নবদ্বীপের রাসের কালী

Share your experience
  • 33
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    33
    Shares

সপ্তক দাসঃ বড় শ্যামা মাতা : ১৭১৮ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত ২৯ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট বড়শ্যামা মাতা নবদ্বীপের তেঘরী পাড়াতে রাস পূর্ণিমাতে পূজিত হন।এই পূজার প্রতিষ্ঠা করেন তন্ত্রসাধক ভৃগুরাম।মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র ভৃগুরামকে তেঘরী মৌজায় ১২০০ বিঘা ভিটা জমি ও ১০০০ বিঘা মাঠের জমি দান করেছিলেন। প্রথমে এই পূজা পারিবারিক থাকলেও বর্তমানে বর্তমানে সার্বজনীন পূজার রূপ নিয়েছে। ১৯৮৪ সালে ৮০০০০ টাকা অর্থ ব্যয় করে বর্তমান মন্দিরটি নির্মিত হয়েছে। ভৃগুরামের তিন পুত্র গদাধর, কৃষ্ণরাম রামগোপাল ।এই বংশের লোক ছাড়া বাইরের কোন পুরোহিত দিয়ে পূজা করার নিয়ম নেই। বড়শ্যামা মাতার সারা বছর ঘটে পূজা হয়.. শুধুমাত্র রাস পূর্ণিমাতেই মূর্তি নির্মাণ করে পূজা হয়। বড়শ্যামা মাতা পূজায় জনসাধারণের থেকে কোনো চাঁদা নেওয়া হয়না.. ” দি ট্রাস্টিস অব বড়শ্যামা মাতা” নামক ট্রাস্টি ফান্ড থেকেই বড়শ্যামা মাতার পূজার আয়োজন করা হয়.. নবদ্বীপে বড়শ্যামা মাতা যেমন আছেন তেমনই আছেন মেজো, সেজো ও ছোট শ্যামামাতা।

বামাকালী মাতা – নবদ্বীপ রামসীতা পাড়ায় বামাকালী মাতা পুজিত হয়, সাবেকি পূজা অসাধারণ সুসজ্জিতা মায়ের মূর্তি, এখানে মায়ের বাম পা শিব বক্ষে থাকে তাই বামাকালি বলা হয়, গৃহস্থের ঘরে পূজা হয়। কৃষ্ণনন্দ আগমবাগীশের সৃষ্ট দক্ষিণা কালীমূর্তিতে কালীর ডান পা শিব বক্ষে থাকে..বামাকালী কিন্তু বিপরীত ! গৃহস্থের ঘরে এই পূজার নিয়ম নেই।মা তন্ত্র মতে পূজিতা হন, এটি একটি সুপ্রাচীন পুজা।

শবশিবা মাতা – শবতশিবা কিন্তু এক বিচিত্র তান্ত্রিক মূর্তি, লোকমতে নিচে জড়বৎ শিব তার উপর মহাকালের সাথে বিপরীত রতিক্রিয়ায় মগ্ন কালীক। কালিকাপুরাণ মতে প্রেতবৎ শিবের সাথে দেবীর সঙ্গমমূর্তি।ব্যাদরাপাড়া ছাড়াও নবদ্বীপের আরো দুই শবশিবা পূজিতা হন একটি ভুতেশ্বরী নাম এবং অপরটি আমপুলিয়া পাড়ায়, তবে শিতিকন্ঠ বাচস্পতির আমপুলিয়া পাড়ার কালী শ্যাম বর্ণা নন, গাঢ় নীল রূপেই তিনি পূজিতা |তবে এতোগুলির মধ্যে ব্যাদরা পাড়ারটিই সর্বাপেক্ষ প্রাচীন – পুজো শুরু হয়েছিল প্রায়কয়েক শতক বছর আগে তবে এই  পুজো একসময় বহুবছরের জন্যে বন্ধ হয়ে গেছিল। এলানিয়া কালীর পুজো শুরুর পরের বছরেই এই রাস পূর্ণিমাতে পুনরায় পূজা শুরু করেন শিতিকন্ঠ বাচস্পতি, তিনি প্রথম রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের অনুগ্রহে  মূর্তিকল্পে দেবী পূজা করেন তার আগে বিশেষ যন্ত্রে এই পূজা সম্পন্ন হতো।

রণকালী – রাধাবাজার এর রণকালি মাতা বিখ্যাত, সুসজ্জিতা মায়ের মূর্তি, এখানে মায়ের ডান পা আগে, মা তন্ত্র মতে পূজিতা হন..এটি মালো সম্প্রদায়ের সুপ্রাচীন পূজা।

ভদ্রকালী মাতা – বাঙালীদের আশ্বিন মাসে দুর্গা পূজা হয়। কিন্তু প্রকৃত দুর্গা পূজা বাসন্তি পুজাকে বলা হয়, রামচন্দ্র পাতালপুরী থেকে দুর্গা মা কে নিয়ে এসে আশ্বিন মাসে মা এর পূজা দেন একে অকালবোধন বলা হয়, ভদ্রাকালী মাতা এই অকালবোধন এর আগের রূপ। হনুমান, রাম, লক্ষ্মণ মা কে নিয়ে আসছেন। দুটি ভদ্রাকালী মাতার পূজা হয় নবদ্বীপে।

গৌরাঙ্গিনী মাতা – যোগনাথ তলার গৌরাঙ্গিনী মাতা নবদ্বীপের ঐতিহ্য, পূজার পরের দিন ১০৮ জন বেয়ারার কাঁধে প্রতিমার শোভাযাএা অতুলনীয়। মা দুর্গা অসুর বিজয় এর পরের রূপ এই মূর্তি। কমিটির সময়কাল অনুযায়ী ১৮৯ বছরের প্রাচীন পূজা এটি। ১৮৬০-৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সংঘটিত প্রবল বন্যা বা ভূমিকম্পে পুরাণগঞ্জ ধ্বংস হয়েছিল। রেকর্ড থেকে জানা যাচ্ছে, ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে প্রবল বন্যা হয়েছিল। এখানে, সম্ভবত এই বন্যাতেই পুরাণগঞ্জ গঙ্গাগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এখানকার অধিবাসীরা বর্তমান শ্ৰীবাস অঙ্গন পাড়ায় উঠে আসেন। পুরাণগঞ্জের বিন্ধ্যবাসিনী শ্ৰীবাস অঙ্গন পাড়ায় পূজিতা হতে থাকে। কয়েক বছরের মধ্যে গোষ্ঠীকেন্দিলে এটি ভাগ হয়ে যায়। একটি গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করে খড়ের গোলার বিন্ধ্যবাসিনী আর অপরটি গৌরাঙ্গিনী নামে প্রতিষ্ঠিত হয় যোগনাথতলায়। রাজপুরোহিত অসীমকুমার ভট্টাচার্য নথিপত্র ঘেঁটে জানালেন যে, গোলকী নাথ ন্যায়রত্ন এই দেবীর ধ্যান রচনা করেছিলেন।

কৃষ্ণমাতা– নবদ্বীপ এর রাম সীতা পাড়ার আর এক প্রতিমা কৃষ্ণমাতা। এই মূর্তিতে কা্লীর কোলে কৃষ্ণকে দেখা যায় বৈষ্ণব ও শাক্ত ধর্মের মিলন পাওয়া যায় মূর্তিতে।

কৃষ্ণকালী– নবদ্বীপের ফাঁসিতলার কৃষ্ণকালী পূজা স্থাপিত ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে.. নবদ্বীপ রাস উৎসবের অনেক বৈচিত্রময় মূর্তির মধ্যে এটি অন্যতম.. কৃষ্ণকালী অর্ধনারীশ্বর মূর্তি। এই মূর্তির মধ্যে শাক্ত ও বৈষ্ণবদের এক অপূর্ব মিলন সাধিত হয়েছে.. জনশ্রুতি আছে এই পূজার বিধান বৃন্দাবন থেকে আনা হয়েছিল..

মহিষাসুরমর্দিনী- নবদ্বীপ রাসে মহিষাসুরমর্দিনী মাতার পূজা বেশি হয়ে থাকে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু পূজার মধ্যে আসে নন্দী পাড়া, ছোট বাজার, ও পোড়ামাতলার মহিষাসুরমদ্দিনী পূজার নাম..পোড়ামাতলার মহিষাসুরমর্দিনী এক মাত্র পূজা যেখানে মায়ের ৩ দিন ধরে পূজা পর্ব উৎযাপন করা হয়..

এবার আসা যাক নবমিতে পোড়ামাতলার পোড়ামা মন্দিরকে সবাই খুব জাগ্রত মানেন। বহু দূর দুরান্ত থেকে লোকেরা আসেন পোড়ামাতলায় মাকে পূজা দিতে। রাস পূর্ণিমার দিন সকালে সকল বারোয়ারি পূজা গুলি ও পূজা দিতে আসেন পোড়ামার কাছে শোভাযাত্রা সহকারে।

আড়ং – পূজার পরের দিন হয় আড়ং (শোভাযাত্রা) আড়ং এর সকালটা যেমন শুরু হয় ১০৮ জন বেয়ারার কাধে গৌরাঙ্গিনী মাতার শোভাযাত্রা দিয়ে। দুপরে শোভাযাএা হয় দুই ভদ্রাকালীর যেমন বিরাট মূর্তি উচ্চতায় প্রায় ( ২০ হাত ) তেমন সুবিশাল শোভাযাত্রা।এই দুই প্রতিমার শোভাযাত্রা শেষ হলে সন্ধ্যে ৬ ঘটিকায় শুরু হয় বাকি সমস্ত প্রতিমার শোভাযাত্রা। আনুমানিকভাবে প্রায় ৫০০ প্রতিমার শোভাযাত্রা হয় সারারাত সাথে থাকে বিভিন্ন বাজনা। প্রতিমাগুলির উচ্চতা খুব বেশি হওয়ায় নিজস্ব এক ধরনের বিশেষ লোহার গাড়ি থাকে প্রতিটি বারোয়ারির কাছে।সব শেষে আসে নিরঞ্জন এর পালা। প্রতিমাগুলি সারারাত সারিবদ্ধভাবে শোভাযাত্রার পর পরেরদিন সকালে নিরঞ্জন দেয়া হয়। শুরু হয় নবদ্বীপবাসীর আর ও একটি বছরের অপেক্ষা।

তথ্যসূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, নবদ্বীপ রয়েল সোসাইটি, সোধগঙ্গা, নবদ্বীপের ইতিবৃত্ত, শান্তিরঞ্জন দেব।

ছবি–তিরুপতি চক্রবর্তী।

 


Share your experience
  • 33
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    33
    Shares

Facebook Comments

Post Author: saptakkoulal

saptakkoulal
সপ্তক দাস।নবদ্বীপের তরুণ ক্ষেত্রসমীক্ষক এবং সংস্কৃতি সংগঠক।