রামব্রহ্ম সান্যাল ও আলীপুর চিড়িয়াখানা 

Share your experience
  • 50
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    50
    Shares

রামব্রহ্ম সান্যাল

অনিন্দ্য সরকার

 

গোবিন্দপুর, সুতানুটি ও কোলকাতা, এই তিনটি গ্রাম নিয়ে হুগলি নদীর তীরে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় যে অখ্যাত শহরের পথ চলা শুরু হয়েছিল সে আজ এক তিলোত্তমা মহানগরী। অখ্যাত এই তিনটি গ্রাম থেকে তিলোত্তমা মহানগরী রূপে আত্মপ্রকাশ কিন্তু এক দিনে হয়নি। প্রায় তিনশো বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রমে সে অনেক পথ পাড়ি দিয়েছে, যার অনেকটাই আজকে ইতিহাস। সেই ইতিহাসের পথে যেমন আছে অনেক না জানা গল্প কাহিনী, তেমনই আছে অনেক জানা ইতিহাস। তিলোত্তমা মহানগরীর জানা ইতিহাসের অনেকাংশই গর্বের,  যা আজ অন্যান্য মহানগরীর ঈর্ষার কারণ। সেই গৌরবময় অতীতের অন্যতম সাক্ষী স্বরূপ আলীপুরে অবস্থিত চিড়িয়াখানা তার গৌরবগাথা বিঘোষিত করে চলেছে ।

বিখ্যাত তাজ বেঙ্গল হোটেল যেখানে অবস্থিত,  ঠিক তার বিপরীতে প্রায় ১৫৭ বিঘা জমির উপর দাঁড়িয়ে আছে ১৪৩ বছর বয়সের আমাদের চিরপরিচিত কোলকাতা চিড়িয়াখানা। একটি নির্দিষ্ট জায়গার সীমিত গন্ডির মধ্যে  বিভিন্ন রকমের বন্যপ্রাণী ও চিড়িয়া আলাদা আলাদা করে রাখা যে কষ্টসাধ্য তা আমরা একবাক্যে স্বীকার করি। এই ভীষণ কষ্টসাধ্য বিষয়কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে ভারতবর্ষের বুকে প্রথম দৃষ্টান্ত  স্থাপন করে কোলকাতা চিড়িয়াখানা। পশু পালনে সম্যক ধারণা না থাকলে বনের পশুদের শহরের  কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে স্বাভাবিক জীবন বিঘ্নিত হবার সমুহ সম্ভাবনা। চিড়িয়াখানা স্থাপনের প্রধান শর্ত কর্তৃপক্ষের এই বিষয়ে সম্যক ওয়াকিবহাল হওয়া। তবেই না মানুষের কোলাহলেও বনের পশুরা বিদ্রোহ করবে না। তাই স্বাভাবিক ভাবেই তিলে তিলে গড়ে উঠেছে এই কোলকাতা চিড়িয়াখানা। এই গড়ে তোলার প্রধান কারিগর ছিলেন একজন বাঙালি সন্তান এবং তাঁর জন্মস্থান ঐতিহাসিক মুর্শিদাবাদ জেলা।

আজও চিড়িয়াখানার প্রধান প্রবেশদ্বার দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে এই বঙ্গসন্তানের ছবি। বিখ্যাত এই মানুষটিই হলেন স্বনামধন্য রামব্রহ্ম সান্যাল। রামব্রহ্ম সান্যালের পৈতৃক বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলার বেলডাঙা থানার অন্তর্গত মহুলা গ্রামে।  অবশ্য সেইসময় গ্রামের নাম ছিল কেদারমাটি মহুলা যা আজকে নতুন মহুলা নামে পরিচিত। ১৮৫১ খ্রীস্টাব্দের ১৫ ই ফেব্রুয়ারী নবকুমার সান্যালের পুত্র  রামব্রহ্ম সান্যালের জন্ম হয় মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলায় অবস্থিত তার মামার বাড়িতে।  রামব্রহ্মের পড়াশোনা শুরু হয় বহরমপুরে। প্রত্যহ তিনি কেদারমাটি মহুলা থেকে বহরমপুর পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতেন। তার যাতায়াতের বিষয় সত্যিই অবাক করে দেয় তার কারণ কেদারমাটি মহুলা থেকে বহরমপুরের দূরত্ব প্রায় ৯ কিলোমিটার।  বহরমপুরে এন্ট্রান্স পাস করে তিনি এল. এম. এস. পড়ার জন্য কোলকাতা চলে যান এবং কোলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তার চোখে তখন ডাক্তারি পড়ার স্বপ্ন, কিন্তু তার স্বপ্নকে সফল করার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় তার নিজের দৃষ্টিশক্তি।

সুপারিন্টেন্ডেন্ট পদের তালিকা।

চোখের সমস্যার কারণে তাকে মেডিকেল এর পড়াশোনা বন্ধ করতে হয়। ডাক্তারি পড়ার সময়েই রামব্রহ্ম সান্যালের বিয়ে হয় নদীয়া জেলার শান্তিপুর নিবাসী আনন্দময় মৈত্রের মেজ মেয়ে কাদম্বিনী দেবীর সাথে। রামব্রহ্ম সান্যালের সন্তান হেমন্ত সান্যালের জন্ম হয় ১৮৭৩ খ্রীস্টাব্দের ২০ শে নভেম্বর। মেডিকেল কলেজে তার তিন বছরের শিক্ষা জীবনে তিনি স্বনামধন্য কয়েকজন শিক্ষক মশায়ের সংস্পর্শে আসেন। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন ডঃ জর্জ কিং, যিনি ছিলেন হাওড়ার শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের সুপারিন্টেন্ডেন্ট। রামব্রহ্ম সান্যাল ডঃ জর্জ কিং এর অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র ছিলেন। আলীপুর চিড়িয়াখানা তৈরির সময় থেকেই রামব্রহ্ম সান্যাল এর সাথে যুক্ত ছিলেন। ডঃ জর্জ কিং এই চিড়িয়াখানা তৈরির ব্যাপারে ছিলেন ভীষণ আগ্রহী। ডঃ জর্জ কিং,  কার্ল লুইস ও জন এন্ডারসনের মত বিশেষজ্ঞরা রামব্রহ্মের কর্মদক্ষতা ও আন্তরিকতার বিষয়ে যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করতেন। বাংলার ছোটোলাটের আদেশে ১৮৭৫ খ্রীস্টাব্দের ২ রা অক্টোবর চিড়িয়াখানা তৈরির জন্য ১৫৬ বিঘা ১৮ কাঠা ৯ ছটাক জমি অধিগ্রহণ করা হয় কোলকাতার আলীপুরে। এই অধিগৃহীত জমিতেই চিড়িয়াখানা তৈরির উদ্দেশ্যের বিষয়ে কার্যনির্বাহী কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় ১৮৭৫ খ্রীস্টাব্দের ১০ ই ডিসেম্বর। আলচ্য বিষয় ছিল কেমন করে এবং কেনো এই চিড়িয়াখানা গড়ে তোলা হবে।  চিড়িয়াখানা তৈরির একাধিক উদ্দেশ্য প্রায় এইরকম ছিল …………..

(১) সমাজের সর্ব স্তরের মানুষের জন্য আমোদ প্রমোদ, কৌতুহল জাগানো ও শিক্ষা দান করবার উদ্দেশ্যে।

(২) জীব জন্তুদের আচার আচরণের বিষয়ে পর্যবেক্ষণ।

(৩) ভারতীয় গ্রীষ্ম প্রধান জলবায়ুতে জীব জন্তুদের অভ্যস্ত করা, পোষ মানানো ও প্রজনন ঘটানো।

(৪) জীব জন্তুদের আমদানি রফতানির সূত্রে জীব বিজ্ঞানের উন্নতি ঘটানো।

মুর্শিদাবাদ জেলার মহুলায় অবস্থিত রামব্রহ্ম সান্যালের পৈতৃক ভিটেয় এইটুকু বাড়ির অংশ অবশিষ্ট আছে।

এইসব উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পরিকল্পনা রূপায়ন বা পরিকাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয়, যেমন পাখিদের খাঁচা ও বাসস্থান, হরিণের জন্য ঘাসযুক্ত উন্মুক্ত জমি, ভালুক ও বাঘ সিংহের জন্য বড়ো খাঁচা, সাপেদের থাকার জন্য জায়গা ইত্যাদি কাজ সম্পূর্ণ হলে চিড়িয়াখানার সীমানা লোহার রেলিং দিয়ে ঘিরে দেওয়া। অবশেষে ১৮৭৬ খ্রীস্টাব্দের ১ লা জানুয়ারী প্রিন্স অফ ওয়েলস সপ্তম এডওয়ার্ড আনুষ্ঠানিক ভাবে তিলোত্তমা মহানগরীর আলীপুরের এই চিড়িয়াখানার উদ্বোধন করেন। ডঃ জর্জ কিংয়ের সাথে সখ্যতার কারনে ১৮৭৬ খ্রীস্টাব্দের ২৪ শে জানুয়ারী রামব্রহ্ম সান্যাল সাধারণ কর্মচারী হিসাবে চিড়িয়াখানার কাজে যোগদান করেন। ডঃ জর্জ কিং সাহেবের অধীনে কাজ করতেন বলে সবাই রামব্রহ্মকে কিংসবাবু নামে ডাকতেন। প্রথম দিকে জে. সি. পারকার এবং জে. আন্ডারসন নামে দুইজন ব্রিটিশ পদাধিকারী চিড়িয়াখানার ডিরেক্টর পদে ছিলেন এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই ডিরেক্টর পদটি তুলে দেওয়া হয়। পরিবর্তে রামব্রহ্ম সান্যাকে সুপারিন্টেন্ডেন্ট পদে নিয়োগ করা হয় ৪০ টাকা মাসিক পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। রামব্রহ্ম সান্যালের অবিভাবক হিসেবে পরিচিত ডঃ জর্জ কিং সাহেব যেহেতু বোটানিক্যাল গার্ডেনের সুপারিন্টেন্ডেন্ট ছিলেন সেহেতু তিনি প্রতি মাসে বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে নতুন গাছের চারা বা বীজ এনে পরিকল্পনা অনুযায়ী চিড়িয়াখানার মধ্যে সবুজায়নে নিমগ্ন থাকতেন।

রামব্রহ্ম সান্যাল চিড়িয়াখানার সুপারিন্টেন্ডেন্ট পদে যোগদানের পরে এই সবুজায়নের কাজে গতি আসে। বাংলার সাবেক গভর্নর জেনারেল আর্থার ওয়েলেসলি অনেক আগেই কোলকাতার নিকটস্থ ব্যারাকপুরে ছোটোখাটো যে পশু উদ্যান গড়ে তুলেছিলেন সেখান থেকে বর্তমান গভর্নর জেনারেলের আদেশ অনুযায়ী ঐ চিড়িয়াখানার পশু পাখি কোলকাতার নতুন চিড়িয়াখানায় স্থানান্তরিত করার চেষ্টা শুরু হয়। ১৮৭৬ খ্রীস্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসে এই কাজ শুরু হয় এবং আগষ্ট মাসে প্রায় ১১ টা জন্তু এসে পৌছায়। প্রথমে এই চিড়িয়াখানার পথ চলা শুরু হয়েছিল ৩৪ জন কর্মচারী নিয়ে যা বর্তমানের বিচারে নিতান্তই কম। ১৮৭৬ খ্রীস্টাব্দের মে মাসে আর একজন বাঙালি ২৫ টাকা বেতনে চিড়িয়াখানার কাজে যোগদান করেন টিকিট সংগ্রাহক হিসেবে, যার নাম নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। অবশেষে ১৮৭৬ খ্রীস্টাব্দের ৬ ই মে জনসাধারনের জন্য চিড়িয়াখানার দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ভারতীয় ও ব্রিটিশ অভিজাত ব্যাক্তিদের দানে এই চিড়িয়াখানা পুষ্ট হতে থাকে। ময়মনসিংহের রাজা সুকান্ত আচার্য্যের সম্মানে এখানকার ওপেন এয়ার টাইগার এনক্লোজারটির নামকরণ করা হয় ময়মনসিংহ এনক্লোজার। এছাড়াও মহীশূরের রাজা চতুর্থ কৃষ্ণরাজ ওয়াদিয়ার তাঁর পশু উদ্যান থেকে অনেক পশু দান করেছিলেন এখানে। এর পর থেকেই রামব্রহ্ম সান্যালের বিখ্যাত হয়ে ওঠার স্বপ্নের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়ে যায়। সাথে সাথে ১৮৭৭ সাল থেকে রামব্রহ্মের কাজের পরিধি বৃদ্ধি পায়। ১ লা জানুয়ারী থেকে প্রতিদিন চিড়িয়াখানার সব পশুপাখির স্বাস্থ্য, অসুখ বিসুখ, খাওয়া দাওয়া ইত্যাদি নানা রকম খবর নথিবদ্ধ করার দায়িত্ব রামব্রহ্ম সান্যালের উপরে এসে পরে।

এইসব বিষয় ছাড়াও কোন পশু পাখি দান হিসেবে এসেছে, কোনটা কেনা হয়েছে বা অন্য কোনও চিড়িয়াখানা থেকে কোনও পশু পাখির বিনিময়ে এসেছে, তাও নথিবদ্ধ করে রাখার দায়িত্ব এসে পড়লো সেই রামব্রহ্মের উপর। কোনো পশুপাখি মারা গেলে তাঁদের সংখ্যা কত, কোন রোগে সেগুলো মারা গিয়েছে সবই নথিবদ্ধ করে রাখতে হতো। চিড়িয়াখানার দর্শনী হিসাবে যে অর্থ টিকিট সংগ্রাহকের কাছে জমা হয়েছে তার হিসেব, ঘোড়ার গাড়ি রাখার জন্য ও পালকি রাখার জন্য আদায় হওয়া টাকাকড়ির হিসেবও লিখে রাখতে হত। রামব্রহ্ম সান্যালের বিখ্যাত হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে কর্মকান্ডের ভূমিকা আছে তা হলো পশুপাখির উপর করা তার মূল্যবান বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা। দিনে প্রায় দুই বার তিনি পরিচালকদের সাথে চিড়িয়াখানার যাবতীয় খাঁচা ঘুরে দেখতেন। যেমন পশুদের চলাফেরা,  ওঠাবসা, খাওয়া, লেজ নাড়ানো, অস্বাভাবিক ডাক,  শ্বাস প্রশ্বাস, বিষ্ঠা ইত্যাদি সব তথ্যই তিনি নথিবদ্ধ করতেন ও নিজের লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ করতেন। জীব জন্তুদের সামান্য উত্তেজিত দেখলেই তিনি তার কারন খোঁজার চেষ্টা করতেন। চিড়িয়াখানার এইসব বিষয় গুলোর উপর তিনি সতন্ত্রভাবেই কাজ করতেন। চিড়িয়াখানার দ্বিতীয় বার্ষিক বিবরণে কার্যনির্বাহী কমিটি রামব্রহ্মের প্রশংসা করে লেখে………. “ Great credit is also due to Baboo R. B. Sanyal,  the native superintendent of the Gardens, who has worked admirably in a difficult and novel position “।

মুর্শিদাবাদ জেলার মহুলায় রামব্রহ্ম সান্যালের পৈতৃক ভিটেয় এই শ্রী শ্রী নারায়ণ মন্দিরটি এখনো টিকে আছে

ইংরেজ সাহেবরা এদেশের লোকেদের ভাল কাজের কতখানি কদর করতেন তা এই বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায়। রামব্রহ্মের এইসব গবেষণার কাজে সাহায্যের জন্য চিড়িয়াখানা চত্বরে ১৮৯২ খ্রীস্টাব্দে বাবু জয় গোবিন্দ ল্যাবরেটরি স্থাপিত হয়েছিল। নানা গবেষণার কাজ এখানে হত। রামব্রহ্ম সান্যাল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা করেছিলেন সাপের বিষ ও বিষের অষুধ নিয়ে। ১৮৯২ সালে তার লেখা বই “ A HAND BOOK OF THE MANAGE MENT OF ANIMALS IN CAPTIVITY IN LOWER BENGAL “। ৩৫১ পাতার এই বইটির প্রথম ভাগে স্তন্যপায়ী প্রাণীর ও দ্বিতীয় ভাগে পাখিদের বিবরণ আছে। রামব্রহ্মের লেখা শতবর্ষ আগের এই বইটি আজও চিড়িয়াখানা পরিচালকের কাছে অনেকটা বেদ – উপনিষদ এর মতই। চিড়িয়াখানা পরিচালনায় তাঁর অভিজ্ঞতা লব্ধ বিষয় সমৃদ্ধ এই বইটি সেই যুগে পৃথিবীর সকল জায়গার চিড়িয়াখানা তত্বাবধায়কদের কাছে ছিল একান্ত গাইড বই। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তখনকার চিড়িয়াখানার দর্শনীয় জীবজন্তুর অধিকাংশই গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের।  প্রসঙ্গত রামব্রহ্মের এই বইটিতে বর্ণিত অধিকাংশ প্রাণীই ছিল এই ধরনের।  এই কারণে ইউরোপ,  আমেরিকায় অবস্থিত অধিকাংশ শীত প্রধান দেশের চিড়িয়াখানার জন্য তাঁর লেখা বইটি ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। রামব্রহ্ম সান্যালের এই বইটি প্রকাশের পর বৃটেনের নেচার পত্রিকার বই সমালোচনা বিভাগ রামব্রহ্মের এই বইটিকে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে। নেচার পত্রিকার সমালোচনার পর রামব্রহ্মের নাম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বন্দিদশায় পশুপাখিদের উপর রামব্রহ্মের এই বই বিশ্বের অন্যতম সেরা কাজ বলে অভিনন্দিত হয়। এরপর ১৮৯৮ খ্রীস্টাব্দে ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অফ জুওলজির চতুর্থ সভায় আমন্ত্রিত হয়ে তিনি কেমব্রিজ এ যান। ১৮৯৮ খ্রীস্টাব্দের ২২ শে জুন থেকে ৪ ঠা সেপ্টেম্বর তিনি লন্ডনে অতিবাহিত করেন। এই সময়কালে তিনি লন্ডন জুওলজিকাল সোসাইটির চিড়িয়াখানা বেশ কয়েকবার ঘুরে দেখেন । লন্ডন যাবার ফলে তাঁকে তাঁর রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারের কিচ্ছু বাধার সম্মুখীন হতে হয়। তবে সব বাধা সফলতার সাথে অতিক্রম করতে সক্ষম হন। আলীপুর চিড়িয়াখানায় রামব্রহ্ম সান্যালের কর্মজীবনের শেষের দিকে স্বামী বিবেকান্দ, ভগ্নী নিবেদিতাকে সাথে নিয়ে আলীপুর চিড়িয়াখানা পরিদর্শনে এসেছিলেন। তখনকার দিনের নিয়ম অনুসারে কর্মজীবন থেকে পঞ্চান্ন বচ্ছর বয়সে অবসর নিতে হতো।  রামব্রহ্মের কর্মদক্ষতায় তাঁর ক্ষেত্রে এই নিয়মটি কার্যকরী হয়নি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি চিড়িয়াখানার সুপারিন্টেন্ডেন্ট বা তত্ত্বাবধায়ক পদে ছিলেন। চাকরি জীবনে তাঁর অসামান্য কৃতিত্বের জন্য ইংরেজ সরকার তাঁকে রায়বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। ব্রাহ্মণ সন্তান রামব্রহ্ম সান্যাল ব্রাহ্মধর্মেরও অনুরাগী ছিলেন। কোলকাতার ভবানীপুর ব্রাহ্মসমাজগৃহ স্থাপনে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। রামব্রহ্ম সান্যালের পারিবারিক জীবন কিন্তু খুব একটা সুখের ছিল না। তাঁর স্ত্রী ও একমাত্র পুত্রকে অপরিণত বয়সে হারাতে হয়। তাঁর পুত্রবধু ও নাতি নাতনিকে নিয়ে তিনি শেষ জীবন অতিবাহিত করেন। অত্যন্ত অমায়িক ও মধুর স্বভাবের মানুষ ছিলেন রামব্রহ্ম সান্যাল।

অবশেষে ১৯০৮ খ্রীস্টাব্দের ১৩ ই অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। আজকের দিনে পরিবেশ নিয়ে যে এতো সমস্যা, আজ থেকে একশো দেড়শো বছর আগে অবশ্যই তা এমন ছিল না। রামব্রহ্ম সান্যাল সেই যুগে পশুপাখি, জীবজন্তুর পাশাপাশি পরিবেশের বিষয়েও অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। চিড়িয়াখানা চত্বরে পশুপাখির পাশাপাশি গাছপালা যেভাবে লাগানো হয়েছিল তা থেকে কিছুটা অনুমান করা যায়। এছাড়া তাঁর লেখা প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীবজগত,  যেমন “ Hours with Nature “ বইটি থেকে তাঁর ভাবনা চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়। রামব্রহ্ম সান্যাল তাঁর বাল্যকাল যেখানে অতিবাহিত করেছেন সেই কেদারমাটি মহুলা গ্রামের আজকে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। এখন গ্রামের নতুন নাম হয়েছে নতুন মহুলা। তাঁর বসত বাড়ির প্রায় সবটুকুই এখন ধ্বংস প্রাপ্ত, শুধুমাত্র একটি ভগ্নপ্রায় ঘর ও আনুমানিক ১৮১৯ খ্রীস্টাব্দে নির্মিত শ্রী শ্রী নারায়ণ মন্দির আজও সেই ঐতিহাসিক বাড়ির স্থান নির্দেশ করে চলেছে। এ বড়ই দুঃখের যে আজও এই জেলার জনমানসে তাঁকে নিয়ে তেমন চর্চার অবকাশ হয়ে ওঠেনি । এই জেলার নতুন প্রজন্মের মাঝে তিনি আজও অচেনাই রয়ে গেছেন। এমন মহত ব্যাক্তির বাল্যজীবনের স্মৃতি বিজরিত মহুলা গ্রামের শেষ স্মৃতি টুকু সংরক্ষিত হলে তাঁর প্রতি কিছুটা হলেও সম্মান প্রদর্শন করা হবে।  এমন বিবিধ প্রতিভার অধিকারী রামব্রহ্ম সান্যাল আজকে আর আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর অমূল্য সব কীর্তি। বাঙালী তথা মুর্শিদাবাদ বাসি হিসেবে আমরা গর্বিত।

ইনিই হচ্ছেন বর্তমান বংশধর সোমনাথ সান্যাল

ততথ্যসূত্র : ROLE OF RAM BRAMHA SANYAL IN INITIATING ZOOLOGICAL RESEARCHES ON THE ANIMALS IN CAPTIVITY এবং পঙ্কজ কুমার দত্তের লেখা একটি প্রবন্ধ।

ঋণ : বংশধর সোমনাথ সান্যাল ও রেলকর্মী শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।

 

 


Share your experience
  • 50
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    50
    Shares

Facebook Comments

Post Author: anindyakoulal

অনিন্দ্য সরকার
অনিন্দ্য সরকার । গ্রাম : বড়দহ। পোস্ট : কলাডাঙ্গা। থানা : দৌলতাবাদ। জেলা : মুর্শিদাবাদ। ইতিহাসপ্রেমী।ক্ষেত্রসমীক্ষক।