প্রত্নডাঙা এক আনা চাঁদপাড়া গ্রাম

Share your experience
  • 50
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    50
    Shares

আশুতোষ মিস্ত্রী

গত ২৩ শে মার্চ হোলি উৎসবের ছুটি উপলক্ষে আমাদের “মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ অ্যান্ড কালচারাল ডেভলপমেন্ট সোসাইটির ” পক্ষ থেকে সাগরদীঘি অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের খোঁজে বেরিয়েছিলাম । সাগরদীঘি নিবাসী এবং  আমাদের সংগঠনের অন্যতম সদস্য শ্রীপরিতোষ বন্দোপাধ্যায় মহাশয়ের  অনুরোধে এই অনুসন্ধান । তিনি ছাড়াও আমাদের সঙ্গে ছিলেন আমাদের সংগঠনের সম্পাদক শ্রীস্বপন কুমার ভট্টাচার্য মহাশয় , এছাড়াও  সঙ্গে ছিলেন  শ্রীসুরজিৎ বসাক , শ্রীমধুসূদন মন্ডল , শ্রীসুশান্ত সিনহা , সনাতন দাস মহাশয়ের মত মানুষজন ও আমি।

মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদীঘি থানার অন্তর্গত মনিগ্রামের বটতলা বাসস্টপ থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এক আনা চাঁদপাড়া গ্রাম। এই গ্রামটির সাথে গৌড়ের সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। চৈতন্যচরিতামৃতে সুবুদ্ধি রায় ও হোসেন শাহের কথা লেখা আছে। হোসেন শাহের পূর্বপুরুষ ছিলেন হযরত  মহম্মদের বংশধর এবং তাঁরা মক্কার সেরিফ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন ।তাঁদের অবস্থা খারাপ হলে তাঁর বাবা সৈয়েদ আশরাফ আরব থেকে ভারতে আসেন । শেষে সৈয়েদ আশরাফ তাঁর দুই ছেলে হোসেন ও ইউসুফকে নিয়ে এই গ্রামে এসে বসবাস করতে থাকেন। সৈয়েদ আশরাফ মারা গেলে বড় ছেলে হোসেন গ্রামের ব্রাহ্মণ জমিদার সুবুদ্ধি রায়ের কাছে চাকরি নেন। সুবুদ্ধি রায় সেই সময় গ্রামে দীঘি খনন করাচ্ছিলেন । তিনি হোসেনকে সামান্য বেতনের কাজে নিযুক্ত করেন। বাড়ির কাজ দেখাশোনা করা ছাড়াও  হোসেনের উপর তাঁর গো- শালার দেখাশোনার কাজও দেওয়া হয়েছিল। হোসেনের কর্তব্য জ্ঞান ও প্রভুভক্তির জন্য সুবুদ্ধি রায় খুব ভালোবাসতেন। বালক হোসেনকে লেখাপড়া শেখানোর জন্য তিনি গ্রামের কাজীকে অনুরোধ করেন । হোসেনের বুদ্ধিমত্তা দেখে কাজী খুশি হন এবং তিনি আরবী – পার্সি ভাষায় শিক্ষিত করে তোলেন। হোসেনের বাল্যকাল সম্পর্কে একটি গল্প আছে , কাজে গাফিলতির জন্য সুবুদ্ধি রায় হোসেনকে এক দিন চাবুক মেরেছিলেন।

“চৈতন্য চরিতামৃতে” লেখা আছে :

“ দীঘি খোদাইতে তাতরে মনসীর কৈল

ছিদ্র পাঞা রায় তারে চাবুক মারিল।

লোক কাহিনী অনুসারে এই ঘটনার পরে একদিন পরিশ্রান্ত হোসেন দীঘির ধারে দুপুরে গাছের ছায়ায় ঘুমিয়েছিলেন । সেই সময় হঠাৎ দুটি সাপ এসে হোসেনের মাথার উপর ফণা তুলে দাড়ায়। ইতিমধ্যে সুবুদ্ধি রায় সেখানে এসে পড়লে ঘটনাটি দেখেন। হোসেন জেগে উঠলে সুবুদ্ধি রায় বলেন তুমি ভবিষ্যতে রাজা হবে আর রাজা হলে যেন আমার কথা তোমার মনে থাকে।  এই ঘটনার পর থেকে আর সুবুদ্ধি রায় হোসেনকে গরু চড়াতে দেননি।

চাঁদপাড়ার কাজীর সঙ্গে গৌড়ের সুলতানের পরিচয় ছিল , তাই তিনি নিজ মেয়ের সাথে হোসেনের বিয়ে দিয়ে গৌড়ের দরবারে কাজে লাগিয়ে দেন। সেই সময় সুবুদ্ধি রায় চাকরি ছেড়ে গৌড়ে চলে যান। কালক্রমে হোসেন শাহ নিজ বুদ্ধি বলে সামান্য কর্মচারী থেকে উজির হন। এরপরে গৌড়ের  অত্যাচারী সুলতান সামস-উদ্দিন – মজ:ফর শাহকে হত্যা করে রাজকর্মচারী ও আমলারা মিলে হোসেন শাহকে গৌড়ের সিংহাসনে বসান। সুবুদ্ধি রায়ের ভবিষৎবাণী সফল হয়। হোসেন শাহ নিজের বুদ্ধি ও দক্ষতায় বাংলার স্বাধীন সুলতান পদে অধিষ্ঠিত হন এবং রাজ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনেন। সিংহাসনে বসে হোসেন শাহ  সুবুদ্ধি রায়কে চাঁদপাড়া ও পাশের কয়েকটি গ্রাম বিনা খাজনায় দান করতে চাইলে সুবুদ্ধি রায় গ্রাম দান নিতে চাননি । সেজন্য হোসেন শাহ বার্ষিক এক আনা কর ধার্য করে গ্রাম গুলি সুবুদ্ধি রায়কে প্রদান করেছিলেন। সেই থেকে চাঁদপাড়া গ্রামের নাম হয় এক আনা চাঁদপাড়া।  তবে শেষে সুবুদ্ধি রায়ের প্রতি হোসেন শাহ অন্যায় করেছিলেন নিজ বেগমের কথা শুনে। হোসেন শাহ সুবুদ্ধি রায়ের কাছে কাজ করার সময় তাঁর হাতে চাবুকের মার খেয়েছিলেন , সেই চাবুকের দাগ তাঁর গায়ে ছিল। সে সম্পর্কে “চৈতন্য চরিতামৃতে”র মধ্যলীলায় ২৫ নং পরিচ্ছদে লেখা আছে :

“তাঁর স্ত্রী তাঁর অঙ্গে দেখি মারণের চিনহে,

সুবুদ্ধি রায়কে মারিতে কহে রাজাস্থানে।

রাজা কয় আমার পোষ্টা রায় হয় পিতা,

তাহারে মারিব আমি ভালো নহে কথা।

স্ত্রী কহে জাতি লহ যদি প্রাণে না মারিবে,

রাজা কহে জাতি নিলে ইঁহো নাহি জীবে।

স্ত্রী মারিতে চাহে রাজা সংকটে পরিলা,

করোয়ার পানী তাঁর মুখে দেয়াইলা।”

ব্রাহ্মণ সুবুদ্ধি রায়ের মুখে ” করোয়ার পানী” ঢেলে দিয়ে জাত নষ্ট করেছিলেন।  জাত যাওয়ায় সুবুদ্ধি রায় প্রায়শ্চিত্ত বিধান নিতে সব কিছু ছেড়ে  কাশির পণ্ডিতদের কাছে যান । কাশির পণ্ডিতরা তাকে বিধান দেন –

 

“প্রায়শ্চিত্ত পুঁছিল তেহো পন্ডিতের সনে,

তারা কহে তপ্ত ঘৃত খাঞা ছাড় প্রাণে।

 

অর্থাৎ  গরম ঘি পান করে তুমি প্রাণ ছেড়ে দিলে তবেই তুমি জাত নষ্ট থেকে উদ্ধার পাবে । কোনো কোনো বইতে আবার গলানো সোনা পান করার কথাও লেখা আছে।  তিনি কিছু পান না করে কাশিতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সাথে দেখা করেন। জাতিচ্যুত সুবুদ্ধি রায় সমস্ত কথা বিস্তারিত বলেন। মহাপ্রভু বৃন্দাবন যাবার আদেশ দেন , সেখানে গিয়ে নিরন্তর কৃষ্ণ নাম সংকীর্তন করলে তার পাপ দোষ চলে যাবে । শেষ জীবন সুবুদ্ধি রায় মথুরায় নাম কীর্তন করে কাটিয়ে দিয়েছিলেন।

বর্তমানে চাঁদপাড়া গ্রাম বসতি ছেড়ে দূরে এক মাঠের কোণে ছোট একটি পুকুরের পাড়ে প্রায় ২ বিঘা জমির প্রাচীন সৌধে

ধ্বংসাবশেষের চিনহ দেখা যায়। অনেক গুলি পাথরের স্তম্ভ বা স্তম্ভাংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে  ঢিবিতে। ঢিবির সবচেয়ে উচু স্থানে বর্গাকার ইটের স্তূপ জমা হয়ে আছে । ইটগুলো আকারে বেশ বড় , অনেকটা গুপ্ত পরবর্তীকালের ইটের মত। এইরকম ইট মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্নে একমাত্র দেখা যায়। সৌধটির বিরাট আকৃতির ছিল , তবে সেটি কোনো ধর্মীয় সৌধ না সুবুদ্ধি রায়ের প্রাসাদের ভগ্ন অংশ ঠিক জানা যায়না।

রাখলদাস বন্দোপাধ্যায় “বাংলার ইতিহাস ” দ্বিতীয় খন্ডে লিখেছেন , ” এই গ্রামে একটি বৃহদাকার পুরাতন মসজিদ আছে এবং তাহার চতুষ্পার্শে আলাউদ্দিন হোসেন শাহের রাজত্ব কালের বহু শিলালিপি আবিষ্কৃত হইয়াছে”। কিন্তু বর্তমানে প্রাসাদ অথবা ঐ মসজিদের কোনো অস্তিত্ব নেই। রাখলদাস বন্দোপাধ্যায় মহাশয় ঐ মসজিদ সম্পর্কে বিশদ লিপিবদ্ধ করে রাখেননি, সেজন্য মসজিদটি ঠিক কেমন ছিল তা জানতে পারেনি।  ভগ্ন স্তূপটির সব চেয়ে উঁচু স্থানে এক পাথরের গায়ে সিঁদুরের ওঙ্কার চিনহ করা আছে এবং কয়েকটি  পোড়া মাটির ঘোড়া রাখা আছে।  স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে জানলাম উক্ত এই স্থানটি এক পীর বাবার সমাধি রূপে আসে পাশের গ্রামের মানুষ জন মানে। সেইজন্য সিঁদুর লেপন ও পোড়া মাটির ঘোড়া নিবেদন করে স্থানীয় ধর্ম ভীরু মানুষজন। সেই ব্যক্তির কাছ থেকে আরো জানলাম বছরের কোনো এক সময় এখানে খিচুড়ি ও পায়েস রান্না করে ভক্তদের খাওয়ানো হয়। তাছাড়াও ওখানে কিছু মানুষজন পিকনিক করতে আসেন ।  সৌধের নিচে কিছু মাটির উনানের চিনহ ও চোখে পড়লো। উক্ত ঢিবিটি খনন কার্য না হলে এর আসল ইতিহাস অজানায় থেকে যাবে । কিছু ধর্ম ভীরু মানুষের জন্য এই সৌধটি খনন কার্য করা আজও সম্ভব হইনি।

২০০৭ -২০০৮ ও ২০০৮-২০০৯ সালে এই সৌধ থেকে ২০০ হাত দূরে আদিবাসী পল্লীর ভেতরে ” চাঁদ ঠাকুরের ডাঙ্গা” ঢিবিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ থেকে খনন কার্য করা হয়েছিল। ক্ষেত্র সমীক্ষা ও উৎখনন করার পর প্রচুর ক্ষুদ্রাশ্ম হাতিয়ার পাওয়া যায়। ক্ষুদ্রাশ্ম হল একধরনের পাথরের অস্ত্র। প্রস্তর যুগে আদিম মানুষেরা এই পাথরের অস্ত্র দিয়ে পশু শিকার করতো। এর থেকে অনুমান করা যায় এই স্থানটি কত প্রাচীন। আরো একবার সরকারের কাছে আমাদের আবেদন করতে হবে যেন এই প্রাচীন সৌধটি খনন কার্য করা হয় সব উপেক্ষা সরিয়ে।

বিশেষ সহায়তা : শ্রীপরিতোষ  বন্দোপাধ্যায় মহাশয়।

ছবি–লেখক

তথ্য সূত্র:

মুর্শিদাবাদ থেকে বলছি (অখণ্ড) – কমল বন্দোপাধ্যায় ,

বাংলার ইতিহাস (দ্বিতীয় খণ্ড) – রাখাল দাস বন্দোপাধ্যায়,

মুর্শিদাবাদের মসজিদ স্থাপত্য – শ্রী বিজয় কুমার বন্দোপাধ্যায় ,

মুর্শিদাবাদ ইতিবৃত্ত (দ্বিতীয় খণ্ড) – সম্পাদনা – অরূপ চন্দ্র ও

মুর্শিদাবাদ অনুসন্ধান (তৃতীয় খণ্ড) – সম্পাদনা  অরিন্দম রায়।


Share your experience
  • 50
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    50
    Shares

Facebook Comments

Post Author: Ashutosh Mistri

Ashutosh Mistri
আশুতোষ মিস্ত্রী ।বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলার নবগ্রাম থানার অন্তর্গত জারুলিয়া গ্রামে । বর্তমানে বহরমপুর Ghosh AET Centre ফার্মের অ্যাকাউন্ট দেখা শুনো করেন । Murshidabad Heritage And Cultural Development এর সদস্য ও ইতিহাস বিষয়ক বই সংগ্রাহক।ক্ষেত্রসমীক্ষক।