মুক্তাই চন্ডী মাতা – পশ্চিম বর্ধমানের এক জনপ্রিয় লৌকিক দেবী

Share your experience
  • 509
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    509
    Shares

মুক্তাই চন্ডী মাতার মন্দির
মুক্তাই চন্ডী মাতার মন্দির

পশ্চিম বর্ধমানের গ্রামগুলিতে যুগ যুগ ধরে বসবাস করছেন অসংখ্য উপজাতি এবং তপশিলি জাতি যেমন সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা, ভূমিজ , মাল পাহাড়ি, মাহাতো বাউড়ি, বাগদী, ডোম ইত্যাদি। এঁরা সবাই মিলে এক মিশ্র সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। যার ভাষা রাঢ়ের প্রচলিত বাংলা, আর পুজো অর্চনার মধ্যে সর্বজাতি সমন্বয়ের চমৎকার প্রকাশ দেখা যায়। তাই এখানে করম পুজো, ধরম পুজো, ধৰ্ম পুজো, মনসা পুজো, ভাদু, টুসু, ইতু ইত্যাদি অসংখ্য পুজো প্রথার সঙ্গে প্রচলিত অগুনতি লৌকিক দেব দেবীর পুজো। যেমন ওলাই চন্ডী, মঙ্গল চন্ডী, উরণচন্ডী, উদ্ধার চন্ডী, নাটাই চন্ডী, অলকা চন্ডী এমন কি হাড়ি ঝি চন্ডী মুক্তাই চণ্ডী মাতা  অবধি আছেন। এখন অবধি প্রায় ১০৩ টি চন্ডীর খোঁজ পাওয়া গেছে। কোথাও তিনি গ্রাম দেবী, কোথাও কূল দেবী আবার কোথাও গৃহ দেবী। লিখছেন–ডা.তিলক পুরকায়স্থ।

নানা ধরনের চন্ডী

সাধারণত নানা রকম প্রতীকে চন্ডী পুজো হয়- ১) খোদিত শিলা মূর্তি , ২) অ- খোদিত শিলা খন্ড, ৩)মাটির ঢেলা, ৪) লাল ঘোড়া, ৫) বৃক্ষ পুজো , ৬) মাটির মূর্তি, ৭)) ধাতু মূর্তি, ইত্যাদি।বিষয়টি বোঝা সহজ হয়ে যাবে যদি রাঢ় বাংলা এবং বাঙালির নৃতাত্ত্বিক কিছু বিশ্লেষণ করা হয়।

আর্য জাতি তাঁদের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে যখন ভারতে, ভালো করে বললে উত্তর ভারতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বা প্রতিষ্ঠা পাবার জন্য যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত আছে, বাংলাদেশে তখন আদিতম দ্রাবিড় গোষ্ঠী এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিম জনজাতি গোষ্ঠী বা প্রটো অস্ট্রোলয়েড গোষ্ঠীর লোকেদেরই বসবাস। এরা ছিল অতি উন্নত জাতি, এরা অস্ট্রিক ভাষায় কথা বলত।

চন্ডীর অবৈদিক উৎস

পরবর্তী কালে অবৈদিক আর্য যেমন আলপিও, দিনারিও ইত্যাদি জন গোষ্টিও বাংলার মাটিকে বাসভূমি হিসাবে গ্রহণ করে থিতু হয়ে বসে। এই দ্রাবিড় এবং মুখ্যত অবৈদিক আর্য আলেপিও , দিনারিও গোষ্ঠীর লোকেদের সঙ্গে অস্ট্রিক সংস্কৃতি ও সভ্যতার ধারক গোষ্ঠীর মিলনের ফলেই আজকের বাংলাদেশের বাঙালি গোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক উৎপত্তি। অর্থাৎ বাঙালি হচ্ছে মিশ্র শংকর জাতি।বৈদিক আর্যদের বঙ্গ বিজয় এবং বৈদিক সংস্কৃতির আবির্ভাব এর অনেক পরের ঘটনা।বঙ্গ সংস্কৃতিতে অনার্য প্রভাব নিয়ে বলা যায় যে নৃতাত্ত্বিক ভাবে বাঙালি যে উন্নত জাতি তার কারণ তার রক্তে আছে তিনটি সভ্যতার – প্রোট অস্ট্রোলয়েড, দ্রাবিড় এবং মিশ্র আর্যভাষী- সভ্যতার মিশ্রণ। তাই বঙ্গ সংস্কৃতি বলতে কেবল ব্রাহ্মণ‍্য সংস্কৃতি আদৌ বোঝায় না। এর পরতে পরতে মিশে আছে আদিম জনজাতি, অবৈদিক সভ্যতার প্রভাব। এর সঙ্গে সংযুক্তিকরণন ঘটেছে বৌদ্ধ ও জৈন সংস্কৃতির প্রভাব। অর্থাৎ এই ভারতের মহামানবেরা হচ্ছেন আদিম যুগ থেকে বসবাসকারী অসংখ্য জাতি-উপজাতিরা।

মুক্তাই চন্ডী মাতা

আমরা যাচ্ছি পশ্চিম বর্ধমানের সদর আসানসোল থেকে সামডি গ্রামে। এখানেই আছে ফুলবেরিয়া নামক একটি গ্রাম। গ্রামে আছে একটি নাতি উচ্চ পাহাড় যার স্থানীয় নাম মুক্তাই চন্ডী পাহাড় এবং একটি অপরূপ মন্দির- মুক্তাই চন্ডী যেখানে অধিষ্ঠিত লৌকিক দেবী মুক্তাইচন্ডী মাতা।

বাংলার লৌকিক দেব দেবীর থান মাহাত্ম্য কিন্তু অসাধারণ। তাই জাত পাত এমনকি ধর্ম নির্বিশেষে বহু মানুষ এখানে জমায়েত হয়, মানতের ব্রত রাখে, পুজো করে, এমন কি কোন কোন থানে পশু বলিও হয়।বেদ, উপনিষদ- কোথাও চন্ডী দেবীর উল্লেখ নেই। তাহলে ইনি কোথা থেকে উদ্ভব হলেন ?

চন্ডীর উদ্ভব

তখন বর্তমানের বাঙালি জাতির উদ্ভব হয়নি। সেই সময়ের প্রোট অস্ট্রোলয়েড সম্প্রদায়ের অন্যতম হচ্ছে ওঁরাও সম্প্রদায়। আজকের বাংলার কৃষক সম্প্রদায়ের বড় অংশ এই ওঁরাও বংশোদ্ভূত। এঁরা সম্ভবত উড়িষ্যা থেকে আগত এবং তখন এঁদের নাম ছিল উড্র । আজ বাঙালি ওঁরাওরা এমনভাবে বর্তমানের হিন্দু সমাজে মিশে গিয়েছেন যে, এঁরা বর্তমানে এদের ভাষা কুরুম থেকে সাদরি অবধি সব বিস্মৃত।এখন ইনারা প্রায় সবাই গৃহস্ত চাষি, কিন্তু বহু প্রাচীন কালে শিকার করে জীবন ধারণ করাও এঁদের অন্যতম পেশা ছিল। শ্রী অশোক দাসের মতে, এই ওঁরাওদের শিকারের দেবী ছিলেন চান্ডী । শিকারের সময় এঁদের সঙ্গে থাকত চান্ডী শিলা। যখন বহিরাগত আর্যরা প্রাক-আর্য দেব দেবীদের আর্যিকরণ করা শুরু করেন, তখন সৃষ্টি হয় মার্কণ্ডেয় পুরান, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরান ইত্যাদি। খুব সম্ভবত ওঁরাওদের পূজিত এই চান্ডী দেবী , পরবর্তীতে হয়ে যান ব্রাহ্মণ‍্য‍ সম্প্রদায়ের পূজিত চন্ডী দেবী। ঠিক যেভাবে শবরকুমারী রুপিনি বীণাবাদিনী সর্ববিষ হরণকারী বৌদ্ধ জাঙ্গুলী দেবী, হয়ে গেলেন হিন্দু সমাজে দেবী মনসা।

লৌকিক চন্ডী পুজো

উচ্চ বর্ণের চন্ডীর পুজো পদ্ধতির সঙ্গে গ্রামে গঞ্জে গাছতলায় প্রতিষ্ঠিত এই লৌকিক চন্ডী দেবীর পুজোর মধ্যে মিলের থেকে অমিলই বেশি । তাই অনায়াসে মুক্তাইচন্ডী মাতার মন্দিরে অবস্থান করেন, দেবী শীতলা। অন্তজ হিন্দু ভক্তরা মনের আনন্দে অংশ গ্রহন করেন, মায়ের মন্দিরের সমস্ত অনুষ্ঠানে।ভক্তদের দ্বারা লাল ঘোড়ার ছলন দেওয়া লৌকিক পুজোর অন্যতম অংশ। বেশির ভাগ পুজো স্থলে সংস্কৃতে নয়, বাংলায় অ- ব্রাহ্মণ পুরোহিত মন্ত্র পরেন । মুক্তাইচন্ডী মন্দিরের একেবারে কাছেই আছে একটি লৌকিক দেবী রোশনাবুড়ির থান। এই থানের মুখ্য পূজারী কিন্তু স্থানীয় মাল সম্প্রদায়ের ‘ লয়া’ পুরোহিত। লয়া অর্থ অ- ব্রাহ্মণ পুরোহিত।

মুক্তাই চন্ডী মাতা
মুক্তাই চন্ডী মাতার প্রতীক শিলাখণ্ড

মন্দির-মুক্তাই চন্ডী মাতা

মুক্তাই চন্ডী মাতার মন্দিরটি একটি নাতিউচ্চ টিলার উপরে অবস্থিত। মন্দিরটি দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। মুখ্যত কয়লাখনি অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় এবং রাষ্ট্রয়ত সংস্থা ই সি এলের সক্রিয় সহযোগিতায় এই অপূর্ব মন্দিরটি নির্মিত হয়েছে। তবে এখানকার চন্ডী মূর্তিটি এবং দেবীর থানটি কিন্তু অদ্ভুত। পাহাড় কেটে তার মধ্যে প্রাচীন শিলাটি স্থাপন করা হয়েছিল কোন সে আদিম যুগে। পাহাড় কেটে করা গুহার উপরে চমৎকার ইঞ্জিনিয়ারিং কৌশলে মন্দিরের ছাদটি নির্মিত। আদি শিলামুর্তিটি প্রায়, ফুট দেড়েক উঁচু, তীর ধনুক নিয়ে এক স্ত্রী যোদ্ধার মূর্তি। একদা মূর্তিটিতে ছয়টি ঘোড়া খোদিত ছিল, অর্থাৎ দেবী ছয় ঘোড়ায় আসীন ছিলেন। বর্তমানে মূর্তিটি মাঝখান থেকে ভেঙে গেছে। ছটির মধ্যে কেবল তিনটি ঘোড়া দেখতে পাচ্ছি। ভাঙবে নাই বা কেন, যেভাবে প্রতিদিন সিঁদুর লেপা হয় মূর্তির উপরে। তবে বর্তমানে একটি আধুনিক পাথরের মূর্তি, শিলা মূর্তির পাদদেশে স্থাপিত করা হয়েছে, দেবী চন্ডী নাম দিয়ে।

মুক্তাই চন্ডী মাতার পুজো

একসময় নিশ্চয়ই চান্ডী শিলার পূজারী ছিলেন ওঁরাওদের পুরোহিত ‘পাহান’রা। অনেক পরে ব্রিটিশ জমানায় বর্তমানের ধানবাদ জেলার অন্তর্ভুক্ত পাঁঁড়রা গ্রামের এক রাজবংশ এই বিস্তীর্ণ জঙ্গলভূমির রাজা হন। এঁরাই সম্ভবত তখনকার উপজাতি পাহান পুরোহিতকে সরিয়ে দিয়ে নিকটবর্তী ফুলবেরিয়া গ্রামের চক্রবর্তী উপাধির ব্রাহ্মণ সেবায়েত নিয়োগ করেন। ৺লোকনাথ চক্রবর্তী থেকে শুরু করে তাঁর পঞ্চম অধঃস্তন পুরুষ, বর্তমানের সেবায়েত নবকুমার চক্রবর্তী। নবকুমার বাবুর সঙ্গে মন্দিরটি নিয়ে অনেক কথা হল। ভারী ভালোমানুষ, কিন্তু মন্দির কিংবা দেবীর প্রাচীনত্ব নিয়ে কোন ধারণা নেই উনার। এক বিখ্যাত ক্ষেত্র সমীক্ষক আমাকে বলেছেন, এই মূর্তি উনার মতে বৌদ্ধ শাষনদেবী। মন্দিরের পাহাড় চূড়া থেকে দারুন লাগে চতুর্দিক দেখতে। এখানে একটি বিশাল পাথরের তৈরি বলির স্থান আছে। বলির পাথরটি এবং এর সামনে মাটিতে প্রোথিত একটি কারুকার্য করা প্রাচীন পাথরের ভগ্ন টুকরো কিন্তু বিস্মৃতপ্রায় ইতিহাসের দিকে আঙ্গুল তোলে।

বলি প্রথা

নবকুমার বাবুর কাছে শুনলাম, এখানে পুজোতে বলি হয়না, কিন্তু মানসিকের পাঁঠা বলি হয়। বলি দেন স্বয়ং পুরোহিত ।নিত্য পুজো ছাড়াও, এখানকার বাৎসরিক পুজো শুরু হয় মাঘী পূর্ণিমাতে। খুব জাঁক জমকের সঙ্গে সাতদিন ব্যাপী চলে মুক্তাইচন্ডী মেলা। কৃষ্ণপক্ষের চতুর্থিতে হয় হোম যজ্ঞ, প্রতিদিনই বাউল গান, কবিগান ইত্যাদির আসর বসে। মন্দির কমিটির তরফে অনেকরকম সমাজসেবা মূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

মুক্তাই চন্ডী মাতা শক্তিপীঠ

এই মন্দিরের পুরো নাম- মুক্তাই চন্ডী শক্তিপীঠ। কি জন্য ইনারা এটিকে শক্তিপীঠ বলছেন জানতে চাইলে একটি কাল্পনিক গল্পকথা শুনলাম। সেটি আপনাদের জ্ঞাতার্থে পেশ করছি। সতীর মৃত্যুর খবরে ক্রুদ্ধ শিব তখন সতীর দেহ নিয়ে তান্ডব নৃত্য করছেন। সেই সময়ে নাকি সতীর নাকচাবির মুক্তটি ছিটকে পড়ে বর্তমান স্থলে। তাই এই জায়গাটির নাম মুক্তাইচন্ডী শক্তিপীঠ।

মুক্তাই চন্ডী বা চান্ডী দেবী আছেন। ব্রাহ্মণ পুরোহিত এবং অসংখ্য হিন্দু ভক্তরা আছেন। কিন্তু দেবীর আদি ওঁরাও ভক্তরা আর নেই।ধারে কাছের গ্রামগুলিতে বর্তমানে নাকি এক ঘর ওঁরাও আর বাস করেন না। ব্রাহ্মণ‍্যবাদী সমাজ কিভাবে একটি সম্পূর্ণ সম্প্রদায়কে গ্রাস করে নিতে পারে, মুক্তাইচন্ডির সংলগ্ন অঞ্চল তার প্রমাণ।

আরও পড়ুন  গঙ্গাদিত্য পুজো-মুর্শিদাবাদের অমরকুণ্ড গ্রামে প্রাচীন সূর্যোপাসনা

তথ্যসূত্র-
১) বাংলার সংস্কৃতি: লুপ্ত ও লুপ্তপ্রায়। পালযুগ. গুপ্তযুগ. সেনযুগ থেকে অদ্যাবধি। নারায়ণ সামাট। দেশ প্রকাশন।
২)কৌলাল, ষষ্ঠ বর্ষ, নভেম্বর ২০১৬। বুড়ি ছুঁয়ে যাই, নবারুণ মল্লিক, পৃষ্টা ৯৩ ।
৩) বর্ধমান সীমান্তের একটি অন-আর্য দেবী: মুক্তাইচন্ডী। অশোক দাস। ( আজকের যোধন, জুলাই-আগষ্ট, ২০০০ সংখ্যা থেকে সংগৃহীত।)
৪) আবাদভূমি, তৃতীয় বর্ষ, সপ্তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৬ – এপ্রিল ২০১৭।
৫)সুহৃদকুমার ভৌমিক । আর্য্ রহস্য। মনফকিরা।
৬) আদিবাসী সমাজ ও পালপার্বন : ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে।লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গ সরকার।ছবি:- লেখক।

 দেখুন কৌলালের লৌকিক দেবদেবী নিয়ে একগুচ্ছ ভিডিও তথ্যচিত্র


Share your experience
  • 509
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    509
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।