মহামারী ও দেবী চণ্ডীকা-পৌরাণিক আখ্যান রক্তবীজ অসুর

Share your experience
  • 317
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    317
    Shares

মহামারী ও দেবী চণ্ডীকা -ভয়ঙ্কর রক্তবীজ নামক অশুভ শক্তির উল্লেখ আছে স্কন্দপুরাণে, দেবী ভাগবতে। দেবী মাহাত্ম্য বা দূর্গা সপ্তশতীতে শুম্ভনিশুম্ভ প্রেরিত রক্তবীজের বিশদ বিবরণ উল্লেখিত। শারদ দূর্গোৎসবের আর কিছুদিন মাত্র বাকী। আকাশে বর্ষা কেটে গেলেই এক বিশেষ নীলাকাশে সাদা সাদা মেঘেরা ভেসে যাচ্ছে, এমন সময়ে সেই মহাদূর্গা দেবীর রক্তবীজ বিনাশকারী অষ্টম অধ্যায়টি বড় গুরুত্বপূর্ণ এই ২০২০তে।লিখছেন–অনিতা বসু।

 

মহামারী ও দেবী চণ্ডীকা
মহামারী ও দেবী চণ্ডীকা

২০২০ সমগ্র পৃথিবীর যাবতীয় ধ্যান ধারনাকে বদলে দিতে পেরেছে। একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র, অদেখা, অজানা, চর্মচক্ষের বাইরের একটি নিরাকার অনাসৃষ্টিময় ভাইরাস। কিভাবে সমস্ত দুনিয়াকে এক অদ্ভুত ভবিষ্যতের সামনে এনে হাজির করেছে ২০২০ তারই এক জীবন্ত উদাহরণ।

মহামারী ও দেবী চণ্ডীকা

প্রশ্ন উঠেছে সারা পৃথিবী জুড়ে কে, কেন, কিভাবে এই ভয়ঙ্কর অসুখের মুখে আমাদের প্রেরণ করেছে। মানুষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমান প্রচুর। কিন্তু এই লেখার উদ্দেশ্যে সেই নেতিবাচক হতাশাকে তুলে ধরা নয়। আজ সকালবেলা সূর্যোউজ্জ্বল নীল আকাশের একটি ঝলমলে দিন। পাখীদের কলকাকলী, বর্ষাস্নাত গাছপালাদের সবুজের উদ্ভাস, ধীরে ধীরে বহে চলা হাওয়ার স্পর্শ মনকে এখনও সদর্থক জীবনকে ভাবতে সাহায্য করছে। আমাদের জাগতিক চাওয়া পাওয়ার উর্দ্ধে যে সর্বশক্তিময় এক দিব্যশক্তি বিরাজ করছেন তার উপস্থিতি ভাবতে ভালো লাগে। আমি আদ্যন্ত একজন সংস্কৃতি, শিল্পকলার মানুষ এই মহামারীর কথা প্রসঙ্গে তাই আমি আজ তুলে ধরবো মহাশক্তি মা দূর্গার এক কাহিনীকে।

মহামারী ও বিজ্ঞান

আমরা জানি পৃথিবীর ইতিহাসে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের মহামারীর প্রকোপ দেখা গেছে। কখনো ব্যাকটেরিয়া সংক্রমন কখনো বা ভাইরাস থেকে সংক্রমন। আমাদের পুরাণ, শাস্ত্রগুলিতেও এমন অনেক উল্লেখ পাই, কিন্তু আধুনিকতার অতি উজ্জ্বল স্বাভিমানের আলোয় সেগুলিকে গুরুত্ব দেবার প্রয়োজন আমরা অধিকাংশ মানুষই অনুভব করি না। বিজ্ঞানের জয়যাত্রার ধ্বজ|ধারী বর্তমান পৃথিবী বোধহয় ভুলেই গিয়েছিলো বিজ্ঞানের পারে যাবার কথা।

শ্রীরামকৃষ্ণ

শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, বলতেন মানুষের জীবনের তিনটি বিশেষ জানার অবস্থা আছে, যাকে জ্ঞান, অজ্ঞান বলে। নানাবিষয়ে অনুসন্ধান লব্ধজ্ঞান, যা মানুষের অন্তর্জগতের গভীরে সত্যরূপে প্রতিভাত হয় নি, তা অজ্ঞান। একটি বিষয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে অন্তর্জগতে ও বহির্জগতে যখন কেউ মেনে চলেন তখন তা জ্ঞান, কিন্তু বিজ্ঞান এর কোনটাই নয়। বিজ্ঞান অর্থে কেউ যখন এই অজ্ঞান ও জ্ঞান দুটো অভিমান রূপ কাঁটাকেই তুলে ফেলে বিশেষ রূপে প্রতিভাত সত্যে প্রতিষ্ঠ জ্ঞান। আর এইটা যে শুধুমাত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্বারা সম্ভব নয়, বিশেষভাবে অনুভবকারী শক্তি তা অনস্বীকার্য।

আজ সারা পৃথিবীজুড়ে কত বিচিত্র চিন্তাভাবনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, এই মহামারী মানুষের দ্বারাই সৃষ্টি না কি অন্যভাবে এই বিতর্কে যেতে চাইনা। কিন্তু কোথায় একটা ভুল তো হয়েছে এটা সর্বজনগ্রাহ্য। আমরা যারা প্রকৃতিকে ভালোবাসি, যারা বিশ্বাস করি এই বিশ্বনিয়ন্ত্রাকে, ধরিত্রীমাকে তারা অনুভব করছি প্রতি মুহুর্তে কতটা কষ্ট আমরা দিয়েছি তাকে। তাইতো সেই সর্বংস্বহা ধরিত্রীও আজ সহ্য সীমা অতিক্রম করে গেছেন। হাজারো Conference, Lecture, আলাপ আলোচনার মধ্যে দিয়ে বারংবার এইরকম একটা কিছু বড় বিপদের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছিলো বহুদিন ধরেই।

মানবহৃদয়তা

কিন্তু আর একটা দিক আছে আমাদের মনুষ্য জীবনের। যেদিকটা আধুনিকতার পরকাষ্ঠায় আজ প্রায় উপেক্ষিত। তা হলো মনুষত্ব্য, মানবহৃদয়তা, শতশত বছরের মানব মনের অসম্মান, দুঃখ, কষ্ট, অত্যাচার, অনাচারের ফল ফলতে শুরু করেছে। সমস্ত কিছুকে আমরা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে গিয়ে আমাদের মনের সুকোমল বৃত্তিগুলিকে হারিয়ে ফেলেছি। আজ যে পৃথিবী একসময়ে বৈদিক সত্যের আলোতে উদ্ভাসিত হয়ে পথ চলতো, জীবনকে চালাতো, প্রকৃতিকে রক্ষা করতো আজ তা অস্তমিত। তাই আবার এসে পড়ে ঐ অজ্ঞান ,জ্ঞান থেকে বিজ্ঞানে যাবার প্রকৃত পথটার খোঁজার কথা।

 শাস্ত্রকথা

আমাদের শাস্ত্রে আছে নানা কাহিনী। কারণ কাহিনীর মাধ্যমে অতি সহজে শিক্ষালব্ধ আচরণ মানুষের মনে পৌঁছে যায়। এটা কর, এটা কোরোনা, এটা ভালো এটা মন্দ এই গুলি মুখে বলে বোঝানো আর জীবনচর্চায় পালন করার মধ্যে অনেক তাফাৎ থাকে। সংসারে সমাজে তাই গল্প, কাহিনী, ছবির মাধ্যমে ঘটনার উপলব্ধি করা এতো স্বীকৃত প্রাচীনকাল থেকে।
ভারতবর্ষের মূল দুটি ধারা ভক্তি এবং শক্তি। আর মানবমনের সাতটি চেতনা যা সমগ্র সৃষ্টির সপ্তসুরের মতন এই পৃথিবীকে ধারন করে আছে। আদি সর্ব নিম্ন তিনটি স্তর, ভুর্, ভুবর, স্বর, পরবর্তীকালে ভূলোক, অন্তরিক্ষ, দ্যুলোক, পৃথিবী ,বায়ু আকাশ. এবার সেই তিনস্তর আসে মানব শরীরে, দেহ-মন-প্রাণ।

মহামানব

এই নিম্ন তিন স্তর থেকে মানুষ চেয়েছে উত্তরন, সেই উত্তরন যা জনঃ তপঃ সত্যম্ এর পথে এগিয়ে দেয় অর্থাৎ জনলোক রূপী আনন্দলোকে, তপলোকরূপী চিৎলোকে সত্যলোকারূপী সৎলোকো তখন আমরা পাই সচ্চিদানন্দ। কিন্তু এই দুই লোকের মাঝে আছে একটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর, যাকে বলা হয় মহঃ বা মহর্লোক অর্থাৎ মহাউদার এক মন, বা অতি-মন।
এই মহামনই মহামানব হয়ে ওঠে, এই মনই আমাদের উচ্চ-নীচে বিক্ষেপ করে। বৈদিক ঋষিরা উচ্চারণ করেছিলেন—
ন তস্য রোগো ন জরা ন মৃত্যুঃ
প্রাপ্তস্য যোগাগ্নিময়ং শরীরম॥
শেতাশ্ব. উ. ২/১২।

অর্থাৎ মৃত্যুকে জয় করবো। রোগ থাকবে না, বার্ধক্য থাকবে না। শরীরময় আলো ফুটে উঠবে ,এক দিব্য জ্যোতি।
আর এই দিব্য জ্যোতির্ময় জীবন লাভের পথে হাজারো বাঁধা এসেছে, আসবে। ভারতবর্ষের আত্মিক যাত্রার পথে তাই আমরা এরকম বহু বাঁধাকে দেখেছি, যেগুলি সাধারণ মানুষের মনে পৌঁছে গেছে কাহিনীর মাধ্যমে, আচার-আচরনের মাধ্যমে, দর্শনের মাধ্যমে। ঐ যে বললাম দুই পথে এসেছে, ভক্তির চর্চায় অথবা শক্তির আরাধনায়।

শতদল
শতদল

 অসুর কাহিনী

সেই প্রাচীনকালের কাহিনীতে আমরা পেয়েছি অসুরদের কথা। অসুর অর্থাৎ সুরের বিপরীত, শুভর বিপরীত। ভগবদ্‌গীতা, শ্রী শ্রী দেবীপুরাণ, রামায়ন, মহাভারত, অষ্টাদশ পুরাণ সর্বত্রই এই শুভ-অশুভর ভেদাভেদ, দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধে অশুভর বিনাশ। আমরা জ্বরাসুর নামক অশুভ শক্তিকে দেখেছি, দেখেছি কালীয় নাগের বিষকারী অশুভ শক্তিকে, পেয়েছি রক্তবীজ নামক এক অতিভয়ঙ্কর অশুভ শক্তিকে। এই প্রতিটি কাহিনীই কোনও না কোনও ভয়ঙ্কর এক অসুখের মতোই নিষ্ঠুর, মৃত্যুর জগতকে তুলে ধরে। কখনো জ্বর বাহিত, কখনো জলবাহিত, কখনো বা রক্তবাহিত।

মহামারী ও দেবী চণ্ডীকা

আজ এই লেখা লিখতে বসে মনে হচ্ছে সত্যিই তো আজ থেকে ৫০০ বা হাজার বছর পরে আমাদের এই মহামারীরূপের কথাও তো এমনই এক অশুভশক্তি, এমনই বিধ্বংসী এক অসুরে পরিণত হতেই পারে। সারা বিশ্বকে এই মহামারীর মূল কারণ করোনো নামী এক অদৃশ্য ভাইরাস আতঙ্কিত করেছে, গৃহবন্দী করেছে, আর্থিকভাবে মানসিকভাবে সমূহ ক্ষতির মুখে পাঠিয়েছে। কবে এর থেকে মুক্তি, কে দেবেন এর থেকে মুক্তি, কি উপায়ে এর থেকে মুক্তি অধীরভাবে মানুষ অপেক্ষা করছেন তার জন্য। এইবার আমরা যদি একটু পিছিয়ে যাই, দেখবেন বেশকিছু এমনই অসুবিধার মুখোমুখি হয়েছিলো মহাভারতের যুগের মানুষ, রামায়নের যুগের মানুষও। অর্থাৎ ত্রেতাকাল, দ্বাপরকালের মানুষও এইরকম সমস্যায় পড়েছেন। হয়তো তা ছিল নির্দ্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের, আজ তা সর্বব্যাপী।

 

মারণ ভাইরাস

আজ এই করোনা মহামারীর গতি, প্রকৃতিকে দেখে বিজ্ঞানীকুলও স্তম্ভিত। প্রতিমুহুর্তে এই ভাইরাস তার আক্রমণশক্তি বদলাচ্ছে, চারিত্রিক গঠন বদলাচ্ছে, যেন হিমশিম খাইয়ে দিচ্ছে সবাইকে। একফোঁটা থেকে হাজার হাজার করোনা রোগী সংক্রমণ ঘটে চলেছে। কত শত শত মানুষ সারাবিশ্বজুড়ে প্রাণ হারিয়েছেন, বিধ্বংসী এই অশুভশক্তির বিনাশের জন্য ভক্তি-শক্তির আরাধনা, প্রার্থনায় প্রায় সকল মানুষ। আর এই বিশ্বাস নিয়েই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে মানুষের মন – এর বিনাশ তো একদিন হবেই।

মহামারী ও দেবী চণ্ডীকা –রক্তবীজ প্রসঙ্গ

এমনই এক অদ্ভুত ভয়ঙ্কর রক্তবীজ নামক অশুভ শক্তির উল্লেখ আছে স্কন্দপুরাণে, দেবী ভাগবতে। দেবী মাহাত্ম্য বা দূর্গা সপ্তশতীতে শুম্ভনিশুম্ভ প্রেরিত রক্তবীজের বিশদ বিবরণ উল্লেখিত। শারদ দূর্গোৎসবের আর কিছুদিন মাত্র বাকী। আকাশে বর্ষা কেটে গেলেই এক বিশেষ নীলাকাশে সাদা সাদা মেঘেরা ভেসে যাচ্ছে, এমন সময়ে সেই মহাদূর্গা দেবীর রক্তবীজ বিনাশকারী অষ্টম অধ্যায়টি বড় গুরুত্বপূর্ণ এই ২০২০তে।

শ্রীশ্রীচণ্ডী

চণ্ডীরত্নামৃত বা শ্রীশ্রী চণ্ডীতে আমরা দেখতে পাই মেধস ঋষি সুরথ রাজা ও সমাধি বৈশ্যকে জানাচ্ছেন এই ভয়ঙ্কর অশুভ শক্তির কথা। দেবী অম্বিকা তথা দূর্গামাকে এই রক্তবীজ কে ধ্বংস করতে এক প্রলয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে হয়েছিলো। রক্তবীজ নামক সেই মহাপরাক্রমী অসুরের এক অদ্ভুত বরপ্রাপ্তি ছিলো। তাকে কেউ আঘাত করলে, তার শরীর থেকে যদি এক বিন্দু রক্তও জমিতে অর্থাৎ মাটিতে পড়ে তার থেকে হাজার হাজার একই রকম অসুর সৃষ্টি হবে। একবার ভেবে দেখুন একই রকম অসুর সৃষ্টি হবে। একবার ভেবে দেখুন একজন শত্রুকে বিনাশ করার জন্য যদি আঘাত করেন তার কয়েক ফোঁটা রক্তপাত হলেই কয়েকশো শত্রু তৈরী হয়ে যাচ্ছে।

দেবী চণ্ডীকা

‘দেবী যতবার তাকে আঘাত করেছেন ততবারই রক্তবিন্দু থেকে আরো ভয়ঙ্করভাবে শত্রুর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। বজ্রাঘাত, মস্তক কেটে দেওয়া, চক্রের আঘাতে শরীরকে যত দেবী ক্ষতবিক্ষত করেছেন, ততই পালে পালে, শয়ে শয়ে রক্তবীজের অসুরকুল সমগ্র জগৎকে ঘিরে ধরেছে। দৈত্য শতশত নির্বিচারে দেবীর সৈন্যকে, মাতৃকাগনকে মৃত্যুর মুখে পাঠাতে শুরু করেছেন। দেবদেবী, অপ্সরা, গন্ধর্ব, ঋষি, মুনীরা সহ সমস্ত জগৎ তখন ভয়ে, বিষাদে বিষণ্ণ হয়ে উঠেছে।

Saptamatrika esechilen ai maha juddhe . Chandi te pai raktaij k binash korte Brahmani , Maheswari, Koumari, Vaisnabi, Varahi, Narasinghi, Aindri esechilen sarva shakti die. দেবীচন্ডীর নিজের শরীর থেকে উৎপন্ন কালিকা শক্তি, মহাবেগবতী, মহাচামুন্ডা ও যেন বিষাদিতা এই অসুরের প্রচন্ড পরিমানে সংখ্যাধিক্যে। এমনই সময়ে দেবী চন্ডী বলেন মহাকালীকে —
“হে চামুন্ডে, কর তুমি বিস্তৃত বদন।
আমার এ শস্ত্র-পাত সম্ভূত শোণিত বিন্দু,
… হয়ে তুমি অতিশয় বেগবতী,
বিশাল বদনে তব করহ ভক্ষণ।

কারণ দেবী অম্বিকা জানতেন স্বয়ং মহাদেবের বরপ্রাপ্ত এই রক্তবীজ অসুরকে ধ্বংস করতে গেলে এর সকল রক্তকে শোষন করে নিতে হবে মাটিতে পড়ার আগেই। যাতে ধীরে ধীরে সে রক্তশূন্য হয়ে যায়, অর্থাৎ শক্তি শূন্য। এবং তার থেকে আর দ্বিতীয় কোনও রক্তবীজ না জন্মাতে পারে শ্রীশ্রী চন্ডীর অষ্টম খণ্ডের যে বর্ণনা পাই তাই আরো বিশদে আছে শ্রীমদ্-দেবী ভাগবতমে। এই যে এক মহা অশুভশক্তি, এই যে এক ভয়ঙ্কর বিপন্ন অবস্থা তা যেন আজকের মতোই। দেবী ভাগবতমে অসাধারণ ভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে রক্তবীজের শরীর, রক্তধারা, কিভাবে দেবলোক, মনুষ্যলোক, পাতাললোককে ব্যপৃত করেছিলো। তার অর্থ তো তাহলে এই অসুরের রক্ত থেকে লক্ষ্য লক্ষ্য রক্তবীজরূপী প্রতিরূপে বিশ্ব ঢেকে গিয়েছিলো! কিরকম একটা অদ্ভুত যেন আভাস।

 প্রার্থনা

প্রাণ প্রণে প্রার্থনা করি হে মা অম্বিকে, মহাচন্ডী চামুন্ডা রূপে এই পৃথিবীকে রক্ষা করো। বেদের সেই আদিসুক্তের থেকে আজ পর্যন্ত তুমিই তো জগৎদ্ধাত্রী, জগৎপালনকারিণী মা, তোমার সৃষ্টিকে তুমি রক্ষা করো।
দেবীর অসুর বিনাশের পর সমগ্র বিশ্ববাসীর হয়ে দেবতাকুল, ঋষিরা যে, প্রার্থনা করেছিলেন আজও তা আমাদের প্রার্থনা।

“দেবী প্রপন্নার্তিহরে প্রসীদ, প্রসীদ মাতর্জগতোঽখিলস্য।
প্রসীদ বিশেশ্বরি পাহি বিশ্বং, ত্বমীশ্বরী দেবী চরাচরস্য।…
ত্বং বৈষ্ণবীশক্তিরনন্তবীর্মা, বিশ্বস্য বীজং পরমাহসি মায়া।
সম্মোহিতং দেবি সমস্তমেতত্ত্বং বৈ প্রসন্না ভুবি মুক্তিহেতুঃ॥”

 

আরও পড়ুন- মহামারী শুধু মারণ রোগ নয়,মল্লভূমের এক প্রাচীন লৌকিক দেবী

মনে আশ্বাস দিয়ে দেবীও আশস্ত করেছেন দেবতাদের, সমগ্র বিশ্বের জন্য আশীর্বাদ করেছিলেন ঠিক গীতার আশ্বাস বাণীর মতই
—দানব উত্থিত বাধা এরূপে হবে যখন,
অবতীর্ণ হয়ে আমি নাশিব শত্রু তখন।
এই মহামারীরও তাঁর মহাকালরূপের সৃষ্টি আবার তিনিই তার মাহাত্ম্য দ্বারা এই সবকে প্রশমন করিবেন।

মহামারী ও দেবী চণ্ডীকা
মহামারী ও দেবী চণ্ডীকা

দুর্গা দুর্গতি নাশিনী–মহামারী ও দেবী চণ্ডীকা

শেষ করি এই মহাভয়বিনাশীনী ‘দূর্গা’র আক্ষরিক অর্থ দিয়ে। শাস্ত্রে ‘দূর্গা’র সম্পর্কে বলা হয় ‘দ’ শব্দটি দৈত্যনাশক, ‘উ’ কার বিঘ্ননাশক, ‘রেফ’ চিহ্নটি রোগবিনাশক, ‘গ’ কার পাপঘ্ন, এবং ‘আ’কার ভয় শত্রু বিনাশক — অর্থাৎ দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ, ভয় ও শত্রু হতে যিনি রক্ষা করেন তিনিই দুর্গা।
“দৈত্যনাশার্থবচনো দকারঃ পরিকীর্ত্তিতঃ।
উকারো বিঘ্ননাশস্য বাচকো বেদসম্মত॥
রোকা রোগঘ্নবচনো গশ্চ পাপঘ্নবাচকঃ।
ভয় শত্রুঘ্নবচনশ্চাকারঃ পরিকীর্ত্তিতঃ॥

এই আশাতেই আমরা মহামারীকে উত্তরণ করে জীবনের জয়গান গাইবো।

ছবি–লেখক

তথ্য সূচি
শ্রী শ্রী চন্ডী – স্বামী জগদীশ্বরানন্দ কর্তৃক অনুদিত ও সম্পাদিত।
উদ্বোধন কার্যালয়।চন্ডী রত্নামৃত।
৺নৃসিংহদেব বন্দোপাধ্যায় অনুদিত। ওরিয়েন্ট লাইব্রেরী প্রকাশিত।বেদ-আবহমান
গৌরী ধর্মপাল।বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়।
দেবদেবী ও তা৺দের বাহন।
স্বামী নির্মলানন্দ । ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ।

 

দেখুন–কৌলালের এ বিষয়ে তথ্যচিত্র 

 

 

 


Share your experience
  • 317
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    317
    Shares

Facebook Comments

Post Author: অনিতা বোস

অনিতা বোস
– Mrs. Anita Bose. শ্রীমতী অনিতা বোস  বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ও  ভারতীয় শিল্প, ভারত তত্ত্ব এবং টেক্সটাইল ডিজাইন তার আয়ত্তে। ব্যাঙ্ককের জাতীয় মিউজিয়ামে বিগত  ৫ বছর  একমাত্র ভারতীয় গাইড রূপে পৃথিবীর বহু দেশের মানুষের কাছে এশিয়ার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কে পৌঁছে দিয়েছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে, তাদের দেশীয় শিল্পে , ইতিহাসে ও ঐতিহ্যে ভারত সংস্কৃতির  প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। ২০১৯এ রামায়ণ চর্চা বিষয়ে বিশেষ বই লিখেছেন- রামায়ণ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পদচিহ্ন।২০১৩ সাল থেকে তিনি এই বিষয়গুলিতে অসংখ্য নিবন্ধ লিখেছেন, যা ভারত, থাইল্যান্ড এবং ইন্দোনেশিয়ার সম্মানিত ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে।  তাঁর প্রথম বই ওড়িশার পটচিত্রে জগন্নাথ সংস্কৃতি 2018 সালে প্রকাশিত হয়েছিল।   তিনি নিজে একজন স্বশিক্ষিত শিল্পী,ভারতের পাশাপাশি থাইল্যান্ডে বিভিন্ন একক এবং গ্রুপ আর্ট প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন।  স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত , রামকৃষ্ণ মিশনের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন হস্তশিল্প শেখানোর কেন্দ্রে  তিনি আন্তরিক ভাবে  সংযুক্ত ।  ভারতের ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন  জায়গায় নারী ও শিশুদের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যমে সহায়তা করছেন। বিদেশে বিভিন্ন আর্ট ওয়ার্কসপে র মাধ্যমে ভারতের ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও সংস্কৃতি কেও পৌঁছে দিচ্ছেন পৃথিবীর নানা দেশে র মানুষের মনের গভীরে।