পবনপুত্র হনুমান – রামায়ণে ও পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে

Share your experience
  • 419
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    419
    Shares

 

পবনপুত্র হনুমান-রামায়ণের অসংখ্য চরিত্রমালার মধ্যে এক বর্ণময় চরিত্র এই হনুমান।পশ্চিমবাংলার টেরাকোটা মন্দির অলঙ্করণে কীভাবে চরিত্রটি রূপায়িত হয়েছে তা নানা তথ্য ও ক্ষেত্রসমীক্ষার নিরিখে মূল্যবান আকর রচনাটি লিখেছেনআশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়।

পবনপুত্র হনুমান -রামলক্ষণের সঙ্গে রত্নেশ্বর ভট্টবাটী
পবনপুত্র হনুমান -রামলক্ষণের সঙ্গে রত্নেশ্বর ভট্টবাটী

রামায়ণে অসংখ্য চরিত্রের ভিড়। এর মধ্যে দু’টি কেন্দ্রীয় চরিত্র হল রাম আর রাবণ। এছাড়া এই দু’জনকে ঘিরে নানা গুরুত্ব এবং নানা রকম বৈচিত্রের অসংখ্য চরিত্র। এর মধ্যে শ্রীরাম শুধুমাত্র রামায়ণের নায়কই নন, তিনি বিষ্ণুর সপ্তম অবতার, তাঁকে বলা হয়েছে বিষ্ণুর অর্ধাংশ। এছাড়া লক্ষ্মণকে বিষ্ণুর এক-চতুর্থাংশ এবং অনেক জায়গায় আদিনাগ বা শেষনাগের অবতার এবং সীতাকে লক্ষ্মীর অবতার বলা হয়েছে। অন্যদিকে রাবণ হলেন রামায়ণের সর্বপ্রধান খলনায়ক। তিনিও কিন্তু সাধারণ চরিত্র নন, বিষ্ণুলোকের দ্বারী এবং বিষ্ণুর বিরোধিতা করেছেন তিনজন্মে বিষ্ণুর হাতে নিহত হয়ে মুক্তিলাভ করার জন্যই।

রাবণের চারপাশে যে সব চরিত্রের ভিড়, তাদের মধ্যে বিভীষণ একটি বিশিষ্ট ভূমিকা নিয়ে আছেন। তাঁর স্বজাতি পরিত্যাগ করে শ্রীরামের দলে যোগদান করা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই, অবশ্য তা আমাদের বর্তমান আলোচনার অংশ নয়।এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, তা হল রামায়ণের অজস্র বর্ণময় চরিত্রগুলির মধ্যে কাকে অমর বলা হয়েছে? উত্তর হল মাত্র তিনজন – পরশুরাম (যিনি বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার), বিভীষণ এবং হনুমান।

বর্তমান নিবন্ধে আমাদের আলোচ্য বিষয় হলেন পবনপুত্র হনুমান – রামায়ণে এবং পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে। এ বিষয়ে রেফারেন্স টেক্সট হিসেবে আমরা বাল্মীকীয় রামায়ণকে ব্যবহার করলেও কৃত্তিবাসী রামায়ণের সাহায্যও নেব, কেননা পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে রামায়ণের ঘটনাবলী রূপায়ণে পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণ শিল্পীরা প্রায় সর্বত্রই কৃত্তিবাসী রামায়ণকেই অনুসরণ করেছেন, বাল্মীকিকে নয়।

হনুমান-রাবণের-রথ-আটকাচ্ছেন।-ইটণ্ডা-জোড়বাংলা.
হনুমান-রাবণের-রথ-আটকাচ্ছেন।-ইটণ্ডা-জোড়বাংলা.

পবনপুত্র হনুমান : পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে – উৎস

যে কোনও তথ্যভিত্তিক নিবন্ধে একটি জিনিষ প্রথমেই বলা প্রয়োজন, তা হল তথ্যের উৎস কী তা জানানো। এই লেখাটির তথ্যের উৎস হল লেখকের দেখা ও ফটোগ্রাফি করা পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৮০টি মন্দির। এই মন্দিরগুলির মধ্যে কিছু মন্দির আসলে মন্দিরগুচ্ছ (উদাহরণ স্বরূপ শ্রীবাটি ৩টি মন্দিরের গুচ্ছ; উচকরণ ৪টি মন্দিরের গুচ্ছ; দুবরাজপুর, নানুর, বনকাটি-অযোধ্যা ও গণপুর ১২-১৪টি করে মন্দিরের গুচ্ছ এবং মল্লেশ্বর ২৫টি মন্দিরের গুচ্ছ), কিন্তু এখানে সেই মন্দিরগুচ্ছগুলিকে একটি মন্দির হিসেবেই গণ্য করা হয়েছে।

এই মন্দিরগুলির সিলেকশন ক্রাইটেরিয়া হল এগুলিতে অলঙ্করণ আছে। এই ৮০টি মন্দিরের মধ্যে ২১টিতে (এদের মধ্যে বালি-দেওয়ানগঞ্জের দুর্গামন্দির, দ্বারহাট্টার রাজরাজেশ্বর মন্দির, কালনার কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির, বিষ্ণুপুরের লালজী মন্দির, হেতমপুরের চন্দ্রনাথ মন্দির, বড়নগরের ভবানীশ্বর মন্দির, পাঁচথুপির নবরত্ন মন্দির ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য) রামায়ণের চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাকি মন্দিরগুলিতে রামায়ণের বিভিন্ন দৃশ্য চিত্রায়িত হয়েছে, যা থেকে পবনপুত্র হনুমান আছেন এমন ছবিগুলি নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

হনুমান-এবং-নাগমাতা-সুরসা-ও-সিংহিকা-রাক্ষসী।-গঙ্গেশ্বর.j
হনুমান-এবং-নাগমাতা-সুরসা-ও-সিংহিকা-রাক্ষসী।-গঙ্গেশ্বর

হনুমান : পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে

প্রথমেই দেখা যাক পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে হনুমানকে আমরা কী পরিস্থিতিতে বা কী রূপে দেখতে পাই। এগুলি হল :-
১) শ্রীরাম-লক্ষ্মণের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎকার। ২) সীতার খোঁজে সমুদ্রলঙ্ঘন। ৩) অশোকবনে সীতার সঙ্গে সাক্ষাৎ। ৪) শ্রীরামের অকালবোধনের সময় নীলপদ্ম আনা। ৫) বিভিন্ন যুদ্ধ দৃশ্যে। ৬) রামকে কাঁধে নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে গমন। ৭) গন্ধমাদন পর্বতে যাওয়ার পথে সূর্যদেব যাতে সময়ের আগে উদীত না হন সেজন্য সূর্যদেবের রথ আটকানো। ৮) গন্ধমাদন পর্বত বহন। ৯) পাতাল থেকে রাম-লক্ষ্মণ এবং যোগদ্যা উমাকে উদ্ধার। ১০) রামরাজা প্যানেলে। ১১) মিসেলানিয়াস বা বিভিন্ন – এর মধ্যে সিংহভাগই হচ্ছে শ্রীরামের সঙ্গে হনুমান।

এছাড়া একা হনুমান কয়েকটি মন্দিরে আছেন। আর একটি ইন্টারেস্টিং ছবি হল হনুমানের শিবপূজা। এগুলি নিয়ে যথাস্থানে আলোচনা করা হবে।

প্রসঙ্গতঃ, সংখ্যার দিক থেকে এর মধ্যে সিংহভাগই দখল করে রেখেছে রামরাজা প্যানেলের দৃশ্যগুলি। আর একটি কথা, পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে রামায়ণের যুদ্ধদৃশ্য অসংখ্য থাকলেও অল্প কিছু দৃশ্য ছাড়া সেগুলিতে হনুমানকে আলাদা করে বোঝা মুশকিল।

অশোকবনে-হনুমান-দশঘরা-গোপীনাথ
অশোকবনে-হনুমান-দশঘরা-গোপীনাথ

পবনপুত্র হনুমান : পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে ছবির মিডিয়াম

একথা সর্বজনবিদিত যে পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণের মিডিয়াম টেরাকোটা ফলক, স্টাকো, পাথর এবং ম্যুরাল হলেও টেরাকোটাই প্রধান। ফলে, পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণ বলতে প্রধানতঃ টেরাকোটা ফলকের কাজই বোঝায়। পবনপুত্র হনুমানের ক্ষেত্রেও এর অন্যথা ঘটে নি। অর্থাৎ বর্তমান আলোচনায় আমরা হনুমানের যে সব ছবি নিয়ে আলোচনা করব, তার দু’য়েকটি ব্যতিক্রম (যেমন গণপুর ও মল্লেশ্বরে ফুলপাথরের কাজ, নানুরে স্টাকোর কাজ ইত্যাদি) ছাড়া বাকি সবই টেরাকোটা ফলকের কাজ।

পবনপুত্র হনুমান – শ্রীরাম-লক্ষ্মণের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ

পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে হনুমানের এন্ট্রি বা প্রথম উপস্থিতি হল শ্রীরাম-লক্ষ্মণের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ দৃশ্যে, যদিও এই দৃশ্যটির উপস্থিতি খুবই কম এবং আমাদের আলোচ্য সিরিজে একটি মাত্র মন্দিরের অলঙ্করণে এই সাক্ষাৎকার দৃশ্যের একটি টেরাকোটা প্যানেল আছে, সেটি হল মুর্শিদাবাদ জেলার ভট্টবাটির রত্নেশ্বর শিব মন্দির। এই টেরাকোটা প্যানেলটিতে দেখা যাচ্ছে ধনুর্ধারী দুই ভাই শ্রীরাম ও লক্ষ্মণকে হনুমান প্রণাম করছেন। তবে এই প্যানেলের ছবিটি যে সত্যিই হনুমানের সঙ্গে শ্রীরাম-লক্ষ্মণের প্রথম সাক্ষাৎকারের দৃশ্য, তার জোরালো প্রমাণ নেই।

তবে বাল্মীকীয় রামায়ণের কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ডের তৃতীয় সর্গে হনুমানের সঙ্গে শ্রীরাম-লক্ষ্মণের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎের যে বর্ণনা আছে, তাতে হনুমান সাধারণ তপস্বীর রূপে এসে (কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ড ৩ : ২) মহাশক্তিমান, পরাক্রমশালী ধনুর্ধর রাম-লক্ষ্মণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন (কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ড ৩ : ৯)। এই বর্ণনার সঙ্গে উপরোক্ত প্যানেলের ছবিটি মিলে যাচ্ছে, যদিও ছবিটিতে হনুমানকে বানর হিসেবেই দেখানো হয়েছে।

হনুমান-ও-রাক্ষসযোদ্ধা-পাথরের-কাজ-গণপুর.
হনুমান-ও-রাক্ষসযোদ্ধা-পাথরের-কাজ-গণপুর.

সমুদ্রলঙ্ঘন  পবনপুত্র হনুমান

পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে হনুমানের সমুদ্রলঙ্ঘনের মত নাটকীয় ঘটনার খুব বেশি ছবি পাওয়া যায় না। আলোচ্য সিরিজের মন্দিরগুলির মধ্যে মুর্শিদাবাদ জেলার বড়নগরের গঙ্গেশ্বর মন্দিরের একটি টেরাকোটা প্যানেলে পাশাপাশি দু’টি ছবি আছে। বাঁদিকের ছবিটিতে নাগমাতা সুরসা এবং ডানদিকের ছবিটিতে সিংহিকা রাক্ষসীর সঙ্গে হনুমানের এনকাউন্টারকে চিত্রায়িত করা হয়েছে।

কৃত্তিবাসী রামায়ণের সুন্দরকাণ্ডের ২০১ – ২৪০ নম্বর শ্লোকে নাগমাতা সুরসা কর্তৃক সমুদ্র লঙ্ঘনকারী হনুমানের পথ অবরোধ এবং হনুমানের বল-বুদ্ধি পরীক্ষান্তে সুরসার হনুমানকে আশীর্বাদ করে পথ ছেড়ে দেওয়ার বিবরণ আছে। আবার সুন্দরকাণ্ডের ২৯৫ – ৩১৫ নম্বর শ্লোকে সিংহিকা রাক্ষসীর হনুমানকে আক্রমণ এবং হনুমান কর্তৃক সিংহিকা বধের বর্ণনা আছে।

পবনপুত্র হনুমান – অশোকবনে, রামায়ণের বর্ণনা

পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে সমুদ্রলঙ্ঘনের পরে হনুমানকে আমরা দেখি লঙ্কাপুরীর অশোকবনে। রাবণ সীতাকে অশোকবনেই বন্দিনী করে রেখেছিলেন।

কৃত্তিবাসী রামায়ণের সুন্দরকাণ্ডে হনুমানের সঙ্গে সীতার সাক্ষাৎকারের বর্ণনা আছে। সুন্দরকাণ্ডের ৪২৬ নম্বর শ্লোকে কৃত্তিবাস বলছেন : “শ্রীরাম বলিয়া সীতা করেন ক্রন্দন। সীতাদেবী চিনিলেন পবননন্দন।।” আবার ৪৪৫ নম্বর শ্লোকে বলছেন – “গাছের আড়ালে গেল পাতাতে প্রচুর। আপনি লুকায়ে দেখে বানর চতুর।।” আবার ৫৪৬ নম্বর শ্লোকে – “সাত পাঁচ হনুমান ভাবেন আপনি। আপনা আপনি কহে শ্রীরামকাহিনী।” এই রামকাহিনী শুনিয়ে এবং শ্রীরামের দেওয়া আংটি দেখিয়ে হনুমান সীতার কাছে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রমাণ দিলেন (সুন্দরকাণ্ড শ্লোক সংখ্যা ৫৮৪-৫৮৫)।

গন্ধমাদন-বহন-উচকরণ
গন্ধমাদন-বহন-উচকরণ

এরপর সুন্দরকাণ্ডে হনুমানের রাক্ষসদের সাথে যুদ্ধ, ইন্দ্রজিতের কাছে বন্দী হওয়া, রাবণের আদেশে হনুমানের লেজে আগুন দেওয়া এবং লঙ্কাদহনের পর অশোকবনে দ্বিতীয়বার সীতার কাছে ফিরে সীতার আশীর্বাদ ও অভিজ্ঞান নিয়ে শ্রীরামের কাছে ফেরার কাহিনী আছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। শ্লোকসংখ্যা ৮৮৭ – ৮৯৬-য়ে লেজের আগুন নেভাবার জন্য জ্বলন্ত লেজ হনুমানের মুখে ঢোকানো এবং তারজন্য হনুমানের মুখ পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া আর তারপর হনুমানের মনের দুঃখ ঘোচাতে সীতা কর্তৃক হনুমানের জ্ঞাতিগুষ্ঠি সবারই মুখ কালো হয়ে যাওয়ার কথা আছে।

প্রসঙ্গতঃ, কৃত্তিবাসীয় রামায়ণ অনুসারে হনুমান আর একবার অশোকবনে সীতাকে দেখতে গিয়েছিলেন ইন্দ্রজিৎ কর্তৃক মায়াসীতা হত্যার পর সীতার অবস্থা সরেজমিনে তদন্ত করতে (লঙ্কাকাণ্ড ৩৩৮৩-৩৩৮৪)।

পবনপুত্র হনুমান – অশোকবনে, পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে

এবার দেখা যাক অশোকবনে হনুমানের কী ছবি আমরা পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে পাই।

প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে পশ্চিমবঙ্গের খুব বেশি মন্দিরের অলঙ্করণে কিন্তু অশোকবনের ব্যাপারটি চিত্রায়িত হয়নি। আলোচ্য সিরিজে চারটি মন্দিরে (হুগলি জেলার দশঘরার গোপীচাঁদ মন্দির ও বাঁশবেড়িয়ার অনন্ত বাসুদেব মন্দির, বীরভূমের উচকরণের শিবমন্দির এবং মুর্শিদাবাদ জেলার গঙ্গেশ্বর মন্দির) অশোকবনের চিত্র আছে (সবকটিই টেরাকোটা ফলকের কাজ)। এর মধ্যে গোপীনাথ মন্দিরে দেখা যাচ্ছে হনুমান অমৃতফলের গাছের উপরে, নীচে রাক্ষস প্রহরীরা। আর উচকরণের শিবমন্দিরের ছবিটিতে দেখানো হয়েছে সীতা হনুমানকে আশীর্বাদ করছেন।

হনুমানের-কাঁধে-রাম-এবং-রাবণের-প্রার্থনা।-চারবাংলা.
হনুমানের-কাঁধে-রাম-এবং-রাবণের-প্রার্থনা।-চারবাংলা.

পবনপুত্র হনুমান – যুদ্ধে — রামায়ণে

রামায়ণের মূল কাহিনীই হল রাম-রাবণের যুদ্ধ। সপ্তকাণ্ড রামায়ণের লঙ্কাকাণ্ডে এই যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ আছে। তবে আমরা তাতে ঢুকছি না। এখানে আমরা শুধু যেখানে হনুমান ইনভলভড, সেই ঘটনাগুলি (এবং পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে সেই যুদ্ধের চিত্রায়ণ) নিয়ে আলোচনা করব, এবং আমরা এখানে কৃত্তিবাসকেই অনুসরণ করব।
প্রথমে রামায়ণ।

কৃত্তিবাসীয় রামায়ণ অনুসারে হনুমান গুরুত্বপূর্ণ যে যুদ্ধগুলিতে নিজে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তা হল :-

১) রাবণের প্রথম দিনের যুদ্ধ (রাবণ মোট চারবার স্বয়ং যুদ্ধ করেছিলেন) (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ১১৮৫ -১২০২)।

২) কুম্ভকর্ণের সঙ্গে যুদ্ধ (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ১৫৫৩ -১৫৫৮)। ৩) ত্রিশিরার সঙ্গে যুদ্ধ (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ১৭৯৬ -৯৭)।

৪) ইন্দ্রজিতের সঙ্গে লঙ্কার পশ্চিমদ্বারে যুদ্ধ, যা ইন্দ্রজিতের দ্বিতীয় যুদ্ধ (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ২১২০ -২১২৬)। এই যুদ্ধে ইন্দ্রজিৎ মেঘের আড়াল থেকে যুদ্ধ করে রাম-লক্ষ্মণ হনুমান সহ সমগ্র বানরবাহিনীকে পরাজিত করে মৃতপ্রায় অবস্থায় ফেলে যান, শুধুমাত্র ব্রহ্মার বরে অমর বলে হনুমান ও বিভীষণ বেঁচে যান (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ২১৫৩ -৫৪)। তখন জাম্ববানের পরামর্শে হনুমান হিমালয়ের মেরু পর্বত থেকে চারটি ঔষধী গাছ (বিশল্যকরণী, মৃতসঞ্জীবনী, অস্থিসঞ্চারিণী এবং সুবর্ণকরণী) নিয়ে এসে রাম-লক্ষ্মণ সহ সবাইকে বাঁচিয়ে তোলেন (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ২১৮৮ – ২২৫০)। মনে রাখতে হবে এটা কিন্তু বিখ্যাত গন্ধমাদন পর্বত নিয়ে আসার ঘটনা নয়।

৫) এরপর রামের আদেশে হনুমান আর একবার লঙ্কাদহন করলেন, তবে এবার একা নয়, সদলবলে (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ২২৯৪ – ২৩১২)।

৬) হনুমান ও নিকুম্ভের (কুম্ভকর্ণের পুত্র) যুদ্ধ (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ২৪৭২ – ২৪৯২)। এই যুদ্ধে প্রথমে নিকুম্ভের প্রচণ্ড মুষ্টাঘাতে হনুমান অচৈতন্য হয়ে পড়েন (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ২৪৮০) এবং নিকুম্ভ হনুমানকে বন্দী করে রাবণের রাজসভায় নিয়ে যান। সেখানে সবাই হনুমানকে উপহাস করেন (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ২৪৮১ – ৮৫)। কিন্তু হনুমান নিকুম্ভের মুণ্ডটি ছিঁড়ে রামের শিবিরে ফিরে আসেন (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ২৪৮৬ – ২৪৯২)।

৭) রাবণপুত্র মকরাক্ষ চালাকি করে বৃষবাহন গোচর্মমণ্ডিত রথে চড়ে সামনে একপাল গরু নিয়ে যুদ্ধ করতে আসে (রাম-লক্ষ্মণ গরুর উপর অস্ত্রপ্রয়োগ করবেন না)। হনুমান এখানে মকরাক্ষর সঙ্গে যুদ্ধ করেন এবং রামের হাতে মকরাক্ষর মৃত্যু হয় (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ২৫১৪ – ২৫৮৪)।

৮) বিভীষণপুত্র তরণীসেনের সঙ্গে হনুমানের যুদ্ধ হয় এবং হনুমান পরাজিত হন (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ২৬৮১ – ২৬৮৬)। এরপর শ্রীরাম তরণীসেনকে বধ করেন। প্রসঙ্গতঃ, তরণীসেন বধের কাহিনী বাল্মীকীয় রামায়ণে নেই।

৯) রাবণপুত্র বীরবাহুর সঙ্গে হনুমানের যুদ্ধ হয় এবং হনুমান পরাজিত হন (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ২৯৮৯ – ২৯৯৬)। এরপর শ্রীরাম বীরবাহুকে বধ করেন (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ৩২০৭ – ৩২০৮)।

১০) ইন্দ্রজিৎ তৃতীয়বার যুদ্ধে এসে মায়াসীতাকে রাম-লক্ষ্মণের সামনে হত্যা করলে হনুবার অশোকবনে গিয়ে আসল সীতাকে জীবিত দেখে এসে সবাইকে আশ্বস্ত করেন (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ৩৩৮৩ – ৮৪)।

১১) ইন্দ্রজিৎ যখন নিকুম্ভিলা যজ্ঞ করছিলেন, তখন হনুমান, লক্ষ্মণ ও বিভীষণ সেখানে যান। সেখানে হনুমান যজ্ঞকুণ্ডে প্রস্রাব করে যজ্ঞপণ্ড করেন (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ৩৪৩৫)। তখন ইন্দ্রজিতের সঙ্গে হনুমানের প্রচণ্ড যুদ্ধ হয় (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ৩৪৯৫ – ৩৫০৫)। হনুমান, লক্ষ্মণ ও বিভীষণ মিলিতভাবে ইন্দ্রজিতের সাথে যুদ্ধ করেন এবং লক্ষ্মণের হাতে ইন্দ্রজিতের মৃত্যু হয় (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ৩৫২৯)।

১২) ইন্দ্রজিতের মৃত্যুতে ক্রুদ্ধ রাবণ যুদ্ধ করতে এসে লক্ষ্মণকে ময়দানব-নির্মিত শক্তিশেলের আঘাতে মৃত্যমুখে ফেলে দিলে সুষেণের পরামর্শে হনুমান গন্ধমাদন পর্বতে বিশল্যকরণী আনতে যান এবং পথে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে (কালনেমি বধ, কুম্ভীরিণী বধ করে গন্ধকালীর মুক্তিদান, গন্ধর্বরাজ হাহা ও হুহুকে পরাস্ত করা, সূর্য যাতে রাবণের ভয়ে আগে না উদিত হন সেজন্য সূর্যের রথ আটকানো ও সূর্যকে বগলে চেপে ধরা) গন্ধমাদন পর্বতে পৌঁছে বিশল্যকরণী চিনতে না পেরে গোটা পাহাড়টাকেই মাথায় করে নিয়ে আসেন (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ৩৭৬২ – ৩৯৭৮)।

ফেরার পথে নন্দীগ্রামের উপর দিয়ে আসার সময় ভরতের বাঁটুলের (গুলতি) আঘাতে আহত হয়ে হনুমান মাটিতে পড়ে যান (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ৪০১০)। পরে হনুমানের পরিচয় পেয়ে ভরত গন্ধমাদন পর্বত সহ হনুমানকে নিজের তিরের উপর বসিয়ে সেই তির ছুঁড়ে গন্ধমাদন পর্বত সহ হনুমানকে আকাশমার্গে লঙ্কায় পাঠিয়ে দিলেন (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ৪০৫৯)। প্রসঙ্গতঃ, হনুমানের সঙ্গে ভরতের নন্দীগ্রামে দেখা হওয়ার কাহিনী বাল্মীকীয় রামায়ণে নেই।বিশল্যকরণীতে লক্ষ্মণ সুস্থ হওয়ার পর হনুমান আবার গন্ধমাদন পর্বতকে স্বস্থানে রেখে এলেন (লঙ্কাকাণ্ড শ্লোক ৪১১৫)।

রাম-লক্ষ্মণ-ও-যোগদ্যা-উমা-সহ-হনুমান।-হদল-নারায়ণপুর-ছোট-তরফ.
রাম-লক্ষ্মণ-ও-যোগদ্যা-উমা-সহ-হনুমান।-হদল-নারায়ণপুর-ছোট-তরফ.

১৩) মহীরাবণ-অহীরাবণ বধ : রাবণপুত্র মহীরাবণ ছিলেন পাতালের রাজা এবং যোগাদ্যা উমার একনিষ্ঠ ভক্ত। রাবণের আহ্বানে মহীরাবন নিজের মায়াবলে হনুমানের ছদ্মবেশে শ্রীরাম-লক্ষ্মণকে অপহরণ করে পাতালে নিয়ে যান এবং উমার কাছে দু’জনকে বলি দেওয়া মনস্থ করেন। হনুমান পাতালে গিয়ে মহীরাবণ এবং তাঁর সদ্যোজাত পুত্র অহীরাবণকে হত্যা করে রাম-লক্ষ্মণ সহ যোগদ্যা উমাকে পাতাল থেকে মর্তে নিয়ে আসেন (লঙ্কাকাণ্ড ৪১৬৯ – ৪৫৪৭)। প্রসঙ্গতঃ, মহীরাবণ-অহীরাবণ বধের কাহিনী বাল্মীকীয় রামায়ণে নেই।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, বর্ধমান জেলার ক্ষীরগ্রামের যোগদ্যা উমার মন্দিরে (৫১ পীঠের একপীঠ) এই কৃত্তিবাসী রামায়ণের কাহিনীর যোগদ্যা উমাই অধিষ্ঠিত বলে সবার বিশ্বাস।

১৪) এরপর হনুমানকে আবার গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে দেখা যায় শ্রীরামের অকালবোধনের সময়। হনুমানই পূজায় আবশ্যক নীলপদ্ম সংগ্রহ করে আনেন (লঙ্কাকাণ্ড ৪৮৯৪ – ৪৯১২)। প্রসঙ্গতঃ, শ্রীরামের অকালবোধনের কাহিনীটি বাল্মীকীয় রামায়ণে নেই।

১৫) এরপর হনুমান আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন, তা হল রাবণের চণ্ডী পুঁথির কয়েকটি পংক্তি মুছে দেওয়া। এর ফলে রাবণের চণ্ডীপাঠ অশুদ্ধ হয় এবং ভগবতী রাবণকে ছেড়ে চলে যান (লঙ্কাকাণ্ড ৫০০৭ – ৫০১৩)।

১৬) এরপরে হনুমানের বিশাল গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ জ্যোতিষীর ছদ্মবেশে মন্দোদরীর কাছে গিয়ে ছলনা করে রাবণের মৃত্যুবান নিয়ে আসা (লঙ্কাকাণ্ড ৫০৮৫ – ৮৬)।

অকালবোধন-শ্রীধর-সোনামুখী
অকালবোধন-শ্রীধর-সোনামুখী

পবনপুত্র হনুমান – যুদ্ধক্ষেত্রে : পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে

আমরা দেখলাম যে হনুমান প্রথম থেকেই যুদ্ধের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে যেগুলি উপস্থিত তা হল –

১) কাঁধে রামকে বহন করা (প্রথমে রামের রথ ছিল না, পরে ইন্দ্র শ্রীরামকে সারথিসহ নিজের রথটি দেন)। এই ঘটনাটি কৃত্তিবাসী রামায়ণের লঙ্কাকাণ্ডের শ্লোকসংখ্যা ১২৭৭ থেকে ১২৭৯ আছে। এর চিত্রায়ণ দেখা যায় মুর্শিদাবাদ জেলার বড়নগরের চারবাংলা এবং গঙ্গেশ্বর মন্দিরের টেরাকোটা প্যানেলে।

২) গন্ধমাদন বহন – একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে আলোচ্য সিরিজের মন্দিরগুলির অলঙ্করণে এই নাটকীয় দৃশ্যটির অলঙ্করণ নেই বললেই চলে। অনেক খুঁজে দু’টি মন্দিরে (বাঁকুড়া জেলার জয়পুরের একটি মন্দিরে এবং বীরভূম জেলার উচকরণের শিবমন্দিরে) অতি সাধারণ এবং ছোট দু’টি টেরাকোটার প্যানেলে হনুমানকে মাথায় পাহাড় বা বড় প্রস্তরখণ্ড বহন করতে দেখা যাচ্ছে, যা গন্ধমাদন বহন দৃশ্য হতে পারে।

৩) গন্ধমাদন পর্বতে বিশল্যকরণী আনতে যাওয়ার সময় হনুমান যাতে বিশল্যকরণী নিয়ে সূর্যোদয়ের আগে ফিরতে না পারেন, সেইজন্য রাবণের আদেশে সূর্যদের সময়ের আগেই উদীত হওয়ার জন্য রথে করে পূর্বদিকে যাচ্ছিলেন। পথে হনুমান সূর্যদেবের রথ আটকান। এই দৃশ্যটি দেখা যায় বীরভূম জেলার ইটণ্ডার জোড়বাংলা কালীমন্দিরের একটি কৌণিক টেরাকোটা ফলকে।
৪) অকালবোধন দৃশ্যে শ্রীরামের সঙ্গে হনুমানকে দেখা যায় বাঁকুড়া জেলার সোনামুখীর শ্রীধর এবং হদল-নারায়ণপুরের মেজো তরফের নবরত্ন মন্দিরে।

৫) হদল-নারায়ণপুরের ছোট তরফের নবরত্ন মন্দিরে হনুমান কাঁধে করে রাম-লক্ষ্মণ এবং মাথায় করে যোগাদ্যা উমাকে নিয়ে যাচ্ছেন (অর্থাৎ মহীরাবণ উপাখ্যানের শেষভাগ) এমন দেখানো হয়েছে।

৬) যুদ্ধদৃশ্যের ব্যাপারে বলা যায় যে মন্দির অলঙ্করণে রামায়ণ থাকলে আর কিছু থাকুক বা না থাকুক যুদ্ধদৃশ্য থাকবেই। সেইসব যুদ্ধদৃশ্য বহু বানর যোদ্ধা দেখা যায় বটে, কিন্তু সেখানে আলাদা করে হনুমানকে চেনা সম্ভব নয়। এর মধ্যে বীরভূমের গণপুরের একটি মন্দিরে একটি ফুলপাথরের ফলকে একজন বিশালাকার বানরকে হাতে একটি বিরাট গাছ নিয়ে একজন একমুণ্ড (অর্থাৎ রাবণ নয়) রাক্ষস যোদ্ধার সঙ্গে যুদ্ধ করতে দেখা যায়।

লজিকালি এই বানর যোদ্ধাকে হনুমান ধরে নেওয়া চলে, কারন কৃত্তিবাসী রামায়ণে হনুমানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বানর যোদ্ধা। কিন্তু রাক্ষস যোদ্ধাটি কে বলা মুশকিল। হনুমান ইন্দ্রজিৎ ও কুম্ভকর্ণ ছাড়া আর যাঁদের সঙ্গে দ্বৈতযুদ্ধ করেছিলেন, তাঁরা হলেন ত্রিশিরা ও অতিকায়, নিকুম্ভ, মকরাক্ষ, বীরবাহু, তরণীসেন, মহীরাবণ, অহীরাবণ ও কালনেমী। কাজেই ছবিটির রাক্ষস যোদ্ধা এঁদের যে কেউ হতে পারেন।

রাম-ও-হনুমান-মহাপ্রভু-ইলামবাজার
রাম-ও-হনুমান-মহাপ্রভু-ইলামবাজার

হনুমান – রাবণ বধের পরে – রামায়ণে

১) রাবণ বধের পর হনুমান রামের আদেশে সীতাকে আনতে যান (লঙ্কাকাণ্ড ৫৩৩৮ – ৩৯)।

২) এরপর হনুমানকে দেখা যায় সীতার অগ্নিপরীক্ষার আগে যখন সবাই কাঁদছেন সীতার বিপদ হবে ভেবে, তখন একমাত্র হনুমানই অবিচলিত থেকে লক্ষ্মণকে বলছেন “… কেন কাঁদ হে লক্ষ্মণ। আমি জানি জানকীর নাহিক মরণ।।” (লঙ্কাকাণ্ড ৫৪৮৮)। লক্ষ্য করুন, হনুমান কিন্তু বলেন নি “আমি বিশ্বাস করি”, বলেছেন “আমি জানি”। এখানে বিশ্বাস অর্থাৎ “Truth as I see it” এবং জানা অর্থাৎ “Truth as it is” র মধ্যের বিশাল পার্থক্যটি কৃত্তিবাস চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন।

৩) এরপর অযোধ্যায় ফেরার পালা। শ্রীরাম নিজে নন্দীগ্রামে ঢোকার আগে হনুমানকে পাঠালেন ভরতের সঙ্গে দেখা করতে (লঙ্কাকাণ্ড ৫৮২৭)।

৪) এরপর হনুমানের উল্লেখযোগ্য কাজ দু’টি – রামের অভিষেকের সময় সহস্র যোজন দূরবর্তী উত্তরসাগর জন্য জল বয়ে আনা (লঙ্কাকাণ্ড ৬০৭৯-৮০) এবং লক্ষ্মণের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে নিজের বুক চিরে “সভামধ্যে দেখাইল বিদারিয়া বক্ষ। অস্থিময় রামনাম লেখা লক্ষ লক্ষ।।” (লঙ্কাকাণ্ড ৬১৪০)।

রাবণ বধের পরে – মন্দির অলঙ্করণে

১) রামরাজা দৃশ্য : যুদ্ধ-পরবর্তী যে সব ঘটনার ছবি পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে দেখা যায়, তার প্রায় সবকটিই হল রামরাজা প্যানেল। যে সব মন্দিরে রামায়ণ চিত্রায়িত হয়েছে, তার সবকটিতেই অন্ততঃ একটি রামরাজা প্যানেল আছে। এই প্যানেল সাধারণতঃ টেরাকোটা ফলকের, তবে স্টাকোরও হতে পারে। স্টাকোর রামরাজা প্যানেলের একটি সুন্দর উদাহরণ দেখা যায় বীরভূম জেলার নানুরের কবি চণ্ডীদাসের ভিটের মন্দিরগুচ্ছের একটি মন্দিরে।

এই রামরাজা প্যানেলগুলি নানা ধরণের হতে পারে। এর একদিকে হচ্ছে ছোট্ট চেয়ার বা টুল জাতীয় বসার আসনে উপবিষ্ট রাম-সীতার পায়ের কাছে বসা বা দাঁড়ানো হনুমান, অন্যদিকে আছে রাজসভার দৃশ্য, যেখানে সিংহাসনে উপবিষ্ট রাম-সীতার দু’পাশে সারিবদ্ধ ভাবে অমাত্যবর্গ। হনুমানের স্থান সাধারণতঃ রামের পায়ের কাছে।

২) রাম ও হনুমান : রামের সঙ্গে রামকে প্রণাম-রত হনুমানের ছবি প্রায় সব মন্দিরেই দেখা যায়।

রামরাজা-স্টাকো-নানুর
রামরাজা-স্টাকো-নানুর

পবনপুত্র হনুমান – পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে কিছু অনির্দিষ্ট ছবি

পশ্চিমবঙ্গের কিছু মন্দিরের অলঙ্করণে হনুমানের কিছু ছবি দেখা যায় যেগুলিকে সরাসরি রামায়ণের কোন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা যায় না। এরকম একটি অনির্দিষ্ট ছবি হল পশ্চিম বর্ধমানের মৌখিরা-কালিকাপুরের একটি শিবমন্দিরের অলঙ্করণের একটি টেরাকোটা ফলকে। সেখানে হনুমানকে এক সারি শিবলিঙ্গকে পূজা করতে দেখা যায়। এছাড়া কিছু মন্দিরে হনুমানের একক ছবি আছে। আবার বীরভূম জেলার উচকরণের শিবমন্দিরে একটি টেরাকোটা ফলকে দেখা যায় সিংহাসনে উপবিষ্ট ধনুর্ধারী রামের ডানপাশে জাম্ববান এবং বাঁয়ে হনুমান।

হনুমান : পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে কী নেই

রামায়ণের নায়ক না হলেও হনুমান অন্যতম প্রধান পার্শ্বচরিত্র। রামায়ণে বর্ণিত হনুমানের নানা ধরণের বর্ণময় ঘটনার মধ্যে কিছু কিছু পশ্চিমবঙ্গের মন্দিরের অলঙ্করণে আছে, আবার অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং নাটকীয় ঘটনা নেই। যা নেই, কিন্তু থাকলে ভালো হত, এমন কয়েকটি ঘটনা বা দৃশ্য হল :-

লঙ্কাদহন, মহীরাবণ-অহীরাবণ বধ, মকরাক্ষর গরুর পালকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বৃষবাহণ রথে করে রাম-লক্ষ্মণকে আক্রমণ এবং মকরাক্ষর সঙ্গে হনুমানের যুদ্ধ, নিকুম্ভিলা যজ্ঞ পণ্ড করে ইন্দ্রজিতের সঙ্গে হনুমানের যুদ্ধ, ছদ্মবেশে মন্দোদরীর কাছ থেকে রাবণের মৃত্যুবান আনা, হনুমানের নিজের বুক চিরে রামনাম দেখানো ইত্যাদি। হতে পারে এগুলির উদাহরণ এই সিরিজের বাইরের কোনও মন্দিরে আছে।

রামরাজা-টেরাকোটা-প্রতাপেশ্বর-কালনা

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক

এখানে আমরা পবনপুত্র হনুমানের ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত বিষয় ছুঁয়ে যাব, সেটি হল পবনপুত্র হনুমানের প্রকৃত পরিচয়টি কী। উনি কি সত্যিই হনুমান জাতীয় প্রাণী, না অন্য কিছু?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে প্রথমে আমরা হনুমান (প্রাণী) সম্বন্ধে খুব সংক্ষেপে কিছু শুনব।

হনুমান (Hanuman langur, Sacred langur, Bengal sacred langur, Northern plains gray langur, Semnopethicus entellus) হল Cercopithecidae গ্রুপের অন্তর্গত Semnopethicus গণের (genus) অন্তর্ভূক্ত এক ধরণের প্রাইমেট। এরা সাধারণ ভাবে নিরামিষাশী হলেও কীটপতঙ্গ খায়। এদের মুখ এবং হাত-পা কালো হয়। এরা সাধারণতঃ বড় বড় দল বেঁধে থাকে।
বাঁদর (রিসাস মাংকি, Rhesus macaque, Macaca mulatta) আর হনুমান চিনতে কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। বাঁদরের মুখ লাল হয়, হনুমানের মুখ কালো। বাঁদরের গায়ের লোম বাদামী রঙের নানা শেডের হয়, হনুমানের হালকা ছাই ছাই থেকে হলদেটে সাদা এমনকি সম্পূর্ণ সাদা হতে পারে। হনুমান আকারে বাঁদরের চেয়ে বড় হয়। বাঁদরের লেজের চেয়ে হনুমানের লেজ অনেক লম্বা।

এ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হল বাঁদর বা হনুমান প্রাইমেট হলেও ‘এপ’ (ape) নয়। ‘এপ’ বলতে মানুষ ছাড়া ওরাংউটান, গরিলা, সিম্পাঞ্জি, বোনোবো, গিবন ও সিয়ামাং-কে বোঝায়। অর্থাৎ, হনুমান মানুষের সমগোত্রীয় প্রাণী নয়।

প্রাইমেট হনুমান, না মানুষ?

(নীচের অংশটির তথ্য-উৎস হল শৈলেন্দ্রনারায়ণ ঘোষাল শাস্ত্রী প্রণীত “আলোকতীর্থ ও আলোকবন্দনা”।)
প্রথমতঃ, হনুমান, যিনি সুপণ্ডিত শাস্ত্রজ্ঞ এবং অনিমা মহিমা গরিমা ইত্যাদি অষ্টসিদ্ধির অধিকারী ছিলেন, তিনি কি একজন প্রাইমেট (এপ-ও নয়) হতে পারেন?

দ্বিতীয়তঃ, বাল্মীকীয় রামায়ণে সাগর লঙ্ঘনের আগে পর্যন্ত হনুমানের লেজের কথা নেই। সাগর লঙ্ঘনের সময় হনুমানের লেজের যে বর্ণনা বাল্মীকি দিয়েছেন তাতে মনে হয় সেটি কোনও এক্সটার্নাল মেকানিকাল ডিভাইস, অর্থাৎ যান্ত্রিক। এবং হনুমানের লেজটি যান্ত্রিক বলেই লেজে আগুন দিলেও হনুমানের দেহে তাপ লাগে নি।

সুগ্রীব, বালী, হনুমান, নল, নীল, সুষেণ প্রভৃতি বানরদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, সমৃদ্ধি, বিলাসব্যসন, সঙ্গীতবিদ্যা, শাস্ত্রাচার ইত্যাদির যে বর্ণনা বাল্মীকি দিয়েছেন, তা কি কখনও কোনও প্রাইমেটের হতে পারে?

রামায়ণের “বানর”-রা যে নিতান্তই শাখামৃগ বা প্রাইমেট ছিলেন না, তার আর একটি শাস্ত্রীয় প্রমাণ পাওয়া যায় ভারতবর্ষের দ্বিতীয় মহাকাব্য মহাভারতের আদিপর্বের সপ্তম অধ্যায়ের ৬৬ নম্বর শ্লোকে, যেখানে “বানর”-দের (এবং রাক্ষস, কিন্নর ও যক্ষদেরও) মহর্ষি পুলস্ত্যর পুত্র বলা হয়েছে। (রাক্ষসাশ্চ পুলস্তস্য বানরাঃ কিন্নরাস্তথা। যক্ষাশ্চ মনুজ ব্যাঘ্র পুত্রাস্তস্য চ ধীমতঃ।।) মহর্ষি পুলস্ত্য মানুষ ছিলেন, তাই তাঁর পুত্র “বানর”-রাও মানুষ, প্রাইমেট নন।

বাল্মীকির লেখাকে সঠিক দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যাবে হনুমান (এবং কিষ্কিন্ধ্যাবাসী বানররা) বন্য প্রাইমেট ছিলেন না, তাঁরা কিষ্কিন্ধ্যা অঞ্চলের মানুষ ছিলেন।

(শৈলেন্দ্রনারায়ণ ঘোষাল শাস্ত্রী প্রণীত আলোকতীর্থ ও আলোকবন্দনা, পৃষ্ঠা সংখ্যা ২০৮ – ২১৩)

শিবলিঙ্গ-সহ-হনুমান-মৌখিরা-কালিকাপুর.
শিবলিঙ্গ-সহ-হনুমান-মৌখিরা-কালিকাপুর.

পবনপুত্র হনুমান – উপসংহার

রামায়ণের অজস্র চরিত্রের মধ্যে কোটি কোটি ভারতবাসীর হদয়ের দেবতা শ্রীরাম হলেও হনুমানও তাঁর অপরিসীম রামভক্তির কল্যাণে সংকটমোচন রূপে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন। লক্ষ্ণণ ও সীতা বাদ দিন, বিষ্ণুর অবতার স্বয়ং শ্রীরামও অমর নন, কিন্তু হনুমান অমর। তিনি ভক্তি ও ভক্তের প্রতীক, ভক্তি ও ভক্তের কখনও মৃত্যু হয় না। হনুমানের বন্দনা এই জ্ঞানহীন ভক্তিহীন শ্রদ্ধাহীন লেখক আর কী করবে, তাঁর সম্বন্ধে শেষ কথাটি তো স্বয়ং শ্রীরামই বলে গেছেন :
“রাম বলে হনুমান তুমি ভক্তবীর। তোমাতে আমাতে ভেদ নাহিক শরীর।।”

(কৃত্তিবাসী রামায়ণ, লঙ্কাকাণ্ড, শ্লোকসংখ্যা ২২৫৩)।

আরও পড়ুন- রাবণ দশানন – রামায়ণে ও পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে

তথ্য উৎস
১) কৃত্তিবাসী রামায়ণ, গীতা প্রেস, গোরক্ষপুর।
২) শ্রীমদ্ বাল্মীকীয় রামায়ণ, গীতা প্রেস, গোরক্ষপুর।
৩) বাল্মীকি রামায়ণ, স্বামী অরুণানন্দ, ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ।
৪) আলোকতীর্থ ও আলোকবন্দনা, শৈলেন্দ্রনারায়ণ ঘোষাল শাস্ত্রী।
৫) বিভিন্ন ইন্টারনেট সাইট।

দেখুন গঙ্গা নিয়ে কৌলালের তথ্যচিত্র

 

 


Share your experience
  • 419
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    419
    Shares

Facebook Comments

Post Author: আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

asish chottopadhyay
আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৫৬) দুর্গাপুরের একজন প্রতিথযশা স্ত্রীরোগবিশেজ্ঞ। দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার হাসতালে ৩২ বছর অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চাকরি করার পর এখন উনি সম্পূর্ণ ভাবে গরীব ও দুস্থ রোগীদের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত রেখেছেন। দেশভ্রমণ, ফটোগ্রাফি এবং বিভিন্ন বিষয়ে ইংরেজি ও বাংলায় লেখালেখি করা ওঁর নেশা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং বইতে ওঁর তোলা ফটো প্রকাশিত হয়েছে। বাংলায় লেখা ওঁর দুটি ব্যতিক্রমী উপন্যাস, একটি ছোটগল্প-সংগ্রহ, একটি কবিতার বই , একটি ছড়ার বই ও দুটি ভ্রমণকাহিনী আছে, যার মধ্যে একটি উপন্যাস (চরৈবেতি) দুবার আনন্দবাজার পত্রিকার বেস্ট সেলার লিস্টে স্থান পেয়েছিল। ইংরেজিতে ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান ও মেলা নিয়ে লেখা ওঁর শতাধিক ব্লগের প্রায় দেড় লক্ষ ভিউ আছে। বাংলার মন্দিরের উপর ওঁর ইংরেজিতে লেখা একটি গবেষণাধর্মী প্রায় দুহাজার রঙিন ফটোসমৃদ্ধ ফটোগ্রাফিক ই-বুক আছে, যেটি সাধারণ মানুষ, যাঁরা মন্দির ভালোবাসেন কিন্তু খুব পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখা পড়তে চান না, তাঁদের জন্য লেখা।।