মুর্শিদাবাদের নবাবি বেড়া উৎসব

Share your experience
  • 24
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    24
    Shares

সনাতন দাস

মুর্শিদাবাদ জেলার প্রাচীন ও ঐতিহাসিক সংস্কৃতি এই বেড়া উৎসব।বেড়া হলো একটি নৌকা।ভারি বিচিত্র এর গড়ন।  একটি কাল্পনিক যন্তুর মতো এর আকৃতি। যার শরিরের দুই দিকে মুখ ।একটি মুখ কুমিরের মত আরেকটি মুখ মাছের মত।

আজ থেকে প্রায় ৩১৫ বছর পূর্বে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ এই উৎসবের সূচনা করেন।প্রাচীন যুগে জলপথে , নৌকা, বজরা  করে বণিকেরা বাণিজ্য করতে যেতেন। ও এক স্থানের সঙ্গে অপর স্থানের সম্পর্ক বজায় রাখতে বিশেষ করে জলপথই সুবিধা হতো।এমনকি দিল্লিতে  খাজনা (কর)  নৌকার মাধ্যমে জলপথেই প্রেরণ করতেন  বাংলার নবাব।

ইসলামী মতে জলে বাস করেন জলের দেবতা খাজাখিজির বা খোয়াজ খিজির।এই জলদেবতা বা পিরকে সন্তুষ্ট করতে পারলে নৌকাডুবি বা বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া যাবে।তাই জলদেবতা খাজাখিজিরকে সন্তুষ্ট করতে এই উৎসবের আয়োজন।

নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দে এই ভাগিরথী নদীর জলে কদলী বৃক্ষের ভেলা বা ভুড় তৈরী করে এই উৎসবের সূচনা করেন। বেড়া বা নৌকায় বিভিন্ন রং বেরঙের বাতির আলোয় আলোকিত করে, এবং খাজা খিজিরকে  ভোগ স্বরূপে লুচি,পরমান্ন, বিভিন্ন ব্যাঞ্জনাদি, অবশেষে মুখসুদ্ধি হিসাবে পান নিবেদন করে  রূপা ও সোনার প্রদীপ প্রজ্বলন করে ভাগীরথী বক্ষে বেড়া উৎসর্গ করতেন।

বর্তমানে সোনার ও রূপার প্রদীপ প্রদক্ষিণ করে তুলে নেওয়া হয়।কিন্তু পূর্বে  নবাবেরা প্রদীপ সহ বেড়া ভাসিয়ে দিতেন।

মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে নবাবী কাল মুছে গেছে বহু বছর আগেই।কিন্তু থেকে গেছে নবাবদের প্রচলিত প্রথা এই বেড়া উৎসব।

কালের নিয়মে সেই নবাবী সময়ের জৌলুস আর নেই, সেরকম জাঁকজমকও আর হয়না।

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের অধীনস্থ মুর্শিদাবাদ স্টেট ম্যানেজারের তত্ত্বাবধানে এই বেড়া বা ব্যারা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

বাংলা বছরের ভাদ্রমাসের শেষ বৃহস্পতিবার রাতে( নয়টা সময়) বেড়া নামক সুন্দর সুসজ্জিত কলাগাছের ভেলাটি ভাগীরথীর পবিত্র জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

বেড়া উৎসব উদ্বোধন করেন জেলা তথা রাজ্যস্তরের বিশিষ্ট সরকারি প্রশাসন দপ্তরের আধিকারিক গণ।এই উৎসব দেখার জন্য জাতী ধর্ম নির্বিশেষে মুর্শিদাবাদ জেলার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ , পাশ্ববর্তী জেলা গুলির মানুষ, এমনকি বাংলাদেশের কিছু পর্যটকেরাও এই মুর্শিদাবাদ জেলার প্রাচীন নবাবী ঐতিহ্য দেখার জন্য আসেন।

ব্যতিক্রম হিসাবে  বিগত বাংলা ১৪২৫ সালের ৩১৫ তম্ বেড়া, ভাদ্রমাসের শেষ বৃহস্পতিবার না হয়ে এক সপ্তাহ আগে হয়েছে।কারণ ভাদ্রমাসের শেষ বৃহস্পতিবার মহরমের জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এমনকি বর্তমান বাংলা বছরের ১৪২৬ সালের একই  সমস্যা (গতবছরের তুলনায় ১০দিন মহরম এগিয়ে গেছে) হওয়ার কারণে তিন সপ্তাহ আগে ৩১৬ তম্ বেড়া, ভাদ্রমাসের প্রথম বৃহস্পতিবার এই উৎসব অনুষ্ঠিত হলো।

সেই কারণে বেড়া উৎসবের কথা অনেক মানুষ অজানা থেকে যাচ্ছে। এর ফলে বিগত বছর থেকে এই উৎসবের দর্শকের সমাগমটা অনেক কমে গেছে।

এর ফলে পর্যটক বা স্থানীয় ব্যবসাদারদের ক্ষতি হচ্ছে, বিশেষ করে যারা, খাবারের দোকান, বাচ্চাদের খেলনা, ছোট ছোট হকাররা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।

সরকার যদি এর গুরুত্ব অনুভব করতে পারে, সঠিক পরিকল্পনা মাফিক প্রচারের আলোয় নিয়ে যেতে পারে, তাহলে প্রচুর পর্যটকের আগমন ঘটবে, ফলে জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে।

ফিরে আসবে ঐ হারিয়ে যাওয়া নবাবী আমলের ঐতিহাসিক বেড়া উৎসবের জৌলুস।

ছবি–লেখক

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 24
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    24
    Shares

Facebook Comments

Post Author: সনাতন দাস

সনাতন দাস
লেখক সনাতন দাস, মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ এন্ড কালচারাল ডেভলপমেন্ট সোসাইটির সাধারণ সদস্য।