মহাপ্রভুর বিশ্রামস্থল অম্বিকা কালনার অন্যতম এক দর্শনীয় স্থান

Share your experience
  • 208
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    208
    Shares

মহাপ্রভুর বিশ্রামস্থল অম্বিকা কালনার অন্যতম এক দর্শনীয় স্থান। রাঢ় বঙ্গে অনেক স্থানে মহাপ্রভুর বিশ্রামস্থল রয়েছে যেমন ঘাটকুলীন নোয়াপাড়া বাহিরী পাণ্ডুয়া ইত্যাদি ।কিন্তু অম্বিকা কালনার মহাপ্রভুর বিশ্রামস্থলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুদীর্ঘ এক ইতিহাস।লিখছেন–শুভদীপ সিনহা

কালনার মন্দির
কালনার মন্দির

মন্দিরময় কালনা ও মহাপ্রভুর বিশ্রামস্থল

অম্বিকা কালনা এক প্রাচীন জনপদ। অম্বিকা বা অম্বুয়া এই নামগুলি প্রাচীন সাহিত্য এবং ইতিহাসের পাতায় বার বার উঠে এসেছে। ১৪৯৫ সালের বিপ্রদাস পিপ্পিলাই এর এর রচিত মনসাবিজয় কাব্যে আমরা অম্বিকার উল্লেখ পাই। অম্বিকা কালনার খ্যাতি মূলত ১০৮ শিব মন্দির এবং এবং লালজী মন্দির কমপ্লেক্স এবং সাধক ভবা পাগলার আশ্রমের জন্য হলেও ভক্ত বৈষ্ণবদের জন্য এ এক পরম পূণ্যতীর্থ।

মহাপ্রভু চৈতন্যের পদরেণু মিশে থাকা এখানকার পুণ্যভূমি, পুণ্য নিত্যানন্দের বিবাহস্থল এবং পরম ভক্ত বৈষ্ণব গৌরদাস পন্ডিতের শ্রীপাট হিসাবে এই স্থান বিখ্যাত। এখানে মহাপ্রভুর বিশ্রামস্থল, মহাপ্রভু মন্দির ও শ্যামসুন্দর মন্দির দেখে আরামে ভোগপ্রসাদ নিয়ে ফিরে আসতে পারেন এক অম্লান আনন্দ নিয়ে।

মহাপ্রভুর বিশ্রামস্থল

পন্ডিত গৌরিদাস ও সূর্যদাস সরখেল নদীয়ার শালিগ্রাম থেকে সাধন-ভজনের জন্য অম্বিকা কালনায় চলে এসে ভাগীরথীর সন্নিকটে একটি তেঁতুল গাছের নীচে(আম্বলী বৃক্ষ) কুটির নির্মাণ করে সাধন-ভজন করতেন। এই তেঁতুল গাছের সাথে চৈতন্যদেবের সাথে গৌরিদাসের ঐতিহাসিক প্রথম মহামিলন ১৫০৮ খ্রীস্টাব্দে হয়েছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সকলের বিশ্বাস এই গাছটির বয়স পাঁচশো বছরের বেশী। গাছের তলায় ছোট মন্দিরে একখন্ড বেলে পাথরের উপর মহাপ্রভুর পদচিহ্ন রয়েছে যার নিত্যপূজা হয়। এই তেঁতুল গাছের একটি বিশাল বৈশিষ্ট হল এটি বটবৃক্ষের মত ঝুরি দিয়ে মাটিতে নেমে আসায় গাছটির শাখা প্রশাখার বিস্তার ঘটেছে। আর একটা বৈশিষ্ট্য হল সারা বছরই গাছে দু-চারটি ফল এবং কিছু ফল ফুটে থাকতে দেখা যায় এবং গাছের ডালপালাগুলি পরস্পর পরস্পরকে জড়িয়ে আছে, যা সচরাচর দেখা যায় না। এই প্রাচীন গাছটি পন্ডিত গৌরিদাস এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সাক্ষাৎ এর একমাত্র সাক্ষী বলে সকল ভক্তবৃন্দ ভক্তিভরে দর্শন করেন। গাছের নীচে সমস্ত চত্বরটি বাঁধানো এবং প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত।

মহাপ্রভু মন্দির

মহাপ্রভু মন্দির, শ্যামসুন্দর মন্দির এবং আম্বলী বৃক্ষ সবগুলি মহাপ্রভু পাড়ায় একই এলাকায় অবস্থিত। মহাপ্রভুর দ্বিতীয়বার অম্বিকা কালনা আগমনের স্মৃতিকে অক্ষয় করে রাখার জন্য ভক্তের প্রবল বাসনাকে মান্যতা দিয়ে চৈতন্যদেবের সম্মতিক্রমে অম্বুয়া বা অম্বিকা-কালনাতে শ্রীচৈতন্যদেবের প্রথম দারু মূর্তি নির্মাণ করেন পন্ডিত গৌরিদাস পন্ডিত, যদিও এই নিয়ে কিছু মতভেদ আছে। চৈতন্য এবং নিত্যানন্দের এই আদি মূর্তিদুটি প্রথমে গৌরিদাসের পর্ণকুটিরে প্রতিষ্ঠিত ছিল। পরে তদানীন্তন ভারত সম্রাট শাহজাহান কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে বাংলার নবাব ইসলাম খাঁ মতান্তরে কাশিম খাঁ কর্তৃক প্রদত্ত এই বিশাল নিষ্কর জমিতে মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়(প্রথম মন্দির নির্মাণের সন তারিখ পাওয়া যায়নি)। ১৩৪২ বঙ্গাব্দে এই মন্দিরের প্রথম সংস্কার করেন ঢাকা নবাবপুর নিবাসী শ্রীরজনীকান্ত পাল।

মন্দিরটি প্রায় চার ফুট উচ্চ ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত কোঠাদালানের মত এবং এর পূর্ব পশ্চিম বরাবর পাঁচটি পরপর ঘরের পূর্ব দিকের প্রথম ঘরে রাম, সীতা, লক্ষণ, দ্বিতীয় ঘরে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা, তৃতীয় ঘরে শ্রীচৈতন্য-নিত্যানন্দ প্রভু; পশ্চিমদিকের চতুর্থ ঘরে রাধাগোবিন্দ এবং শেষ ঘরে গৌরিদাস এবং তাঁর সেবিত দেবতসগণ। মহাপ্রভু শান্তিপুরে হরিনদী গ্রাম থেকে ভাগিরথী প্রেরিয়ে নৌকায় যে বৈঠা বেয়ে কালনার ঘাটে এসেছিলেন সেই নৌকার বৈঠাখানি এবং মহাপ্রভুর স্বহস্তে লিখিত একটি গীতা গৌরিদাসকে প্রদান করেছিলেন। এই দুটি অমূল্য রত্ন মন্দিরে আজো রক্ষিত আছে।

এগুলি সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে। সমগ্র মন্দির প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এবং প্রবেশদ্বারটিও দেখার মত। আগে থেকে যোগাযোগ করা থাকলে সামান্য দক্ষিণার বিনিময়ে ভোগ প্রসাদ পাওয়া যায়।এই মন্দিরের বিগ্রহগুলির ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

আরও পড়ুন –হিলোড়ার শ্যামসুন্দর- রামায়েত সন্ন্যাসী ও আসর উন্নেসা বেগম

শ্যামসুন্দর মন্দির

মহাপ্রভু মন্দিরের অনতিদূরেই এই দালানকোঠা মন্দিরটি আনুমানিক চার ফুট ভিত্তিভূমির উপর স্থাপিত। এখানে পর পর তিনটি কক্ষের মাঝখানে নিতাই গৌর দারুমূর্তি এবং দুপাশে নিত্যানন্দ তাঁর দুই সহধর্মিণী মাতা বসুধা ও মাতা জাহ্নবা, সূর্যদাস, উদ্ধারণ দত্ত এবং শ্যামসুন্দর বিগ্রহ আছে। মন্দিরের সামনে নাটমন্দির আছে এবং এর পিছনে সেবাইতদের বাসগৃহ আছে। নাটমন্দিরের পাশের বাগানে একটি বাঁধা কুলগাছ আছে। কথিত আছে, এই স্থানেই সূর্যদাস কন্যা বসুধা ও জাহ্নবার সাথে নিত্যানন্দের বিবাহ সম্পন্ন হয়। পাশে বিবাহ স্থানের উপর একটি স্মারক মন্দির আছে। এখানেও আগে যোগাযোগ করলে সামান্য অর্থের বিনিময়ে ভোগ প্রসাদ পাওয়া যায়।

 মহাপ্রভুর বিশ্রামস্থল দেখুন কৌলালের ভিডিও


Share your experience
  • 208
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    208
    Shares

Facebook Comments

Post Author: শুভদীপ সিনহা

শুভদীপ সিনহা
শুভদীপ সিনহা।সরকারি আধিকারীক।ক্ষেত্রসমীক্ষক ও লোকসংস্কৃতি চার্চায় বিশেষ আগ্রহী।