নশিপুর রাজবাড়ির ঝুলন-যাত্রাপালার অভিনয় থেকে গাছমেলা

Share your experience
  • 391
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    391
    Shares

নশিপুর রাজবাড়ির ঝুলন বাংলার অন্যতম বৈচিত্র্যপূর্ণ ঝুলন উৎসব।ঝুলনে অপেরা যাত্রাপালার অভিনয় থেকে নানা ধরনের ফলের গাছ বিক্রির মেলা বসে।লিখছেন–আশুতোষ মিস্ত্রী।

নশিপুর রাজবাড়ির ঝুলন
নশিপুর রাজবাড়ির ঝুলন

ঝুলন পূর্ণিমা হল শ্রীকৃষ্ণের অনুগামী ভক্তদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। অমাবস্যার পরের একাদশী থেকে শুরু করে শ্রাবনী পূর্ণিমা পর্যন্ত চলে উৎসবের সমারোহ। এটি দোল পূর্ণিমার পরবর্তী বৈষ্ণবদের বড় উৎসব। ঝুলন পূর্ণিমাকে শ্রাবণী পূর্ণিমাও বলা হয়।মুর্শিদাবাদ জেলায় ঝুলন উৎসবের প্রসঙ্গ উঠলে প্রথমেই নাম উঠে আসে নশিপুর রাজবাড়ীর ঝুলন উৎসবের কথা।

নশিপুর রাজবাড়ি ও কুখ্যাত দেবী সিংহ

ইতিহাস কুখ্যাত দেবী সিংহ ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে নশিপুরে রাজবাড়ী তৈরি করেছিলেন। তার পূর্ব পুরুষ দিল্লির বাদশার অধীনে চাকরি করে রায় উপাধি পেয়েছিলেন। দেবী সিংহ ব্রিটিশ আমলে ওয়ারেং হেস্টিংসের প্রিয়পাত্রে পরিণত হন। ওয়ারেং হেস্টিংস দেবী সিংহকে রাজস্ব বিভাগের কাজে নিযুক্ত করেছিলেন। বিশেষ করে রংপুর অঞ্চলে রাজস্ব আদায়ের কাজে নিযুক্ত হলে প্রজাদের উপর নানান রকম ভাবে উৎপীড়ণ অত্যাচার করে রাজস্ব আদায় করেছিলেন। এই অত্যাচার উৎপীড়নের কথা এখনও ইতিহাসের পাতায় কালো অধ্যায় রূপে পরিচিত। দেবী সিংহ নি:সন্তান ছিলেন তাই তিনি মারা গেলে তার সমস্ত সম্পত্তির মালিক হন তার ভাই রাজা বাহাদুর সিংহ। বাহাদুর সিংহের মৃত্যু হলে তার পুত্র হনুমন্ত সিংহ রাজা হন। কিন্তু তিনিও পিতার মৃত্যুর এক বছর পর মারা যান।

নশিপুর রাজবাড়ি ও মন্দির

তখন হনুমন্তের পুত্র কিষেন চাঁদ একেবারে নাবালক ছিলেন। কাজেই বাহাদুর সিংহের মেজ ছেলে উদমন্ত সিংহ নশিপুর রাজ এস্টেটের মালিক হন। ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে গর্ভনর জেনারেল তাকে রাজা উপাধি দিয়েছিলেন। বাংলায় যে ছয়টি পঁচিশ চূড়া বিশিষ্ট মন্দির আছে , তার মধ্যে এই নশিপুর রাজবাড়ীর মন্দিরটি অন্যতম। রাজবাড়ীর অভ্যন্তরে মন্দিরটির অবস্থান। মন্দিরের গায়ে মার্বেল পাথরের একটি ফলক উৎকীর্ণ আছে তাতে লেখা আছে মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দ। রাজা উদমন্ত সিংহ এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনিই এই মন্দিরে রঘুনাথজীর মূর্তি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, এবং প্রচুর দেবোত্তর সম্পত্তি রঘুনাথজীর সেবা পূজার জন্য দান করেছিলেন। তিনি পূর্ব পুরুষের পাপ মোচনের জন্য বহু অর্থ দান করেছিলেন।

নশিপুর রাজবাড়ি- ঝুলন উৎসব

রাজ পরিবারের বিরাট ঠাকুরবাড়ি ও পরিবারের গৃহদেবতা রামচন্দ্র দেব ঠাকুরের নামে উৎসর্গীকৃত করেছিলেন। রাজা উদমন্ত সিংহই নশিপুর রাজবাড়ীতে প্রথম ঝুলন যাত্রা উৎসব চালু করেছিলেন। এই ঝুলন যাত্রা উৎসব উপলক্ষ্যে চারদিনের মেলার প্রচলন ও করেছিলেন। এই পঁচিশ চূড়া বিশিষ্ট মন্দিরটি রাজবাড়ীর অভ্যন্তরে হওয়ায় সামনা সামনি দৃষ্টি গোচর হয় না। মূল মন্দিরের পেছনদিকে তিন দিক ঘেরা ছোট ছোট প্রকোষ্ঠে প্রচুর দেবতার মূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে। এবং সামনে একটি বিরাট নাট মন্দির আছে। ধারাবাহিক ভাবে এই মন্দিরেই নিয়ম মাফিক ঝুলন উৎসব পালিত হয়ে আসছে। দেবী সিংহ , রঞ্জিত সিংহদের উত্তরাধিকারীগনের দ্বারা বর্তমান নশিপুর রাজ দেবোত্তর এস্টেটের সেবাইত মাননীয় শ্রী রণজয় সিংহ দ্বারা মন্দির রাজবাড়ী পরিচালিত হয়ে চলেছে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে।

  নশিপুর রাজবাড়ির ঝুলন-বিগ্রহ

মন্দিরের মূল বিগ্রহ রাম , লক্ষণ , সীতা, হনুমান এবং সঙ্গে স্বয়ং বিষ্ণু ও গণেশের মূর্তি গুলি ঝুলন উৎসব উপলক্ষে দোলনায় উপবিষ্ট হতেন এক সঙ্গে। এবং যার জন্য এই ঝুলন উৎসব সেই রাধা কৃষ্ণের মূর্তি দুটি দোলনায় সব বিগ্রহের মধ্যে অবস্থান করেন। চারদিন উৎসব উপলক্ষে বিগ্রহ গুলি বিশেষ ভাবে সজ্জিত হত। ইলেকট্রিক আসার আগে রাজবাড়ীতে হ্যাজাক, ডে লাইট, মোমবাতির ঝাড়বাতি দিয়ে সজ্জিত করা হত। মূল মন্দিরের পেছনে তেত্রিশ কোটি দেবতার মধ্যে প্রায় অনেক দেবতার মূর্তি প্রকোষ্ঠ মধ্যে উপবিষ্ট আছেন , উৎসব উপলক্ষে সেগুলিও বিভিন্ন অঙ্গরাগ সহকারে পূজিত হন।

ভোগ প্রসাদ

এই সময় পুজোর ভোগ হিসেবে ব্যবহৃত হত নানা রকমের মিষ্টান্ন, শুঁকনো বোদে, মিষ্টি পোলাও , পায়েস এছাড়া নানা রকমের ফলের ভোগ নিবেদন করে পূজা অনুষ্ঠিত হত। রাজবাড়ীর ঝুলন উৎসবের প্রসাদ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাড়িতে বিতরণ করার ব্যবস্থা ছিল। এবং উৎসবে আগত সকল ভক্তবৃন্দ ও যাত্রীদেরও প্রসাদ বিতরণ করা হত। এই ঝুলন উৎসবে বহু দূর থেকে তীর্থযাত্রীরা আসতেন যেমন বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহী থেকেও নদীপথে নৌকা যোগে আসতেন, এছাড়া টোপর দেওয়া গরুর গাড়িতেও সপরিবারে ভক্তবৃন্দরা আসতেন এই ঝুলন উৎসব দেখার জন্য। বর্তমান নেতাজি শিশু উদ্যানের জায়গাতে অস্থায়ী ভাবে সেই সময় সকল তীর্থ যাত্রীরা থাকতেন। নিজেরা রান্না বান্না করতেন বা কখনো বা প্রসাদ খেয়ে দিন কাটাতেন।

নশিপুর রাজবাড়ির ঝুলন ও  যাত্রাপালা

ঝুলন উৎসবের মূল আকর্ষণ ছিল সারারাত ব্যাপী যাত্রাপালা। মন্দিরের সামনের নাট মন্দিরে কলকাতার সব বিখ্যাত যাত্রাদলের যাত্রা অভিনীত হত। নট্ট কোম্পানি, সত্য নারায়ণ অপেরা, ক্যালকাটা যাত্রাপার্টি সহ বহু নামি দামী যাত্রা দল এই ঝুলন উৎসবে যাত্রা পালা অভিনয় করতেন। সে যুগের দিকপাল যাত্রা শিল্পীরা প্রায় সকলেই এই মঞ্চে অভিনয় করেছেন। সেই সময় ছেলেরাই মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করতেন। যাত্রা পালা একাদশীতে শুরু হয়ে পূর্ণিমাতে শেষ হত। যেদিন যাত্রা দেরিতে শুরু হত সেদিন সূর্য উদয়ের আগে শেষ হত।

উল্লেখ্য সেই সময় কলকাতা চিৎপুরের নামজাদা যাত্রা দল নশিপুর রাজবাড়ীর নাট মন্দিরে পালা অভিনয়ের জন্য বিশেষ আগ্রহী হয়ে থাকতেন। বছরের প্রথম পালার উদ্বোধন নশিপুর রাজবাড়ীর নাট মন্দিরে করলে বর্ষার পর থেকে যে যাত্রা পালার সিজিন শুরু হয় তাতে ভালো লাভবান হতেন। যাত্রা অভিনয় দেখার জন্য বর্তমান বংশের রাজারাও উপস্থিত থাকতেন নাট মন্দিরে। নাট মন্দিরের একদিকে মহিলাদের বসার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হত।

 নশিপুর রাজবাড়ির ঝুলন- কীর্তন ও মেলা

এই যাত্রা পালা অভিনীত হবার আগে কীর্তন সম্রাজ্ঞী শ্রীমতী রাধারাণী দেবীর কীর্তন ও কোনো কোনো বার পূর্ণ দাসের বাউল গানও পরিবেশিত হত। ঝুলন উৎসবের সময় নশিপুরে প্রত্যেক বাড়িতে আত্মীয়দের সমাগমে পরিপূর্ণ থাকতো। এছাড়া বহু বাইরে থেকে আগত যাত্রীরা প্রত্যেক বাড়ির সম্মুখে উন্মুক্ত বারান্দায় আশ্রয় নিতেন, এতে কেউ বিরক্ত হতেন না। এত গেল রাজবাড়ীর অন্দরের কথা। নাট মন্দিরে যেমন চলত সারারাত ব্যাপী যাত্রাপালা, অনুরূপ রাজবাড়ীর সামনের মাঠে বসতো বিশাল মেলা।

গাছমেলা

নাগরদোলা, মরণকূপ,ম্যাজিক, সার্কাস সহ বসতো নানা রকম খাবারের দোকান। মিষ্টি , জিলিপি, পাঁপড়, নানান রকমের তেলেভাজার দোকান বসতো মেলায়। তালপাতার বাঁশি ও তাল পাতার নাচা সেপাই সহ অনেক বাচ্চাদের খেলনা পাওয়া যেত সেই সময়ের মেলায়। দশ বছর আগেও প্রায় কয়েকশো দোকান বসতো রাজবাড়ী চত্বরের মেলায়। গ্রামীণ অন্যান্য মেলার মত এই মেলার ও বিশেষত্ব আছে। এখানের মেলার এটাই বিশেষত্ব যে এই চারদিন বিভিন্ন নার্সারি থেকে প্রচুর চারা গাছ বিক্রয় হয়। আম, নারিকেল ও টবে পেয়ারা ও লেবু ধরেছে এমন গাছ প্রচুর পাওয়া যায় মেলায়। আগে প্রচুর সংখ্যক চারাগাছ বিক্রির দোকান বসতো। সেই সংখ্যা এখন কমে গেলেও মেলাতে এখনো গাছের চারা বিক্রয় হয়।

এমন ও অনেক মানুষ আছেন যারা শুধুমাত্র গাছের চারা কিনতেই মেলাতে যায়। মেলায় বিভিন্ন রকমের তেলেভাজা ও জিলিপির দোকান, মনোহারী দোকান ও বসে। এখন আর ঝুলন উৎসবে কলকাতার যাত্রাপালা হয় না , স্থানীয় বেলডাঙা বা আসে পাশের কোনো যাত্রাদলের যাত্রা অভিনীত হয়। আগের মত পূণ্যার্থীদের ভিড়ও বিশেষ দেখা যায়না।

বর্তমানে বিশ্ব মহামারী করোনা ভাইরাস সংক্রমণের জন্য মেলা বসার উপযুক্ত পরিস্থিতি নেই। তাই এবছর কোনো জাঁকজমক ভাবে ঝুলন উৎসব পালিত হবে না । তাই কোনো মেলা হচ্ছে না। শুধুমাত্র মন্দিরের অভ্যন্তের রীতি অনুযায়ী ঝুলন উৎসব পালিত হবে বলে জানিয়েছেন মন্দির কতৃপক্ষ।

 আরও পড়ুন   সূত্রধর বা ছুতোর জন-জাতির উদ্ভব ও পেশার কথা ইতিহাসের প্রেক্ষিতে

তথ্য ঋণ: মুর্শিদাবাদ কাহিনী – নিখিল নাথ রায়,
মুরশিদাবাদ থেকে বলছি (অখণ্ড) – কমল বন্দোপাধ্যায়,
মুর্শিদাবাদ জেলার ঐতিহ্যবাহী মেলা – সুশান্ত বিশ্বাস ও উইকিপিডিয়া।
বিশেষ কৃতজ্ঞতা-  শ্রী সুরজিৎ বসাক

আরও দেখুন কৌলালের তথ্যচিত্র-


Share your experience
  • 391
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    391
    Shares

Facebook Comments

Post Author: Ashutosh Mistri

Ashutosh Mistri
আশুতোষ মিস্ত্রী ।বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলার নবগ্রাম থানার অন্তর্গত জারুলিয়া গ্রামে । বর্তমানে বহরমপুর Ghosh AET Centre ফার্মের অ্যাকাউন্ট দেখা শুনো করেন । Murshidabad Heritage And Cultural Development এর সদস্য ও ইতিহাস বিষয়ক বই সংগ্রাহক।ক্ষেত্রসমীক্ষক।

1 thought on “নশিপুর রাজবাড়ির ঝুলন-যাত্রাপালার অভিনয় থেকে গাছমেলা

Comments are closed.