নাটাই চণ্ডী বা নাটাই মঙ্গলচণ্ডী ব্রত লোক ইতিহাসের অমূল্য দলিল

Share your experience
  • 421
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    421
    Shares

পূর্ববঙ্গের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে অগ্রায়ণ মাসের প্রতি রবিবার সন্ধ্যায় মূলত অবিবাহিত মেয়ের বিবাহ কামনায় নাটাই চণ্ডী বা নাটাই মঙ্গলচণ্ডী পুজো  করা হয় । মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলে সাধারণত আর ব্রতটি করার প্রচলন নেই ।তবে কিছু কিছু জাতির নারীদের মধ্যে আজীবন এই ব্রত করতে দেখা যায় । লিখছেন–ময়ূখ ভৌমিক।

  নাটাই মঙ্গলচণ্ডী ব্রত বা নাটাই চণ্ডী ব্রত

নাটাই চণ্ডী ব্রত

সাধারণত রবিবার সন্ধ্যায় বাড়ির উঠানে একটা ছোট পুকুর কেটে তার চারপাশে চালের গুঁড়োর আল্পনা দিয়ে, বা কোনো কোনো পরিবারে চাল গুঁড়ো দিয়ে চতুৰ্ভূজা দেবী মূর্তির মতো এঁকে, সিঁদুর ফোঁটা ও কাজল ফোঁটা দিয়ে চোখ মুখ তৈরী করে পুজো করা হয় ।পুজোয় প্রয়োজন হয় সর্ষেফুল, গাঁদাফুল, ইত্যাদি, আর চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরী ছোট ছোট সাতটি পিঠে ।আর প্রয়োজন হয় আট টি করে কচু পাতা, তুলসী পাতা, দুর্বা ।আবার কোনো কোনো পরিবারে কলাপাতার মাঝের মোটা ডাঁটা টিকে বিশেষ কৌশলে কেটে, একটুকরো পাতা গুঁজে ও সিঁদুর দিয়ে জিভ তৈরী করা হয় । এরপর চারটে কালো কচুর ডাঁটা ভাঁজ করে ওই কলার ডাঁটার দুপাশে জোড়া হয় ।

নাটাই চণ্ডী ব্রতের দেবী

এভাবে একটি চতুর্ভুজা, লোলজিহ্বা দেবী মূর্তির মতো তৈরী করে পুকুর এর পারে রাখা হয় ।বাড়িতে যতগুলি অবিবাহিত বালক বালিকা আছে, প্রত্যেকের নামে সাতটি করে কচু পাতা, তুলসী/বেল পাতা, দুর্বা পরপর রাখতে হয় । আতপচালের গুঁড়ো দিয়ে কতগুলি চিতই পিঠে তৈরী করতে হয় । এই পিঠে আবার দু রকমের হয় । নোনা,ও আনোনা (নুন যুক্ত, নুন ছাড়া )। প্রতিটি পাতার গুচ্ছের ওপর সাতটি করে পিঠে দেবার নিয়ম । প্রতি পাতায় নোনা -আনোনা দুরকমই থাকতে হবে ।

সবকিছু হয়ে গেলে বাড়ির (অনেক সময় প্রতিবেশী বাড়ির ও ) শিশু ও মহিলারা সমবেত হলে ব্রত শুরু হয় । উপস্থিত মহিলারা একসাথে তিন বার জোকার (উলুধ্বনি )দেন । বাড়ির গিন্নি তিন বার সর্ষে, গাঁদা ইত্যাদি ফুল নিয়ে আল্পনা ও পিঠের পাতগুলোর ওপর ছড়িয়ে দেন । এর পরে সবাই হাতে ফুল নিয়ে ব্রতকথা শোনে । ব্রতকথার একটা বিশেষ জায়গায় সমবেত মহিলারা এক বার জোকার দিয়ে পুকুরটিকে দুধ দিয়ে ভরে দেন ।

এর পর কথা শেষ হলে যথারীতি জোকার ও শঙ্খধ্বনি করে ব্রতের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয় । সমস্ত পিঠেগুলো একত্রে মিশিয়ে উপস্থিত বালক বালিকা দের খেতে দেওয়া হয় । প্রচলিত বিশ্বাস যে নোনতা পিঠে খাবে তার তাড়াতাড়ি বিয়ে হবে বা পরীক্ষায় পাস করবে (স্পষ্টতই, এটা বর্তমান কালে বাল্যবিবাহ বন্ধ হবার পরের সংযোজন ) আর যে আনোনা খাবে তার বিপরীত ফল হবে।

নাটাই চণ্ডী ব্রতকথা

কোনো কোনো জায়গায় এই পিঠেগুলো গোয়াল ঘরে গিয়ে খাওয়ার রেওয়াজ আছে এই ব্রতে যে” কথাটি বলা হয়, সেটি এরকম – এক দেশের রাজার (বা সওদাগর ) এর দুই রানি। বড় রা্নি মাটির মানুষ আর ছোট রানি খান্ডার । দুই রানিরই একটি করে ছেলে ও মেয়ে । হটাৎ বড় রানি মারা গেলেন । শোক সন্তপ্ত রাজা বড় ছেলে ও বড় মেয়েকে আগলে আগলে রাখতে লাগলেন। দেখে ছোট রানি হিংসা ও রাগে জ্বলে উঠলেন । কিন্তু রাজার উপস্থিতিতে কিছু করার উপায় নেই, তাই সুযোগের অপেক্ষায় থাকলেন । সুযোগ এলো কিছু দিন পর। রাজাকে রাজকার্য্যে বিদেশ ভ্রমণে যেতে হবে।তাই রাজ বাড়িতে সাজ সাজ রব পরে গেল। সাত নৌকা ধন রত্ন, জিনিস পত্র সাজানো হলো ।

নাটাই মঙ্গলচণ্ডী ব্রত

কিন্তু রাজার মনে সুখ নেই। রাজকার্য না করলেও না, আবার বড় ছেলে মেয়েকে তাঁর অনুপস্থিতিতে ছোট রানী কি করবে, না করবে ভেবে রাতে ঘুম আসেনা, দিনে অন্ন রোচে না। এই অবস্থায় মন্ত্রী পরামর্শ দিল, রাজামশাই, আপনি তেলিকে কড়ি দিয়ে জান, রাজপুত্র রাজকন্যাকে তেল মাখিয়ে দেবে, ধোপা কে কড়ি দিয়ে যান, ক্ষার -খৈল মাখিয়ে দিবে, নাপিতকে কড়ি দিয়ে যান স্নান করিয়ে দেবে। আর গোয়ালাকে কড়ি দিয়ে যান দুধ দই যোগাবে, ময়রাকে কড়ি দিয়ে যান, মুড়ি মুড়কি মোদক যোগাবে, বামুন ঠাকরুনকে কড়ি দিয়ে যান দুপুরে ভাত যোগাবে । তাহলে আর ছোট রানিমার হাততোলা হতে হবে না ।

তাই হলো । রাজা গোপনে তেলি, মালি, ধোপা, নাপিত, গোয়ালা, ময়রা, বামুন সবাই কে কড়ি দিয়ে বলে গেলেন, আমার অনুপস্থিতে আমার বড় ছেলে মেয়েকে দেখ ।এদিকে ছোট রানি এই দিনের অপেক্ষায়ই ছিল l রাজার নৌকা ঘাট ছেড়ে যেতেই, বাড়ির রাখাল ছাড়িয়ে দিল । সতীনের ছেলে মেয়েকে ডেকে বলেদিল, কাল থেকে তোরা গরু ছাগল চড়াবি ।
পর দিন থেকে ভোর হতেই বড় রাজপুত্র বড় রাজকন্যা গরু ছাগল নিয়ে মাঠে যেতে লাগলো। সারাদিন মাঠে ঘাটে ঘুরে সন্ধ্যায় বাড়ি আসলে সৎ মা পাত কুড়ানি নাত কুড়ানি (অকিঞ্চিৎকর খাবার ) যা দিত, তাই সোনা মুখ করে খেয়ে চট গায় দিয়ে ঢেঁকি শালে শুয়ে পড়ত ।

কিন্তু দিন দিন তাদের গায়ের রঙ উজ্জ্বল হতে লাগলো, গড়ন বাড়ন্ত হতে লাগলো ।আর ছোট রানির ছেলে মেয়ে দিন দিন শুকিয়ে যেতে লাগলো । দেখে রানির প্রাণ ফেটে গেল । শেষে একদিন ফন্দি ঠাউরে নিজের ছেলে মেয়ে কে বলল, কাল তোরা দাদা দিদির সাথে গরু চড়াতে যাবি আর দেখবি ওরা সারাদিন কি করে, কি খায় ।

সতীন সমস্যা

কথা মতো কাজ হলো, পরদিন ছোট ছেলে মেয়ে দুটি দাদা দিদির সাথে মাঠে গেল l সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মা কে বললো, মা দাদা দিদির যে সোনার কপাল, গরু ছেড়ে দিয়ে ওরা গাছতলায় বসে থাকে আর প্রহরে প্রহরে গোয়ালা, ময়রা, বামুন সবাই এসে দুধ দই চিঁড়া মুড়ি মুড়কি মিষ্টি মন্ডা ভাত তরকারি সব খাইয়ে যায় । শুধু কি তাই, তেলি এসে গন্ধ তেল মাখিয়ে যায়, ধোপা ক্ষার খৈলে গা রগড়ে দিয়ে যায়, নাপিত স্নান করিয়ে দিয়ে যায়, মালি ফুলে চন্দনে সাজিয়ে যায় । আমরাও এখন থেকে রোজ গরু চড়াবো ।
শুনে তো রানির আক্কেল গুড়ুম ! সারারাত ধরে ভেবে উপায় বের করলো । পরদিন সকাল হতেই তেলি, মালি, গোয়ালা, ধোপা, নাপিত, ময়রা, বামুন সবাইকে ডেকে পাঠালো । পরে রাজার হাতের আংটির ছাপ দিয়ে একটা চিঠি দেখিয়ে বললো, রাজা মশাই হুকুম দিয়েছে যে যে তাঁর ছেলে মেয়ে কে খাওয়া বা- মাখাবে, তার ধড়ে মুন্ডু রাখবে না । শুনে প্রাণের ভয়ে সবাই চুপ করে রইল । মিথ্যা বুঝেও কেউ কিছু বলল না ।

 দুর্ভাগ্য

সেদিন থেকে ছেলে মেয়ে দুটির কপাল পুড়লো । মাঠে বসে থেকে থেকে সন্ধ্যা হয়ে এলো, কেউ খাওয়ালো না, দাওয়াল না । বসে বসে ক্লান্তি তে দুই ভাই বোন ঘুমিয়ে পড়লো । শেষে শেয়ালের ডাকে উঠে বসে দেখে সন্ধ্যা হয়েছে । কিন্তু এদিকে আরেক বিপদ । একটা গরু ছাগল ও মাঠে নেই । ভয়ে দুঃখে দুই ভাই বোন কেঁদে উঠল । সেই কান্না শুনে মা নাটাই চন্ডীর প্রায় হায় হায় করে উঠল । তিনি বুড়ি বামনির বেশ ধরে এসে বললেন, তোরা কাঁদিসনা আমার সাথে আয়, আমি গরু ছাগল খুঁজে দেব ।
বুড়ির সাথে চলতে চলতে দুই ভাই বোন গ্রামের ভিতরে এক গৃহস্থ বাড়ির দরজায় এসে উপস্থিত হলো । সেখানে এসে বুড়ি অদৃশ্য হয়ে গেল । এদিকে সেই বাড়ির গিন্নি ছেলে মেয়ে নাতি নাতনি নিয়ে নাটাই পূজা করতে গিয়ে দেখে, এক জোড়া পাতার গোছা বেশি হচ্ছে । তখন বাইরে বেরিয়ে দেখে দুটি রাজপুত্র রাজকন্যা র মতো ছেলে মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে । তাদের হাত ধরে ভিতরে নিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করতে, সব শুনে বলল মা নাটাই চণ্ডী তোমাদের এখানে এনেছেন l।তোমরা মার পুজো কর, সব দুঃখ দূর হবে ।

যথা রীতি পুজো হলো । পূজার পর গিন্নি সবাই কে বর চাইতে বললেন । সব ছেলে মেয়েরা নিজের নিজের মনমত বর চাইল । এরা দুই ভাই বোন বলল, মা নাটাই চণ্ডী, আমাদের গরু ছাগল যেন খুঁজে পাই l শুনে গিন্নি বললেন,” ওকি বর চাওয়া ! বলো আমাগের দূরের বন্ধু উইড়া আসুক, আমাগের বাবা সাত নৌকা ধন চোদ্দ নৌকা কইরা ফিরুক, আমাগের সকল দুঃখ দূর হউক । ” শুনে ভাই বোনে সেই মতো চাইলো । তারপর প্রসাদ খেয়ে গৃহস্তের বাড়িতে কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো ।

 ফিরে এলো সদাগর

ভোর হতেই দেখে গরু ছাগলের পাল ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে । গৃহস্থের কাছে বিদায় নিয়ে ফেরার পথে শোনে ঘাটে বাজনা বাজছে । দৌড়ে গিয়ে দেখে, ওদের বাবা চোদ্দ নৌকা সোনা দানা ধন দৌলত আর এক দেশের রাজকন্যা একদেশের রাজপুত্র নিয়ে ফিরে এসেছে । রাজা ও ছেলে মেয়ে র দশা দেখে, তাদের মুখে সব শুনে, সমস্ত ই বুঝলেন । এদিকে ছোট রানী রাজা এসেছে খবর পেয়ে এক পুটুলি ধন রত্ন নিয়ে পালাতে গিয়ে পাত কুয়ো য় পরে মারা গেল । রাজা বাড়ি এসে সৎকার ও শ্রাদ্ধ শান্তি করে পরে রাজকন্যা র সাথে ছেলের আর রাজপুত্র র সঙ্গে মেয়ে র বিয়ে দিলেন ।

 বিয়ের পর

বিয়ের পর রাতে বাসর ঘরে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে (পূর্ব বঙ্গে বাসর জাগার প্রথা নেই ) রাজকন্যা চুপিচুপি উঠে বরণ ডালার চাল গুঁড়ো করে, প্রদীপ এর আগুনে পিঠে ভেজে নাটাই ব্রত করতে লাগলেন । এই দেখে রাজকন্যা র স্বামী অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, এ কিসের ব্রত? রাজকন্যা বলল, নাটাই চণ্ডী ব্রত । প্রশ্ন হলো, এ করলে কি হয়? যে যা মানস করে পূর্ণ হয় । ব্রতী কে মা নাটাই চণ্ডী সব বিপদে রক্ষা করেন । শুনে রাজপুত্র মনে মনে ভাবলেন, পরীক্ষা করতে হবে ।

পরদিন বাসি বিয়ের পর বর কন্যা “চলন ” (পূর্ব বঙ্গে বিবাহ কালে গমন কে চলন বলে )হল । নৌকা চলছে, চারদিকে অতুল জল, হঠাৎ রাজপুত্র বলল, তোমার সব গয়না যদি এখানে জলে ফেলে বাড়িতে বসে পাই, তবে তোমার নাটাই চণ্ডীকে সত্যি বলে মানি । শুনে রাজকন্যা মা নাটাই কে স্বরন করে, গায়ের সমস্ত গয়না খুলে, পুটুলি বেঁধে জলে ফেলে দিল । অমনি এক বিরাট রাঘব বোয়াল পুটুলি গিলে খেয়ে ফেলল । বৌ এসে শ্বশুর বাড়ির ঘাটে পৌছালো । এতো বড় রাজার মেয়ে এমন ন্যাড়া ন্যংটা দেখে পাড়া পড়শি আত্মীয় স্বজন সবাই ছি ছি করতে লাগলো । যাই হোক, কোনো ক্রমেবৌ বরণ হলো l পরদিন বৌভাত । দশ গ্রামের লোক নিমন্ত্রিত । কিন্তু কোথাও মাছ পাওয়া যাচ্ছে নাl নতুন বৌ বলে পাঠালো, নদীতে জাল ফেললে মাছ উঠবে ।

 রাঘব বোয়াল

তাই হলো, বিশাল রাঘব বোয়াল ও অন্যান্য প্রচুর মাছ উঠল । জেলেরা বলল বৌ খুব পয়মন্ত । এবার আরেক সমস্যা দেখা দিল । অতবড় রাঘব বোয়াল কেউ কাটতে পারছে না । শাশুড়ি বৌ কে জব্দ করতে বলল, বৌ মা আমার এমন পয়মন্ত, ওই মাছ কাটুক। বৌ মাছের গায়ে বঁটি ঠেকাতেই মাছ দুই টুকরো হয়ে গেল, আর সমস্ত গয়না বৌ এর কাছে ফিরে এলো l বাড়ির সবাই আশ্চর্য হয়ে গেল, শুধু রাজপুত্র মনে মনে স্বীকার করলো নাটাই চণ্ডী জাগ্রত দেবী l

এর কিছু দিন পরে রাজকন্যার একটা ছেলে হলো । বুড়ো রাজা, রানি সবাই খুশি l নাতির কল্যাণে রাজা এক বিশাল পুকুর কাটলো । মনে মনে ভাবলো নাতির অন্নপ্রাশন এর দিন পুকুর প্ৰতিষ্ঠা করবে । কিন্তু ভাবলে কি হবে, পুকুরে একটুও জল উঠলো না। দেখতে দেখতে অন্নপ্রাশন এর দিন চলে এলো । মনের দুঃখ নিয়েই রাজা রানি নাতির অন্নপ্রাশন এর আয়োজন করতে লাগলো, আবার দশ গ্রামের লোক নিমন্ত্রণ করলো, বাজনা বাদ্যি বাজালো, নাপিত পুরুত খবর দিল । উৎসবের আগের দিন রাতে রাজা স্বপ্ন দেখলো দেবী চণ্ডী বলছেন, তোর নাতি কে কাল কেটে পুকুরে ফেল, তাহলে জল হবে । এই দারুনকথা শুনে রাজা মূর্ছা গেলেন । বাড়িতে হুলুস্থূল পরে গেল । মূর্ছা ভঙ্গে রাজা কাউকে কিছু বলেন না, শুধু কাঁদেন। শেষে অনেক সাধ্য সাধনার পর ছেলে র কাছে মুখ খুললেন । রাজপুত্র সব শুনে বললেন, দেবীর আদেশ আমি অবশ্য মানবো। তবে আপনার বৌমাকে কিছু জানিয়ে দরকার নেই ।

সেই মতো কাজ হলো, অন্নপ্রাশন এর পর, রাজপুত্র ছেলেকে কেটে পুকুরে ফেলল, আর কলকল করে পুকুর ভরা জল হলো (গল্পের এই জায়গায় ব্রত কারিনী একটি ফুল দু টুকরো করে ছিঁড়ে পুকুরে ফেলে ও কাঁচা দুধ দিয়ে পুকুর পূর্ণ করে । সমবেত মহিলারা একবার জোকার দেয় )

নাটাই চণ্ডী ব্রত ও পুকুর প্রতিষ্ঠা

যথারীতি পুকুর প্ৰতিষ্ঠা হলো ।এদিকে রাজকন্যা সকাল থেকে রান্না ঘরে রান্না করছে । অনেক বার একে তাকে বলেছে ছেলে কে এনে দিতে । কিন্তু সবাই একথা সেকথা বলে এড়িয়ে যাচ্ছে । শেষে সন্ধ্যার কিছু আগে রান্না বান্না শেষ হলে, ভাবলো নতুন পুকুর এ জল উঠেছে শুনলাম, যাই একবার স্নান করে আসি । পুকুর ধারে গিয়ে হটাৎ প্রতিবেশীর বাড়িতে জোকার শুনে মনে পড়লো আজ তো অঘ্রান মাসের রবিবার, নাটাই ব্রত করতে হবে । তখনই পুকুর পারে কচুপাতা তুলে, প্রতিষ্টার চাল কুড়িয়ে পিঠে গড়ে নাটাই ব্রত করলো l ব্রত করে প্রণাম করে উঠতেই দেখে মা চণ্ডী তার ছেলে কোলে বলছে, এরা কখন তোর ছেলে কে কেটে পুকুরে ফেলেছে, আর এতক্ষনে তোর ছেলের কথা মনে হলো ! আমি সেই তখন থেকে ছেলে নিয়ে বসে আছি l এই বলে ছেলেকে তার কোলে দিয়ে স্বস্থানে গমন করলেন ।

রাজকন্যাকে ছেলে কোলে বাড়ি ফিরতে দেখে বাড়িতে শোরগোল পরে গেল । পরে সব শুনে সবাই মা নাটাই চণ্ডীর মহিমা দেখে আশ্চয হয়ে গেল । বুড়ো রাজা দেবীর উদ্দেশ্য এ প্রণাম করে বললেন, এখন থেকে প্রতি বছর আমি এই পুজো করবো, আর রাজ্যে রাজ্যে প্রচার করবো । সেই থেকে এই পুজো সব দেশে প্রচলিত হলো ।

 আরও পড়ুন –কালী ছাড়া কালীপূজা–গাছ পাথর আর বিচিত্র গম্ভীরা বলয়ে

নাটাই চণ্ডী ব্রত ও পাটাই চণ্ডী পুজো

অঘ্রান মাসের একটা রবিবার বাদে, বাকি প্রত্যেক রবিবার সন্ধ্যায় এই পুজো হয়। শেষ রবিবার বিশেষ আয়োজন হয় । সেদিন নোনা আনোনা পিঠে ছাড়াও, পায়েস, পাটিসাপ্টা ইত্যাদির ব্যবস্থা থাকে। পাড়া প্রতিবেশি, আত্মীয় স্বজনকে সাধ্যমত আপ্যায়ন করা হয় । নতুন জামাই (যার এক বছরের মধ্যে বিয়ে হয়েছে ) মেয়ে থাকলে বিশেষ খাতির যত্ন করা হয় । কোনো কোনো পরিবারে আবার পৌষ মাসের একটি রবিবার দুপুরে “পাটাই চণ্ডী” পুজো করে এই ব্রতের সমাপ্তি হয় ।


Share your experience
  • 421
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    421
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ময়ুখ ভৌমিক

ময়ুখ ভৌমিক
ময়ূখ ভৌমিক।কোচবিহারে থাকেন।হোমিওপাথি চিকিৎসক।নেশা ক্ষেত্রগবেষণা।