নবদ্বীপের বৈষ্ণব রাস

Share your experience
  • 26
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    26
    Shares

 

 রিয়া দাসঃকার্তিকী পূর্ণিমা মানেই নবদ্বীপ বাসীর কাছে রাসপূর্ণিমা। কারণ কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিতে বৈষ্ণব মতে শুরু হয়েছিল রাস উৎসব। বৈষ্ণব মতে, রাধা কৃষ্ণের মিলন উৎসবই রাস উৎসব। কার্তিকী পূর্ণিমার জোছনার আলোয় সেজে ওঠে রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি। পরবর্তীকালে নবদ্বীপের রাস উৎসব বৈষ্ণব ও শাক্তধর্মের মিলিত উৎসবে পরিণত হয়।এখানে যেমন বৈষ্ণব মতে রাধা কৃষ্ণের পুজো করা হয় ঠিক তেমনই শাক্ত মতে শক্তির উপাসনা করা হয়ে থাকে। কথিত আছে, রাস পূর্ণিমার দিনে নবদ্বীপের প্রাচীন পণ্ডিতগণ বাড়িতে ঘট স্থাপন করে তাদের ইষ্ট দেবতার পূজো করতেন। তারমধ্যে দক্ষিণা কালী, মুক্তকেশী প্রভৃতি দেবীর পুজো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীকালে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আদেশে মূর্তি রূপে সেই ইষ্ট দেবতাদের পুজো শুরু হয় এবং সেই থেকেই নবদ্বীপের রাস বৈষ্ণব ও শাক্ত ধর্মের মিলিত উৎসবে পরিণত হয়।

বলা হয়’রস’থেকে রাস।’রস’অর্থে আনন্দ, দিব্য প্রেম, দিব্য অনুভূতি বোঝায়। বৈষ্ণব ধর্মের রস বলতে মধুর রসকেই বোঝানো হয়েছে। আর পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ হলেন মধুর রসের ঘনীভূত আধার। তাকে ঘিরেই রাস। রাস বলতে বোঝায় নারী-পুরুষের হাত ধরাধরি করে গোলাকার নৃত্য। কিন্তু বৈষ্ণবদের কাছে রাস কথাটি ভিন্ন অর্থ বহন করে।শ্রীকৃষ্ণ শারদ পূর্ণিমা রাতে বৃন্দাবনের যমুনাতটে গোপিনীদের আহ্বান করেন এবং তাদের অহং বর্জিত বিশ্বাস ভক্তি হয়ে সঙ্গ দান করেন। তাই বৈষ্ণবদের রাসযাত্রা সনাতন ধর্মালম্বীদের একটি বাৎসরিক উৎসব। রাস মূলত শ্রীকৃষ্ণের ব্রজলীলা অনুকরণে বৈষ্ণবীয় ভাবধারায় অনুষ্ঠিত ধর্মীয় উৎসব।

নবদ্বীপের রাস এর উৎস ঠিক কবে, এর উত্তরে স্থানীয় ইতিহাসের গবেষক, ও নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদের সম্পাদক শান্তিরঞ্জন দেব জানান, নদীয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের রাজত্বকালে (১৭২৮-১৭৮২) রাসের বাড়বাড়ন্ত শুরু হয়েছিল। রাজা হওয়ার পর থেকে ১৭৫০ পর্যন্ত কৃষ্ণচন্দ্র নানা সমস্যায় জর্জরিত থাকতেন।তারপর থেকে তিনি মঠ-মন্দির স্থাপন,মেলা উৎসবের সূচনা বা বহু জনকল্যাণমূলক কাজে মনোনিবেশ করেন। ১৭৫৩-১৭৫৬র মধ্যে তিনি জগদ্ধাত্রী পুজো, বারোদোলের সূচনা করেন। মনে করা হয় ওই একই সময়ে তিনি নবদ্বীপে বৈষ্ণবদের রাস উৎসবের খোললনলচে বদলে দেন।

শ্রীকৃষ্ণের সুমধুর বংশীধ্বনিতে মুগ্ধ হয়ে গোপিনীবৃন্দ নিজেদের কর্তব্যকর্ম বিসর্জন দিয়ে সংসারের সকল মোহ পরিত্যাগ করে বৃন্দাবনে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং শ্রীকৃষ্ণের চরণে নিজেদের সমর্পণ  করেছিলেন।

প্রথমে শ্রীকৃষ্ণ গোপিনীদের স্বগৃহে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন; বলেন, তাঁদের সংসার ধর্ম পালন করা উচিত। কিন্তু গোপীনীরা নিজেদের মতে দৃঢ় ছিলেন। ভগবান ভক্তের অধীন। শ্রীকৃষ্ণ গোপিনীদের দৃঢ় ভক্তি দেখে তাঁদের মনোকামনা পূরণার্থে রাসলীলা আরম্ভ করেন। কিন্তু যখনই শ্রীকৃষ্ণ তাদের অধীন বলে ভেবে গোপিনীদের মন গর্ব-অহংকারে পূর্ণ হল, তখনই শ্রীকৃষ্ণ গোপিনীদের মধ্য থেকে অন্তর্ধান হয়ে গেলেন।

শ্রীকৃষ্ণ যখন রাধাকে নিয়ে উধাও হলেন, তখন গোপিনী বৃন্দ নিজেদের ভুল বুঝতে পারেন। ভগবান কে’একমাত্র আমার’বলে ভেবে অহংকারের ফলে শ্রীকৃষ্ণকে তারা হারিয়ে ফেলেছিলেন।যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ ত্রি জগতের পতি, তাই তাঁকে কোন মায়া বন্ধনে বেঁধে রাখা যায় না। তখন গোপিনী বৃন্দ একাগ্রচিত্তে শ্রীকৃষ্ণের স্তুতি করতে শুরু করেন। ভক্তের ভক্তিতে  সন্তুষ্ট হয়ে’ ভগবান গোপিনীদের মানব জীবনের পরমার্থ বুঝিয়ে দিয়ে তাঁদের অন্তর পরিশুদ্ধ করেন। গোপিনীদের ইচ্ছাকে তিনি সম্মান জানিয়ে’যতজন গোপিনী, ততজন কৃষ্ণ’হয়ে গোপিনীদের মনের অভিলাষ পূর্ণ করেছিলেন আর গোপিনী বৃন্দ ও  জাগতিক ক্লেশ থেকে মুক্তি লাভ করেছিলেন। এইভাবে জগতে রাস উৎসবের প্রচলন ঘটে।

জনশ্রুতি প্রচলিত আছে যে, চৈতন্যদেব রাধাকৃষ্ণের রাস উৎসবের সূচনা করেছিলেন নবদ্বীপে। এ কথা যদি সত্যি হয় তাহলে স্বীকার করে নিতে হয় যে, ষোড়শ শতাব্দীর প্রারম্ভেই রাসের সূচনা হয়েছিল। আর চৈতন্যদেবের সন্ন্যাস গ্রহণের পর নবদ্বীপের বৈষ্ণব আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। গৌরাঙ্গ পরিজনেরা বাধ্য হয়ে নবদ্বীপ ত্যাগ করে স্থানান্তরে গমন করেন। ফলে বৈষ্ণবীয় উৎসব অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে।দ্বিতীয় পর্যায়ে নবদ্বীপের রাস উৎসবের সূচনা হয় অভিনব এবং বাংলার ধর্মীয় ইতিহাসে তা অদ্বিতীয়।

তথ্যসূত্রঃ১/ নবদ্বীপ ইতিবৃত্ত, নবদ্বীপ নদীয়াঃ মৃত্যুঞ্জয় মন্ডল, জানুয়ারি ২০১৩।২/ “আনন্দবাজার পত্রিকা-কলকাতা”।

৩/ দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়।’আজও অটুট রাসের মেজাজ’।৪/ “রাসে  মাতোয়ারা নবদ্বীপ”৫ নভেম্বর ২০১৭।

ছবি–লেখক


Share your experience
  • 26
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    26
    Shares

Facebook Comments

Post Author: রিয়া দাস

রিয়া দাস
রিয়া দাস।ইতিহাসে স্নাতকোত্তরে পাঠরত।ক্ষেত্রসমীক্ষক।