পুজো করে আসছেন।

চট্টোয়াপাধ্যায় পরিবারের দুর্গা
চট্টোয়াপাধ্যায় পরিবারের দুর্গা

চট্টোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গা

অতীতে এই বাড়ির পুজো প্রতিপদতিথিতে বোধনের মাধ্যমে শুরু হলেও বর্তমানে ষষ্ঠীতে হয় তবে প্রতিপদ থেকে চণ্ডীপাঠ আজও হয়। এই বাড়ির প্রতিমার বৈশিষ্ট্য হল দেবীর বাহন সিংহটি অশ্বমুখী এবং আগে মাটির সাজ হলেও বর্তমানে ডাকের সাজের প্রতিমা হয় একচালার এবং দেবীর গায়ের রঙ এখানে অতসীপুষ্পবর্ণা। দুর্গাপুজোর সপ্তমীর দিন বাড়িতেই নবপত্রিকার স্নান হয় এবং এই সপ্তমী, মহাষ্টমীতে নিরামিষভোগ হলেও নবমীতে মাছের ভোগ নিবেদন করা হয়।

ভোগের বৈশিষ্ট্য

ভোগে থাকে সাদাভাত, খিচুড়ি, পোলাও, নানান রকমের ভাজা, শুক্তনি, ডাল, নানান রকমের তরকারি, চাটনি, পায়েস ইত্যাদি। পুজোর কয়টি দিন দেবীকে পাঁচবেলা সেবা দেওয়া হয় এবং সন্ধিপুজোর সময় দেবীকে আটভাজা ও সাথে লুচি, নাড়ু ইত্যাদি নিবেদন করা হয়। মহাষ্টমীর দিন এই পরিবারে ধুনো পোড়ানো এবং কুমারিপুজোর রীতি রয়েছে প্রাচীনকাল থেকেই। পরিবারের দেবতা শ্রী রাধাগোপালকৃষ্ণ জীউ পুজোর সময় ঠাকুরদালানেই উপস্থিত থাকেন কিন্তু দশমীর দিন তাঁর উদ্দেশ্যে বিশেষ ভোগ নিবেদন করা হয় এবং সেই ভোগ তিনি নিজে রান্নাঘরে গিয়ে গ্রহণ করেন কারণ দশমীর দিন দেবীকে বাসীলুচি, দই,খই ইত্যাদি নিবেদন করা হয়।

 

 

মহাদেবকে চিঠি!

অতীতে এই পরিবারে পশুবলিদান হলেও বর্তমানে প্রতিকী বলি শুধুমাত্র উৎসর্গ করা হয় দেবীর উদ্দেশ্যে। দশমীর দিন দর্পন বিসর্জনের আগে পরিবারের যিনি কর্তা আছেন তিনি দেবী বিগ্রহের বামদিকে একটি দেওয়ালে মহদেবের উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লেখেন যে এবছরের মতন আমরা উমাকে শ্বশুরঘরে পাঠাচ্ছি আবার সামনের বছর উমা এই ঠাকুরদালানেই আসবেন এমন একটি আগাম পত্র লেখার রীতি রয়েছে এই বাড়িতে প্রাচীনকাল থেকেই।

আরও পড়ুন– নীলদুর্গা পুজো ঘোষ রায় পরিবারে দেবীর স্বপ্নাদেশে শুরু হয়েছিল

শ্রীশ্রীদুর্গাসহায়

এছাড়া বিসর্জনের আগে দেবীর পায়ে তিনটিপাতা যুক্ত বিল্বপত্রে “শ্রীশ্রী দুর্গা সহায়” লিখে নিবেদন করা হয় দশভূজার উদ্দেশ্যে। দশমীর দিন দেবীবরণের পর কনকাঞ্জলিপ্রথা রয়েছে পরিবারে এবং প্রতিমা আজও কাঁধে করে বিসর্জন হয়। যারা কাঁধে করে প্রতিমা নিয়ে যান তাদের অবশ্যই জেলে সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন এবং এইভাবে ঐতিহ্যের সাথে আজও পুজো করে আসছেন কালনার চট্টোপাধ্যায় পরিবারের সদস্যরা।

বনেদিবাড়ির দুর্গাপুজো দেখুন-

 


Share your experience
  • 2.7K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.7K
    Shares

Facebook Comments

Post Author: শুভদীপ রায় চৌধুরী

শুভদীপ রায় চৌধুরী
শুভদীপ রায় চৌধুরী, ১২বছর দক্ষিণ কলকাতার স্বনামখ্যাত বিদ্যালয় "বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়" থেকে পড়ার পর উত্তর কলকাতার স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে স্নাতক এবং বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিভাগে স্নাতকোত্তর, বিশেষ বিষয় ছিল-ভারতের আধুনিক ইতিহাস। তাছাড়া ২০১৬সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে স্বতন্ত্র গবেষণায় যুক্ত। বর্তমানে বহু পত্রিকায় যুক্ত স্বতন্ত্র লেখায়, শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গে নয় ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখার কাজেও যুক্ত। বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল কলকাতার সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারের ৩৬তম বংশধর