নাস্তিক পন্ডিতের ভিটায়-বাংলাদেশের বজ্রযোগিনী গ্রামে

Share your experience
  • 175
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    175
    Shares

নাস্তিক পন্ডিতের ভিটায়-বাংলাদেশের বজ্রযোগিনী গ্রামে।বাংলাদেশ ভ্রমণে সড়কপথে ঢাকা থেকে মুন্সীগঞ্জ খুব বেশি হলে ৬০ কিঃমিঃ দূর হবে। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে পৌঁছে যাবেন। আবার ইচ্ছে করলে সদরঘাট থেকে লঞ্চে চেপে প্রকৃতির দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে যাবেন মুন্সীগঞ্জ লঞ্চঘাটে, সময় সেই ঘন্টা দুয়েকই লাগবে। ওখানে রিক্সায় চেপে পৌঁছে যান বজ্রযোগিনী ইউনিয়নের বজ্রযোগিনী গ্রামে, নাস্তিক পন্ডিতের ভিটায়। লিখছেন–ডা.তিলক পুরকায়স্থ।

নাস্তিক পন্ডিতের ভিটায়

শরৎচন্দ্র দাস

শরৎচন্দ্র দাসের সম্মন্ধে জানতে ইচ্ছুক হলে আনন্দবাজার পত্রিকার ২২ শে জানুয়ারি, ২০১৭ তারিখে প্রকাশিত পর্জন‍্য‍ সেনের ” পন্ডিত গুপ্তচর” লেখাটি পড়ে দেখবেন। অতীশ দীপঙ্করের মতনই এই বৌদ্ধ পন্ডিত ও পূর্ববঙ্গের চট্টগ্রামের আলমপুর গ্রামে ১৮৪৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন।

কোন সেই ১৮৮২ সালে লামাদের মতন লাল জোব্বা গায়ে, সঙ্গে সেক্সট্যান্ট , কম্পাস আর রিভলবার নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের হয়ে এই তীক্ষ্ণ মেধাবী পন্ডিত, একদিকে তিব্বতের ডিটেইলস মানচিত্র আঁকছেন, জরিপের কাজ করছেন, অন্যদিকে তিব্বতের বৌদ্ধ ধর্মের বহু প্রাচীন পুঁথি যা আদিতে ভারতীয় পুঁথির অনুবাদ সংগ্রহ (এবং দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ভারতের মূল পুঁথি সব হারিয়ে গ্যাছে), সেই সব দুষ্প্রাপ্য পুঁথির নকল আবার উনার হাত ধরেই ভারতে ফিরে আসে। এভাবেই আবার ভারতে ফিরে এলো দন্ডির কাব্যাদর্শ, কাশ্মীরি পন্ডিত খেমেন্দ্রের “অবদানকল্পলতা বা চান্দ্র ব্যাকরণের প্রাচীন পুঁথি।

তাই একদিকে দেখতে পাই উনার আঁকা মানচিত্র ও জরিপের উপরে ভরসা করে ব্রিটিশরা তিব্বতের উপর আক্রমণ শানাবে। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রায়বাহাদুর, অর্ডার অফ ইন্ডিয়ান এম্পেরর ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করবে , আবার তাঁর তিব্বত চর্চার ভূয়সী প্রশংসা করে, তাঁকে সম্মান জানাবে জিওগ্রাফিক সোসাইটি অফ লন্ডন। তাঁকে তাঁর জীবনভর বৌদ্ধ চর্চার জন্য সম্মানিত করেছিলেন স্বয়ং থাইল্যান্ডের রাজা।

নাস্তিক পন্ডিতের ভিটায়

চলুন ঘুরে আসি নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা থেকে । জেনেনি অতীশ দীপঙ্করের বংশ ঠিক করে বললে রাজবংশের পরিচয়। এর জন্য আপনাদের যেতে হবে বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ জেলার বজ্রযোগিনী গ্রামের নাস্তিক পন্ডিতের ভিটায়। আপনাদের মনে প্রশ্ন উঠতেই পারে এমন বিচিত্র নামের কারণ কি ? আমার মনে হয় যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা ছিলেন হিন্দু আর অতীশ এবং তাঁর পরিবার ছিল বৌদ্ধ, এবং বৌদ্ধ ধর্মে প্রথাগত ঈশ্বরের ধারণা এবং মূর্তি পুজো সেভাবে প্রচলিত ছিল না, তাই সম্ভবত তৎকালীন হিন্দু সমাজের মাথারা উনাকে কিংবা উনার পরিবারকে নাস্তিক বলে দেগে দিয়ে নিজেদের নিম্ন মানসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

  বজ্রযোগিনী গ্রামের নাস্তিক পন্ডিতের ভিটায়

বাংলাদেশ ভ্রমণে সড়কপথে ঢাকা থেকে মুন্সীগঞ্জ খুব বেশি হলে ৬০ কিঃমিঃ দূর হবে। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে পৌঁছে যাবেন। আবার ইচ্ছে করলে সদরঘাট থেকে লঞ্চে চেপে প্রকৃতির দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে যাবেন মুন্সীগঞ্জ লঞ্চঘাটে, সময় সেই ঘন্টা দুয়েকই লাগবে। ওখানে রিক্সায় চেপে পৌঁছে যান বজ্রযোগিনী ইউনিয়নের বজ্রযোগিনী গ্রামে, নাস্তিক পন্ডিতের ভিটায়।বিশ্বাস করা শক্ত একসময় এই স্থানটি ছিল পুন্ড্রবর্ধন- বঙ্গ-সমতটের চন্দ্র বংশীয় রাজাদের রাজধানী। ঐতিহাসিক এবং পুরাতাত্ত্বিক ভাবে প্রমাণ পাওয়া গেছে অতীশ দীপঙ্করের সঙ্গে চন্দ্রবংশীয় রাজবংশের যোগ।

আসছি সেই প্রমানে- ময়নামতির চারপত্র মুড়ায় উৎক্ষণনে পাওয়া গেছে স্থানীয় চন্দ্রবংশীয় রাজাদের ৪ টি তাম্রশাসন, যার মধ্যে দুটি জারি করেন রাজা লড়হচন্দ্র, একটি গোবিন্দচন্দ্রের। এগুলি জারি করা হয় বিক্রমপুর থেকে। চন্দ্রবংশীয় রাজা কল্যাণচন্দ্রের চতুর্থ তাম্রশাসনটি পাওয়া গেছে ঢাকায়, তাই এটিকে বলা হয় কল্যাণচন্দ্রের ঢাকা তাম্রশাসন।

ইতিকথা

এছাড়াও ময়নামতির শ্রীভবদেব বিহারে খননকাজ চালিয়ে পাওয়া গেছে চন্দ্রবংশীয় রাজাদের আমলের অসংখ্য স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা। আরো পাওয়া গেছে রাজা শ্রী চন্দ্রদেবের একটি ভূমিদান পট্টলী। প্রমাণিত হয়েছে যে অতীশ ছিলেন পুন্ড্রবর্ধন- বঙ্গ-সমতটের চন্দ্র বংশীয় রাজবংশের সন্তান। এই রাজবংশের প্রথম রাজা ছিলেন পূর্ব বঙ্গের লালমাটি- ময়নামতি অঞ্চলের রাজা পূর্নচন্দ্র । মনে করা হয়, পূর্ন চন্দ্রের পুত্র সুবর্নচন্দ্র এই বংশে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী প্রথম পুরুষ। এই বংশের শেষ রাজা ছিলেন গোবিন্দচন্দ্র, কলচুরীরাজ কর্ণের সঙ্গে যুদ্ধে গোবিন্দচন্দ্র পরাজিত হন।

জীবনী– নাস্তিক পন্ডিতের ভিটায়

এই বংশের কুরচিনামায় এক রাজার নাম পাওয়া যায় কল্যাণচন্দ্র যিনি জারি করেছিলেন কল্যাণচন্দ্রের ঢাকা তাম্রশাসন। অনেক ঐতিহাসিক বলেন এই রাজা কল্যাণচন্দ্রই হচ্ছেন তিব্বতী ঐতিহাসিকদের বর্ণিত রাজা কল্যাণশ্রী।এরই দ্বিতীয় পুত্র হচ্ছেন চন্দ্রগর্ভ বা অতীশ ( ৯৮০- ১০৫৪) ।তকনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন শ্রীগর্ভ, বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারে তাঁর দীক্ষা নাম হয় – বীর্যচন্দ্র। ইনিও অতীশ দীপঙ্করের সঙ্গে তিব্বত প্রবাসী হন। কল্যাণচন্দ্রের বড় পুত্র পদ্মগর্ভ- সিংহাসনে আরোহণ করে লড়হচন্দ্র নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন।

আবার অনেকে বলেন চন্দ্রগর্ভের পিতা কল্যানশ্রী রাজবংশের লোক ছিলেন, কিন্তু নিজে রাজা ছিলেননা। এই কথাটি কিন্তু স্বয়ং অতীশ নিজমুখে তাঁর তিব্বতী শিষ্যদেরও বলে গেছেন। আর বিক্রমপুরের বজ্রযোগীনি গ্রাম নিঃসন্দেহে সমতটের রাজাদের রাজধানী ছিল, তবে এই রাজারা সম্ভবত গৌড়ের সম্রাটের অন্তর্ভুক্ত রাজ্যের সামন্ত রাজ ছিলাম। সেই গৌড় দেশ- যেখানে ক্রমান্বয়ে রাজশক্তির বদল হয়েছে । কখনও পাল সাম্রাজ্য, পরে কর্ণাটক থেকে আগত সেন রাজারা , শেষে সুলতানি আমল- বিশাল সময় জুড়ে এক বিরাট ক্যানভাস। মহাযান বৌদ্ধ পাল বংশ বাংলা ও মগধ – পাটলিপুত্র, গৌড়, মুঙ্গের, বিক্রমপুর, সোমপুর , বরেন্দ্র, তমলুক- এক বিশাল অংশ জুড়ে রাজত্ব কায়েম করেছিলেন।

পালরাজন্য বর্গ

অতীশের ভারতবাসের জীবনকালে গৌড়ের তিনজন পাল বংশের রাজার নাম দেখতে পাচ্ছি। তাঁর একদম শিশুকালে গৌরাধীশ ছিলেন দ্বিতীয় বিগ্রহপাল। আর তাঁর ৬ বছর বয়সে গৌড়ের সিংহাসনে বসেন দ্বিতীয় বিগ্রহপালের পুত্র মহিপাল । আর তাঁর পৌঢ়ত্বের সময়ে রাজা হয়েছিলেন মহিপালের পুত্র নয়পাল।

বৌদ্ধ পাল রাজারাই সোমপুর মহাবিহার নির্মাণ করেন, নালন্দা আর বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালিয়কে মুক্ত হস্তে দান করেছেন, প্রোট বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ এবং ” চর্যা পদ” পাল যুগের এক উল্লেখযোগ্য কীর্তি । বিক্রমশীল এবং সোমপুর মহাবিহার, দুই জায়গাতেই অতীশ অধ্যাপনা করেন। সোমপুর বিহারে বসে লেখেন-” মধ্যমরত্নপ্রদীপ”।

কথা হচ্ছিল মহাপন্ডিত অতীশ দীপঙ্কর কে নিয়ে। নয়াপালের সময় কলচুড়ি রাজ কর্ণ গৌড় আক্রমণ করেন। এই দুই রাজার মধ্যে বিবাদ মেটাতে, এবং বাংলাকে বাঁচাতে অতীশ তৎপর হন, এবং উনার সালিশি মেনে নিয়ে দুই রাজার মধ্যে সন্ধিপত্র স্বাক্ষর হয়। পরে নয়াপালের পুত্র তৃতীয় বিগ্রহপালের সঙ্গে কলচুরি রাজের কন্যা যৌবনশ্রী-র বিবাহ হয়। এইভাবে কিছুদিন বৌদ্ধ পালবংশ টিঁকে থাকে, যদিও পরে দক্ষিণ ভারতের চালুক্য রাজ চতুর্থ বিক্রমাদিত্যের হাতে তৃতীয় বিগ্রহপাল পরাজিত হন।

তথাগত

আবার ফিরে যাচ্ছি ভগবান তথাগতের কাছে। এই নিয়ে আগেই কিছু লিখেছি, তবুও আবার লিখলাম।

“শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা

আ যে দিব্যধামানি তস্থুঃ,

বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তং

আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ।”

শোনো অমৃতের পুত্র যত দেবগণ দিব্যধামবাসী , আমি জেনেছি তাঁহারে মহান্ত পুরুষ যিনি আঁধারের পারে জ্যোতির্ময় । তাঁরে জেনে তাঁর পানে চাহি মৃত্যুরে লঙ্ঘিতে পারো , অন্য পথ নাহি ।

উপনিষদের এই বাণী আমরা কতজন অন্তর থেকে উপলব্ধি করি। কিম্বা আদৌ উপলব্ধির চেষ্টা করি কি ?

হ্যাঁ- একজন তো অবশ্যই করেছিলেন, তিনি এক রাজকুমার । কিসে আছে সেই চরম সুখ, সেই তো হবে জীবনের পরম প্রাপ্তি। জরা, ব্যাধি, মৃত্যু- কে লঙ্ঘিতে পারে কে – কোন সে পথ, কিসে পাওয়া যাবে সেই পথের ঠিকানা ? চাই সেই সত্য- সুন্দর- পরম প্রাপ্তি, চাইনা এই ভোগ-বিলাস, বুঝেছি প্রবজ্যাই আমার একমাত্র পথ, পেতে হবে নিব্বুতা-বা নির্বাণ। বেরিয়ে গেলেন গভীর রাতে রাজপ্রাসাদ থেকে। কেশদাম কেটে মুন্ডিত মস্তক হয়ে গেলেন, রাস্তায় দেখা এক ব্যাধকে তাঁর বহুমূল্য বস্ত্র দিয়ে তার চিরবাস ধারণ করলেন। চললেন কাঙ্খিত বোধি পথের সন্ধানে- যে বোধি সন্ধান দেবে নির্বানের।

বোধিসত্ত্ব

এভাবেই একদিন সেই রাজকুমার হলেন পরমপুরুষ ” বোধিসত্ব”।

বোধি পথের সন্ধান দিয়ে, নির্বাণ বা মোক্ষ নিয়ে পরম সুখের সন্ধানে নিয়োজিত রাজকুমার , ৮০ বছর বয়সে কুশীনগরে পার্থিব দেহ ত্যাগ করলেন।

নির্বাণ অর্থাৎ ধর্মের পথেই আছে মুক্তি। জন্ম, ব্যাধি, জরা, মৃত্যু- কিছুই ধর্মকে স্পর্শ করতে পারেনা । কিন্তু সেজন্য চলতে হবে সংযমের পথে। মানতে হবে অহিংসার পথে চলা, মিথ্যা কথা না বলা , গরিবকে দান করা, মদ্য পান ও ব্যভিচার থেকে দূরে থাকা, আরামপ্রদ শয্যায় শয়ন না করা, সোনা-রুপা- সুগন্ধি জিনিষ ইত্যাদি বর্জন করা- এসবই যেন হয় জীবনে চলার পথের আদর্শ।

 বুদ্ধ

বুদ্ধ শব্দের অর্থ যিনি শাশ্বত পরম সত্যকে উপলব্ধি করে আত্মস্থ করেছেন। ত্রিপিটক অনুসারে ৪ প্রকার বুদ্ধের অস্তিত্ব আছে – ১)বুদ্ধের যেসব শিষ্যরা সরাসরিভাবে তথাগতের শিষ্য ছিলেন এবং তথাগতের কাছেই ধর্মতত্ত্ব লাভ করে বৌদ্ধ ধর্মকে মানব কল্যানে নিয়োজিত করেন , তাঁরা হচ্ছেন শ্রাবক বুদ্ধ। ২) পচ্চেক বুদ্ধ- যিনি আত্মসাধনার দ্বারা নির্বাণ এবং আত্মমুক্তি লাভ করেন । ৩) সম্যক বুদ্ধ- যিনি জগতের মুক্তির লক্ষে ধর্মাচরণ করেন । ৪) শ্রুত বুদ্ধ- যিনি সম্পূর্ণ ত্রিপিটক কে কণ্ঠস্থ করতে পারেন। আজ অবধি কেবলমাত্র একজন শ্রুত বুদ্ধ জন্মেছেন- সিংহল দ্বীপে থেরাবাদী বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারক বুদ্ধ ঘোষ।

গৌতম বুদ্ধ দেহ রেখেছেন। কিন্তু মহাপরিনির্বানের আগে স্বয়ং বুদ্ধদেব তাঁর অন্যতম প্রধান শিষ্য আনন্দকে বলে গেছিলেন বুদ্ধ ধর্ম পৃথিবীতে ৫০০০ বছর প্রচলিত থাকবে । কিভাবে- তাঁর ৮৪,০০০ উপাস্য বুদ্ধমূর্তি বা ধর্মস্কন্ধ ই বুদ্ধরূপে মান্যতা পাবে। তাই বৌদ্ধদের ধর্মাচরণ ও জীবন যাপন সমস্থ ব্যাপারটি আবর্তিত হয় উপাস্য বুদ্ধকে সামনে রেখে।

বুদ্ধের বাণী

এখন বুদ্ধের বানীর বিভিন্ন অর্থ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে প্রচলিত হয়। কিন্তু বুদ্ধ আগে না ধর্ম আগে, আত্মমুক্তি আগে না জগতের মুক্তি আগে, এই ব্যাপারেই প্রথমে বৌদ্ধ ধর্মের অনুগামীরা দু ভাগে ভাগ হয়ে গেলেন। যাঁরা আত্মসাধনার দ্বারা নির্বাণ এবং আত্মমুক্তি কে প্রাধান্য দিতেন- তাঁরা হলেন হীনযান বৌদ্ধ, এঁদের কাছে ধর্মাচরণ প্রথম হচ্ছেন বুদ্ধ, তারপরে ধর্ম এবং শেষে সঙ্ঘ । আর অন্যরা, যাঁদের কাছে আগে ধর্ম, পরে বুদ্ধ এবং শেষে সঙ্ঘ, তাঁরা হলেন মহাযান ধর্মী। পরবর্তী কালে দেখতে পাচ্ছি, বৌদ্ধদের পালনীয় ধর্মীয় আচার-আচরণ তখন প্রায় ১৮ রকম বিভিন্ন শাখা নিয়ন্ত্রণ করছে।

সিংহলে প্রথমে হীনযান সম্প্রদায়ের প্রাধান্য ছিল, কিন্তু সেখানে বর্তমানে থেরাবাদী সম্প্রদায় সংখ্যাগরিষ্ঠ। অন্যদিকে ভারত, তিব্বত, চীন, জাপান ইত্যাদি দেশে মহাযান সম্প্রদায়ের প্রাধান্য রয়েছে।

আবার মহাযান মতাদর্শের মধ্যে থেকেই আবার আরো অনেক মতাদর্শের প্রচলন হয়- যেমন বজ্রযান, মন্ত্রযান, সহজযান, কালচক্র যান ইত্যাদি। সহজিয়া সাধন বা সহজযান, পদ্ধতি খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, এই সাধকেরা নিজেদের সিদ্ধাচার্য বলে পরিচয় দিতেন। সমাজের অত্যন্ত নিচু তলার লোকেদের দ্বারা এই সহজিয়া সাধনা, সমাজ জীবনে ব্যাপক সাড়া জাগায়। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক বৌদ্ধ ধর্ম, ভিক্ষু জীবন, এবং বৌদ্ধ বিহারগুলি কোণঠাসা হয়ে পরে।

অবতার বুদ্ধ

পরবর্তী কালে তাই দেখতে পাচ্ছি, বৌদ্ধ ধর্ম দুদিকের সাঁড়াশি আক্রমণে পড়ে – নিজেদের মধ্যে ক্রমাগত বিভাজন তাকে দুর্বল করে দেয় আর ব্রাম্মন্যবাদী সমাজের আগ্রাসনের সঙ্গে আপোষ করতে করতে এক সময় বৌদ্ধ ধর্ম নিজেও বোধি তত্ত্ব বিস্মৃত, মন্ত্র- তন্ত্র ও ক্রিয়াকর্ম সর্বস্ব জড় ধর্মে পরিণত হয়। সংখ্যাগুরু ভারতীয় জনগণ বুদ্ধ অবতারকে সন্মান করতেন, প্রণাম করতেন, কিন্তু তাঁর ত্যাগের বাণী অন্তরে গ্রহণ করতে পারেননি।

তাই মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম কোণঠাসা হতে হতে রাজানুগ্রহে কেবলমাত্র গৌড় আর মগধেই টিঁকে ছিল। বড় শাস্ত্রজ্ঞ পন্ডিতদের সংখ্যাও কমতে থাকে।

 বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার

ভারতীয় সভ্যতার জয়জয়কারের দিনে , রামায়ণ- মহাভারত এবং সংস্কৃত ভাষার প্রভাব সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায়। ভারতীয় সভ্যতা, তার ঐতিহ্য, তার ধর্মে আকৃষ্ট হয়ে কোন সে সুদূর সুমাত্রা আর মধ্য জাভার রাজা শান্তনু সম্ভবত ৬৫০ সালে, শৈব ধর্মে দীক্ষা নেন এবং শৈলেন্দ্র ( শৈল + ইন্দ্র = পর্বতের অধিপতি) রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ইনারা মহাযান বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেন এবং বহু হিন্দু ও বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণ করেন, যার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হচ্ছে বর্তমানের ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ বড়োবুদুরের বৌদ্ধ মন্দির।

এঁদের রাজত্বে প্রাচীন মালয় এবং প্রাচীন জাভানিজ ভাষা প্রচলিত ছিল, কিন্তু সরকারি এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ব্যাবর্হিত হত সংস্কৃত ভাষা। ৮২৪ সালের একটি খোদাই রাজলিপি অনুসারে দেখা যায় যে, রাজাদের চিতাভস্ম যেখানে রাখা থাকত, সেই স্থলের নাম ছিল বেনুবন বিহার।

নালন্দা মহাবিহারে প্রাপ্ত ৮৬০ সালের একটি প্রস্তরখোদিত লিপিতে লেখা আছে যে, সুবর্ন দ্বীপের শৈলেন্দ্র বংশের রাজা ” বালপুত্র” , বৌদ্ধগয়াতে একটি বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করেছিলেন এবং বালপুত্রের অনুরোধে গৌড়ের পাল নৃপতি “দেবপাল” , বৌদ্ধ বিহারের জন্য ৫ টি গ্রাম দেবোত্তর সম্পত্তি হিসাবে বন্টন করেন।

নাস্তিক পন্ডিতের ভিটায় থেকে সুবর্ণ দ্বীপ

অতীশ দীপঙ্কর যখন সুবর্ণ দ্বীপে যাত্রা করেন তখন সুবর্ন দ্বীপে শৈলেন্দ্র রাজবংশের রাজা বিজয়তুঙ্গ বর্মনের রাজত্ব। ইনি রাজা বালপুত্রের উত্তরসুরি।

এই শৈলেন্দ্র বংশেই জন্ম নিয়েছিলেন এক অসাধারণ রাজপুত্র যিনি পরবর্তী সময়ে সারা পৃথিবীতে পরিচিত হয়েছিলেন বিখ্যাত মহাযান ধর্মগুরু ” আচার্য্য ধর্মকীর্তি নামে” । ঠিক বলেছেন- ইনিই অতীশ দীপঙ্করের শিক্ষা গুরু । বুদ্ধদেব নিজে ছিলেন রাজপুত্র, অতীশ ও তাই, আবার শৈলেন্দ্র রাজপুত্রও গুরু হিসাবে পেয়েছিলেন বৌদ্ধগয়ার আচার্য মহর্ষিরত্ন কে। দীক্ষান্তে এবং শিক্ষান্তে রাজপুত্র হলেন আচার্য ধর্মকীর্তি । অসাধারণ গুরু- শিষ্য শিক্ষার পরম্পরা চলেছিল দীর্ঘ বারো বছর। শিষ্যকে গুরু মহাযান ধর্মের অদ্বিতীয় পন্ডিত রূপে গড়ে তোলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, বিদেশে ভারতীয় সভ্যতার ধ্বজা তুলে ধরা শৈলেন্দ্র রাজবংশের পতন ঘটল আরেক যুদ্ধবাজ দক্ষিণ ভারতীয় রাজা রাজেন্দ্র চোলার হাতে। ধ্বংস হয়ে গেল শ্রীবিজয় রাজবংশ, বিচ্ছেদ ঘটল গুরু-শিষ্যের মধ্যে, বড়োবুদুর ধ্বংসস্তূপ হয়ে চোখের আড়ালে চলে গেল। ‘স্থপতি মোদের স্থাপনা করেছে বরভূধরের ভিত্তি/ শ্যাম কম্বোজে ওঙ্কারধাম মোদেরি প্রাচীন কীর্তি’– বলার কি আর মুখ রইল ?

গুরুকে ছেড়ে শিষ্য ফিরে এলেন দেশে। সালটা তখন ১০২৫, আর দীপঙ্করের বয়স ৪৩ বৎসর।

নাস্তিক পন্ডিতের ভিটায় থেকে তিব্বত

ভারতে তখন মহাযান তত্ত্বের পন্ডিত মাত্র ২ জন- প্রবীণতম আচার্য নারোপা, আর প্রবীণ আচার্য রত্নাকর শান্তি। অতীশ আসাতে সেই সংখ্যাটি দাঁড়াল ৩ । আচার্য নারোপা কিছু দিনের মধ্যে দেহরক্ষা করলেন। মহাযান ধর্মের মূল সূত্রকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তখন মাত্র দুজন। অতীশের বয়স তখন বেড়ে গেছে, এখন তিনি ৫৮ বছরের প্রৌঢ়। এমন সময় ভগবান তথাগতের ডাক এলো তিব্বত থেকে ।

আরও পড়ু ন-অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান -বাঙালীর এক বিস্ময়কর প্রতিভা

এই নিয়ে প্রচ্ছদের শুরুতেই আলোচনা করেছি, তবুও আবার সেই সময়ের পুনর্নির্মাণ করছি। হিমালয়ের পথে পথে ঘুরতে, প্রৌঢ় সন্যাসীর প্রশান্ত মুখে কোন কষ্টের ছাপ নেই। প্রকৃতির সৌন্দর্যে অভিভূত সন্ন্যাসী সদা প্রশান্ত মুখে অবিরাম সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে পথ চলেছেন। আর পথিমধ্যে হটাৎ করে কোন চমকপ্রদ সুন্দর কিছু দেখতে পেলেই তাঁর মাতৃভাষায় বলে উঠছেন- ” অতি ভালো ! অতি ভালো ! অতি মঙ্গল !” এ আমার কথা নয়, তাঁর দোভাষী নাগছো ছলাটিম জলবার বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে । অতীশ যে ১০০% বাঙালি- এর থেকে কোন বড় প্রমান হতে পারেকি ?

তথ্যসূত্র:- ১) অতীশ দীপংকর, একরাম আলি। প্রকাশক : রেদওয়ানুর রজমান জুয়েল, নালন্দ, ৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা।

২) অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞান। অলকা চট্টোপাধ্যায়, নবপত্র প্রকাশন, কলকাতা ৯ ।

৩) Atish Dipankar- Wikipedia.


Share your experience
  • 175
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    175
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।

1 thought on “নাস্তিক পন্ডিতের ভিটায়-বাংলাদেশের বজ্রযোগিনী গ্রামে

Comments are closed.