পৌষপার্বণ– পৌষ আগলানো রাঢ় বাংলার প্রধান শস্য উৎসব

Share your experience
  • 595
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    595
    Shares

পৌষপার্বণ– পৌষ আগলানো রাঢ় বাংলার প্রধান শস্য উৎসব। এই উৎসবে জাড়িয়ে আছে নানা লোকাচার ও বর্ণময় লোক ইতিহাস।লিখছেন–সৌরভ নন্দী ।

আলপনা –পৌষপার্বণ

 পৌষপার্বণ

বাংলার পৌষ মানেই লক্ষ্মী মাস। পৌষ মানেই পিঠে,পার্বণ, মেলা, উৎসব,বনোভোজন । ইংরাজি মাসের ২৫ শে ডিসেম্বর অর্থাৎ বড় দিন, ও ইংরাজির নববর্ষ বাংলার এই পৌষ মাসেই হয়ে থাকে । আবার এই মাসকে ঘিরে গ্রাম বাংলায় রয়েছে অনেক আচার,রীতি, নিয়ম । যেমন এই পৌষ মাসে কোনো বিবাহ হয়না কারণ বাংলার ঘড়ের মেয়েকে লক্ষ্মী হিসাবে ধরে বাড়ীর মেয়েকে অন্যের বাড়ী (শশুর বাড়ী ) বিদায় জানাতে কোনো বাবা- মা ই এই  লক্ষ্মী মাসে চায়না, তাই এই মাসে বাংলা পঞ্জিকায় কোনো বিবাহের দিন থাকে না ।গোটা মাস ধরেই বাঙালি শীতের আমেজ গায়ে লাগিয়ে নলেন গুড়ের সাথে পিঠে পুলির নানা স্বাদে রসনা তৃপ্ত করে থাকে ।

 পৌষলক্ষ্মী

অগ্রহায়ন মাসে নতুন শস্য ঘরে তোলা হয়, তাই পৌষ মাসে গৃহস্থের ধানের গোলা,রান্না ঘরেরর ভাঁড়ার পূর্ণ থাকে ।তাই এই মাসকে লক্ষ্মী মাস হিসাবে ধরে গ্রাম বাংলার মানুষ পৌষকে যেন বিদায় জানাতে চায় না । যেমন শাক্ত পদাবলীতে আমরা দেখি নবমীর নিশাবাসনে দশমী প্রভাতে ‘উমা’ চলে যাবেন বলে মা ‘মেনকা’ নবমী নিশিকে চলে না যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে পুজো করেছেন “ওরে নবমী – নিশি, না হইও রে অবসান “। ঠিক তেমনি গ্রাম বাংলার গৃহস্থ মহিলারা এই লক্ষ্মী মাসের সংক্রান্তির দিন পৌষের শেষ নিশাবসান চান না। বিভিন্ন রীতি উপাচারের সাহায্যে পৌষকে যেন যেতে দিতে চাননা, সারা বছর ঘরে আগলে রাখতে চান । তাই বলা হয়-

“এসো পৌষ যেও না জন্ম জন্ম ছেড়ো না,
আঁধারে-পাঁদারে পৌষ, বড় ঘরের কোনে বোস।
পৌষ এলো গুড়ি গুড়ি, পৌষের মাথায় সোনার ঝুড়ি ।”

 পৌষপার্বণ পৌষ আগলানো

বোঝাই যাচ্ছে পৌষ মাস আসবার সাথে সাথে ঝুড়ি বোঝাই করে নতুন শস্য, ফসল নিয়ে হাজির হয় ।তাই গ্রাম বাংলার মানুষের যাতে সারা বছর এই ভাবে গৃহস্থের ভাঁড়ার শস্য এ পূর্ণ থাকে তাই পৌষ এর শেষ অর্থাৎ সংক্রান্তির দিন বিভিন্ন উপাচারের মাধ্যমে এই মাসকে আগলে রাখতে চায়। গ্রাম বাংলার অনেক জায়গায় একে ‘পৌষ আগলানো ‘ বলা হয় । যেমন বীরভূমে এবং বর্ধমানের অনেক গ্রাম অঞ্চলে পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন রাত্রিতে বা সংক্রান্তির দিন ভোর বেলায় গোবরের গোল নাড়ু (মন্ড )তৈরী করে তার মধ্যে সিঁদুরের টিপ ও দূর্বা ঘাস গুঁজে দেওয়া হয়, সেই গোল মন্ড গুলিকে তুলসী মঞ্চের সামনে, গোয়াল ঘরে, ধানের মরাই বা গোলায়, ঠাকুর ঘরে, সদর দরজায় প্রভৃতি স্থানে নতুন চালের গুঁড়ি গোল করে মারুলি দেওয়ার মতো করে ছড়িয়ে দিয়ে তার মাঝখানে একটি এই গোবরের গোল মন্ড কে রেখে মুলো ফুল ও সরষে ফুল দিয়ে বাড়ীর গৃহস্থ মহিলারা শঙ্খধ্বনি ও উলু ধ্বনির সাহায্যে পুজো করে থাকে।

 মুটলক্ষ্মী পুজো

কাত্তিক সংক্রান্তিতে নতুন ধান ঘরে তোলবার আগে আড়াই মুঠো ধান সমেত যে খড়ের আঁটিতে ‘মুট লক্ষ্মী’ পুজো হয় সেই খড়ের একটি টুকরো ও এখানে রেখে দেওয়া হয়। একেই স্থানীয় ভাষায় ‘পৌষ আগলানো ‘ বলে ।’মুট লক্ষ্মী’ পুজোর ঐ খড়ের আঁটি থেকে ধানগুলকে আলাদা করে সেই ধান এর সাথে আরো ৫ পোয়া আবার অনেক জায়গায় ৫ কেজি: নতুন ধান মিশিয়ে এইদিন নতুন ধানে উপর লক্ষ্মীর আসন পেতে অনেক জায়গায় পুজো করা হয় ।

এই ধান সারা বছর যে লক্ষ্মী পুজোগুলি হয় সেই লক্ষ্মীর আসনে পাতা হয়, এবং ভাদ্র মাসে ইন্দ্র দ্বাদশীর দিন যে লক্ষ্মী পুজো হয় সেই পুজোর পর এই ধান গুলি ঢেকিতে ছেঁটে সেই চাল এর পায়েস করে দুর্গা পুজোর আগের মধ্যে খাওয়ার হয়ে থাকে ।হাওড়া, মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম এর বেশ কিছু অঞ্চলে লক্ষ্মী ঘট ও গণেশ ঘটে পৌষ লক্ষ্মীপুজো দেখতে পাওয়া যায় ।আবার অনেক জায়গাতে মাটির ছোট ৫টি বা ৭টি বিজোড় সংখ্যার পাত্রে নতুন ধান, গম, ডাল, নুন, তেল প্রভৃতি রেখে সামগ্রী গুলিকে একত্রে করে খড় দিয়ে বেঁধে এই দিন ‘বাউরি বাঁধা’ হয় ।এবং এই সামগ্রী গুলিকে লক্ষ্মীর আসনের পাশে রেখে পুজো করা হয় ।

পৌষপার্বণ

 আউনি বাউনি

এই ‘বাউরি বাঁধা ‘ স্থানভেদে এক এক জায়গায় এক এক রীতির প্রচলন আছে , কোথাও একে ‘আউনি বাউনি ‘বলে আবার কোথাও ‘আউড়ি বাউরি’ বলে থাকে । যেমন কোনো কোনো গ্রাম অঞ্চলে ‘চুলের বিনুনি’র মতো করে খড়কে পেঁচিয়ে তার সাথে সরষের ফুল, মুলো ফুল, আম পাতা দিয়ে ‘বাউরি’ বাঁধা হয়ে থাকে।আবার কেউ কেউ এতো নিয়ম এর মধ্যে না গিয়ে খড়ের একটি টুকরো ভাড়ার জিনিসের পাত্রে ও চাল, ডালের পাত্রে রেখে ‘বাউরি বা ‘বাউনি’ বাঁধে’ । পৌষের সংক্রান্তির লক্ষ্মীপুজো বা ‘বাউরি বাঁধা’ সর্ব ক্ষেত্রে নতুন ফসলের আগমন হিসাবে মুলো ফুল ও সরষে ফুল দিতে দেখা যায় ।রাঢ় বাংলায় পৌষ সংক্রান্তিতে লাল মাটি ও গোবর দিয়ে বাড়ীর দেয়াল, উঠান নিকিয়ে নতুন চালগোলা দিয়ে সুন্দর আল্পনায় গোটা উঠান ভরিয়ে তোলা হয় ।

 পৌষপার্বণ আলপনার বৈচিত্র্য

পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন মুর্শিদাবাদ এর বেশ কিছু গ্রামঅঞ্চলে এই আল্পনার সাহায্যে একটি ‘পিঠে গাছ’ আঁকা হয়, আবার ঐখানে ‘একটি পিঠে দাও না’ এই সবও কথাও আল্পনার সাহায্যে লিখতে দেখা যায় ।কেন না ঐ দিন অনেক জায়গায় পিঠে পার্বণ হয়ে থাকে । আর একটি ঘড় আল্পনা দিয়ে এঁকে সেই ঘরে চাঁদ, সূর্য, তারা, দাঁড়িপাল্লা আঁকা হয়, আর তার মধ্যেখানে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে পুতুল আঁকা হয়ে থাকে এর একটি হলো ‘আউড়ি’ আর একটি ‘বাউরী ‘। এর সাথে রান্নার কাজে ব্যবহৃত সামগ্রী যেমন হাতা, খুন্তি, বটি, সাঁড়াশি ইত্যাদি এবং কৃষি কাজের সামগ্রী কাস্তে, কুলো, দা প্রভৃতি সামগ্রী গুলিকে রেখে আল্পনায় ব্যবহৃত চাল গোলা দিয়ে সেই সামগ্রী গুলির প্রন্ত বরাবর রেখা টেনে যেন সমআকৃতির ছাপ তুলসী মঞ্চের সামনে বা উঠনে অঙ্কন করা হয়ে থাকে । এখানে পুজো পদ্ধতির সাথে সমস্ত আঙিনা জোড়া এক বৃহৎ ক্ষেত্রের ধারণাকে কৃষি ও রান্না সমগ্রীর আকৃতির ছাপের মাধ্যমেই প্রতিকায়িত করা হয়।

 আউরি বাউরি পুজো

দ্রব্যই যেখানে আরাধ্য সেখানে দ্রব্য এর অন্তরালে ছাপই যেন আঙিনা জুড়ে আল্পনা সাদৃশ্য হয়ে চিত্রিত হয় । এর পর সন্ধ্যে বেলায় সন্ধ্যা দেবার সময় ‘আউড়ি’ ‘বাউরি ‘ আঁকা ঘরটিতে ধানের শীষ, সরষের ফুল, গাঁদা ফুল, নতুন আতপ চাল সিঁদুর চন্দন সহযোগে ধূপ প্রদীপ দিয়ে বাড়ীর মহিলারা পুজো করে । পুজোর পর একটি মাটির বড় পাত্র (মুড়ি ভাজার খোলা ) দিয়ে সেটিকে ঢেকে দেওয়া হয় ।একে স্থানীও ভাষায় ‘আউড়ি বাউরি’ পুজো বলে । এই পুজোর পর, সেই দিন পৌষ পার্বন এর পিঠে করা শুরু হয় ।এই রকম স্থান ভেদে পৌষ সংক্রান্তিতে বিভিন্ন রীতি নিয়ম গ্রাম বাংলায় প্রচলিত আছে ।

 মেলা

আবার এই দিন সংক্রান্তিতে বিভিন্ন জায়গায় মেলা অনুষ্ঠিত হয় তার মধ্যে অন্যতম বীরভূমের অজয় নদীর তীরে ‘কেন্দুলির জয়দেবর মেলা’। এই মেলায় বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক বউলের সমাগম হয় । মকর স্নানের জন্যও অনেক মানুষ অজয় নদীতে ভীড় করে । আবার গঙ্গাসাগরেও লক্ষ লক্ষ মানুষ পূর্ণ স্নানের জন্য ভীড় করে । বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূমের বেশ কিছু জায়গায় অগ্রহায়ন মাসের শেষ দিন যে ‘টুসু’ উৎসবের সূচনা হয় পৌষ সংক্রান্তিতে তা শেষ হয় । আবার দামোদর নদের তীরে বর্ধমানের বেশকিছু গ্রামে ও বর্ধমান শহরে ‘ঘুড়ি উৎসবে’ মানুষ পিঠে পার্বন এর সাথে ঘুড়ি ওড়াবার আনন্দে মেতে ওঠে ।

 আরও পড়ুন- উদ্ধারণ দত্ত- গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম এবং সপ্তগ্রামের ইতিবৃত্ত

তাই ঘর ভর্তি নতুন ফসল ও শস্য সাথে খাওয়া দাওয়া, রীতি নিয়ম, অনুষ্ঠানে বাংলার মানুষ পৌষ মাসে এবং শেষ দিন সংক্রান্তিতে এক উৎসবে সামিল হয় । তাই কবিগুরুর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে-
“পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে,
আয় রে চলে,আয় আয় আয়
ডালা যে তার ভরেছে আজ পাকা ফসলে,
মরি হায় হায় হায়,”


Share your experience
  • 595
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    595
    Shares

Facebook Comments

Post Author: সৌরভ নন্দী

সৌরভ নন্দী
বীরভূমের সিউড়ীর বাসিন্দা ।বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় এর কলেজ অফ আর্ট এন্ড ডিজাইন থেকে স্নাতক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের ছাপাই চিত্রকলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর । বর্তমানে ছাপচিত্রী হিসাবে কাজ করছেন । জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বেশ কিছু ছাপাই চিত্রের প্রদর্শনীতে সৌরভের শিল্প কর্ম ঠাঁই পেয়েছে । গ্রামীণ লোক সংস্কৃতি ও শিল্পের খোঁজে গ্রামেগুলিতে ঘুরে বেড়ান, ও সেই বিষয়ের ওপর লেখালেখি করেন।

1 thought on “পৌষপার্বণ– পৌষ আগলানো রাঢ় বাংলার প্রধান শস্য উৎসব

Comments are closed.