পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্প এবং মৃৎশিল্পীদের বারোমাস্যা

Share your experience
  • 364
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    364
    Shares

পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্প
বাঁকুড়ার  পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্প

পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্প এবং মৃৎশিল্পীদের বারোমাস্যা এক বর্ণময় অধ্যায়।পুরান থেকে আধুনিক ইংরেজ রাজত্ব, নৌবিহার থেকে শিকার, যুদ্ধ বিগ্রহ থেকে দৈনন্দিন জীবন সংগ্রাম, সবকিছুই দেখা যায় এইসব টেরাকোটা প্যানেলের মধ্যে। বলা যায় সেযুগের সমাজ জীবনের জীবন্ত দলিল এই সব পোড়ামাটির কাজগুলি। লিখছেন–ডা.তিলক পুরকায়স্থ।

 টেরাকোটা শিল্প

পশ্চিবঙ্গের বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়া এবং অজয় নদের গা ঘেঁষা বর্ধমান জেলার মাটির রং লাল। লাল রঙের ল্যাটেরাইট গোত্রের মাটি পুড়িয়েই এই বিশাল অঞ্চলে একদা তৈরি হত টেরাকোটার বহু মূর্তি, প্লেট এবং বহু দেবস্থান । এই অঞ্চলগুলোতে প্রচুর টেরাকোটার কাজ সমৃদ্ধ সুন্দর সুন্দর মন্দির আছে যা বাঙালি জাতির সহজাত অজ্ঞতা এবং উন্নাসিকতায় হারিয়ে যাচ্ছে। ১৭ ও ১৮ শতকে এই সব পোড়ামাটির মন্দির তৎকালীন কুম্ভকাররা কি অসম্ভব দক্ষতায় তৈরি করেছিলেন, তা প্রায় ধ্বংস প্রাপ্ত বহু মন্দিরের ইঁটের এবং পোড়ামাটির টালির কাজ দেখলে বোঝা যায়। কি নেই এসব মন্দির ভাস্কর্যে ? পুরান থেকে আধুনিক ইংরেজ রাজত্ব, নৌবিহার থেকে শিকার, যুদ্ধ বিগ্রহ থেকে দৈনন্দিন জীবন সংগ্রাম, সবকিছুই দেখা যায় এইসব টেরাকোটা প্যানেলের মধ্যে। বলা যায় সেযুগের সমাজ জীবনের জীবন্ত দলিল এই সব পোড়ামাটির কাজগুলি।

পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্প মুখমণ্ডল
পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্প মুখমণ্ডল

পোড়ামাটির কাজ

অবশ্য ভারতবর্ষে পোড়ামাটির ইঁট , খেলনা, বিভিন্ন পুতুল, গহনাগাটি, সিলমোহর, বাসনপত্র ইত্যাদির ব্যবহার কোন সুদূরে মহেঞ্জদরো, হরপ্পা সভ্যতার মধ্যেও পাওয়া গেছে। মানব সভ্যতার বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল টেরাকোটা সামগ্রীর, সুমের- ব্যাবিলন- আজটেক সভ্যতার প্রত্নসামগ্রীর মধ্যেও পোড়ামাটির শিল্প সামগ্রী পাওয়া গেছে। পরবর্তী কালেও এঁটেল ও ল্যাটেরাইট মাটির সহজলভ্যতার কারণে, পোড়ামাটির কাজ ও মন্দির অলংকার প্রায় বাংলার একচেটিয়া, নিজস্ব শিল্পকর্মে পরিণত হয়।- পাল সেন যুগের সোমপুর, মহাস্থানগড় বিহার ইত্যাদির উদাহরণ তো চোখের সামনেই রয়েছে। এর অনেক পরে ১৫৩৩ সালে চৈতন্য মহাপ্রভু দেহ রাখলেন, তাঁর প্রচলিত প্রেমের বাণী এবং বৈষ্ণব ধর্মের প্লাবনে সারা বাংলা বিশেষ করে মল্লভূম প্লাবিত হয়ে গেলে পরবর্তীকালে কত যে টেরাকোটার মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল, তা গুনে শেষ করা যাবেনা। তবে টেরাকোটার উপরে আমার বর্তমান প্রবন্ধ সীমাবদ্ধ রাখছি কেবলমাত্র বাঁকুড়ার পাঁচমুড়ার গ্রামে নির্মিত পোড়ামাটির শিল্প সামগ্রী নিয়ে।

পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্প

বাঁকুড়া জেলার তালড্যাংড়া থানার পাঁচমুড়া গ্রাম- এক আশ্চর্য্য শিল্পগ্রাম। গ্রামের প্রায় ৭০ টি ঘরে বর্তমানে প্রায় ৩০০ জন মৃৎশিল্পীর বাস। পুরো গ্রামটাই বলা চলে, ওপেন এয়ার মৃৎশিল্পের মিউজিয়াম। প্রতিটি বাড়ির সামনে এক চিলতে উঠোনে, থরে থরে সাজিয়ে রাখা থাকে বিভিন্ন টেরাকোটা বা পোড়ামাটির শিল্পসামগ্রী।টেরা একটি ল্যাটিন শব্দ যার অর্থ মাটি, আর কোটা মানে আগুনে পোড়ান। পাঁচমুড়া আর বাঁকুড়ার ঘোড়া প্রায় সমার্থক হয়ে গেছে। ডোকরা বা দারু শিল্পেও এই পাঁচমুড়ার ঘোড়ার মূর্তি নির্মাণ করা হচ্ছে।

পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্প হাতি ঘোড়া মনসাচালি

কিন্তু পাঁচমুড়ার বর্তমান প্রজন্মের তরুণ শিল্পীরা হাতি- ঘোড়া- মনসাচালির যুগ পেরিয়ে বহুদূরে চলে গেছেন। এঁদের ঘরে ঘরে তাই জাতীয় ও রাজ্য পুরস্কার পাওয়া শিল্পীদের ছড়াছড়ি। এখানেই রয়েছেন আমার তরুণ শিল্পী বন্ধু , রাজ্য সরকারের পুরস্কার , মূর্তি নির্মাণের জন্য এশিয়ান পেইন্টস শারদ সম্মান ইত্যাদি বহু পুরস্কারে সম্মানিত ( যুগ্মভাবে উনার কাকা বিশ্বনাথ কুম্ভকারের সঙ্গে) ভূতনাথ কুম্ভকারের বাড়ি , ২০১৮- র পাঁচমুড়ার বাৎসরিক টেরাকোটার মেলায় আমার আড্ডা ভূতনাথের ঘরেই। প্রতিবছর পাঁচমুড়ার মৃৎশিল্পী সমবায় সমিতি এবং বাংলা নাটক ডট কমের সহযোগিতায় সাধারণত ২-৪ নভেম্বরে মেলা বসে পাঁচমুড়ায়, সহায়তায় রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ খাদি ও গ্রামীণ শিল্প পর্ষদ এবং ইউনেস্কো।দেখে নেওয়া যাক, কিভাবে লোকশিল্পীদের হাতেসামান্য মাটি থেকে তৈরি হচ্ছে চোখ ধাঁধান সব শিল্প কীর্তি।

পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্প কথা

এর জন্য সর্বাগ্রে দরকার ভালো এঁটেল মাটি, কাঠ, ঝাঁটি-লকরি, গাছের ঝরে পড়া শুকনো পাতা ইত্যাদি। ভালো কোয়ালিটির এঁটেল মাটি কিনতে গেলে এমন দাম লাগে যে পড়তায় পোষায় না। তাই দুঃখের কথা হচ্ছে, শিল্পীরাই ভালো জাতের এঁটেল মাটির খোঁজে , নদীর ধারে মাটির খাদানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেমে মাটি কাটতে বাধ্য হন। মাটি কাটতে গিয়ে জনৈক শিল্পী ভুবন কুম্ভকার মাটি চাপা পরে প্রাণ হারিয়েছেন, কালিপদ কুম্ভকার কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন, এমনকি ভূতনাথ বাবু অবধি একবার মাটি চাপা পড়েও বরাত জোরে বেঁচে গেছেন।

নদীর ধারে বা তীরবর্তী অঞ্চলে, যেখানে ভালো এঁটেল মাটি পাওয়া যায়, সেই অঞ্চলগুলিকে বলে সোল জমি। এখানেই মাটি কেটে গর্ত খুঁড়ে বিশেষ স্তরের মধ্যে থেকে সংগৃহীত হয় এঁটেল মাটি এবং পোড়ামাটির রং আনতে ভীষণ রকম প্রয়োজনীয় রংমাটি বা গাদ।

পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্প রঙের কথা

রংমাটি আবার দুরকমের হয়- হলুদ রঙের এবং কালচে রঙের মাটি। কালচে রঙের মাটিকে স্থানীয় ভাষায় বলে ‘ বনক ‘। এঁটেল মাটিকে একটি ছায়া ঘেরা , শীতল জায়গায় “গাদাবন্দি” অর্থাৎ ঢিপির মতন জমা করে রাখা হয়। আর রংমাটিকে কোন মাটির পাত্রে জল দিয়ে গুলে বেশ কিছুদিন রাখা হয়। এরপরে সেই মাটির ঘন গাদের মতন অংশটিকে ছেঁকে বা চেলে নিয়ে, বালি ও কাঁকর বাদ দিয়ে কেবলমাত্র গাদ অংশটি রং-মাটির কাজে ব্যবহার করা হয়। রংমাটি তৈরির কাজ সাধারণত বাড়ির মেয়েরাই করে।

গাদাবন্দি এঁটেল মাটিকে সাধারণত সরু তার বা পাতলা লোহার পাত বা ” পতর ” দিয়ে সরু, সরু ফালি কেটে নিয়ে, কাঁকর বাদ দিয়ে, জল ছিটিয়ে নরম করা হয়। এরপর এই এঁটেল মাটির সঙ্গে পরিমাণমত বালি মিশিয়ে, পায়ের গোড়ালি দিয়ে চেপে চেপে একটি বালু-মাটির মিশ্রণ তৈরি করা হয়, আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে মাটির আঁঠালো এবং চিটচিটে ভাব কিছুটা কমান। এইভাবে তৈরি মাটি কুমারের চাকে ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত হয়। এখানে একটি কথা, ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছেন, কুমোরের চাক বলতে কাঠের আল যুক্ত চাকার ব্যবহার। এখন কিন্তু প্রযুক্তির কল্যাণে ইলেকট্রিক মোটর যুক্ত, গোল লোহার প্লেটের চাকাও, আধুনিক নবীন প্রজন্মের শিল্পীরা ব্যবহার করছেন।

পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্প বৈচিত্র্য

তবে আসল টেকনিক হচ্ছে , চাকা ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে দু-হাতে তালু ও কব্জির চাপে ঘুরন্ত চাকতির উপরের মাটির গাদাকে গোল ও সরু করে উপরের দিকে ওঠানো। একই সঙ্গে সিংক্রোনাইজ হয়ে চলবে হাতের আঙ্গুলের চাপে বিভিন্ন রকম ফাঁপা জিনিষের আকৃতির নির্মাণ। সেটা বাঁকুড়ার ঘোড়ার লম্বা গলা হতে পারে, কিম্বা ফুলদানি বা হাতি ইত্যাদি। এর পরবর্তী ধাপ হচ্ছে সরু সুতো বা সুঁচ দিয়ে শিল্পকর্মটি কেটে চাক থেকে নামানো।

এর পরে এই টুকরো খণ্ডগুলিকে রোদে প্রয়োজন মতন শুকিয়ে নিয়ে, কাটা জায়গাটি সামান্য জলে ভিজিয়ে দিয়ে, অতিরিক্ত মাটি জুড়ে, বড় শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে কাটা অংশের জোড়া মাটিকে ” পাথরের বল ” দিয়ে, আর ছোট ঠ্যাং ইত্যাদির জোড়া মাটিকে ” কাঠের পিটুনি ” দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে প্রাথমিক আকৃতি প্রদান করা। পরের দিন বাঁশের ” কাবাড়ি ” এবং ” উঁচা ” দিয়ে লেগে থাকা অতিরিক্ত মাটি পরিষ্কার করে, বাঁশের চাঁচারি দিয়ে এবং সরু সরু মাটির লেত্তি থেকে পিস পিস করে কেটে প্রয়োজনীয় অলংকরণ করে, ঘষিয়ে “চিকনা” পালিশ করে ছায়াতে শুকনো হয়। এর পরে শিল্পদ্রব্যগুলির উপরে সাধারণত হলুদ রঙের রং মাটির প্রলেপ দুবার দেওয়া হয়। তবে কালো রঙের সামগ্রীর উপরে বনক প্রলেপ দেওয়া হয়।

পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্প
পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্প

প্রস্তুত দ্রব্যগুলি শুকিয়ে গেলে, অপেক্ষা করা হয়, যতক্ষণ অবধি না এক ভাটিতে পোড়াবার মতন যথেষ্ট সামগ্রী তৈরি হচ্ছে। ছায়াতে শুকনো দ্রব্যগুলির উপরে রংমাটিতে ভিজিয়ে পাতলা কাপড় জড়িয়ে রোদে শুকিয়ে নেওয়া হয়, এতে টেরাকোটার নিজস্ব রংয়ের খোলতাই হয়।

ভাটি বা শাল

এরপরে আসে ভাটি বা ” শাল” এ পোড়াবার পালা।ভাটির দুটি মুখ্য অংশ- জালির উপরে ও নিচে। জালির উপরে পর পর শিল্পদ্রব্যগুলি সাজিয়ে রেখে তার উপরে ভাঙ্গা হাঁড়ি কলসির টুকরো দিয়ে ঢাকা দেওয়া হয়, একে বলে ” পাতন “।
এরপরে পাতনের উপরে বিচুলি বিছিয়ে দিয়ে তার উপরে নরম কাদামাটির একটি প্রলেপ দেওয়া হয়। এই প্রলেপের উপরে কমপক্ষে ৫/৬ -টি ছিদ্র রাখা হয়। এই ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে বোঝা যায়, পোড়ানো কেমন হচ্ছে এবং মাটির পাত্রের গায়ে কেমন টেরাকোটার রং ধরেছে !

এরপর আগুন দেবার পালা। জালির নিচে প্রথমে শুকনো পাতা দিয়ে আগুন ধরানো হয় অর্থাৎ ভাটির জিনিষপত্র কম তাপমাত্রায় পোড়ানো হয়। এর পরে কাঠ জ্বালিয়ে তাপমাত্রা বাড়ান হয়। আস্তে আস্তে তাপমাত্রা না বাড়ালে শিল্পসামগ্ৰী তুবড়ির মতন ফেটে যাবে। ভাটির তাপমাত্রা যখন ৭০০ থেকে ৮০০℃ পৌঁছায়, তখন মাটির জিনিসগুলি পুড়ে টেরাকোটার রক্ত বর্ন ধারণ করে।

পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্প কথন

কালো রঙের সামগ্রী তৈরির পদ্ধতি একটু আলাদা। এখানেও ভাটিতে পাতা ও কাঠ জ্বালিয়ে আগুন ধরানো হয়। তবে কম কাঠ জ্বালিয়ে তাপমাত্রা অপেক্ষাকৃত কম রাখা হয়। ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে যখন দেখা যায়, দ্রব্যগুলি পুড়ে গেছে তখন জালির নিচে জলে ভেজানো ঘুঁটে গুঁজে দেওয়া হয়। তারপরে ইঁট দিয়ে ভাটির মুখ আর পাতন এবং মাটির প্রলেপ দিয়ে সমস্থ ছিদ্রপথগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়। জলে ভেজা ঘুঁটে থেকে প্রচুর ধূম নির্গত হয়। সেই ধোঁয়ার কার্বন ভাটির সামগ্রীর গায়ে বসে গিয়ে, শিল্পসামগ্রীগুলি কৃষ্ণবর্ন ধারণ করে।পরের দিন ভাটি ঠান্ডা হলে লাল বা কৃষ্ণবর্ণের শিল্পসামগ্রীগুলিকে ভাটির উপরের মাটির প্রলেপ এবং পাতন অংশ সরিয়ে বের করা হয়। এই হচ্ছে টেরাকোটার শিল্প-সামগ্রী নির্মাণের সামগ্রিক বর্ণনা ।

পোড়ামাটির ঘোড়া

পোড়ামাটির ঘোড়া বাঁকুড়া জেলার বহু গ্রামের কুম্ভকারেরা নিজস্ব শৈলীতে নির্মাণ করেন যেমন রাজগ্রাম, সোনামুখী, মুরলু ইত্যাদি স্থানে। সোনামুখীর ঘোড়ার এনাটমি টাট্টু ঘোড়ার মতন, বাস্তবসম্মত। তাই বাস্তবসম্মত তার ল্যাজ আর কান, দেহের সঙ্গেই যুক্ত। পাঁচমুড়ার ঘোড়ার থেকে তার গলায় এবং দেহে অলংকরন ও অনেক কম। অন্যদিকে রাজগ্রামের ঘোড়া সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ঠাকুর-দেবতার থানে। মুখ্যত মানতের সাদা মাটা ঘোড়া তৈরি হয় রাজগ্রামে। মুরলু গ্রামে নির্মিত পোড়ামাটির ঘোড়া দেখার সৌভাগ্য হয়নি, তবে অমিয়বাবুর লেখা থেকে জেনেছি যে, এই ঘোড়ার গলা সবচেয়ে লম্বা ও বাঁকানো। অনেকটা নাকি ডাইনোসরের মতন। আর অলংকার বলতে ঘোড়ার গলায় বেড় দিয়ে রয়েছে একসারি গর্ত।

তবে শিল্পীর মানস সঞ্জাত এবং লোক কল্পনায় উদ্ভূত বাঁশ পাতার মতন দীর্ঘ কান এবং প্রশ্ন চিহ্নের মতন লেজ বিশিষ্ট পাঁচমুড়ার ঘোড়া হচ্ছে ভারতীয় লোক শিল্পের উজ্জ্বলতম প্রতিনিধি, সেন্ট্রাল কটেজ ইন্ডাস্ট্রিস এমপোরিয়ামের লোগো।
কিন্তু কিভাবে বাঁকুড়ার পোড়ামাটির ঘোড়া বিশ্বের দরবারে ভারতীয় লোকশিল্পের প্রতিনিধি রূপে নির্বাচিত হলো ? দেখে নেওয়া যাক সেই ঘটনাটি।

 অমিয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

এর কৃতিত্ব প্রখ্যাত ক্ষেত্র সমীক্ষক অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অল ইন্ডিয়া হান্ডিক্রাফটস বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান শ্রীমতি কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়ের। পাঁচমুড়ার টেরাকোটার কাজের উপরে অমিয়বাবুর লেখা একটি প্রবন্ধ পড়ে খোদ শ্রীমতি চট্টোপাধ্যায় দিল্লী থেকে এসে হাজির হন পাঁচমুড়া গ্রামে, সঙ্গে ছিলেন খোদ অমিয়বাবু। চেয়ারম্যান মহোদয়ার নির্দেশে সেই মুহুর্তেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন এমপোরিয়ামের জন্য ৫০০০ বাঁকুড়ার ঘোড়া ক্রয় করা হয় এবং দিল্লিতে ফিরে গিয়ে উনার নির্দেশেই কেন্দ্রীয় কুটিরশিল্প বিপণন সংস্থার লোগো হিসাবে স্থান পায় বাঁকুড়ার ঘোড়া।
এবারে একটু আলোচনা করা যাক কুম্ভকার সম্প্রদায়ের উৎপত্তির সম্মন্ধে।

বিশ্বকর্মা প্রসঙ্গ

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরানের দশম অধ্যায়ে দেখা যায় যে, দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা কোন দেবীকে বিবাহ না করে অপ্সরা ঘৃতাচীকে বিবাহ করেন এবং তাঁর নয়টি পুত্র সন্তান হয়। এখানে বলা হচ্ছে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং তাঁর অভিশাপে স্বর্গের অপ্সরা ঘৃতাচী মর্ত্যলোকে মন্মথ নামক গোয়ালার কন্যা হয়ে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর নাম হয় প্রভাতী। এবং বিশ্বকর্মা এঁকেই বিবাহ করেন। এঁদের বিবাহজাত নয়টি শিল্পী সম্প্রদায়ের নামগুলি হচ্ছে এরূপ-মালাকার, কর্মকার, শাঁখারি বা শঙ্খকার,তন্তুবায়, কুম্ভকার ,কাংশকার, সূত্রধর, চিত্রকর এবং স্বর্ণকার। তাই এই নয়টি শ্রেণীর বিভিন্ন প্রকার শিল্পকর্মের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি ব্যক্তির কাছেই বিশ্বকর্মা পুজো হচ্ছে সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান।

পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্প ও শিল্পী

অবশ্য পাঁচমুড়ার কুম্ভকার সম্প্রদায়ের বিশ্বাস মহাদেবের জটা থেকে নাকি কুম্ভকার সম্প্রদায়ের উৎপত্তি। আসলে লোকপুরান মতে শিবের বরপুত্র রুদ্রপাল হচ্ছেন কুম্ভকার সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা। কুমারের চাক এঁদের কাছে নারায়ণের চক্র আর চাক ঘোরানোর লাঠি হচ্ছে শিবের ত্রিশূলের প্রতিরূপ। পাঁচমুড়ার কুম্ভকারদের কাছে কিন্তু সবচেয়ে বড় উৎসব হচ্ছে চাকা পূজা।

দেখে নেওয়া যাক চাকা বা চাক পুজো কি, কেন এবং কিভাবে করা হয় ।এই পূজোর পিছনে বেশ কয়েকটি লৌকিক কাহিনী আছে। তবে ব্রাহ্ম‍্য‍ন‍্যবাদী সমাজ সর্বদা পটুয়া, চিত্রকর বা কুমোরদের অর্থাৎ সমাজের নিম্নস্তরের ব্যক্তিদের উপর আধিপত্য বিস্তারের জন্য সব কাহিনীতে বেচারা ভোলেবাবাকেই শিখন্ডি করে গল্প ফাঁদত। সত্যি কথা বললে, শিব ঠাকুর তো আদিতে অনার্যদের পূজিত দেবতা ছিলেন। ব্রাহ্মণ‍্যবাদী হিন্দু সমাজ অনেক পরে উনাকে বৈদিক দেবতার স্তরে উন্নীত করে। ভোলেবাবা যেহেতু সর্বস্তরে পূজিত হতেন তাই চাকা পূজোর সব গল্পও মহাদেবকে নিয়ে।

একটি গল্পে বলা হয় চৈত্র গাজনের অনুষ্ঠানে কুমোরদের কাউকে না দেখতে পেয়ে শিব নাকি রাগ করে চাকার উপরে বসে পরেন। তখন কুমোর সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁদের ভুল বুঝতে পারেন এবং মাসাধিককাল চাকা ঘোরানো বন্ধ রেখে, পুজো আর্চা করে শিবকে তুষ্ট করেন।

পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্প ও শিল্পী ভূতনাথ

আবার ভূতনাথের কাছে শুনলাম যে, চৈত্র সংক্রান্তির দিনে প্রচন্ড গরমে কাহিল হয়ে শিব ঠাকুর একটি ছায়াঘেরা জায়গার খোঁজ করছিলেন। ছায়া ঘেরা স্যাঁতস্যাঁতে কুমোরের মাটি-গাদার পাশে রাখা চাকা-র স্থানটি তাঁর পছন্দ হয়। প্রচন্ড দাবদাহে ক্লান্ত শিব ওই চাকার উপরেই বসে পড়েন এবং শরীর শীতল হলে ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়েন। খুব স্বাভাবিক ভাবেই, শিব যেখানে বসে রয়েছেন, সেটিকে ঘোরানোর কোন কথাই ওঠেনা। তখন থেকে শুরু হয় চৈত্র সংক্রান্তির চাকা পূজো।

কিভাবে চাকা পুজো হয় ? – চৈত্র সংক্রান্তির দিনে চাকার উপরে মাটি রেখে, চাকাকে মাত্র ১ পাক ঘুরিয়ে, আঙ্গুল এবং কব্জির মোড় দিয়ে একটি ফাঁপা শিবলিঙ্গের আকৃতি তৈরি করা হয়। এরপরে শিবলিঙ্গের গায়ে একটি সুতোর টুকরো অর্থাৎ পৈতে এবং একখণ্ড সাদা বস্ত্র, শিবলিঙ্গের নিচের দিকে অর্থাৎ কাঁচামাটির উপরে চিটিয়ে দেওয়া হয়। শিবলিঙ্গ তৈরির শেষে কলাই সিদ্ধ ও মুড়ি খাওয়ার রেওয়াজ আছে। পরের দিন শিবলিঙ্গের মাথায় ধান-দূর্বা এবং আবির দিয়ে প্রণাম করা হয়। আর পরে চাকার চারদিকে আলপনা দেওয়া হয় এবং ফুল দিয়ে চাকাটিকে সাজিয়ে শিবজ্ঞানে ধূপ-দীপ দিয়ে পুজো করা হয় পুরো বৈশাখ মাস , জ্যৈষ্ঠ মাসের ১ তারিখ বাদ দিয়ে প্রথম বিজোড় শনিবার দিন অবধি। এই দীর্ঘ সময় জুড়ে কুম্ভকারদের ঘরে মাটির কাজ বন্ধ থাকে।

 চাকপুজো

জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম বিজোড় শনিবার হয় ঠাকুর ভাসান। সকালে চাকা সহ শিবলিঙ্গকে পদ্ম ফুল, আরো সব ফুল, বেলপাতা দিয়ে সাজানো হয়। ভোগ সাজানো হয় চিঁড়ে, ছোলা ভাজা, বাদাম ভাজা, মুড়কি, বিভিন্ন ফল, বাতাসা ইত্যাদি সহযোগে। এদিনের পুজো- অর্চনা এবং পুষ্পাঞ্জলি দেবার জন্য ব্রাহ্মণ পুরোহিতের প্রয়োজন হয়। এরপরে ব্রাহ্মণ , বৈষ্ণব, আত্মীয়-কুটুম্ব ভোজনের ব্যবস্থা করা হয়। শেষে শিবলিঙ্গকে চাকা থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে স্থানীয় পুকুরে বিসর্জন দেওয়া হয়। এর পরবর্তী পদক্ষেপ হচ্ছে- বিসর্জন দেবার পরে সব কুম্ভকার শিল্পীরাই একসঙ্গে মাটি খাদানে গিয়ে শিব ঠাকুরকে স্মরণ করে কিছু মাটি কেটে বাড়ি নিয়ে আসেন। কোথাও কোথাও সন্ধ্যায় গান-বাজনার আসর বসে। আবার শুরু হয় কুম্ভকারদের দৈনন্দিন জীবন সংগ্রাম।

চাকা পূজোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা- লোককথা যাই বলুক না কেন, এই চাকা পুজো এবং মাসাধিককাল কর্মবিরতির আসল কারণ হচ্ছে প্রখর গ্রীষ্মকাল মৃৎশিল্পদ্রব্য নির্মাণের জন্য উপযুক্ত সময় নয়। গ্রীষ্মের দাবদাহে কাঁচা মাটি খুব তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায় এবং মাটির সামগ্রীতে ফাটল ধরে, শিল্পীদের ক্ষতি হয়। তাই শিবপুজো নিয়ে মানুষগুলোকে ব্যাস্ত রেখে গরমকাল পার করে দেবার জন্যই, এই লোককথার অবতারণা।

পাঁচমুড়ার শিল্পী

চলুন আলাপ করিয়ে দি পাঁচমুড়ার এক শিল্পী ও তার পরিবারের সঙ্গে। আগেই লিখেছি, পাঁচমুড়ার শিল্প ও শিল্পীদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় আদতে আমার এক উজ্জ্বল তরুণ শিল্পী বন্ধু ভূতনাথ কুম্ভকারের মাধ্যমে। ভূতনাথ বাবুর প্রপিতামহ স্বর্গীয় রাসবিহারী কুম্ভকার ছিলেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কার প্রাপ্ত শিল্পী। ১৯৬৮ – ৬৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাকির হোসেন উনাকে এই সন্মান প্রদান করেন। রাসবিহারী বাবুর ৫ সুপুত্রই রাজ্য সরকারের পুরস্কারে সম্মানিত। ভূতনাথের পিতা বীরেন্দ্রনাথ কুম্ভকার এবং কাকারাও অনেকেই রাজ্য সরকারের পুরস্কারে সম্মানিত। আর অত্যন্ত মৃদুভাষী, সুভদ্র ভূতনাথের কথা কি বলব ?

অতি তরুণ বয়সে ২০০১-২০০২ সালেই তিনি ” কৃষ্ণধেনু ” নামক এক অসাধারণ শিল্পকর্মের দ্বারা জিতে নেন রাজ্য সরকারের পুরস্কার। তারপর থেকে তাঁর পুরস্কারের ঝুলিতে যে কতরকম পুরস্কার জমা হয়েছে তার কোন ইয়ত্ত্বা নেই। তাছাড়া এশিয়ান পেইন্টস শ্রেষ্ঠ মূর্তির পুরস্কার ইত্যাদি তো আছেই, সে কথাও আগে উল্লেখ করেছি। এরকম একটা পুরস্কার পেলেই আমরা বুদ্ধিজীবী বনে গিয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করতাম! আর এই নিরহংকারী ,অসাধারণ শিল্পী মানুষটি কি বললেন জানেন ? বললেন , এতে উনার কোন কৃতিত্ব নেই, সবই ঈশ্বরের কৃপা।

ঊর্মিমালা দেবী

ভূতনাথের স্ত্রী ঊর্মিলাও কিছু কম যায়না। ২০১৮ – ২০১৯ সালে উনার নাগরাজ মূর্তিটি রাজ্য সরকারের পুরস্কার জিতে নিয়েছে। ভূতনাথের তৈরি টেরাকোটার মূর্তিগুলি দেখে বুঝতে পারবেন পাঁচমুড়ার বর্তমান টেরাকোটা শিল্প ট্রাডিশনাল কাজের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধনে কোন স্বর্গীয় স্তরে পৌঁছে গেছে।

কিন্তু কিভাবে একজন অসাধারণ শিল্পীর হাতের আঙুলের ছোঁয়ায় প্রাণ পায় একটি শিল্প সামগ্রী, সেই অংশটি কোন ভাবেই বর্ণনার দ্বারা বোঝানো সম্ভব নয়। কিভাবে ভূতনাথ বাবুর হাতে বাংলার বাউল প্রাণ পাচ্ছে- সেটি দেখতে চাইলে ইউ টিউবের ভিডিওটি ক্লিক করে দেখতে পারেন। গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যাবেন দেখলে।

আরও পড়ুন-বিশ্বকর্মাপুজোয় ঘুড়ি ওড়ানো এবং শিল্পী সম্প্রদায়ের কথা 

তথ্যসূত্র

১) পাঁচমুড়ার বিখ্যাত শিল্পী ভূতনাথ কুম্ভকার মহাশয়, এই প্রবন্ধ লেখাতে ব্যক্তিগত ভাবে তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন এবং কুম্ভকার সমাজের বারোমাস্যা বুঝতে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছেন।
২)বঙ্গলক্ষ্মীর ঝাঁপি, অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলিকাতা – ৯ ।

ছবি- লেখক।
সমস্থ মূর্তি শিল্পী ভূতনাথ কর্মকার দ্বারা নির্মিত।

লোকশিল্প নিয়ে দেখুন কৌলালের একগুচ্ছ ভিডিও প্রতিবেদন–


Share your experience
  • 364
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    364
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।