নদিয়াজেলার বাঙালী খ্রিষ্টান সমাজ বড়দিন ও বর্ষবরণ উৎসব

Share your experience
  • 144
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    144
    Shares

নদিয়াজেলার বাঙালী খ্রিষ্টান সমাজ বড়দিন ও বর্ষবরণ উৎসব।ডিসেম্বর মাসের শেষে এলে দেখতে পাবেন, নদীয়া জেলায় কৃষ্ণনগর, রানাঘাট এবং গাংনাপুর অঞ্চল কি সুন্দর ভাবে সেজে উঠেছে খ্রিসমাস উপলক্ষে।  লিখছেন ডা.তিলক পুরকায়স্থ।

নদিয়াজেলার বাঙালী খ্রিষ্টান সমাজ

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ভারতবর্ষে বিশেষ করে বাংলায় খ্রিস্ট ধর্মের প্রচার ও প্রসারের ইতিহাস কিন্তু খুব বেশদিনের কথা নয়। ইউরোপীয়ান বণিকদের হাত ধরেই খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের প্রবেশ ঘটে এখানে। বাংলার ইতিহাসে দেখছি একদা হুগলী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় পর্তুগিজ প্রভাব ছিল, ত্রিবেণী বা সম্ভবত বাঁশবেড়িয়াতে তাঁদের বসতি স্থাপন হয় ১৫৭৯ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবরের দেওয়া ফরমান অনুসারে। পেড্রো ট্যাভার্স নামক একজন পর্তুগিজ ক্যাপ্টেনের ব্যবহারে খুশি হয়ে আকবর এই ফরমান জারি করেছিলেন। তবে এদেশে পর্তুগিজদের আগমন, তারও অনেক আগে , ১৪৯৮ সালে পর্তুগীজ নাবিক ভাস্কো ডা গামা পদার্পণ করলেন কালিকটে, ১৫১৭ সালে পর্তুগীজ বণিকেরা ব্যবসা করতে এলেন বাংলায়- চট্টগ্রাম বা পর্তো গ্রান্ডে এবং সপ্তগ্রাম বা পর্তো পিকুয়েনোতে। সপ্তগ্রামে ব্যবসা করবার জন্য ১৫৩৬ সালে তারা বাংলার সুলতান মামুদ শাহের কাছ থেকে ফরমান-ও আদায় করে নিয়েছিল।

বাঙালী খ্রিষ্টান

আবুল ফজলের বর্ণনা অনুসারে দেখা যাচ্ছে, আকবরের জমানায় সাতগাঁও এবং হুগলি নদী বন্দর পর্তুগিজ অধীনে ছিল। কিন্তু আকবরের ফরমানের অপব্যবহার করে পর্তুগীজরা লুটপাট, ডাকাতি আর দাস-ব্যবসা শুরু করল, এমনকি এক সময় তাঁরা মুঘলদের রাজস্ব দেওয়াও বন্ধ করে দিলে, শাজাহানের নির্দেশে তৎকালীন বাংলার শাসন কর্তা কাশিম খাঁ পর্তুগীজদের বাড়ি ঘর, গির্জা, দুর্গ সব ধ্বংস করে মাটিতে মিশিয়ে দেন।

বিদেশি পঙ্গপালের হানা

তখন শাজাহানকে খুশি করে ব্যবসার সনদ বা ফরমান নিয়ে প্রথমে ১৬২৫ সালে ওলন্দাজরা আসে চুঁচুড়ায় এবং ১৬৩৮ সালে ইংরেজরা আসে হুগলী বন্দর অঞ্চলে ব্যবসা করতে। ফরাসিরা চন্দননগরে আসে ১৬৭৪ সালে, ভদ্রেশ্বর অঞ্চলে আসে দিনেমাররা, প্রতিষ্ঠা করে দিনেমার ডাঙ্গা। পরে দিনেমাররা চলে যায় শ্রীরামপুরে এবং ১৭৫৫ সালে নির্মাণ করে ফ্রেডেরিক নগর। সোনার বাংলা লুট করার জন্য ঝাঁকে ঝাঁকে বিদেশি পঙ্গপালের হানার বিবরণ চমৎকার ভাবে দিয়েছেন, অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর “কোতরং” নামক ছড়াতে-

” হাঁসের প্রিয় গুগলি,
পর্তুগীজের হুগলী।
গুনীর প্রিয় তানপুরা,
ওলন্দাজের চিনসুরা।
চোরের প্রিয় আঁধার ঘর,
ফরাসীদের চন্নগর।
শিশুর প্রিয় চানাচুর,
দিনেমারের সিরামপুর।”

এর সঙ্গেই আরো জুটেছিল বেলজিয়ান, জার্মান, গ্রীক ও আর্মেনিয়ানরা ।

মিশনারি প্রভাব

তবে উপরোল্লিখিত বিদেশিরা মুখ্যত ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যেই এদেশে এসেছিল। কিন্তু সবচেয়ে পরে আসা ফিরিঙ্গিরা যখন ব্যবসার নামে এসে রাজা বনে বসে, তখন আর্থ-সামাজিক অবস্থা বদলের সঙ্গে খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রভাবে ধীরে ধীরে বাংলার কিছু মানুষ খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করেন। তবে শুরুতে ধর্মান্তরিত বাঙালির সংখ্যা ছিল খুব কমই । ইংরেজরা তখন রাজা এবং কলকাতা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। ইংরেজ রাজত্বের ৮০ বছর পরে ১৮৩৭ সালের ২৫ শে ফেব্রুয়ারি, সমাচার দর্পণ সংবাদপত্র তৎকালীন কলকাতা শহরের পুলিশ সুপার ক্যাপ্টেন বর্বের একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে । সেই লেখা অনুসারে দেখছি ১৮৩৭ সালের ১ লা জানুয়ারির আদমশুমারি অনুসারে কলকাতায় খ্রিস্টান জনসংখ্যা হচ্ছে : ইংলন্ডজাত-৩১৩৮, ষ্টিন্ডীয়ান( সম্ভবত এঙ্গলো ইন্ডিয়ান বোঝাচ্ছে ) ৪৭৪৬, পোর্ত্তগালজাত ৩১৮১, ফ্রান্সদেশীয় ১৬০, আরমানি ৬৩৬, য়িহুদি ৩৬০, বাঙালি খ্রীষ্টিয়ান
৪৯ জন ।

 বড়দিন পালন

গ্রামে গঞ্জে বসবাসকারী বাঙালির বড়দিন পালনের ঘটনায় যাবার আগে দেখে নেওয়া যাক ইংরেজ আমলের বড়দিন পালনের রীতিনীতি।দেশ থেকে বহুদূরে থাকা বিদেশি মানুষগুলি অবশ্যই শীতের কলকাতায় ইংল্যান্ডের বড়দিনের কথা ভেবে নস্টালজিক হয়ে পড়তেন ! কিন্তু এদেশে আর কোথায় বরফ আর কোথায় বলগা হরিণে টানা সান্তাক্লজ ? তাই এদেশে এসে তাঁরা হিঁদুদের পালা-পার্বণের ঢঙেই ক্রিসমাসের সময়ে ঘরবাড়ি রং করতেন, হিদেনদের মতই সদর দরজার দুদিকে বসাতেন কলাগাছ। বাকি বাড়ি এবং ঘরদোর সাজাতেন ফুল, লতা-পাতা বিশেষ করে দেবদারু পাতা দিয়ে। সারা বাড়িতে ঝুলিয়ে দেওয়া হত রংবেরঙের রঙিন কাগজের ফুল এবং শিকল। বিজয়ার শুভেচ্ছার বিনিময়ের মতন সাহেবরা গ্রিটিংস কার্ড এবং বড়দিনের শুভেচ্ছা বাণী বিনিময় করতেন দেশের নিকটজনের সঙ্গে।

 খানাপিনা

বড়দিনের প্রার্থনা চার্চে হলেও, খানা-পিনার সবচেয়ে এলাহী ব্যাপার হত- বড়লাটের প্রাসাদে। তবে সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হত কেবল উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ও দেশীয় রাজা- বাদশাদের।সেখানে যাঁরা আমন্ত্রিত হতেন না, তাঁরা সাধারণত বড়দিনের পার্টি করতেন উইলসন( আজকের গ্রেট ইস্টার্ন) হোটেলে। বড়দিনের বিশেষ পদ ছিল শুয়োরের মাথা দিয়ে প্রস্তুত বোরস হেড। এর সঙ্গে আরো যেসব পদের খোঁজ পাওয়া গেছে, সেগুলি হচ্ছে ডাক রোস্ট, খ্রিস্টমাস পুডিং, কেক, ফল, চকোলেট ইত্যাদি। আর থাকত অঢেল সুরার আয়োজন, সেই দিনের স্পেশ্যাল সুরা ছিল রেড ওয়াইন এবং রামপাঞ্চ।ফ্যানি পার্কস লিখে গেছেন সেযুগে দেশীয় মোসাহেব, গোমস্তা, বেনিয়া, মুৎসুদ্দিরা, প্রভুদের খুশি করতে বিশাল বিশাল উপহারের ডলি সাজিয়ে পাঠাতেন। সম্ভবত ডলি বলতে ঝুড়ি বা ডালা বোঝান হয়েছে।

নদিয়াজেলার বাঙালী খ্রিষ্টান সমাজ

ঈশ্বর গুপ্ত অবধি এই উপহারের বর্ণনা দিয়ে গেছেন-” খ্রিস্টের জনম দিন, বড়দিন নাম / বহুসুখে পরিপূর্ন, কলিকাতা ধাম / কোম্পানি দেওয়ান আদি বড় বড় মেট / সাবেক ঘরে ঘরে পাঠাইতেছে ভেট।”পরের দিকে বাঙালি খ্রিষ্টানদের সংখ্যা বাড়তে থাকলেও তাঁরা বাংলার সংস্কৃতি এবং হিন্দুদের পালিত আচার-আচরণ আদৌ ত্যাগ করেন নি। তাই গোঁড়া মিশনারীদের গোঁড়ামকে উপেক্ষা করে বাঙালি খ্রিস্টানরা শুরু করে খোল- করতাল বাজিয়ে সন্ধ্যার ক্যারল গান এবং সকালে নগর সংকীর্তন করা। সেই ধারাই ক্রম প্রবাহমান হয়ে বর্তমানের বাঙালি খ্রিস্টান সমাজকে বাংলা সংস্কৃতি এবং ধর্মনিরপেক্ষতার এক চমৎকার উদাহরণে পরিণত করেছে।

নদিয়াজেলার বাঙালী খ্রিষ্টান

তাই ডিসেম্বর মাসের শেষে এলে দেখতে পাবেন, নদীয়া জেলায় কৃষ্ণনগর, রানাঘাট এবং গাংনাপুর অঞ্চল কি সুন্দর ভাবে সেজে উঠেছে খ্রিসমাস উপলক্ষে। এই সমগ্র অঞ্চলে এক বৃহৎ সংখ্যক অধিবাসী বাঙালি খ্রিস্টান। গাংনাপুর অঞ্চলে প্রটেস্টান্ট এবং রানাঘাটে ক্যাথলিক চার্চের সংখ্যা বেশি। প্রতিটি পাড়া, প্রতিটি বাড়ি এমন ভাবে সেজে ওঠে যে, সে এক দেখার মতন ব্যাপার। ৩/৪ দিন ধরে চলা চার্চ গুলির অসংখ্য অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করতে পারেন। সবারই অবারিত দ্বার এখানে।

২০১৮ র প্রাক বড়দিনেই চলে গেছিলাম , ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের উপর অধিষ্ঠিত বেগোপাড়ার চার্চ দেখে, বন্ধুবর অধিস হালদারের গাংনাপুরের বাড়িতে। সারাদিন কাটল বেলুন, রঙিন কাগজের শিকল, চিনা লণ্ঠন আর লম্বা বাঁশের মাথায় আকাশ প্রদীপের মতন বিশাল বিশাল বেথলাহামের তারা দিয়ে বাড়ি এবং বাড়ির সামনের টিনের চালের সেন্ট এন্ড্রুজ গির্জাকে সাজানোতে।

নদিয়াজেলার বাঙালী খ্রিষ্টান সমাজএর বড়দিন

বহুদিন পরে বাইরে থেকে আসা কন্যা লেগে পড়ল, অধিস বাবুর স্ত্রী প্রভাতী দেবী এবং কন্যা অতিথি এবং গ্রামের আরো মেয়ে বৌয়ের সঙ্গে, চিতই পিঠে, পুলি পিঠে এবং পাটিসাপটা তৈরি করতে। আবার আমার অনুরোধে শুরু হল ভাপা পিঠে তৈরি। দেবলগর পুরাতাত্ত্বিক সঙ্ঘ ও মিউজিয়ামের প্রেসিডেন্ট চিত্তরঞ্জন হালদারের বাড়ির ৬০ বছরের ঢেঁকি বুড়ি সমানে সকাল থেকে চালের গুঁড়ো তৈরি করেই চলেছে, সঙ্গে রয়েছে গ্রামের শিউলি ও শিউলি বউয়ের হাতে তৈরি খেজুর গুড় এবং বারকোশ ভর্তি খোয়ার পাহাড়।

এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই কারণ বাঙালি খ্রিষ্টান সমাজ আগে বাঙালি পরে তাঁর ধর্ম পরিচয়। তাই ১০০% মাছে-ভাতে বাঙালি খ্রিস্টানরা তাঁদের পারিবারিক নাম ও পদবি যেমন ত্যাগ করার কথা ভাবতে পারেন না, তেমনি যুগ যুগ ধরে চলে আসা বাঙালি রসনাকেই তাঁরা বড়দিন ও নববর্ষ বরণে লোক-লৌকিকতার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করেন।তাই প্রতিবছর ডিসেম্বরের শেষে শহর থেকে পালিয়ে চলে যাই নদিয়া জেলার গাংনাপুরের খ্রিস্টান পাড়ায় – সরা পিঠে, গোকুল পিঠে, পুলি পিঠে, চিতই পিঠে, দুধ পুলি, পাটিসাপটা, রস বড়ার স্বাদ নিতে। তারপরে ঘরে ফিরে এসে পৌষ সংক্রান্তির দিনে দ্বিতীয় ইনিংস খেলা।

নদিয়াজেলার বাঙালী খ্রিষ্টান -বর্ষবরণ

শুধু বাঙালি খ্রিষ্টান সমাজ কেন, যাঁদের আমরা চিনেও চিনতে চাইনি, সেই বো- ব্যারাকের এঙ্গলো ইন্ডিয়ান লোকগুলির বাড়িতে আমরা শুধু প্রাক বড়দিনের সময় থেকে গুটি কয়েক দিন দিন খাঁটি হোম মেড ওয়াইন এবং এঙ্গলো ইন্ডিয়ান হেঁশেলের স্বাদ নিতে , হামলে পড়ি। তবে সত্যি কথা, সেই সময়ে ওয়াইন, কেক, বিভিন্ন ধরনের মাংসের রোস্ট ইত্যাদি বাদ দিলে, এদের কিচেনেও সারা বছরই প্রায় ষোল আনা বাঙালি স্বাদ পাবেন খাবারে। মনে পড়ছে ম্যাকলাস্কিগঞ্জে ববি গর্ডনের বাড়িতে থাকা- খাওয়ার কথা , ববির মায়ের হাতের রান্নার সঙ্গে আমার মায়ের হাতের রান্নার স্বাদের আদৌ কোন তফাৎ লাগেনি।

নদিয়াজেলার বাঙালী খ্রিষ্টান সমাজএর সংস্কৃতি

বড়দিনে খুব সকালে যেতে হবে চার্চে, তারপরে রবাহুত , অনাহুত সবার জন্য থাকবে মিষ্টি মুখের ব্যবস্থা । অবশ্য খ্রীষ্টের জন্মদিনে এক টুকরো কেক থাকবেনা, তা কি হয় ? তবে শুনলাম কেক আসবে বেকারি থেকে। ঘরে ঘরে আনন্দ উৎসবে, ভর সন্ধ্যায় খ্রিষ্টান পাড়া জুড়ে তখন কেবল বাঙালি হেঁসেলের পিঠে -পুলির গন্ধে ম ম করছে। শুধু তাই নয়, বাইরে থেকে যাঁরা আসছেন এই বিশাল বাড়িতে, কোন রকম হ্যান্ডশ্যেক নয়, তাঁরা হয় গুরুজনদের পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করছেন, নয়ত আলিঙ্গন করছেন, – একেবারে ১০০% খাঁটি বাংলা সংস্কৃতিকে এঁরা পরম যত্নে বাঁচিয়ে রেখেছেন ।

সন্ধ্যাবেলা প্রথমে গেলাম সমাধি প্রাঙ্গনে। যদিও প্রতিবছর ২ রা নভেম্বর পরলোকগত আত্মীয় স্বজনের স্মরণে এখানে ” অল সোলস ডে” পালন করা হয়, তবুও প্রভু যীশুর জন্মের পুন্য মুহূর্তেও এখানে পুনরায় পরলোকগত আত্মাদের উদ্দেশ্যে মোমবাতির আলো দিয়ে কবরগুলিকে আলোকিত করা হল। সেখান থেকে গেলাম দেবগ্রাম ফাতিমা মেরি চার্চে। কি অপরূপ ভাবে চার্চের ভিতরটি সাজানো হয়েছে দেখে চোখ ঝলসে গেল।


সন্ধ্যাবেলা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম সেন্ট এন্ড্রুজ চার্চের পাশের মাঠের মধ্যে বসা বেশ বড় মেলাটি। যেমন সব মেলায় আসে, সেসব দোকানপাট এখানেও বসেছে। কিন্তু একটা জিনিষ চোখে পড়ল, মিষ্টির দোকানে ইয়া বড় বড় গামলায় রাখা আছে প্রচুর লেডিকিনি। একটা লেডিকেনি চাইলে দোকানদার প্রায় অজ্ঞান হয়ে পরে আরকি ! তখন শুনলাম, শক্তিগরের যেমন ল্যাংচা, রানাঘাট তেমনি বিখ্যাত পান্তুয়া তৈরির জন্য। আমি ওঁদের মিষ্টান্ন শিল্পের প্রায় অবমাননা করে ফেলেছি লেডিকিনি বলে। খেয়ে দেখলাম অসাধারণ টেস্ট, শুনলাম ইনারা বেশি করে খোয়া দেন তৈরির সময় এবং বেশ কড়া করে ভেজে তবেই রসে ফেলেন।

নদিয়াজেলার বাঙালী খ্রিষ্টান সমাজ দেবগ্রাম

দেবগ্রামের গির্জাপাড়া যেন বাংলার বুকে এক টুকরো বেথেলহাম।প্রতিটি খ্রিষ্টান বাড়ির সামনে এক চিলতে জায়গায় পুতুল সাজিয়ে খ্রিষ্টের জন্মদৃশ্যের ছোটো প্রদর্শনী সাজান হয়েছে।এই দৃশ্য কে নেটিভিটি বা ক্রীব বলা হয়।আর রয়েছে আলোকিত ক্রিসমাস ট্রি। ক্রিসমাস ট্রি দিয়ে বাড়ি সাজাবার প্রথা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে জার্মানি থেকে। এছাড়া বর্তমানে ক্রিসমাস ট্রি বলে যে গাছটি বিখ্যাত সেটি আদতে মেক্সিকোর পইনসেটিয়া গাছ।কোন ডেকোরেটর নয়, বিরাট পরিবারের সবাই মিলে মিশে হাত লাগানো হলো গির্জা ও ঘর সাজানোর কাজে । রাত ১০ টায় চার্চের প্রার্থনা বা খ্রিস্ট জাগরণ উৎসবে যোগ দিলাম। রাত বারোটা অবধি বাইবেল পাঠ, রবীন্দ্রনাথ, রজনীকান্ত সেন ইত্যাদির গান, এসবের মধ্যে দিয়ে যীশুর জন্ম সময় এসে গেল। কিছু বাজি ফাটানোর শব্দ কানে ভেসে এলো।

নদিয়াজেলার বাঙালী খ্রিষ্টান সমাজএর কথা

এক অপার্থিব আনন্দে মনটা ভরে গেল। রাত বারোটায় সবাই মিলে খোল-করতাল-ড্রাম সহযোগে ক্যারল গান গেয়ে সারা গ্রাম প্রদক্ষিণ করা হলো। গ্রামের আরো অনেক খ্রিস্টান বাসিন্দাও এতে যোগ দিলেন।রাত্রি বেলা গল্পকথার মতন নদিয়ার এই অঞ্চলে খ্রিস্টান পাড়া গড়ে ওঠার গল্প শুনছি। গাংনাপুর খ্রিস্টান পাড়া মূলত প্রটেস্টান্ট ধর্মাবলম্বীদের বাসস্থান। এই পাড়ার চার্চটির নাম সেন্ট এন্ড্রুজ চার্চ, যার দেখভাল থেকে পরিচালনার দায়িত্বে আছেন অধিস হালদার মশাই। এই চার্চটি প্রথমে নির্মাণ করেন এই গ্রামের লোকেরাই ১৯৫৪ সালে, অর্থাৎ এটির বয়স বর্তমানে ৬৫ বছর।

১৯৬০ সাল নাগাদ রানাঘাটের বিশপ ব্রায়ান , চার্চ নির্মাণের জন্য কিছু অর্থ সাহায্য করলে, সেই পয়সায় কেনা হয় ৫ কাঠা জমি এবং এর উপরে বাঁশের খুঁটি, টিনের চালা এবং মূলি বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি হয় নতুন চার্চ। পরে অবশ্য আরো কিছু পয়সা জোগাড় করে বর্তমান চার্চের জায়গাটি ক্রয় করা হয় । হালে শিশুরঞ্জন হালদার নামক এক খ্রিস্ট ভক্তের পুত্র – কন্যারা নিজ প্রচেষ্টা ও খরচে এই চার্চটির পুনর্নির্মাণ করেন। তখন থেকে অধিস এবং প্রভাতি হালদারের উদ্যোগেই গাংনাপুর প্রটেস্টান্ট চার্চের কাজকর্ম চলেছে।

নদীয়া জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে খ্রিষ্টান বসতি গড়ে ওঠার পিছনে তৎকালীন মিশনারিদের বহু জনসেবামূলক কাজকর্মের অবদান রয়েছে। ১৮৩৯ সালে অবিভক্ত নদীয়া জেলার মেহেরপুর সাব ডিভিশনের চাপড়াতে দুজন জার্মান মিশনারি রেভারেন্ড ক্রুক বার্গ এবং আনসর্জি জনসেবামূলক কাজ শুরু করেন এবং ১৮৪০ সালে চাপড়াতে প্রতিষ্ঠা করেন প্রাচীনতম রোমান ক্যাথলিক চার্চের। ১৮৫০ সালে চার্চের তরফেই প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি স্কুলের।

নদিয়াজেলার বাঙালী খ্রিষ্টান সমাজ কৃষ্ণনগর

কৃষ্ণনগর অঞ্চলে ১৮৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আজকের ডায়োসেস অফ কৃষ্ণনগর। ১৮৭০ সালে এই কেন্দ্রের দায়িত্ব নেন ফাদার আন্তোনিও মেরিয়েটটি। এঁরা নার্সারি, প্রি-প্রাইমারি, লোয়ার প্রাইমারি, হাই স্কুল, জুনিয়ার কলেজ, ডিগ্রি কলেজ সহ ডিস্পেন্সারি এবং হেল্থ সেন্টার বহুকিছু প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। কৃষ্ণনগর গভর্মেন্ট কলেজের কাছেই রয়েছে প্রটেস্টান্ট চার্চ।

অবিভক্ত বাংলায় ১৮৬৩ সালে রানাঘাট নদীয়া জেলার সাব-ডিভিশনের মর্যাদা লাভ করে এবং ১৮৬৪ সালে রানাঘাট মিউনিসিপালিটি গঠিত হয়। এই সময় নদীয়া জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত এক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিস কর্মচারী জেমস মনরো পিছিয়ে পরা জেলার গরিব কিন্তু সৎ মানুষের জন্য কিছু কাজ করার লক্ষ্যে রানাঘাটে একটি সি এম এস বা চার্চ মিশনারি সোসাইটি নির্মাণ করেন এবং স-পরিবারে রানাঘাটে ভাড়া ঘরে থাকতে শুরু করেন। মিশনের কাজে একটি হাসপাতাল এবং ডিস্পেন্সারি নির্মাণ একান্ত প্রয়োজন মনে করে, তিনি তাঁর চাকুরী জীবনে অর্জিত সর্বস্ব উপার্জন ব্যায় করে রানাঘাটের ১ মাইল দক্ষিণে ৩৩ বিঘা জমি ক্রয় করেন। এই হচ্ছে সেকালে রানাঘাটের বিখ্যাত হাউস অফ গ্রেস বা দয়াবাড়ী হাসপাতাল নির্মাণের গোড়ার কথা। হাসপাতাল চালু হবার প্রথম ৯ মাসে জাতিধর্ম নির্বিশেষে বিনামূল্যে ২৮ হাজার রুগীর সেবা করার পরে এই হাসপাতালের নাম ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। ১২-১৩ বছরের মধ্যে আউটডোরে ২.৫ লক্ষ এবং ইনডোরে ভর্তি রুগীর সংখ্যা ছিল ২ হাজারের বেশি।

নদিয়াজেলার বাঙালী খ্রিষ্টান কুপার্স সাহেব

১৯১২ থেকে ১৯৩৯ সাল অবধি রানাঘাট হাসপাতালের দায়িত্বে ছিলেন জনদরদী বিখ্যাত ডাক্তার ডঃ আর এইচ কুপার, সারা দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে মিশনারি হাসপাতালের নাম। ডঃ কুপার চেয়েছিলেন হাসপাতালটিকে মেডিক্যাল কলেজে রূপান্তরিত করতে, সেই উদ্দেশ্যে তিনি রানাঘাটের এক প্রান্তে কয়েকশো একর জায়গা কিনেছিলেন। তারপরে দেশভাগের পরে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিতাড়িত উদ্বাস্তুদের মধ্যেও মিশনারীরা খাদ্য-বস্ত্র-চিকিৎসা সেবা চালু করেন। তার বিনিময়ে কিভাবে এক বিশেষ রাজনৈতিক দলের মদতে হাসপাতালের ইনচার্জ ডঃ হ্যাট, ডঃ আর্চার, ডঃ পার্সিভাল এবং সিস্টার লি কে ১৯৪৭ সালের ২২ শে নভেম্বর গুলি করে হত্যা করা হয়, মেডিক্যাল কলেজের জন্য কেনা জমিতে উদ্বাস্তুদের বসিয়ে দেওয়া হয়, সেসব কলঙ্কের কাহিনী নিয়ে আর কিছু বলার ইচ্ছে নেই। কতজন জানেন যে কুপার্স সাহেবের নামাঙ্কিত কুপার্স ক্যাম্পের পিছনের ইতিহাস।

বড়দিন উপলক্ষে রানাঘাটের ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে বেগোপাড়ার গোয়াদাল‍্যুপ ক্যাথলিক চার্চের মাঠে বসে ৭ দিনের মেলা। গতকাল আসার সময় দেখে এসেছি, দুর্গাপুজোর খ্রিস্টীয় সংস্করণ বলা চলে, গ্রাম-শহর থেকে লোকে ভেঙ্গে পড়বে এই সাতদিন, শুনলাম অনুষ্ঠান চলবে ৩১ শে ডিসেম্বর অবধি । বিশাল চার্চটি অবশ্য তেমন পুরান নয়, ১৯৮৪ সালে নির্মিত হয়েছে ।
তবে এই মেলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান হচ্ছে খ্রিস্ট স্মরণে বসা গানের আসর, যেখানে বাউলের সুরে যীশুর বন্দনা গান শুনতে পারবেন।

নদিয়াজেলার বাঙালী খ্রিষ্টান বড়দিনের কথা

২৫ শে ডিসেম্বরে খুব সকালে আবার বেরোলাম সবাই খোল-করতাল নিয়ে যীশুর নাম নিয়ে নগর কীর্তনের গান করতে করতে পাড়া ভ্রমণে। একেবারে বাঙালির ভুলে যাওয়া ঐতিহ্য টহল গান আরকি ।সকাল ৯ টার বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করলেন রেভারেন্ড পার্থ চন্দ্র দে মহাশয় এবং উনার সহকারী ছিলেন অধিস বাবুর কন্যা অতিথি হালদার। তারপর পিঠে পুলির সদ্ব্যবহার পর্বের সঙ্গে চললো বিজয়া সম্মিলনীর মতন নির্ভেজাল গল্পের আসর এবং দ্বিপ্রহরের আহারের জন্য ছোটবেলার পিকনিকের আসরের মতন বাগানের এক কোনায় মাটি খুঁড়ে তৈরি করা হল মাটির উনুন। কাঠের আগুনে চাপান হল এক বিশাল ডেকচি , তাতে ঢিমে আঁচে তৈরি হচ্ছে উপস্থিত ৫০/৬০ জনের জন্য চিকেন বিরিয়ানি। যীশুর জন্মদিন পালনের সঙ্গে একেবারে আনন্দ-উৎসবের ফোয়ারা। বড়দিন শুধু কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের উৎসব নয়, যীশু খ্রীষ্টের জন্মদিন পালনের সঙ্গে সঙ্গে এই দিনটি চিরমঙ্গলময় ঈশ্বর ও সাধারণ মানবের মধ্যে প্রেম ও ভালোবাসার এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। তাইতো এই দিনটিকে ঘিরে যে উৎসাহ, উদ্দীপনা সারা পৃথিবীর মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, তার দ্বিতীয় উদাহরণ আর নেই।

বর্ষবরণ উৎসব

২০১৮ র নববর্ষের অনুষ্ঠানে অবশ্য থাকতে পারিনি। তবে এই অনুষ্ঠান সম্মন্ধে অধিসবাবুর কাছে জেনেছিলাম যে সেদিনও ঘরে পিঠে পুলি তৈরি হয়, সম্ভব হলে কেকও তৈরি করা হয়। তবে ৫/৭ রকমের পিঠে পুলি তৈরি করা হবেই কারণ নববর্ষবরণের রাতটি মুখ্যত আনন্দ ও আশার সঞ্চার করে, উন্নত ভবিষ্যতের লক্ষে। ৩১ তারিখ সন্ধ্যাবেলা আবার ছেলেপুলের দল হৈ হৈ করে বেরিয়ে পড়ে ক্যারল গানের ঝোলা নিয়ে, বাংলা গান গাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক বিখ্যাত ইংরেজি গানও, বাংলা ছন্দে গাওয়া হয়। রাত এগারোটায় সেন্ট এন্ড্রুজ চার্চে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ প্রার্থনা সভা, সমাপ্ত হয় পুনরায় ক্যারল গান এবং বাজি পোড়ানোর মধ্য দিয়ে। ১ লা জানুয়ারি সকাল ৮ টায় নতুন বছরের শুরুতে আবার চার্চে হয় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন। প্রার্থনা শেষ হলে বিজয়ার শুভেচ্ছার মতন ছোটরা বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করে, সম-বয়সীরা করে পরস্পরকে আলিঙ্গন।

আরও পড়ুন- অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান -বাঙালীর এক বিস্ময়কর প্রতিভা দ্বিতীয় পর্ব

 পিঠেপুলি

প্রতিটি বাড়িতে আগত ব্যক্তিদের পিঠে-পুলি এবং এক টুকরো কেক দিয়ে স্বাগত জানান হয়। চার্চের প্রাঙ্গনে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে স্থানীয় বাচ্চাদের হাতে কিছু উপহারের বাক্স তুলে দেওয়া হয়। সাধ্যমত কাপড় জামা দেওয়া হয়। পুরো খরচা বহন করেন ইনারা নিজেরাই, তবে কখনও কখনও একটি আমেরিকান মিশনারি সংস্থা বাচ্চাদের জন্য খেলনার প্যাকেট পাঠিয়ে দেন। ২০১৯ এর অনুষ্ঠানে কিছু কাপড়-জামা এবং খাতা-পেন্সিলের প্যাকেট হাতে উপিস্থিত হলাম এখানে , বিদেশে সংস্থার পাঠান খেলনার প্যাকেটগুলি অধিস বাবুর সঙ্গে ঘুরে ঘুরে কিছু হ্যান্ডিক্যাপড বাচ্চাদের ঘরে পৌঁছে দেওয়া হয়। বাকি প্যাকেট নিয়ে গিয়েছিলাম অখ্রিস্টান মাইনরিটি অধ্যুষিত এক গ্রামে। সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষ একটুকরো ভারতবর্ষ হচ্ছে গাংনাপুরের বাঙালি খ্রিষ্টান পাড়া।

তথ্যসূত্র: ১) ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে দেবলগড় সেন্ট এন্ড্রুজ চার্চের অধ্যক্ষ অধিস হালদার।
২)ইতিহাসের কলকাতা, সংগ্রহ সম্পাদনা কমল চৌধুরী।
৩) কলকাতার বড়দিন: সেকাল একাল, রাধপ্রসাদ গুপ্ত, দেশ , ১৮/১২/১৯৯৩
৪) সেন্ট লুকস চার্চ ও দয়াবাড়ি মন্ডলীর ইতিহাস ,জনসন সন্দীপ।
৫) উইকিপিডিয়া।


Share your experience
  • 144
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    144
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।