পঞ্চভূত স্থলম ও পঞ্চভূত লিঙ্গম- দেবাদিদেব শিবঠাকুরের খোঁজে

Share your experience
  • 183
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    183
    Shares

পঞ্চভূত স্থলম ও পঞ্চভূত লিঙ্গম- দেবাদিদেব শিবঠাকুরের খোঁজে।শৈবতীর্থ কথাটা অনির্দিষ্ট। শৈবতীর্থের কোনও সংখ্যা গণনা হয় না। অজস্র শৈবতীর্থ ভারতবর্ষে এবং বাইরে ছড়িয়ে রয়েছে। ভারতের সব শহর এবং প্রায় পাঁচলক্ষ গ্রামের প্রতিটিতেই এক বা একাধিক শিবমন্দির আছে। এর মধ্যে যেমন অত্যন্ত বিখ্যাত শৈবতীর্থগুলি আছে, তেমনি আছে স্থানীয় ভাবে বিখ্যাত এবং অসংখ্য অল্পখ্যাত এবং অখ্যাত শিবমন্দির। একজন মানুষের পক্ষে এক জীবনে এগুলির সবকটি দেখে ওঠা সম্ভব নয়। বর্তমান লেখক চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শৈবতীর্থে ঘুরে বেড়িয়েও একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশের বেশি দেখে উঠতে পারে নি। কিন্তু এই খুঁজতে গিয়ে যে কথাটি পরিস্কার বোঝা গেছে তা হল প্রায়োরিটাইজেশন ছাড়া কিছু করা সম্ভব নয়। তা করতে গিয়ে দেখা গেল প্রায়োরিটাইজেশন ব্যাপারটা অনেকটাই ব্যক্তিগত, অর্থাৎ নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি-ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।লিখছেন-  আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়।

একাম্বরেশ্বর মন্দির
একাম্বরেশ্বর মন্দির

শুরু হলো নতুন ধারাবাহিক–শিব ঠাকুরের খোঁজে–প্রথম পর্ব

যাই হোক, আমার ব্যক্তিগত রুচি অনুসারেই আমি শৈবতীর্থগুলি ঘুরে বেরিয়েছি, এবং বুঝেছি যে সেই খোঁজ শেষ হওয়ার নয়।
এইটুকু ভূমিকা-কাম-কৈফিয়ৎয়ের পর আমরা এখন শৈবতীর্থ পরিক্রমায় বার হব। প্রথম লক্ষ্য পঞ্চভূত স্থলম, যেখানে আছেন পঞ্চভূতের অধীশ্বর পঞ্চভূত লিঙ্গম।

পঞ্চভূত

পঞ্চভূত বলতে পাঁচটি আদি পদার্থকে বোঝায় — ক্ষিতি (পৃথিবী বা মাটি), অপ্ (জল), তেজ (আগুন), মরুৎ (বায়ু) ও ব্যোম (মহাকাশ বা শূন্য)। হিন্দুশাস্ত্র মতে কসব কিছুই এই পাঁচটি ‘ভূত’ দিয়ে তৈরী।

পঞ্চভূত লিঙ্গম ও পঞ্চভূত স্থলম

পঞ্চভূতের পাঁচটি ‘ভূত’-য়ের প্রত্যেকটির একজন অধীশ্বর শিবলিঙ্গ আছেন, তাঁদের বলা হয় পঞ্চভূত লিঙ্গম, এবং এই পাঁচটি ভূত-লিঙ্গম যেখানে অবস্থিত, সেই জায়গাগুলিকে বলা হয় ‘পঞ্চভূত স্থলম’।
এই পাঁচটি জায়গার চারটি তামিলনাড়ুতে এবং একটি অন্ধ্রপ্রদেশে। তামিলনাড়ুর পঞ্চভূত স্থলগুলি হল যথাক্রমে কাঞ্চীপুরম (ক্ষিতি বা পৃথ্বী লিঙ্গ একাম্বরেশ্বর), থিরুভনাইকাভাল (অপ্ বা জল লিঙ্গ জম্বুকেশ্বর), থিরভনমাল্লাই (তেজ লিঙ্গ অরুণাচলেশ্বর) এবং চিদাম্বরম (ব্যোম লিঙ্গ থিল্লাই নটরাজার)। আর অন্ধ্র প্রদেশে অবস্থিত পঞ্চভূত স্থলটি হল শ্রীকালহস্তি (বায়ু লিঙ্গ শ্রীকালহস্তিশ্বর)।

জম্বুকেশ্বর-মন্দির
জম্বুকেশ্বর-মন্দির

পঞ্চভূত স্থলের ভৌগোলিক অবস্থান

পঞ্চভূত স্থলগুলির ভৌগোলিক অবস্থানের একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার আছে। ঐ ‘স্থল’-গুলির ভৌগোলিক কো-অর্ডিনেট (অর্থাৎ ল্যাটিচ্যুড ও লঙ্গিচ্যুড) লক্ষ্য করলে ব্যাপারটি বোঝা যাবে।এই পঞ্চভূত স্থলগুলির ভৌগোলিক কো-অর্ডিনেট হল যথাক্রমে কাঞ্চীপুরম (একাম্বরেশ্বর) 12.50 ডিগ্রী নর্থ, 79.42 ডিগ্রী ইস্ট; থিরুভনাইকাভাল (জম্বুকেশ্বর) 10.51 ডিগ্রী নর্থ, 78.42 ডিগ্রী ইস্ট; থিরুভনমালাই (অরুণাচলেশ্বর) 12.13 ডিগ্রী নর্থ, 79.41 ডিগ্রী ইস্ট; শ্রীকালহস্তি (শ্রীকালহস্তিশ্বর) 13.44 ডিগ্রী নর্থ, 79.41 ডিগ্রী ইস্ট এবং চিদাম্বরম (থিল্লাই নটরাজার) 11.23 ডিগ্রী নর্থ, 79.41 ডিগ্রী ইস্ট।

অর্থাৎ পঞ্চভূত স্থলের পাঁচটির মধ্যে চারটির অবস্থানই 79 ডিগ্রী ইস্ট লঙ্গিচ্যুডের উপরে এবং বাকিটি অর্থাৎ জম্বুকেশ্বরের অবস্থান ঠিক 79 ডিগ্রী ইস্ট লঙ্গিচ্যুডে না হলেও তার খুব কাছাকাছি, 78.4 ডিগ্রী ইস্ট লঙ্গিচ্যুডে।
প্রসঙ্গতঃ, আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ মন্দির, যাদের মধ্যে শুধু শিবমন্দিরই নয়, বিষ্ণুমন্দির এবং মন্দির ছাড়াও কিছু হিন্দুদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়-পর্বত তীর্থস্থানও আছে যাদের অবস্থান 79 ডিগ্রী ইস্ট লঙ্গিচ্যুডে। এর মধ্যে গুরত্বপূর্ণ কয়েকটি হল :

১) পঞ্চকেদার (কেদারনাথ, তুঙ্গনাথ, রুদ্রনাথ, মদমহেশ্বর ও কল্পেশ্বর)।২) পঞ্চসভাই স্থলঙ্গল (পঞ্চসভা)-য়ের দু’টি (রত্নসভাই থিরুভনালগাডু বৃহৎ অরণ্যেশ্বরার মন্দির এবং কনকসভাই চিদাম্বরম নটরাজ মন্দির)।

৩) ষড়চক্রের অধীশ্বর ছ’টি আধার-লিঙ্গম মন্দিরের মধ্যে চারটি (মূলাধার — থিরুবারুর ত্যাগরাজা, মণিপুর — অরুণাচলেশ্বর, বিশুদ্ধাক্ষ — শ্রীকালহস্তিশ্বর ও আজ্ঞা — চিদাম্বরম নটরাজ)।

৪) সপ্তম জ্যোতির্লিঙ্গ রামেশ্বর।

৫) কুম্ভকোনামের আদি কুম্ভেশ্বর মন্দির।

৬) তাঞ্জাভুরের বৃহদীশ্বরার মন্দির।

৭) শ্রীকেদারনাথের শীতকালীন আবাস উখিমঠ এবং শ্রীবদরীনাথের শীতকালীন আবাস যোশীমঠ।

৮) বিষ্ণুর অষ্ট স্বয়ম্ভূ ক্ষেত্রের (বদরীনাথ, মুক্তিনাথ, পুষ্করের বরাহস্বামী, নৈমিষারণ্যের দেবরাজা পেরুমল, তিরুপতি বালাজী, শ্রীরঙ্গমের শ্রীরঙ্গনাথ, শ্রীমুশনামের ভূবরাহস্বামী ও বৃদ্ধাচলমের তোতাদ্রিনাথ) মধ্যে চারটি (বদরীনাথ, তিরুপতি, শ্রীমুশনাম ও তোতাদ্রিনাথ)।

৯) সপ্তবদরীর মধ্যে পাঁচটি (শ্রীবদরীনাথ, ধ্যানবদরী, অর্ধবদরী, ভবিষ্যবদরী ও যোগবদরী)।

১০) মন্দির ছাড়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান যেমন পঞ্চপ্রয়াগের তিনটি (কর্ণপ্রয়াগ, নন্দপ্রয়াগ ও বিষ্ণুপ্রয়াগ); কেশবপ্রয়াগ।

১১) কয়েকটি ধর্মীয় দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হিমালয়ের পর্বতশৃঙ্গ যেমন অলকনন্দা নদীর উৎস সতোপন্থ ও ভাগীরথী খড়ক গ্লেসিয়ারের উৎস চৌখাম্বা (30.74 ডিগ্রী নর্থ, 79.4 ডিগ্রী ইস্ট), গোমুখের উপর সদাজাগ্রত প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে থাকা ভাগীরথী পিকস (30.85 ডিগ্রী নর্থ, 79.14 ডিগ্রী ইস্ট), শ্রীবদরীনাথের মন্দিরের পিছনে গলায় হলাহল নিয়ে শিবরূপী নীলকণ্ঠ (30.72 ডিগ্রী নর্থ, 79.4 ডিগ্রী ইস্ট), গোমুখের কাছে অবস্থিত অনন্যসুন্দর শিবলিঙ্গ পীক (30.52 ডিগ্রী নর্থ, 79.03 ডিগ্রী ইস্ট) ইত্যাদি।
এই ৭৯ ডিগ্রী ইস্ট লঙ্গিচ্যুডের রহস্য নিয়ে অন্য জায়গায় বিস্তারিত আলোচনা করেছি (আমার “পাণ্ডবপ্রস্থানের পথে” বইটিতে)। এখানে সেই আলোচনার স্থান নেই।

অরুণাচলেশ্বর-মন্দির_-পিছনে-অরুণাচলগিরি
অরুণাচলেশ্বর-মন্দির_-পিছনে-অরুণাচলগিরি

পঞ্চভূত স্থলগুলির মন্দির

এই মন্দিরগুলি নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে লেখা হবে। তাই এখানে শুধু ছুঁয়ে যাওয়া হচ্ছে।

১) ক্ষিতি বা পূথ্বী লিঙ্গ একাম্বরেশ্বর
তামিলনাড়ুর কাঞ্চীপুরমের কাছে ভারতবর্ষের অন্যতম প্রাচীন মন্দির একাম্বরেশ্বর। প্রাচীন তামিল ‘সঙ্গম’ সাহিত্যে খৃষ্টপূর্ব ৩০০ সালেই এই মন্দিরটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় ২৪ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরের রাজা গোপুরমটির উচ্চতা ৫৯ মিটার (১৯৪ ফিট)। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে দেবী পার্বতী এখানে একটি আমগাছের তলায় কঠোর তপস্যা করে শিবের দর্শন পেয়েছিলেন।এই মন্দিরের ‘মন্দির-বৃক্ষ’ বা temple tree হল একটি ৩৫০০ বছরের পুরোনো আমগাছ। বলা হয় যে এই আমগাছটির চারদিকের শাখায় চার ধরণের আম হয়।

শ্রীকালহস্তিশ্বর-মন্দি
শ্রীকালহস্তিশ্বর-মন্দি

২) অপ্ বা জল লিঙ্গ জম্বুকেশ্বর

ত্রিচি বা তিরুচিরাপল্লীর কাছে থিরুভনাইকাভালে অবস্থিত জম্বুকেশ্বর মন্দির। জম্বু অর্থাৎ জাম গাছের নীচে অবস্থিত বলে শিবের নাম জম্বুকেশ্বর। বলা হয় যে এই জামগাছটি সাধারণ জামগাছ নয়, সাদা জাম (Syzygium cumini)। চোল রাজাদের আমলে তৈরী সাতটি গোপুরম ও পাঁচটি দেওয়াল ঘেরা মন্দিরে মূল শিবলিঙ্গ একটি প্রাকৃতিক ঝর্ণার জলে ঘেরা (অপ্ বা অপ্পু লিঙ্গ)। পার্বতী এখানে আছেন অখিলান্দেশ্বরী নামে। মূল মন্দিরের গর্ভগৃহের পশ্চিম দিকের দেওয়ালে জানালা দিয়ে শিবলিঙ্গ দর্শন করার প্রথা।

৩) তেজ বা অগ্নি লিঙ্গ অরুণাচলেশ্বর বা আন্নামালাইয়ার

তামিলনাডুর থিরুভন্নামালাই শহরে অরুণাচল বা আন্নামালাই পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত অরুণাচলেশ্বর বা আন্নামালাইয়ার মন্দিরে আছেন তেজ বা অগ্নি লিঙ্গ অরুণাচলেশ্বর বা আন্নামালাইয়ার। এখানে শিবের সঙ্গে পার্বতী আছেন উন্নামালাই আম্মান নামে।চোল আমলে খৃষ্টীয় ৯ম শতাব্দিতে তৈরী এই বিশাল মন্দির কমপ্লেক্সটি ১০ হেক্টার জায়গা নিয়ে অবস্থিত। পরে দাক্ষিণাত্যের বিভিন্ন রাজবংশের (বিজয়নগরের সংগম রাজবংশ, সালুভা রাজবংশ, তুলুভা রাজবংশ, নায়ক বা নায়ক্কার রাজবংশ ইত্যাদি) রাজারা এই মন্দিরটিতে নানা রকমের স্থাপত্য সংযোজন করেন।

এর চারদিকে চারটি গোপুরম আছে, তার মধ্যে পূর্ব দিকের গোপুরমটির উচ্চতা ৬৬ মিটার বা ২১৭ ফিট। এটি ভারতের সর্বোচ্চ মন্দির টাওয়ারগুলির মধ্যে একটি। এটি তৈরী করেন নায়ক রাজবংশের সেবাপ্পা নায়ক্কার।
এই বিশাল মন্দির কমপ্লেক্সে অনেকগুলি মন্দির এবং হল অর্থাৎ সভাঘর আছে, তার মধ্যে সবচয়ে বিখ্যাত হল বিজয়নগর রাজাদের আমলে নির্মিত ‘থাউজ্যাণ্ড পিলার হল’।

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে শিব আন্নামালাই পর্বতের শিখরে আগুনের স্তম্ভ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। সেই পৌরাণিক ঘটনার স্মরণে প্রতি বছর কার্তিক পূর্ণিমায় ঐ পাহাড়ের চূড়ায় একটি দৈত্যাকৃতি প্রদীপ জ্বালিয়ে ‘কার্তিগাই দীপম’ উৎসব পালন করা হয় যখন প্রায় ৩০ লক্ষ লোকের সমাগম হয়।

অরুণাচলেশ্বরের কথা বলতে গেলে মন্দির ছাড়া আর দু’টি বিষয়ের কথা না বললেই নয়। তার মধ্যে একটি হল রামন মহর্ষির (যাঁকে অনেকেই ভুল করে রমণ মহর্ষি বলেন) কথা এবং দ্বিতীয়টি হল ‘গিরিবালম’ বা অরুণাচল পর্বতকে পরিক্রমা করার কথা।

প্রথমে রামন মহর্ষির কথা।

রামন মহর্ষি (১৮৭৯ — ১৯৫০ খৃষ্টাব্দ) একজন অত্যন্ত উচ্চস্তরের ব্রহ্মজ্ঞ ঋষি ছিলেন। সারা পৃথিবীতেই তাঁর শিষ্যরা ছড়িয়ে আছেন। অরুণাচলেশ্বর মন্দিরের একটি হলের বেসমেন্টে পাতাললিঙ্গের কাছে রামন মহর্ষি তপস্যা করে সিদ্ধিলাভ করেন। মন্দির থেকে কিছু দূরে রামন মহর্ষির আশ্রম আছে।

শ্রীকালহস্তিশ্বর-লিঙ্গ
শ্রীকালহস্তিশ্বর-লিঙ্গ

এবার গিরিবালম বা অরুণাচল পর্বত প্রদক্ষিণ।

অরুণাচল পর্বতকেই স্বয়ং শিব বলে মানা হয়। একটা জিনিস খেয়াল করে দেখুন, স্বয়ং কৈলাসও কিন্তু শিব নয়, শিবের বাসস্থান মাত্র। কিন্তু অরুণাচল গিরি স্বয়ং শিব। এই পাহাড়টির চারদিকে পায়ে হেঁটে ঘোরাকে (১৬ কিলোমিটারের কছাকাছি) বলা হয় গিরি প্রদক্ষিণা বা গিরিবালম। এই গিরিবালম শাস্ত্রানুসারে করত গেলে বিশেষ তিথিতে খালি পায়ে সর্বদা অরুণাচল গিরিকে ডানদিকে রেখে শিবস্তোত্র জপ করতে করতে হাঁটতে হয়। প্রদক্ষিণা পথে আটটি শিবমন্দির পড়ে — ইন্দ্রলিঙ্গম, অগ্নিলিঙ্গম, যম লিঙ্গম, নিরুধি লিঙ্গম, বায়ু লিঙ্গম, বরুণ লিঙ্গম, কুবের লিঙ্গম এবং ঈশান লিঙ্গম। এই আটটি শিবলিঙ্গকে ‘অষ্ট লিঙ্গম’ বলা হয়। গিরিবালমের সময় এর প্রতিটি মন্দিরে পূজা দিতে হয়।

এই গিরিবালম ব্যাপারটি অত্যন্ত ভালো ভাবে অর্গানাইজড, এমনকি ভক্তদের সুবিধার জন্য গিরিবালমের সব তথ্য দেওয়া একটি অ্যাপ অর্থাৎ অ্যাপ্লিকেশন আছে যা সেল ফোনে ডাউনলোড করে নেওয়া যায়। কয়েক বছর আগে আমি যখন বিশেষ তিথির বাইরে একটি সাধারণ দিনে একা একা প্রদক্ষিণ করছিলাম, তখন স্থানীয় লোকজনের কাছে যে সাহায্য ও উৎসাহ পেয়েছিলাম, তা ভোলার নয়, যদিও সবাই জানতেন যে আমি শাস্ত্রের নির্দেশ মেনে গিরিবালম করছি না।

৪) মরুৎ বা বায়ু লিঙ্গ — শ্রীকালহস্তিশ্বর

পঞ্চভূত লিঙ্গের চতুর্থ লিঙ্গ হলেন মরুৎ বা বায়ু লিঙ্গ শ্রীকালহস্তিশ্বর। পঞ্চভূত লিঙ্গের অন্য চারটির অবস্থান তামিলনাড়ুতে হলেও শ্রীকালহস্তিশ্বর অন্ধ্র প্রদেশে তিরুপতি থেকে ৩৬ কিলোমিটার দূরে শ্রীকালহস্তিতে অবস্থিত।
এই মন্দিরকে ‘রাহু-কেতু ক্ষেত্র’ এবং ‘দক্ষিণ কৈলাস’-ও বলা হয়।

মন্দিরটির ভিতরের অংশ আনুমানিক খৃষ্টীয় ৫ম শতাব্দিতে প্রতিষ্ঠিত এবং বাইরের অংশ খৃ্ষ্টীয় ১১শ শতাব্দিতে রাজেন্দ্র চোল (প্রথম) দ্বারা নির্মিত হয়। তবে ১২০ ফিট উঁচু প্রধান গোপুরম এবং ‘১০০ পিলার মণ্ডপ’-টি তৈরী করেন সম্রাট কৃষ্ণদেবরায় ১৫১৬ খৃষ্টাব্দে। দুঃখের কথা, এই গোপুরমটি ২০১০ সালের ২৬ মে ভেঙে পড়ে। ASI-য়ের বিশেষজ্ঞদের মতে গোপুরটি ১২০ ফিট উঁচু হলেও এর ভিত ছিল মাত্র দেড়ফুট। তবে এই ভেঙে পড়া গোপুরমটিকে ৪৫ কোটি টাকা খরচ করে আবার বানানো হয়েছে এবং নতুন করে বানানো গোপুরমটি ২০১৭ সালের ১৮ই জানুয়ারি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে।

এই মন্দিরে শিবকে বায়ু রূপে পূজা করা হয়। গর্ভগৃহে শিবলিঙ্গের চারপাশে অনেকগুলি প্রদীপ সর্বক্ষণ জ্বলে। সেই প্রদীপগুলির শিখাগুলি স্থির, কিন্তু তার মধ্যে একটি প্রদীপের শিখা এমন ভাবে নড়তে থাকে যে মনে হয় কেউ যেন শুধুমাত্র এই প্রদীপটিকেই হাওয়া করছেন বা ফুঁ দিচ্ছেন। পুরোহিতরা জানালেন যে এটাই বায়ু লিঙ্গের মাহাত্ম্য। কিন্তু ওনারা কিছুতেই ভিডিও বা ফটো তুলতে দিলেন না।

প্রঙ্গতঃ, পার্বতী এখানে জ্ঞান প্রসুনাম্বিকা দেবী রূপে আছেন।

৫) ব্যোম বা আকাশ লিঙ্গ চিদাম্বরম নটরাজ

নটরাজ মন্দির বা থিল্লাই নটরাজা মন্দির তামিলনাড়ুর কুদ্দালোর জেলার চিদাম্বরমে অবস্থিত। নৃত্যের অধীশ্বর নটরাজ রূপী শিবের উদ্দেশ্যে নির্মিত বর্তমান মন্দিরটি চোল রাজাদের দ্বারা খৃষ্টীয় ১০ম শতাব্দিতে প্রতিষ্ঠিত।
এই মন্দিরটির অনেকগুলি বৈশিষ্ট্য আছে।

আরও পড়ুন- পবনপুত্র হনুমান – রামায়ণে ও পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে

প্রথমতঃ, এটি শুধুমাত্র পঞ্চভূত লিঙ্গমের ব্যোমলিঙ্গই নয়, আধার-লিঙ্গমের আজ্ঞা-চক্রের নিয়ন্ত্রক এবং পঞ্চসভাই স্থলের কনক সভাই।

দ্বিতীয়তঃ, এই মন্দিরে শিবের তিনরূপেরই পূজা হয় — নিরাকার, লিঙ্গরূপ (স্ফটিক লিঙ্গ) এবং মনুষ্যাকৃতি রূপ (নটরাজ মূর্তি)। নটরাজ রূপী শিব এখানে ‘আনন্দ তাণ্ডব’ নৃত্যরত।

তৃতীয়তঃ, শৈব ধর্মের মন্দির হলেও এখানে শাক্ত, বৈষ্ণব, সৌর, গাণপত্য ইত্যাদি মতের মন্দিরও আছে। দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন আম্মান বা দেবী মন্দির এখানেই আছে। এখানকার সূর্য মন্দিরটি খৃষ্টীয় ১৩শ শতাব্দির আগে প্রতিষ্ঠিত।

চিদাম্বরম-মন্দিরের-গোপূরম
চিদাম্বরম-মন্দিরের-গোপূরম

স্থাপত্য

মন্দির কমপ্লেক্সটি ১৬ হেক্টার জমির উপর স্থাপিত। এর মোট ৯টি গোপুরম আছে। গর্ভগৃহটিতে কেরল বা মালাবার রীতির স্থাপত্যকলার ছাপ আছে। এখানে অনেকগুলি সভামণ্ডপ বা হল আছে। মন্দিরে অনেকগুলি জলাশয় আছে, তার মধ্যে শিবগঙ্গা পুকুরটি সবচেয়ে বড়।

উপসংহার

পঞ্চভূত লিঙ্গম সম্বন্ধে একটা ‘বার্ডস আই ভিউ’ দেওয়াই এই নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য। এরপর প্রতিটি মন্দির নিয়ে আলাদা করে লেখার বাসনা রইল।

ওঁ শিবায় নমাহ।

  দেখুন কৌলালের তথ্যচিত্র


Share your experience
  • 183
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    183
    Shares

Facebook Comments

Post Author: আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

asish chottopadhyay
আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৫৬) দুর্গাপুরের একজন প্রতিথযশা স্ত্রীরোগবিশেজ্ঞ। দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার হাসতালে ৩২ বছর অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চাকরি করার পর এখন উনি সম্পূর্ণ ভাবে গরীব ও দুস্থ রোগীদের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত রেখেছেন। দেশভ্রমণ, ফটোগ্রাফি এবং বিভিন্ন বিষয়ে ইংরেজি ও বাংলায় লেখালেখি করা ওঁর নেশা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং বইতে ওঁর তোলা ফটো প্রকাশিত হয়েছে। বাংলায় লেখা ওঁর দুটি ব্যতিক্রমী উপন্যাস, একটি ছোটগল্প-সংগ্রহ, একটি কবিতার বই , একটি ছড়ার বই ও দুটি ভ্রমণকাহিনী আছে, যার মধ্যে একটি উপন্যাস (চরৈবেতি) দুবার আনন্দবাজার পত্রিকার বেস্ট সেলার লিস্টে স্থান পেয়েছিল। ইংরেজিতে ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান ও মেলা নিয়ে লেখা ওঁর শতাধিক ব্লগের প্রায় দেড় লক্ষ ভিউ আছে। বাংলার মন্দিরের উপর ওঁর ইংরেজিতে লেখা একটি গবেষণাধর্মী প্রায় দুহাজার রঙিন ফটোসমৃদ্ধ ফটোগ্রাফিক ই-বুক আছে, যেটি সাধারণ মানুষ, যাঁরা মন্দির ভালোবাসেন কিন্তু খুব পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখা পড়তে চান না, তাঁদের জন্য লেখা।।

2 thoughts on “পঞ্চভূত স্থলম ও পঞ্চভূত লিঙ্গম- দেবাদিদেব শিবঠাকুরের খোঁজে

Comments are closed.