নানা রূপে লক্ষ্মী

Share your experience
  • 32
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    32
    Shares

স্বপনকুমার ঠাকুর:বৈদিক সাহিত্যে লক্ষ্মী ও শ্রী নামে দুই দেবীর কথা আছে।উভয়ে সৌন্দর্য ও সম্পদের দেবী হিসাবে বর্ণিত হয়েছেন।পরবর্তীকালে শ্রীদেবী লক্ষ্মীর সঙ্গে মিশে যান।এখন শ্রীর অবস্থান আমাদের নামের নাকের ডগায় । যদিও বর্তমানে অনেকেই নামে শ্রীহীন হতে ভালোবাসেন। লক্ষ্মী কালক্রমে সৌন্দর্য শান্ত সৌভাগ্য ঐশ্বর্যের প্রতীক হয়ে ওঠেন এবং পৌরাণিক দেবীদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেবীতে পরিণত হন।

লক্ষ্মীর কোন মন্দির বাংলায় দেখা যায়না। অথচ প্রতিটি বাড়ির ঠাকুরঘরে তিনি আসীন। বাড়ির দেওয়ালে গোলাঘরে আলপনায় লক্ষ্মী রেখাচিত্রে বিরাজমান।পৌরাণিক রূপে তিনি দ্বিভূজা অথবা চতুর্ভুজা।চারুনেত্রা।কম্বু কন্ঠ। প্রশস্ত শ্রোণিদেশ।সুস্তনী এবং অপূর্ব সৌন্দর্যময়ী।বাঙালি কল্পনায় তিনি শিব-দুর্গার দুহিতা।বিভিন্ন পুরাণে তিনি পরস্পর বিরোধী দেবীচরিত্র রূপে চিত্রিত,যেমন দেবসেনা রূপে লক্ষ্মী জন্মেছিলেন বলে কার্তিক বা স্কন্দের স্ত্রী। আবার মন্ত্রমহোদধি গ্রন্থানুসারে তিনি গণেশের পত্নী। কলাবউ রূপে লক্ষ্মীপুজোর মধ্যে এই ঘটনার ছায়া আছে কিনা কে জানে।তবে অধিকাংশ পুরাণ অনুসারে বিষ্ণু  বরাহ অবতার  রূপে বসুমতীকে পত্নী রূপে গ্রহণ করেছিলেন।পরে জলদেবতা নারায়ণের পত্নী রূপে লক্ষ্মী স্বীকৃত হন।  আর এই সূত্র ধরেই হয়তো তিনি সমুদ্র কন্যা রূপে বিবেচিত হয়েছেন।

জলদেবী লক্ষ্মী ভাবনায় দুটি ঘটনার প্রভাব পড়েছে বলে হয় এক-তিনি আদতে অপ্সরী।দুই –পৌরাণিক সমুদ্র মন্থনের কাহিনি।পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে দুর্বাশা মুনি একবার সন্তুষ্ট হয়ে একটি পুষ্পমাল্য ইন্দ্রকে উপহার দিয়েছিলেন।।ইন্দ্র সেই মালাটি তার ঐরাবতের শুঁড়ে দেন পরিয়ে।এদিকে মত্ত হাতি সেটিকে পদদলিত করে দিলে দুর্বাশা প্রচণ্ড রেগে বললেন তিনলোক থেকে ইন্দ্র লক্ষ্মীকে হারাবে। উদোর ঘাড়ে বুধোর বোঝা গিয়ে চাপলো।বেচারা লক্ষ্মী আর কোথায় যান।সুমুদ্রে গিয়ে লুকালো। পরে সুর অসুর মিলে সমুদ্র মন্থন করলে উঠে এল অমৃত ভাণ্ডসহ দেবী লক্ষ্মী। লক্ষ্মীর সঙ্গে যে কুম্ভটি থাকে সেটি কি এই অমৃতভাণ্ডের ? সমুদ্রের সঙ্গে লক্ষ্মীর এই যোগাযোগের ফলে শুধু গজলক্ষ্মী বা কমলে কামিনী রূপে নন; সম্পদ(সমুদ্রের এক নাম রত্নাকর) ও সমুদ্রবাণিজ্যের প্রতীক হয়ে উঠলেন।আজও লক্ষ্মী পুজোয় এই কারণে নৌকার প্রয়োগ দেখা যায়।স্মরণ রাখতে হবে সামুদ্রিক কড়ি ছিল একসময়  আমাদের অর্থের প্রতীক।আজও গজলক্ষ্মীর পুজো হয় কোজাগরী পূর্ণিমায় বর্ধমানের হুগলির বিভিন্ন গ্রামে।

গবেষকদের মতে লক্ষ্মী আদিতে লৌকিক দেবী ছিলেন। বিশিষ্ট গবেষক কল্যাণকুমার দাশগুপ্তর মতে তিনি ছিলেন আদিমাতা ও পৃথ্বীমাতার রূপভেদ।তিনি লিখেছেন—“আদিতে লক্ষ্মী লোকায়ত দেবী ছিলেন তার প্রতিধ্বনি মেলে জৈনসাহিত্যে তাঁকে গন্ধর্ব কিন্নর প্রমুখ ব্যন্তর দেবতা বা মধ্যবর্তী দেবতাদের শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করায়”। প্রতিমাশিল্পে হিন্দু দেবদেবী,পৃ—১২১

সুতরাং লক্ষ্মী শুধু লৌকিক দেবী নন,তিনি আদি ধরিত্রীমাতা। অবশ্যই বলা যায় তিনি আদিতে অনার্যদের পূজিতা ছিলেন।পাল সেন আমলের যে ভোগবিষ্ণুমূর্তি দেখা যায় সেখানে বিষ্ণুর দুপাশে লক্ষ্মী বা ধরিত্রী আর সরস্বতী রয়েছেন স্ত্রী রূপে।পুরাণে এই বসুধা বা পৃথিবী বিষ্ণুর স্ত্রী রূপে কল্পিত।রামায়ণে রামচন্দ্রকে বিষ্ণু ও লক্ষ্মীকে শ্রী বা সীতা রূপে কল্পনা করা হয়েছে।উত্তরকাণ্ডের ৪৫।।২৩ শ্লোকে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে –“তস্য পত্নী মহাভাগা লক্ষ্মীঃ সীতেতি বিশ্রুতা।“অপমানাহতা সীতা শেষ পর্যন্ত ধরিত্রীর গর্ভে স্থান লাভ করেছিলেন।আজও কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিনে সীতার নামে অনেক স্থানে  বিশেষ একটি ভোগ নিবেদন করা হয়।মনে রাখা প্রয়োজন কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে জানা যায় সীতা ছিল মৌর্যযুগে কৃষিদেবী।আর এই কৃষিদেবী যে কৃষিলক্ষ্মীর রূপান্তর সেকথা বলাই বাহুল্য।

পৃথিবীমাতার অনুষঙ্গে লক্ষ্মী ক্রমশ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে ওঠেন।কৃষিলক্ষ্মী রূপেই তাঁর সিংহভাগ আরাধনা দুই বাংলায় বহুতর বৈচিত্র নিয়ে হচ্ছে।রাঢ়বাংলায় কৃষিলক্ষ্মী হিসাবে ভাদ্র চৈত্র এবং পৌষমাসে বিশেষভাবে পূজিত হন।ধানকেই লক্ষ্মী হিসাবে পুজো করা হয়।বেতের বা ধাতুর কুনকে ধান চূর করে লক্ষ্মীর আটন পাতা হয়।নানবিধ আল্পনায় চিত্রিত করা হয় পূজাগৃহ এবং সারা অঙ্গনখানি।অনেক স্থানে ঘটে পটে মুখোশে এবং মূর্তিতে পূজা করা হয়। সেখানে অন্যান্য উপকরণের পাশাপাশি সশিষ ধান থাকে  আবশ্যিকভাবে।

লক্ষ্মীর ভাস্কর্যে দেখা যায় তিনি শুধু পদ্মবেদিকায় আসীন নন। তাঁর এক হাতে লীলায়িত পদ্ম অন্য হাতে তিনি শ্রীফল ধরে আছেন।পদ্মকে অনেকেই সূর্যের প্রতীক বলেন।পণ্ডিতরা দাবী করেন বিষ্ণু উপাসনা আসলে প্রাচীন সৌর-উপাসনার নামান্তর।লক্ষ্মীর অবস্থান বিষ্ণুর হৃদয়ে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন—“রমার আশার বাস হরির উরসে।“অন্যদিকে পদ্ম ঊর্বরতা,পুনর্জন্ম,অখণ্ড সৌন্দর্যের প্রতীক।সুতরাং কমলা যে তাঁর আরেক নাম হবে তাতে সন্দেহ কোথায়?কিন্তু শ্রীফল হাতে থাকার কী কারণ বোঝা যায় না।

প্রাচীন বৃক্ষোপসনা দুর্গাপুজোর মধ্যে যেমন আত্মপ্রকাশ করেছে তেমনি কালক্রমে লক্ষ্মীর মধ্যেও লক্ষ্য করা যায় ।তবে শ্রীফল নয়,সেখানে এসেছে কলাগাছ,ধানগাছ হলুদ তুলসী এবং মানকচু।আস্ত একটি  কলাগাছের সঙ্গে উক্ত চারটি গাছ-গাছালিকে বেঁধে তার উপর একখানা শাড়ি জড়িয়ে কলা-বউ রূপে পুজো করার রীতি পুর্ববাংলার লোকজনদের।কোথাও আবার নবপত্রিকা রূপে লক্ষ্মীকে পুজো করা হয়।শুধু কলাগাছ নয় কয়েক ছড়া কলাকে লক্ষ্মী রূপে পুজো করার রীতি রয়েছে নদিয়াজেলার অনেক স্থানে।  ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায়ের মতে কলা সুপারি হলুদ মান ইত্যদি গাছগুলির নাম অস্ট্রিক সভ্যতা থেকে আগত।সুতরাং বোঝাই যায় এই কলাগাছ কেন্দ্রিক লক্ষ্মিপুজোর ধারাটি অনার্য সভ্যতা থেকে এসেছে।

মুখোশ পুজো অতি প্রাচীন এক লৌকিক উপাসনার ধারা। রাঢ় বাংলায় লক্ষ্মীপুজোর রাতে জল থেকে দুর্গাকাঠামো তুলে দেবী দুর্গার মেড়ে শোলার মুখোশ গেঁথে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে লক্ষ্মীপুজো করা হয়।পূর্ববাংলার অনেকেই এই শোলার  লক্ষ্মীমুখোশ ধানের মধ্যে গেঁথে পুজো করেন।এই শোলার মুখোশকে প্রতিমা বলা হয়।স্থানীয় মালাকারেরা এই সব লক্ষ্মীমুখোশ তৈরি করেন।এই মুখোশটি কোথাও কোথাও আবার ধানের জমিতে পুঁতে দিয়ে আসা হয় পুজোর পরে।

দেবীলক্ষ্মীর বাহন নিয়ে দুচার কথা বলা উচিৎ।আদিতে লক্ষ্মীর বাহন ছিল সিংহ কিম্বা হস্তী।শশাঙ্কের মুদ্রায় দেখি লক্ষ্মী হংসবাহনা।নেপালের পটচিত্রে আবার দেবী কচ্ছপবাহনা।পরে দেবীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পেঁচা।পেঁচাকে সাধারণত জ্ঞানীর প্রতীক ধরা হয়।এছাড়া পেঁচা নিশাচর প্রাণী।লক্ষ্মী শুধু ধনলাভের দেবী নন ।তাঁর কৃপা না হলে সেই ধনসম্পদ মুহূর্তেই মিলিয়ে যেতে পারে।সুতরাং ফসলের বা ধনের পাহাড়াদার হিসাবে পেঁচার আবির্ভাব হয়েছে লক্ষ্মীর কাছে।অনেকেই আবার বলেছেন যে গ্রিক বিত্তদেবী এথেনার বাহন পেঁচাই লক্ষ্মীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।রাঢ়-বাংলায় পেঁচা লক্ষ্মী রূপে পূজিত হন অনেক গৃহে।কাটোয়ার নতুনগ্রামের দারুশিল্পীদের তৈরি পেঁচা রাঢ় অঞ্চলের ঠাকুরঘরে নিত্য পূজিত হন।

এযাবৎ আলোচনায় আমরা দেখেছি লক্ষ্মীর সঙ্গে ভূমি বা কৃষির যোগ ।সেইসঙ্গে লক্ষ্মীর সঙ্গে জলের যোগের নানাবিধ তাৎপর্য।সবক্ষেত্রেই অর্থ সম্পদ ও সৌভাগ্যের কথা জড়িয়ে আছে। সম্পদ বা অর্থ যেমন শ্রমের মাধ্যমে অর্জিত হয় তেমনি আর একটি দিক হলো ফাটকা বা জুয়ার মাধ্যমে অনেক সময় আশাতীত অর্থ বা সম্পদ মেলে।কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে  সারারাত জেগে পাশাখেলা বা জুয়াখেলার কথা।ধনসম্পদ লাভের এই সর্পিলপথটিও যুক্ত হয়েছে লক্ষ্মী উপাসনায়।

তথ্যঋণ–বাংলার মুখ,স্বপনকুমার ঠাকুর,বই চই


Share your experience
  • 32
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    32
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ড.স্বপনকুমার ঠাকুর

DR.SWAPAN KUMAR THAKUR
ড.স্বপনকুমার ঠাকুর।গবেষক লেখক ও ক্ষেত্রসমীক্ষক।কৌলালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।