কেতুগ্রামের নিরোলে ব্যতিক্রমী কৃষ্ণকালীর রাস উৎসব

Share your experience
  • 1.4K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.4K
    Shares

কৌশিক রায় চৌধুরী: নবদ্বীপ শান্তিপুর দাঁইহাটের রাস মানেই বৈষ্ণব আর শাক্তরাস।কিন্তু কৃষ্ণকালীর রাস দেখেছেন?আর সেই কৃষ্ণকালীকে দেখতে সর্গের দেব-দেবীরা ভীড় জমিয়েছেন। কোথায় জানেন? কাটোয়া মহকুমার কেতুগ্রাম থানার নিরোলগ্রামে।চলুন সেই চমৎকার রাসের পুজোয়।তার আগে রাস সম্পর্কে দুচার কথা জানাই।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “জগৎ  দুঃখের আগারই বটে।” এই জগতের কাম কাঞ্চন থেকে মুক্ত হয়ে সত্যি কারের আনন্দ পেতে গেলে ভগবানের নাম স্মরণ করতে হয়। রাধা সমেত সকল গোপীগণ সেই আনন্দের অমৃত সুধা পান করতে কৃষ্ণাভিলাষী হয়েছিলেন। কৃষ্ণ সৎ আর রাধা চিৎ। দুয়ে মিলে সচ্চিদ্। আর রাসলীলা হল সচ্চিদের বিলাসে উদ্দাম আনন্দধারা। ভাগবতের প্রাচীন টিকাকার বিজয়ধ্বজ রাসের সংজ্ঞা দিয়েছেন:-
নৃত্যাদিষু ভরতরীতিসংজ্ঞেষু ষোহধিরসোল্লাসো,
জায়তে স রসঃ তৎসম্বন্ধী রসো রাসঃ তদুদ্রেকেন ক্রীড়া নৃত্য বিশেষ।অর্থাৎ রাস হচ্ছে সেই ক্রীড়া যা রস পরাকাষ্ঠা প্রাপ্ত এবং যেখানে মাধুর্যের চরম প্রাপ্তি ঘটে।

কার্ত্তিক পূর্ণিমাতে এই রাস ঘটেছিল। গোপীরা কৃষ্ণের সাথে নিষ্কাম প্রেমে মিলিত হয়েছিল।পশ্চিমবঙ্গের রাস উৎসব সাধারণত চৈতন্য প্রভাবিত স্থানগুলিতেই বেশি দেখা যায় যেমন নবদ্বীপ, শান্তিপুর, নিত্যানন্দের শ্রীপাট খড়দহ, কাটোয়ার পাশে দাঁইহাট। সেদিক থেকে কেতুগ্রাম থানার নিরোল গ্রামের রাস একটু ব্যতিক্রমই বটে। নিরোল একটি প্রাচীন জনপদ। কথিত আছে দ্বাদশ শতাব্দীতে সেন বংশের রাজত্বকালে এখানকার রাজা ছিলেন নিদ্রাবল। তাঁর নাম থেকেই নিরোল নামটি এসেছে বলে অনেকে মনে করেন। বেশিরভাগ ব্রাহ্মণের বাস। এছাড়াও কৈবর্ত্য, সদগোপ, তন্তুবায়, স্বর্ণকার, বাগদী ইত্যাদি জাতি রয়েছে। গ্রাম্য দেবতা ঈশানেশ্বর শিবলিঙ্গ। শিবের গাজন ঐতিহ্যবাহী। গ্রামের বৈদ্য বংশে আছে ত্রিবিক্রম বাসুদেব। গুপ্ত বংশে আছে ব্যতিক্রমী দুর্গা কামাখ্যা দশভুজা। কিন্তু এদের সকলকে ছাপিয়ে যায় কার্ত্তিক পূর্ণিমার রাস উৎসব।

আজ থেকে আনুমানিক ২০০ বছর আগে নিরোলের ভূমিপুত্র বনোয়ারিলাল অধিকারী শ্যামসুন্দর ও শ্যামাশ্রী বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন এবং রাস উৎসব শুরু করেন। এখানে নিত্য সেবা হয়। শ্যামসুন্দর কষ্টিপাথরের উচ্চতায় ১৮ ইঞ্চি এবং শ্যামাশ্রী অষ্টধাতুর তৈরী উচ্চতায় ১০ ইঞ্চি মতো হবে। গ্রামের এটাই আদিরাস। মন্দিরটি নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে। রাসের সময় অধিকারীরা শ্যামসুন্দরের পাশাপাশি  রাধা, কৃষ্ণকালী, জটিলা,কুটিলা আর আয়ানের মৃন্ময়ী মূর্তি পুজো করেন।

কৃষ্ণকালীর রাস কী? এর উত্তরে শ্যামসুন্দরের সেবাইত স্বপন অধিকারী জানান যে রাধা যে কৃষ্ণের সাথে প্রেম করতে গেছেন সেটা জটিলা কুটিলা টের পায় এবং হাতে নাতে ধরবে বলে রাধার স্বামী আয়ানকে সঙ্গে করে বৃন্দাবনের মধুবনে নিয়ে যায়। আয়ান ছিল কালী ভক্ত। এদিকে অন্তর্যামী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেটা বুঝতে পেরে রাধার সামনে কালী মূর্তি ধারণ করে। একেই কৃষ্ণকালী বলে। এই মূর্তি দেখতে স্বর্গ থেকে সকল দেবতা নেমে এসেছিল সেদিন। আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই অধিকারীদের রাস উৎসব হয়ে থাকে। নিরোলের রাসের একটি বিশেষত্ব হল যে অধিকারীদের শ্যামসুন্দর আগে রাসের পুজো পায় তারপর গ্রামের অন্যান্য রাসের পুজো হয়। যেদিন পূর্ণিমা লাগে সেদিন সকাল বেলা আতপ চাল ও ফলমূলের পুজো দেওয়া হয়, দুপুরে চিঁড়ের ভোগ (অন্নের ভোগ হয় না), ও সন্ধ্যায় লুচি, মিষ্টি, দুধ, ছানার পায়েস ইত্যাদির শীতলা ভোগ। পরের দিন বাকী রাসগুলির পুজো শুরু হয়।

সার্বজনীন ও বাড়ির পুজো মিলিয়ে তিরিশটারও বেশি রাসের পুজো হয়। ক্লাবগুলির মধ্যে ‘শিব দুর্গা সংঘ’, ‘লক্ষ্মী নারায়ণ সংঘ’, ‘শ্রী দুর্গা বান্ধব সমিতি’ উল্লেখযোগ্য। এখানকার রাসের আর এক বিশেষত্ব হল রাসের দিন শুধু রাধা কৃষ্ণ নয় সমস্ত রকমের দেবতার পুজো হয়। যেমন, ঈশানেশ্বর তলায় কালী, যোগমায়া, মিঠু বলের বাড়িতে জগদ্ধাত্রী, নিরোলের দাস পাড়ায় ও গুঁইয়ে পাড়ায় শিব-দুর্গা, দক্ষিণ পাড়ায় কমল কামিনী মায়ের পুজো, দুই দিকে দুটো হাতি আর মাঝে পদ্মফুলের উপর কমলকামিনী। এছাড়া গৌর নিতাই, রাধা কৃষ্ণের মূর্তি তো হয়ই। এর কারণ হল যেহেতু নিরোলের আদি রাস বা অধিকারীদের শ্যামসুন্দরকে কৃষ্ণকালী রূপে পুজো করা হয়, আর যেহেতু কৃষ্ণের এই কালীরূপ দেখার জন্য স্বর্গের সমস্ত দেব দেবীরা ভীড় জমিয়েছিল, তাই সেই দিকটা মাথায় রেখেই নিরোলে রাসের দিন বিভিন্ন দেব দেবীর পুজো আনা হয়। আশেপাশের গ্রামগুলি থেকে প্রচুর লোকের সমাগম ঘটে। রাস্তার ধারে ধারে বসে মেলা। পাড়ায় পাড়ায় অর্কেস্ট্রা, কবিগান, বাউল, যাত্রা, পঞ্চরস বা আলকাপ ইত্যাদি তো আছেই।  সব মিলিয়ে নিরোলের রাস কেতুগ্রাম থানার এক নজরকাড়া রাসে পরিণত হয়।

তথ্যসূত্র:– স্বপন অধিকারী, সন্ন্যাসী মন্ডল, সঞ্জিত ভান্ডারি – নিরোল।

 

 


Share your experience
  • 1.4K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.4K
    Shares

Facebook Comments

Post Author: koushik roychoudhury

koushik roychoudhury
কৌশিক রায় চৌধুরী পেশায় শিক্ষক,নেশায় ক্ষেত্রগবেষণা।