মুর্শিদাবাদের বন্যেশ্বর শিবমন্দির

Share your experience
  • 125
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    125
    Shares

আশুতোষ মিস্ত্রী

মহাভারতের যুগে প্রাচীন স্থানের নামের সাথে  পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি অঞ্চলের নাম পাওয়া যায়। তার মধ্যে প্রথমটি প্রায় সকলেই জানেন। তা হলো একচক্রা গ্রাম ও বক-রাক্ষস বধের কথা।  অজ্ঞাতবাস চলাকালীন চালচুলোহীন হয়ে ঘুরতে ঘুরতে পান্ডবেরা মাতা কুন্তি ও দ্রৌপদী সহ  ব্রাহ্মণ ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে তাদের এই গ্রামে পদার্পণ করতে হয়েছিল। এবং সেখানে এক গৃহস্থের বাড়িতে রাত্রিবাস ও পরদিন ভীম এখানেই বকরাক্ষসকে বধ করেছিলেন।  মহাভারত প্রসিদ্ধ এই জায়গাটি রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের লাল মাটির দেশ বীরভূমের বীরচন্দ্রপুর ওরফে একচক্রা গ্রাম।

ঠিক তেমনি মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘী থানার বন্যেশ্বর গ্রামের বন্যেশ্বর মন্দিরের শিবলিঙ্গটি প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মহাভারতের পাণ্ডবদের নাম শোনা যায়। বন্যেশ্বর গ্রামটি আজিমগঞ্জ – নলহাটি রেলপথের মোড়গ্রাম স্টেশন থেকে ৯ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত।  এছাড়া ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের বেলেপুকুর বাসস্টপ থেকে মোরাম রাস্তা ধরে গ্রামে পৌঁছানো যায়। বীরভূম জেলার সীমান্তবর্তী পুরাতন বাদশাহী সড়কের অদূরেই গ্রামটি অবস্থিত।

বন্যেশ্বর শিবমন্দির নিয়ে  জনশ্রুতি আছে যে- বীরভূম জেলার নলহাটি থানার বারা (বারণাবত)  গ্রামে পাণ্ডবেরা নাকি অজ্ঞাতবাসের সময় এসেছিলেন। তখন পাণ্ডবেরা এই শিব লিঙ্গটি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এবং পূজার্চনা করতেন। এই বারণাবত থেকে পরবর্তী কালে বারা নামটির নাম করণ বলে জানা যায়। পরবর্তী কালে বন্যেশ্বর শিব লিঙ্গটি মাটির নিচে চাপা পড়ে যায় এবং ওই স্থানটি গভীর জঙ্গলে পরিণত হয়। এই শিবলিঙ্গটি খুঁজে পাওয়া নিয়েও একটি জনশ্রুতি শোনা যায়।  উক্ত বারা গ্রামের এক গোয়ালার একটি কালো গাভী প্রতিদিন জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে শিব লিঙ্গের উপর দুধ দিয়ে আসতো। দিনের পর দিন গাভী থেকে দুধ না পেয়ে সেই গোয়ালা রহস্যের সন্ধানে গাভীটির পিছু নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করে দেখে যে গাভীর বাঁট থেকে দুগ্ধ ধারা ঝড়ে পড়ছে একটি শিবলিঙ্গের উপর। গোয়ালা সেই সব দেখে হতবাক হয়ে গ্রামে ফিরে আসেন। তখন সেই গোয়ালা ও প্যারীচাঁদ মোহান্ত নামে এক সাধককে  নিয়ে গিয়ে সেই স্থান গিয়ে  শিবলিঙ্গটি খুঁজে বের করেছিলেন। উক্ত স্থানটি বন জঙ্গলে পরিপূর্ণ থাকার কারণে এবং এই শিবলিঙ্গের মাহাত্ম্যের জন্য এই অঞ্চলের নাম বন্যেশ্বর রাখা হয়। প্যারীচাঁদ মোহান্ত ছিলেন বন্যেশ্বর শিব মন্দিরের প্রথম সেবাইত। যদিও বারা গ্রামটি বীরভূম জেলার মধ্যে পড়লেও উক্ত বন্যেশ্বর গ্রামটি মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘী থানার মধ্যে পড়ে।

বর্তমান বন্যেশ্বর শিবমন্দিরটির প্রতিষ্ঠা সমন্ধেও তেমন কিছু সঠিক বৃত্তান্ত জানা যায় না । মন্দির গাত্রে কোনো লিপি না থাকার জন্য সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়না । তবে শোনা যায় নাকি বর্তমান শিব মন্দিরটি রানী ভবানী নির্মাণ করে দিয়েছিলেন, এবং পূজার্চনার খরচ চালানোর জন্য অনেক  লাখেরাজ জমি দান করেছিলেন। স্থাপত্যে মন্দিরটি সাধারণ চারচালা রীতির মধ্যে পড়ে। শিবমন্দিরটি একটি উচ্চ ঢিবির ধ্বংসাবশেষের উপরে অবস্থিত । ঢিবির চারিদিকে বিক্ষিপ্তভাবে গুপ্ত – উত্তর যুগের পুরাতন ইট দেখা যায় । কৃষ্ণ মসৃণ লোহিত , ধূসর ইত্যাদি নানা বর্ণের মৃৎপাত্রের ভগ্ন অংশ ঢিবির চারিদিকে  ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। মন্দিরটি গ্রামের বাইরে এক ফাঁকা মাঠের মধ্যে অবস্থিত। তবে বর্তমানে কিছু বসতি নির্মাণ হয়েছে। মন্দির সংলগ্ন বটবৃক্ষের  স্থানটিকে ষষ্ঠীতলা বলা হয়। এই ষষ্ঠী তলায় একটি ভগ্ন পাথরের উমা – মহেশ্বরের মূর্তির সাথে  অনেক গুলো ভগ্ন পাথরের মূর্তির অংশ দেখা যায় । মন্দিরের কাছেই প্রায় ধ্বংস প্রাপ্ত একটি তুলসী বেদী আছে । তার সাথে আছে একটি কালী পূজার পাকা বেদী। বেদীর উপর পাথর নির্মিত প্রাচীন সৌধের অংশের সাথে কোনো বৃহদাকার পাথরের মূর্তির ভাঙা পাদপীঠ দেখা যায়। মন্দিরের স্থানটি নিরিবিলি পরিবেশের উপর  দধি সাগর দীঘির পাড়ে অবস্থিত। এই দীঘির জলাশয়ের উপর প্রাচীন চুন সুরকির গাঁথনিতে পুরাতন ইটের তৈরি একটি প্রাচীন ঘাট দেখা যায় । এই  প্রাচীন ঘাটটি অধিকাংশ সময় জলের তলায় ডুবে থাকে। বন্যেশ্বরের মন্দির সংলগ্ন ঢিবিটি খনন কার্য হলে ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া তথ্য উদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে।

বন্যেশ্বর গ্রামে প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের শিবরাত্রিতে শিবচতুর্দশী উপলক্ষে ১০ দিনের মেলা বসে মন্দির প্রাঙ্গণে । তখন মহা ধুমধাম সহকারে বন্যেশ্বর দেবের পূজা হয়। এই মেলায় সাগরদিঘী ছাড়াও মুর্শিদাবাদ লাগোয়া বীরভূম জেলার নলহাটি – রামপুরহাট থেকে প্রচুর ভক্ত আসেন বাবার মাথায় জল ঢালার জন্য। দুরারোগ্য ব্যাধি হলে রোগ সরানোর জন্য ভক্তরা মানত করেন। অনেকে মানতের ছাগ বলি দেন মন্দিরের সামনের প্রাঙ্গণে। লোক মুখে শোনা যায় সাঁওতাল পরগনার পরিমল দাস নামে এক ব্যক্তি এখানে মানত করে দুরারোগ্য ব্যাধি অম্লশূল রোগ থেকে মুক্তি পান এবং সেই থেকে তিনি এখানেই বসবাস শুরু করেন , এবং পরে সাধক ও হয়েছিলেন।  জল ঢেলে স্নান করানো আগত ভক্তদের জন্য মন্দির কতৃপক্ষ থেকে খিচুড়ি প্রসাদ খাওয়ানো হয়।

এই মন্দিরের প্রাচীন কথা জানার জন্য পাশের   তাঁতিবিড়ল গ্রামে মামার বাড়িতে  বড় হয়ে ওঠা  শ্রীবিজন রায় মহাশয়ের কাছে জানলাম –   ” এক থেকে দেড়শো বছর আগেও বীরভূম জেলার নলহাটি রামপুরহাট থেকে বহু ভক্তের আগমন ঘটতো বাবার মাথায় জল ঢালার জন্য। সেই সময় টোপর যুক্ত গরুর গাড়ির চল ছিল , সেই গরুর গাড়িতে করে বাড়ির মহিলা সমেত পুরুষ মানুষেরা আসতেন । উল্লেখিত বন্যেশ্বর গ্রাম থেকে একটু দূরে তাঁতিবিড়ল গ্রাম পর্যন্ত গরুর গাড়ির লাইন পড়ে যেত। সেই সময় গ্রামের মেলা বসত  গ্রাম কেন্দ্রিক বিশেষ করে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য , জামাকাপড়, চাষবাস করার সরঞ্জাম , আসবাবপত্র , মাটির হাঁড়ি কলসি প্রভৃতি নিয়ে। ভক্তরা বাবার মাথায় জল ঢেলে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নিয়ে গরুর গাড়ির স্থানে এসে খিচুড়ি কিম্বা ভাত রান্না করে খেয়ে দেয়ে তবেই বাড়ি ফিরতেন ।

বর্তমান সময়েও মন্দির সংলগ্ন এলাকায় মেলা বসে তবে আগের মত অত জৌলুস আর দেখা যায় না। এখন তো প্রায় সব গ্রামেই চাহিদা মত নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়া যায় তাই আর কোনো মেলায় আগের মত ভিড় চোখে পড়েনা । তবে বন্যেশ্বর মেলায় আনন্দ বিনোদনের জন্য কবিগান, যাত্রাপালা ও আলকাপ গান হয়ে থাকে। দূরের ভক্তদের থাকার  জন্য মন্দির সংলগ্ন স্থানে একটি যাত্রীনিবাস বানানো হয়েছে যাতে কোনো রকম অসুবিধা না হয়ে থাকে।

ছবি–লেখক :

তথ্যসূত্র : মুরশিদাবাদ থেকে বলছি (অখণ্ড) – কমল বন্দোপাধ্যায়,

মুর্শিদাবাদের ঐতিহ্যবাহী মেলা – সুশান্ত বিশ্বাস,

প্রত্ন ক্ষেত্র সাগরদিঘি – অজয় কুমার ঘোষ(মুর্শিদাবাদ অনুসন্ধান দ্বিতীয় পত্র)।

সাক্ষাৎকার : শ্রীবিজন রায় মহাশয় ও বিশেষ সহায়তা – শ্রীপরিতোষ বন্দোপাধ্যায় মহাশয়।

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 125
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    125
    Shares

Facebook Comments

Post Author: Ashutosh Mistri

Ashutosh Mistri
আশুতোষ মিস্ত্রী ।বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলার নবগ্রাম থানার অন্তর্গত জারুলিয়া গ্রামে । বর্তমানে বহরমপুর Ghosh AET Centre ফার্মের অ্যাকাউন্ট দেখা শুনো করেন । Murshidabad Heritage And Cultural Development এর সদস্য ও ইতিহাস বিষয়ক বই সংগ্রাহক।ক্ষেত্রসমীক্ষক।