বাংলার প্রথম বারোয়ারি পুজো গুপ্তিপাড়ার বিন্ধ্যবাসিনী পূজিত হয় জগদ্ধাত্রী পুজোর দিনে

Share your experience
  • 116
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    116
    Shares

সুমন্ত বড়ালঃহুগলীজেলার এক প্রসিদ্ধ জনপদ গুপ্তিপাড়া।   কবিকঙ্কণ মুকুন্দ রাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গলকাব্যে এই জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায়।গুপ্তিপাড়া প্রসিদ্ধ তার রথ উৎসবকে কেন্দ্র করে। গুপ্তিপাড়াকে প্রাচীন ইতিহাসের খনি বলা যেতে পারে । আধুনিক যুগের সূচনায় এই গুপ্তিপাড়ার  নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে লিখে গেছেন  এই জনপদের ১২ জন ব্রাহ্মণ । ১২ জন বন্ধু অর্থাৎ বারো ইয়ার। প্রথম বারোয়ারি পুজো গুপ্তিপাড়াতেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল।তবে সে পুজো দুর্গাপুজো নয়।বিন্ধ্যবাসিনী পুজো।সেই ঐতিহ্যবাহী পুজো আজও অনুষ্ঠিত হয় জগদ্ধাত্রীপুজোর দিনে।অনেকেই বিন্ধ্যবাসিনী আর জগদ্ধাত্রীকে এক করে দিলেও দুই দেবী স্বতন্ত্র।

বর্তমানে  সারা বঙ্গে বারোযারী পুজোর রমরমা। নানা শিল্প সুষমায় সেজে সে পুজো আজ বিশ্ব ব্যাপী প্রসারিত। কিন্তু আজ থেকে ২৬০ বছর আগে এই গুপ্তিপাড়া ১২ জন ব্রাহ্মণ যুবক মিলে প্রথম রাজবাড়ীর ঠাকুর দালান থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন উৎসবকে। উৎসব তো সকলের। রাজা বা জমিদারের আঙিনায় তা বন্দী থাকবে কেন? আজ থেকে ২৬০ বছর আগে যেন সেই বিপ্লব ঘটিয়েছিল গুপ্তিপাড়া।

কথিত আছে গুপ্তিপাড়া অঞ্চলের কিছু মহিলা স্থানীয় জমিদারবাড়িতে দুর্গাপুজা দেখতে গিয়ে অপমানিত হন, বাড়ি ফিরে তারা সে কথা জানালে পাড়ার কর্তাব্যক্তিরা  নিজেদের উদ্যোগে পুজো করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু দুর্গাপূজা তো তখন হয়ে গেছে তাই কার্ত্তিক মাসের শুক্লনবমীতে  তাঁরা পূজা আয়োজন করেন।শুরু হয় অবিভক্ত বাঙলার প্রথম যৌথ উদ্যোগে পুজো যা রাজবাড়ির আঙিনায় নয় বরং সাধারণ এর উঠানে অনুষ্ঠিত হয় লৌকিক বারোয়ারী পূজা।

দেবীর নাম হয় বিন্ধ্যবাসিনী। সেই থেকে আজও গুপ্তিপাড়ার বিন্ধ্যবাসিনী তলাতে সাড়ম্বরে পালিত হয় এই পুজো ।তৎকালীন বিভিন্ন পত্রিকায় এই ঘটনার উল্লেখ করা হয়।সেই সময় স্থানীয় ব্রাহ্মণরা  বারোজনকে নির্বাচিত করে একটি কমিটি গঠন করেন ।যারা বাংলার সম্ভ্রান্ত পরিবারের কাছ থেকে সেই সময় ৭০০০ হাজার টাকা চাঁদা সংগ্রহ করেছিলেনএই বিষয়ে শ্রীরামপুর থেকে প্রকাশিত “ফ্রেন্ডস অব ইন্ডিয়া ” পত্রিকায় ১৮২০ সালে একটি খবর প্রকাশিত হয়। যাতে লেখা হয়।

”  A new species of puja which has been introduced into Bengal within the last thirty years called Barowaree, About thirty year’s ago at Guptipara near Santipoora a twon celebrated in Bengal for it’s numerous colleges a number Brahmans formed on association for the celebration of puja independently of the rules of shastra ”

পত্রিকার প্রকাশিত খবর অনুযায়ী এই পুজা শুরু ১৭৯০ সালে । ক্যালকাটা রিভিউ পত্রিকা এই মত গ্রহণ করেছে তবে সাল নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে। বিন্ধ্যবাসিনী তলা নিবাসী উষানাথ মুখোপাধ্যায় মহাশয় এই পুজোর দ্বিতীয় বর্ষের পুজোর একটি ফর্দ খুঁজে পান। যে ফর্দের কথা শ্রী বিনয় ঘোষ তার পশ্চিম বঙ্গের সংস্কৃতি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন (পাতা ৪৭৭ ২য়সংষ্করণ) । যে ফর্দের উল্লেখিত সাল বাংলার ১১৬৭ সন অর্থাৎ ১৭৬০ সাল।সেই মতে এই পুজোর  বয়স ২৬০ বছরের।

শোনা যায় সেই সময় ব্রাহ্মণরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন জেলায় চাঁদা সংগ্রহ করতে যেতেন। ক্রমে এই বারোয়ারী পুজা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং সমগ্র বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। গুপ্তিপাড়ার বারোয়ারির সাথে শান্তিপুরের বারোয়ারি পুজোর প্রতিযোগিতার কৌতুক চিত্র কালীপ্রসন্ন সিংহ এর ” হুতোম পেঁচার নকসা’তেও পাওয়া যায়।

জমিদার বাড়ির অলিন্দ থেকে সার্বজনীন আঙিনায় উৎসবকে নিয়ে আসার ২৬০ বছরের গৌরব নিয়ে আজও সাড়ম্বরে পালিত হয়ে চলেছে গুপ্তিপাড়ার বিন্ধ্যবাসিনী পুজো।

ছবি–লেখক।


Share your experience
  • 116
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    116
    Shares

Facebook Comments

Post Author: সুমন্ত বড়াল

সুমন্ত বড়াল
সুমন্ত বড়াল লেখক ক্ষেত্রসমীক্ষক ও সংস্কৃতিসংগঠক