কলাবউ কী এবং কেন?

Share your experience
  • 29
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    29
    Shares

দীপক কুমার মজুমদার

দুর্গা পুজোর  এক বিশেষ অনুষ্ঠান বা রীতি নবপত্রিকা স্থাপন ও তার পূজা। গণেশের পাশে লাল পাড় সাদা অথবা হলুদ শাড়ী পড়িয়ে ঘোমটা দিয়ে একটি কলাগাছের সাথে আরও অন‍্য গাছকে বেঁধে রাখা হয়। লোকমুখে–কলাবউ। জনশ্রুতি  অনুযায়ী অনেকেই গণেশের স্ত্রী মনে করেন। কিন্তু গনেশের স্ত্রীদের নাম রিদ্ধি ও সিদ্ধি। এটিকে ‘নবপত্রিকা ‘ বলা হয়।দুর্গা পূজায়  একটি রহস্যময় ব্যাপার হলো নবপত্রিকা। পত্রিকা মানে পাতা হলেও আসলে নবপত্রিকা হলো নয়টি গাছ। নবপত্রিকার নয়টি উদ্ভিদ আসলে দেবী দুর্গার নয়টি বিশেষ রূপের প্রতীকরূপে কল্পিত ।

(১) কদলী বা রম্ভা: কদলি গাছ এর অধিষ্ঠাত্রী দেবী ব্রহ্মাণী;

(২) কচু: কচু গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী কালিকা;

(৩) হরিদ্রা: হরিদ্রা গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী উমা;

(৪) জয়ন্তী: জয়ন্তী গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী কার্তিকী;

(৫) বিল্ব: বিল্ব গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী শিবা;

(৬) দাড়িম্ব: দাড়িম্ব গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী রক্তদন্তিকা;

(৭) অশোক: অশোক গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী শোকরহিতা;

(৮) মান: মান গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী চামুণ্ডা;

(৯) ধান: ধান গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মী।

এই নয় দেবী একত্রে “নবপত্রিকাবাসিনী নবদুর্গা” নামে ” নবপত্রিকাবাসিন্যৈ নবদুর্গায়ৈ নমঃ মন্ত্রে পূজিতা হন।। একটি পাতাযুক্ত কলাগাছের সঙ্গে অপর আটটি গাছ মূল ও পাতাসহ একত্র করে একজোড়া বেল সহ সাদা অপরাজিতা গাছের লতা দিয়ে বেঁধে লালপাড় সাদা শাড়ি জড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া বধূর আকার দেওয়া হয়। তারপর তাতে সিঁদুর দিয়ে দেবীপ্রতিমার ডান দিকে দাঁড় করিয়ে পূজা করা হয়। প্রচলিত ভাষায় নবপত্রিকার নাম কলাবউ। আর না জেনে আমরা এটাকেই মনে করে আসছি গনেশের বউ।নবপত্রিকার পূজা প্রকৃতপক্ষে শস্যদেবীর পূজা।

গবেষকদের মতে, “এই শস্যবধূকেই দেবীর প্রতীক গ্রহণ করিয়া প্রথমে পূজা করিতে হয়, তাহার কারণ শারদীয়া পূজা মূলে বোধহয় এই প্রকৃতি রূপিনী শস্য-দেবীরই পূজা। পরবর্তীকালের বিভিন্ন দুর্গাপূজার বিধিতে এই নবপত্রিকার বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হইয়াছে। … বলাবাহুল্য এই সবই হইল পৌরাণিক দুর্গাদেবীর সহিত এই শস্যদেবীকে সর্বাংশে মিলাইয়া লইবার একটা সচেতন চেষ্টা। এই শস্য-দেবী মাতা পৃথিবীরই রূপভেদ, সুতরাং আমাদের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে আমাদের দুর্গাপূজার ভিতরে এখনও সেই আদিমাতা পৃথিবীর পূজা অনেকখানি মিশিয়া আছে। তবে অনেক পুরাণ বিশেষজ্ঞের মতে দেবীপুরাণে নবদুর্গা আছে, কিন্তু নবপত্রিকা নাই।… নবপত্রিকা দুর্গাপূজার এক আগন্তুক অঙ্গ হইয়াছে।… বোধ হয় কোনও প্রদেশে শবরাদি জাতি নয়টি গাছের পাতা সম্মুখে রাখিয়া নবরাত্রি উৎসব করিত। তাহাদের নবপত্রী দুর্গা-প্রতিমার পার্শ্বে স্থাপিত হইতেছে ।

উল্লেখ্য, মার্কণ্ডেয় পুরাণে নবপত্রিকার উল্লেখ নেই। কালিকাপুরাণে নবপত্রিকার উল্লেখ না থাকলেও, সপ্তমী তিথিতে পত্রিকাপূজার নির্দেশ রয়েছে। কৃত্তিবাস ওঝা বিরচিত রামায়ণে রামচন্দ্র কর্তৃক নবপত্রিকা পূজার উল্লেখ রয়েছে – “বাঁধিলা পত্রিকা নব বৃক্ষের বিলাস।” 

         মহাসপ্তমীর দিন সকালে নিকটস্থ নদী বা কোনো জলাশয়ে (নদী বা জলাশয়ে ) নিয়ে যাওয়া হয়। পুরোহিত নিজেই কাঁধে করে নবপত্রিকা নিয়ে যান। তাঁর পিছন পিছন  শোভাযাত্রা সহকারে ঢাকীরা ঢাক বাজাতে বাজাতে এবং মহিলারা শঙ্খ ও উলুধ্বনি করতে করতে যান। শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী স্নান করানোর পর নবপত্রিকাকে নতুন শাড়ি পরানো হয়। তারপর দোলাতে বা পাল্কীতে চাপিয়ে পূজামণ্ডপে নিয়ে এসে পুরনারীদের দিয়ে বরণ করানোর পর নবপত্রিকাকে দেবীর ডান দিকে একটি কাঠে সিংহাসনে স্থাপন করা হয়। পূজামণ্ডপে নবপত্রিকা প্রবেশের মাধ্যমে দুর্গাপূজার মূল অনুষ্ঠানটির প্রথাগত সূচনা হয়।ঠিক একই প্রথা মেনে সর্বাগ্ৰে নবপত্রিকা বিসর্জনের পরই দেবী দুর্গার মৃণ্ময়ী মূর্তি বিসর্জন হয়ে থাকে।

ছবি–লেখক


Share your experience
  • 29
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    29
    Shares

Facebook Comments

Post Author: দীপক কুমার মজুমদার

Dipak Majumder
শিক্ষাগত যোগ্যতা চ্যাটার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট হওয়ার পর সেল ( স্টীল অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার ইস্কো স্টীল প্লান্টে) ৩৪ বছর ফিনান্স বিভাগে কাজ করে এজিএম হিসেবে অবসর নিয়েছেন । আসানসোলে থাকেন। এখন অঢেল সময় , সঙ্গে ক্যামেরা ও পরিবার নিয়ে বেড়িয়ে পড়েন। সেই অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে লিখে অন্যদের আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করেন । ছবি তুলতে ভালো লাগে , সুযোগ পেলেই ক্যামেরা কাজে লাগান। এছাড়াও বর্তমানে টাটা এআইএ লাইফ এর সাথে ফিনান্সিয়াল অ্যাডভাইসর ও লাইফ প্ল্যানার হিসেবে যুক্ত আছেন।