নদীয়ার স্বাধীনতা দিবস ১৮ই আগস্ট

Share your experience
  • 40
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    40
    Shares

অঞ্জন সুকুল

 

কোন দেশের স্বাধীনতা দিবস বলতে একটিই দিন বোঝায়। কিন্তু ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে ঘটেছে ব্যতিক্রম। ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট সারা বিশ্ব যখন নিদ্রামগ্ন তখন ভারতবর্ষের পূর্বপ্রান্তের কয়েকশত ব্যক্তির প্রাণশক্তি ও স্বাধীনতা জাগ্রত হন ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট নয়, ১৯৪৭ সালের ১৮ই আগস্ট।

2018_08_14 11_11 PM Office Lens (2)
১৮ই আগস্ট, পতাকা উত্তোলন

সমগ্র ভারতবর্ষে যখন ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয় তখন কেন ১৮ই আগস্ট নদীয়ার স্বাধীনতা দিবস? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রবীন নদীয়াবাসীদের মনের কোণে লুকিয়ে থাকা চাপা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ আজও ঘটে। ভারত ভাগের স্ম্য স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফের তৈরি ম্যাপের গণ্ডগোলের জন্যই ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ভারতবাসীর কাছে অন্যতম স্মরণীয় দিন হয়েও নদীয়াবাসীর কাছে ছিল চরম দুঃখের ও বেদনার দিন।

স্বাধীনতার প্রাক্কালে অবিভক্ত নদীয়ার মহুকুমা ছিল পাঁচটি; কৃষ্ণনগর সদর, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও রানাঘাট। র‍্যাডক্লিফের ম্যাপে ভাগীরথীর পশ্চিমপাড়ে নবদ্বীপ বাদে বাকি এলাকা পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। নবদ্বীপকে নদীয়া জেলা বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৪৭ সালের ১২ই আগস্ট রেডিওতে ঘোষণা করা হয়, ভারতবর্ষকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হবে, এবং নদীয়া জেলাকে পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে পড়ছে বলে জানানো হয়।

নদীয়া জেলা পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তির কথা শুনে জেলার বেশিরভাগ ঘরে কান্নার রোল পরে গিয়েছিল। সে সময় নদীয়ার রাণী ছিলেন জ্যোতির্ময়ী দেবী। তিনিও যথেষ্ট আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এর পিছনেও আছে রাজনৈতিক কারণ।

১৯৪৬ সাল থেকেই নদীয়ার সাম্প্রদায়িক বিরোধ চাপা পড়া আগুনের মতো ধিকধিক করে জ্বলছিল। মুসলিমদের আগাম হুমকি ছিল “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান”। ১৪ই আগস্টের পর তারা জোর করে রাজবাড়ি দখল নেবে। কৃষ্ণনগরের রাস্তায় রাস্তায় এ ধরনের আওয়াজও তোলেন তাঁরা। সে সময় কৃষ্ণনগর মানে আমিনবাজার থেকে রাজবাড়ি, চকেরপাড়া হয়ে আনন্দময়ীতলা, পুরসভা থেকে গোবিন্দ সড়ক হয়ে জলঙ্গি নদীর ধার, অর্থাৎ গোয়াড়ী পর্যন্ত। মুস্লিম লিগের নেতারাই পতাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা করেন। মুসলিম লিগের পতাকাই হয় পাকিস্তানের পতাকা। কৃষ্ণনগর পাবলিক লাইব্রেরির মাঠেই পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলিত হয়। পাকিস্তানের জয়ধ্বনি দেওয়া হয়।

2018_08_14 11_11 PM Office Lens

জানা যায়, নদীয়া জেলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় মুসলিমরা পোস্টঅফিস মোড়, গোবিন্দ সড়ক (বর্তমান হাইস্ট্রিট), আনন্দময়ী তলা, আমিনবাজার, চকেরপাড়া, কোর্ট রডে আওয়াজ তোলেন ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’। হিন্দুরা তখন আতঙ্কগ্রস্ত। মুসলমানরা হুমকি দিচ্ছেন কে কোন বাড়ি দখল নেবে! রানী জ্যোতির্ময়ী দেবীর আশঙ্কা ছিল, নদীয়া পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে পড়লে তাঁর জমিদারী থাকবে না।

এই সময় রানী জ্যোতির্ময়ী দেবীর নেতৃত্বে, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, কাবু লাহিড়ী, প্রমথনাথ শুকুল, সাবিত্রী দেবী প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আন্দলন সংগঠিত করতে থাকেন। এই খবর বিদ্যুৎগতিতে ব্রিটিশ সরকারের কাছে পৌঁছে যায়। ব্রিটিশ সরকারও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং চিন্তা করেন যদি এই অজুহাতে আবার দ্বিখণ্ডিত ভারত এক হয়ে যায়, তবে ব্রিটিশের কাছে তা হবে অতি ভয়ঙ্কর দিন। এই সময় আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলে স্যার র‍্যাডক্লিফকে ডেকে পাঠান এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বলেন। স্যার র‍্যাডক্লিফ দেখলেন, ভুল তাঁরই। নদীয়ার ভারতে থাকার কথা। চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর মহুকুমাকে নদীয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কৃষ্ণনগর ও রানাঘাট মহুকুমাকে নিয়ে নদীয়ার নতুন সীমানা নির্ধারিত হয়। শিকারপুর থেকে পলাশী।

১৮ই আগস্ট রেডিওতে ঘোষণা করা হয় কৃষ্ণনগর ও রানাঘাট মহুকুমা নিয়ে গঠিত, নবগঠিত ভারত ভূখণ্ডেই থাকছে। প্রবীন সাহিত্যিক সুধীর চক্রবর্তী বলেন, “সে সময় আমি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। ১৮ই আগস্ট খাওয়া দাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়েছি। হঠাত মাঝরাতে চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙ্গে যায়।“

2018_08_14 11_10 PM Office Lens
‘৪৭ সালের ১৮ই আগস্ট নদীয়া জেলার ভারতভুক্তি উপলক্ষে ১৮ই আগস্ট ২০১২ শিবনিবাসে আয়োজিত নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা

জানলা দিয়ে দেখি লরি ভরতি করে পায়ে হেঁটে লোকজন আনন্দে রাস্তায় নেমে পড়েছেন, মুসলিমদের পাল্টা হুমকি দিয়ে নিজেদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিলেন। তিনদিন পাকিস্তানে থাকার পরে পাবলিক লাইব্রেরীর মাঠে ওঠে চরকা চিহ্নযুক্ত তেরাঙ্গা জাতীয় পতাকা। ফলে র‍্যাডক্লিফের সীমানা নিরদেশক মানচিত্রের ভুলে কৃষ্ণনগর স্বাধীন হয় ১৮ই আগস্ট। তাই ১৮ই আগস্ট নদীয়ার স্বাধীনতা দিবস ভা ভারতভুক্তি দিবস।

কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ এরকম ছিল না। কেউ ইতিহাসকে স্মরণ করার ঝামেলা গ্রহন করেননি। খুব সাম্প্রতিক কালে পর্যন্ত ভারতের ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা ২৩শে জানুয়ারী নেতাজীর জন্মদিন, ২৬শে জানুয়ারী প্রজাতন্ত্র দিবস ও ১৫ই আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে পতাকা উত্তোলনের বিধি অনুযায়ী নিষিদ্ধ থাকায় আমি একক প্রচেস্টায় নদীয়া জেলার শিবনিবাস গ্রামে যা কলকাতা থেকে ১২০ কিমি দূরবর্তী, ১৮ই আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালন করার ব্যবস্থা করি। কারণ, আমি আমার দাদু, প্রমথনাথ শুকুলের কাছ থেকে গল্প শুনেছিলাম। আমার দাদু ছিলেন একজন স্বাধীনতায় অংশগ্রহনকারী প্রত্যক্ষ সৈনিক। তিনিই আমায় ঐ তিনদিনের ইতিহাস স্মৃতিচারণ করেন। দাদুর কাছের কাহিনী থেকে আরও জানতে পারি নদীয়া জেলার ৫টি মহুকুমা, মালদা জেলার কিছু অংশ, বনগাঁ ও বালুরঘাটের কিছু অংশ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই জায়গার বেশীর ভাগই ছিল হিন্দু প্রধান। সুতরাং এগুলি ভারতবর্ষের অংশ হওয়া উচিত ছিল। এই সমস্ত অঞ্চলের হিন্দুরা প্রতিবাদ শুরু করেন এবং কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ জাতীয় স্তরে তাদের ব্যাপারটি তুলে ধরেন। র‍্যাডক্লিফ কমিশনকৃত ভুল সংশোধিত হওয়ার পর এই স্থানগুলি ভারতের অংশীভুত হয়।

2018_08_14 11_11 PM Office Lens (1)
২০১৩ সালের ১৮ই আগস্ট শিবনিবাসে আয়জিত মহিলাদের নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা

দাদুর কাছে কাহিনী শুনে শৈশব কাল থেকেই আমি অবাক হয়েছি এটা ভেবেই যে কেন স্বাধীনতা দিবস ১৫ই আগস্ট পালিত হয়, যখন আমার জন্মস্থান ভারতের অংশীভুত হয় ১৮ই আগস্ট! ১৫ই আগস্ট দাদু-দিদার কাছে আনন্দের বা সুখের দিন ছিল না, কারণ ১৯৪৭ সালের ঐ দিন ছিল শোক-সন্তপ্ত।

ঐতিহাসিক অনুসন্ধান শুরু তখন থেকে। ১৯৪৭-এর সঠিক ঘটনাপ্রাপ্তির জন্য তথ্যাবলী অনুসন্ধান শুরু করি। বহু মানুষের (যাদের মধ্যে ঐতিহাসিকেরাও ছিলেন) কাছে যাই এবং তাদের থেকে এই ঘটনাবহুল দিনের, বিশেষ করে ১২ই আগস্ট থেকে ১৮ই আগস্ট পর্যন্ত দিনগুলির বহুল বিবরন পাই। কিন্তু দুঃখের বিষয়, উক্ত ঘটনার কোন লিখিত নথিপত্র পাওয়া যায়নি।

বিভিন্ন গ্রন্থাগারগুলিতে অনুসন্ধান শুরু করি এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালের কলকাতার মহাকরণের তথ্যদপ্তরে গেলাম। প্রায় দুইমাস অনুসন্ধানের পর হঠাত পেয়ে গেলাম লাল রঙের চর্মাবৃত শক্ত বাঁধাই করা একটি বাংলা মুদ্রিত পুস্তক ‘নদীয়ার স্বাধীনতা’ যাতে পুঙ্খনাপুঙ্খ ভাবে ঐ দিনগুলির ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। অবশেষে পাওয়া গেল প্রাথমিক দলিল, যাতে বলা হয়েছে নদীয়া ও বাংলার অন্যান্য কিছু স্থানে ভারতের অন্তর্ভুক্তি হয় ১৯৪৭ সালের ১৮ই আগস্ট।

2018_08_14 11_12 PM Office Lens

কিছু সরকারী কর্মীকে যুক্তি দিয়ে বোঝানো গেল যে নদীয়া জেলায় ১৮ই আগস্ট স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হওয়া উচিত। সেই মোতাবেক পরিকল্পনা করে ১৯৯১ সালের ১৮ই আগস্ট ভারতের ত্রিবর্ণ রঞ্জিত জাতীয় পতাকা শিবনিবাসে উত্তোলন করা হয় এবং উত্তোলন করেন নদীয়া জেলার বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী সাবিত্রী দেবী।  কিন্তু অনেকেই পতাকা বিধি লঙ্ঘনের জন্য আমার গ্রেফতার হতে, হতে পারে এই আশঙ্কায় সাবধান করলেন আমায়। কিন্তু কোন কথায় কর্ণপাত না করেই উদযাপনের ব্যবস্থা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। আমার  যুক্তিগ্রাহ্য উৎসাহকে সম্মান করে শেষ পর্যন্ত সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন ভারত সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক। তাদের সহযোগিতাকে অবলম্বন করে ততকালীন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাও-এর কাছে পৌঁছান গিয়েছিল এবং তাঁকে বুঝিয়ে দিনটি পালনের অনুমতি আদায় করা গিয়েছিল। তৎকালীন ভারত সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের নদীয়া জেলার আধিকারিক শ্রী সুভাষ সরকার মহাশয়ের আন্তরিক সহযোগিতায় ও আমার প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে পাওয়া গেল নদীয়ার স্বাধীনতা দিবস পালন করার অধিকার। প্রশাসনের তরফ থেকে এই উদ্যোগ বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া হলেও গুরুত্বপূর্ণ নথি দেখানোয় শেষ পর্যন্ত প্রশাসন পিছু হঠতে বাধ্য হয় এবং শিবনিবাস মন্দির সম্মুখে জাতীয় পতাকা উত্তোলন হয়।

2018_08_14 11_34 PM Office Lens.jpg
সাবিত্রী দেবী ও লেখক

এরপর থেকে এই স্বাধীনতার দিনটির ব্যাপ্তি পেতে থাকে রাণাঘাট, মালদা, বনগাঁ এবং বালুরঘাটে। ১৮ই আগস্ট দিনটিকে পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে উদযাপিত করা শুরু হয়। বর্তমানে হাজার হাজার মানুষ শিবনিবাস মন্দির প্রাঙ্গনে সমবেত হয় এইদিনে স্মৃতিচারন করতে। বর্তমানে এই অনুষ্ঠান ব্যাপ্তি লাভ করেছে। সমস্ত শ্রেনীর দৈনিক পত্রিকা ও ইলেক্ত্রনিক্স মিডিয়ার দৌলতে এই দিনটি সবার কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে।

আজ নদীয়াবাসীর কাছে ১৫ই আগস্ট যেমন স্বাধীনতা দিবস পালনের একটি গণতান্ত্রিক আবেগ, ঠিক তেমনই ১৮ই আগস্ট তারিখটিও ঐতিহাসিক আবেগের কারণে সমান মর্যাদায় পালিত হয়।

নদীয়ার স্বাধীনতা ১৫ই আগস্ট নয়. ১৮ই আগস্ট। এ সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক অঞ্জন শুকুল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন উদয়ন মজুমদার।

ছবিঃ লেখক সম্পাদিত ‘ইতিহাসের অন্তরালে নদীয়া‘ থেকে সংগৃহীত

কৌলালে প্রকাশিত সমস্ত বক্তব্য লেখকের নিজস্ব। 

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 40
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    40
    Shares

Facebook Comments

Post Author: অঞ্জন সুকুল

অঞ্জন সুকুল
নদিয়ার বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক
error: Content is protected. Thanks and Regards, Koulal.