নিরোলের ব্যতিক্রমী গুপ্তবাড়ির দুর্গাপুজো

Share your experience
  • 36
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    36
    Shares

কৌশিক রায় চৌধুরী

নিরোল পূর্ব বর্দ্ধমান জেলার কেতুগ্রাম থানার অন্তর্গত একটি সুপ্রাচীন গ্রাম। লোকশ্রুতি আছে যে দ্বাদশ শতাব্দীর বল্লাল সেনের আমলে নিরোল এলাকার রাজা ছিলেন নিদ্রাবল। তাঁর নাম অনুসারেই গ্রামের নাম নিরোল। এখানে বেশ কয়েকটি শতাব্দী প্রাচীন বনেদি বাড়ির দুর্গা পুজোর দেখা মিলবে। যার মধ্যে অন্যতম হল গুপ্ত বাড়ির কামাখ্যা দশভুজা।
এই বংশের দুর্গার মূর্তিখানি বেশ কিছুটা অন্যরকম। প্রথমত, গনেশ, কার্ত্তিক অনুপস্থিত। তাঁদের স্থলে দুই মুনি। একটি সাদা একটি কালো। মায়ের দুইপাশে লক্ষ্মী ও সরস্বতী। এই চারজন মাটির তৈরী অর্থাৎ মৃন্ময়ী। কিন্তু স্বয়ং মা দুর্গা আর তাঁর বাহন সিংহ মশাই সমেত মহিষাসুর অষ্টধাতুতে উপস্থিত হন। এই দশভুজা মাকেই তো আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর আগে অসমের কামরূপ কামাখ্যা থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল।
প্রায় আড়াইশো বছরেরও আগে এক নিষ্ঠাবান শাক্ত সাধক নবদ্বীপ থেকে কোন এক অজানা কারণে নিরোল গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন। পেশায় ছিলেন কবিরাজ। নাম রামতারণ গুপ্ত। সেবার অম্বুবাচি উপলক্ষ্যে তিনি কামরূপে কামাখ্যা মা দর্শন করতে গেছিলেন। ওখানে গিয়ে শুনতে পেলেন স্থানীয় এক ধনী ব্যক্তির ছেলের ভীষণ শরীর খারাপ। ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। শোনা যায় তিনি তাঁর কবিরাজি বলে সেই ছেলেটিকে সুস্থ করে তোলেন। অত্যন্ত খুশি হয়ে ও কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ধনী ব্যক্তিটি অনেক কিছু দিতে চাইলেন রামতারণ বাবুকে। তিনি কিছুই নিলেন না। সংসারী হলেও তিনি শাক্ত সাধক। পার্থিব জিনিসে তাঁর কোন লোভ নাই। কিন্তু অনেক কাকুতিমিনতির পর একটি সাংঘাতিক জিনিস চেয়ে বসলেন। ওঁদের বাড়িতে যে অষ্টধাতুর দশভুজা দুর্গা মূর্তিটি ছিল সেটাই। বেশ মুশকিলে পড়লেন ভদ্রলোক। তাঁদের ঘরের ঠাকুর দেন কেমন করে? “এটা তো দিতে পারব না কবিরাজ মশাই। তবে এরকমই যদি একটা বানিয়ে দিই?” তাতেই রাজি হলেন। কারণ ঐরকম সুন্দর ছোট্ট কামাখ্যা মায়ের মূর্তি বাড়ি নিয়ে গিয়ে পুজো করার বাসনা তখন রাম বাবুর মনে প্রবল। একই রকম একটা বানানো হল। মা কামাখ্যা রাত্রে ধনী ব্যক্তিটিকে স্বপ্নে আদেশ দিলেন- যে আমাকে চাইছে সে একজন বড় শাক্ত সাধক ও মাতৃভক্ত। আমি ওর কাছেই পূজিত হতে চাই। আমাকে রাখিস না। দিয়ে দে। স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পরেই তিনি দুটো মূর্তিই রামতারনবাবুকে দিয়ে দেন। উনি মূর্তি দুটোকে নিজ বাড়িতে নিয়ে এসে আসলটিকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন এবং নকলটিকে বাড়িতেই রেখে দেন। পরবর্তী কালে নকল বা রেপ্লিকা দশভূজাটি মন্দিরের পুরোহিতকে দান করে দিয়েছিলেন। (এটির নাম নেপালেশ্বরী। এখনও এটি বর্তমান কুলপুরোহিত তথা নিরোলের দেবব্রত ভট্টাচার্যের বাড়িতে রাখা আছে)। আসল মূর্তিটির নাম দেন কামাখ্যা দশভুজা। এইভাবে পুজো চালু হল গুপ্ত বাড়িতে। তবে গনেশ কার্ত্তিক কেন বাদ গেল আর তার পরিবর্তে দুইজন মুনিঋষি কোত্থেকে এলেন এ ব্যাপারেটা ক্ষেত্র সমীক্ষা থেকে উঠে আসে নি।
নিরোলে গুপ্ত বাড়িতে কামাখ্যা দশভুজার আগে পিছে দুটো মন্দির আছে। একটিতে মা সারা বছর থাকেন। প্রত্যহ দুবার করে পুজো দিতে হয়। বেলা এগারোটা নাগাদ মাকে স্নান করিয়ে অন্নভোগ দিয়ে যান পুরোহিত দেবব্রত ভট্টাচার্য। এনারাই বংশপরম্পরায় পুজো করে আসছেন আজ ২৫০ বছর। এই যজমানী প্রথা এই পুজোর এক বৈশিষ্ট্য। যিনি ঢাক বাজান বা যিনি ঠাকুর গড়েন এঁদের পূর্বপুরুষেরাই বছরের পর বছর এই কাজ করে আসছেন। সন্ধ্যায় সন্ধ্যারতির সময় মন্ডা, বাতাসা, ফল ইত্যাদি সহযোগে শেতলা দেওয়া হয়। ঢাক বাজিয়ে আরতি করা হয়। বারো মাস মা এখানে থাকেন ও নিত্যসেবা পেয়ে থাকেন। শুধু আশ্বিন মাসে পুজোর চারদিন মাকে নিয়ে আসা হয় পাশের দুর্গা মন্দিরে। স্থানীয়রা মজা করে বলে থাকেন একটা মায়ের শ্বশুরবাড়ি যেটাতে মা বারো মাস থাকেন। আর পাশের দুর্গা মন্দিরটা হল বাপের বাড়ি।
মহাসপ্তমীর সক্কাল বেলা দশভূজাকে শ্বশুরবাড়ির মন্দির থেকে বাপের বাড়ির মন্দিরে এনে রূপোর পদ্মফুলের মধ্যে রাখা হয়। একই কাঠামোর মধ্যে দুই পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী ও দুই মুনি ঋষি। মধ্যে খানে উচ্চতায় পৌনে এক ফুট মতো অষ্টধাতুর তিন পুতুলের ছোট্ট মূর্তিটি তখন এক অনন্য শোভায় বিরাজ করে।
পুজো পদ্ধতিতে আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয় না। সপ্তমীর সকালে গ্রামের ঠাকুর পুকুর থেকে ঘট ভ’রে আনা হয় ও নবপত্রিকা সাজানো হয়। মহাষ্টমীর সন্ধিক্ষণে আগে পাঁঠা বলি হতো।বছর কয়েক হল বন্ধ হয়ে গেছে। গুপ্ত বংশের একাংশ ধর্মের নামে পশুবলি মেনে নেয় নি। তাই পাঁঠার পরিবর্তে চালকুমড়ো বলি দেওয়া শুরু হয়। নবমীতে কুমারী পুজো, হোম যজ্ঞ ইত্যাদি সংঘটিত হয়। দশমীর রাতে গ্রাম ঘুরিয়ে ধাতুর মূর্তিটি বাদে বাকী মৃন্ময়ী মূর্তি সমেত কাঠামোটি ঐ ঠাকুর পুকুরের জলেই বিসর্জন দেওয়া হয়। আর অষ্টধাতুর দশভুজা মাকে আবার তাঁর শ্বশুরবাড়ির মন্দিরে এনে অধিষ্ঠিত করা হয়।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বছর পাঁচ ছয় আগে অষ্টধাতুর আসল মূর্তিটি গয়নাগাটি সমেত চুরি হয়ে যায়। মূর্তিটি ফিরে পেতে গুপ্ত বংশধররা অনেক খড় কুটো পোড়ান। গুপ্ত বংশের লোকেরা বেশির ভাগই কোলকাতায় থাকেন। কলকাতা সি আই ডি দপ্তর ভবানী ভবন পর্যন্ত ছুটেছিলেন। কোন লাভ হয় নাই। গুপ্ত বংশের সেবাইত ড. সলিল গুপ্তের মতে, “মূর্তিটির face value বেশি হবে না। কারণ ওটা সোনার তৈরী নয়। কিন্তু এর antique value অত্যন্ত উচ্চমানের। তাই মনে করা হচ্ছে কোন আন্তর্জাতিক দস্যুর দল এর পিছনে যুক্ত আছে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে এর antique value কয়েক লক্ষ টাকা।” আবার লক্ষ্য করার বিষয় যে মূর্তিটি অম্বুবাচির তিথির মধ্যেই চুরি যায়। ঐদিন গুলিতে মা কামাখ্যা রজঃস্বলা হন। অসমের কামাখ্যা মন্দিরে বিরাট ধুমধাম শুরু হয়ে যায়। গোটা দেশের অনেক সাধু সন্তের ভীড় জমে। মা অম্বুবাচিতেই এসেছিল আর অম্বুবাচিতেই চলে গেল। তাই গ্রামের কেউ কেউ আশঙ্কা করেন যে চুরির পিছনে কোন সাধুর হাত নাই তো?
চুরি হওয়ার পর সেই বছরে মায়ের বাঁধান ছবিকে দুর্গা রূপে পুজো করা হয়েছিল। আর ছবিটাতেই নিত্যপূজা করা হতো। বছর ঘুরতেই পুরোনো মূর্তির আদলে একইরকম একটা দশভূজা মায়ের মূর্তি বানানো হয়। বেনারস থেকে তিনজন পুরোহিত ও তাঁদের দলবল এসে বিরাট যজ্ঞানুষ্ঠানের মাধ্যমে (প্রায় ছ’ঘন্টা ধরে পুজো করে) নতুন দশভুজাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই নতুন মূর্তিটিই বর্তমানে কামাখ্যা দশভুজা রূপে পূজিত হয়ে আসছে।
 
ঋণস্বীকারঃ– ড. সলিল গুপ্ত।
 
 


Share your experience
  • 36
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    36
    Shares

Facebook Comments

Post Author: koushik roychoudhury

koushik roychoudhury
কৌশিক রায় চৌধুরী পেশায় শিক্ষক,নেশায় ক্ষেত্রগবেষণা।