বাঙালি উদ্যোগপতি  রামদুলালদের বাড়ির  দুর্গাপুজো

Share your experience
  • 20
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    20
    Shares

ডা.তিলক পুরকায়স্থ

 

কে এই রামদুলাল দে ? ইনি সেযুগের এমন এক ব্যক্তি, যাঁর জীবনকথা সিনেমার গল্পের থেকেও রোমাঞ্চকর। ১৭৫২ সালে দমদমের কাছে রেকজানি নামক গ্রামে তাঁর জন্ম। কৈশোরে মাতৃ পিতৃহীন একেলা বালক, একমাত্র অভিভাবক ঠাকুমার হাত ধরে দুমুঠো অন্নের খোঁজে চলে এলেন কলকাতায়। ঠাকুমা রাঁধুনির কাজ নিলেন, হাটখোলার বিত্তশালী জাহাজ ব্যবসায়ী মদনমোহন দত্তের বাড়িতে।আর হাতে পায়ে ধরে অনাথ কিশোরটিকে ঢুকিয়ে দিলেন জাহাজ কারখানায়, বিল সরকারের চাকরিতে। মাসিক মাইনে পাঁচ টাকা।কিন্তু বয়স কম হলেও বেনিয়া বুদ্ধিতে যে রামদুলাল কিছুমাত্র কম ছিলেন না, তা প্রমাণিত হয় কিছুদিনের মধ্যেই।একটি জলে ডোবা জাহাজ ১৪০০০/- টাকায় কিনে(?),  টাকা জমা করবার পূর্বেই এক সাহেব কোম্পানিকে পটিয়ে ১ লক্ষ টাকায় সেই জাহাজ বেচে দেন। মাত্র পাঁচ টাকার কর্মচারী পুরো লভ্যাংশ তাঁর মালিককে দিতে গেলে, মদনমোহন বাবু সামান্য কর্মচারীর অসামান্য সততা ও ক্ষুরধার বুদ্ধি দেখে চমৎকৃত হয়ে, পুরো টাকাটাই রামদুলালকে দান করে  ব্যবসায় খাটানোর পরামর্শ দেন।রামদুলাল নতুন কোম্পানি খুলে নাম দেন- ফার্গুসন এন্ড কোম্পানি।রামদুলালের বিশেষত্ব ছিল, ব্রিটিশ জমানায় তিনি বিভিন্ন আমেরিকান কোম্পানির মুৎসুদ্দি হিসাবে কাজ করতেন। এমন কি চীন দেশের সঙ্গেও তাঁর বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। ভুললে চলবেনা যে, মাত্রই ১৭৭৬ সালে, মার্কিনদেশ, ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে স্বাধীন হয়েছে।

আরেকটা কথা,  টাকা তো অনেকেই রোজগার করেন, নিজের জন্য খরচা করেন, সমাজের উন্নতিতে কজন ব্যয় করেন ? সেযুগে রামদুলাল বাবু কিভাবে ব্যয় করতেন একটু দেখি।

বেলগাছিয়াতে এক বিশাল অথিতি নিবাস তৈরি করে, প্রতিদিন ১০০০ লোককে সিধা দান করা হত। হিন্দু কলেজ তৈরিতে ৩০০০০/- টাকা, বেনারসের শিবমন্দির নির্মাণে ২,২২,০০০/- টাকা, মাদ্রাজের দুর্ভিক্ষে ১,০০,০০০/-টাকা, এমন অসংখ্য সামাজিক কারণ ও প্রকল্পে তাঁর প্রভূত দান আছে। এত দান ধ্যানের পরেও ৭৩ বছরের পরিণত বয়সে মৃত্যুর সময় তাঁর সম্পত্তির পরিমান ছিল ১ কোটি ২২ লক্ষ টাকা। আজকের দিনে কত হতে পারে ভাবতে পারেন !

রামদুলাল দের দুই পুত্র। আশুতোষ দে বা ছাতু বাবু এবং প্রমথনাথ দে বা লাটু বাবু।এঁরা দুজনেও বাবার মতন বিদেশী কোম্পানির বেনিয়ান বা মুৎসুদ্দির কাজ করে প্রচুর উপার্জন করেছেন।

রামদুলালের পদবি দে বা দেব। তিনি সরকারের কাজ করতেন বলে তাঁর নামাঙ্কিত রাস্তার নাম রামদুলাল সরকার স্ট্রিট।

এই বাড়িতে দুর্গাপূজা শুরু করেন রামদুলাল বাবু- ১৭৮২ সালে।বর্তমানে লাটু বাবুর পুত্র অনাথনাথ দেব ট্রাস্টের পক্ষ থেকে পুজোর খরচাপাতি বহন করা হচ্ছে।

ছাতুবাবু ও লাটুবাবুর ঠাকুরদালানের প্রতিমার- একচালা ডাকের সাজ। দেবীর সঙ্গে ঘোটক মুখো সিংহ, এবং মায়ের দু পাশে থাকেন দুই সখী- জয়া ও বিজয়া। আরো উপস্থিত রাম এবং হনুমান সঙ্গে মহাদেব তো থাকবেনই।বেশিরভাগ সাবেকি বাড়িতেই ঘোটক মুখো সিংহের উপস্থিতি চোখে পড়বে।এই নিয়ে আমার বিশেষ কিছু জানা নেই, তবে অনেক হিন্দু মন্দির স্থাপত্য নকশায় ইয়ালি বা ভায়েলা বা ভিদালা বলে এরকম এক কাল্পনিক প্রাণীর নকশা দেখা যায়, বিশেষ করে মন্দির স্তম্ভগুলিতে।আরো জানাই যে দক্ষিণ ভারতের একটি প্রচলিত বিশ্বাস হচ্চে, সিংহমুখ এবং সুরাপদমন ছিল অসুরদের দুই ভাই।একবার দেবসেনাপতি কার্তিক বা মুরুগার সঙ্গে সিংহমুখ অসুরের লড়াই হয়েছিল। সিংহমুখ অসুরের সেই লড়াই দেখে দেবতারা সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে মানাস্থলা বা মা দুর্গার বাহন সিংহে রূপান্তরিত করেন।আর বাঙালিরা শ্রী শ্রী চন্ডী (মার্কণ্ডেয় পুরাণ)অনুসারে বিশ্বাস করে হিমালয় মা চন্ডী কে তাঁর বাহন সিংহ দান করেছিলেন।

পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজনের ভিড়ে ঠাকুরদালান গম গম করছে। পুজোয় পশুবলি হয়না, আখ ও চালকুমড়ো বলি হয়।নবমীর দিন কুমারী পুজো, কিন্তু এবাড়ীর পুজোর বিশেষত্ত্ব হচ্ছে, পরিবারের সর্বজ্যেষ্ট বধূ, কুমারী কন্যাকে নির্বাচিত করেন এবং নিজেই এই কুমারী পূজা করেন।

 

(কুমারী পূজা অনেকেই দেখেছেন, কিন্তু এর উদ্দেশ্য কি ? কুমারী কন্যা নারীর বীজাবস্তা। নারীকে সন্মান করতেই এই পূজা, অর্থাৎ নারী পূজ্যা, ভোগের সামগ্রী নয়।এভাবে চিন্তা করলে তবেই মানুষ, উচ্চ স্থরে উন্নীত হতে পারবেন।দেবীজ্ঞানে সর্বজাতের, সর্বধর্মের কুমারীই পূজ্য।অনধিক ষোল বছরের অরজ:স্বলা কুমারী কন্যা পুজো করা হয়।বয়স অনুসারে কুমারীকে ডাকা হয় বিভিন্ন নামে।যেমন ১ বছরের বালিকাকে – সন্ধ্যা, ২ বছর-সরস্বতী, ৩ বছর -ত্রিধামূর্তি, ৪ বছর-কালিকা, ৫ বছর- সুভাগা, ৬ বছর-উমা, ৭ বছর-মালিনী, ৮ বছর-কুঞ্চিকা ইত্যাদি।)

 

নবমীতেই আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধবদের অন্নভোগের নিমন্ত্রণ করা হয়।একসময় এই পরিবারের রমরমার যুগে দশমীতে নীলকন্ঠ পাখি উড়িয়ে দেওয়া হত। এখন এসব বন্ধ, তবে বিসর্জনের আগে কনকাঞ্জলি রীতি পালিত হয়।কনকাঞ্জলি রীতি হচ্ছে বিসর্জনের পূর্বে মায়ের উদ্দেশ্যে দানবিশেষ। একটি রুপোর পাত্রে সিঁদূর, তন্ডুল, দূর্বা ঘাস, সোনা- রুপার মুদ্রা ইত্যাদি রাখা হয়।মায়ের মূর্তির সামনে পরিবারের সর্ব জ্যেষ্ঠ বধূ দুই হাতে শাড়ীর আঁচল মেলে ধরেন এবং কোন পুরুষ সদস্য সেই প্রসারিত আঁচলের মধ্যে দেবী-মাকে উদ্দেশ্য করেই রুপোর পাত্রে রাখা দ্রব্যগুলি ঢেলে দেন।

 

তথ্যসূত্র:

১) কলকাতা বিচিত্রা, রাধারমন রায়, দেব সাহিত্য কুটির, জানুয়ারি ২০১১।

২) ইতিহাসের কলকাতা, সংগ্রহ সম্পাদনা কমল চৌধুরী

৩) অভিজিৎ ধর চৌধুরী।

ছবি– বন্ধুবর অভিজিৎ ধর চৌধুরী।


Share your experience
  • 20
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    20
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।