রামগঞ্জ তাম্রশাসনের ঈশ্বর ঘোষই কি ইছাই ঘোষ?

Share your experience
  • 113
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    113
    Shares

ডা.তিলক পুরকায়স্থ

 

এর আগের প্রথম তিনটি পর্বে আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল – ইতিহাসে ও কিংবদন্তিতে ভরা গড় জঙ্গল, ইছাই ঘোষ ও গোপভূমির কথা। সেখানে দেখানো হয়েছে, ধর্মমঙ্গল কাব্যের দুটি চরিত্র ইছাই ঘোষ এবং রাজা হরিশ্চন্দ্রের কথা, আদতে গোপভূমির রাজকাহিনী।

তবে ইছাই ঘোষ কিন্তু কেবল ধর্মমঙ্গল কাব্যের অন্যতম নায়ক নন, তিনি ছিলেন একজন রক্ত মাংসের ঐতিহাসিক চরিত্র। আসছি সেই কথায়-

১৮৩৩ সালে বর্তমানের বাংলাদেশের দিনাজপুরের, রামগঞ্জ নামক গ্রামে  ঈশ্বর ঘোষের নামাঙ্কিত একটি অতি মূল্যবান তাম্রশাসন আবিষ্কার হলে, হৈ হৈ পরে যায়। এটিই বিখ্যাত ” রামগঞ্জ তাম্রশাসন ” । পাল যুগের সমসাময়িক এত বিখ্যাত ঐতিহাসিক দলিল আর দুটি নেই। অনেকের মতে ইছাই ঘোষ আর  তাম্রোশাসনোক্ত ঈশ্বর ঘোষ একই ব্যক্তি।

রামগঞ্জ তাম্রশাসন নিয়ে বিস্তৃত বর্ণনা পাচ্ছি , রাজশাহী জেলার বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটির ভূতপূর্ব কিউরেটর শ্রী ননীগোপাল মজুমদারের অসাধারণ বই ” ইন্সক্রিপসন অফ বেঙ্গল” নামক গ্রন্থে। এই বই থেকে জানতে পারছি সম্ভবত ১৮৩৩ সালের কিছু আগে, অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার রানিসংকোল থানার নিকটবর্তী রামগঞ্জ নামক স্থানে এই  তাম্রশাসন আবিষ্কার হয়, তাই এটিকে বলা হয় রামগঞ্জ তাম্রশাসন। কিন্তু রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বইয়ে লেখা আছে যে, দিনাজপুর জেলার রাজ এস্টেটে দপ্তরখানায় এটি বহুদিন ধরে রক্ষিত ছিল পরে ১৮৩৩ সালে কোর্ট-অফ-ওয়ার্ডস দ্বারা এটি  মালদোয়ার রাজবংশের সম্পত্তি হিসাবে পরিগণিত হয়ে এসেছে। এই রামগঞ্জ তাম্রশাসনে লিখিত লিপির প্রথম পাঠোদ্ধার করেন দ্বারভাঙ্গা জেলার জনৈক পন্ডিত বাচ্চা ঝা মহাশয় । তবে উনি উনার আবিষ্কার প্রকাশ করেননি, নিজের খাতায় লিপিবদ্ধ করে রাখেন।

রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে এর পরে ” শ্রীযুক্ত অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় মহাশয় এই তাম্রশাসনের পাঠোদ্ধার করিয়াছেন, কিন্তু তিনি ইহার কাল নির্দ্দেশ করেন নাই।”এই রামগঞ্জ তাম্রশাসনের দুই পৃষ্টেই মহামান্ডলিক ঈশ্বর ঘোষের  আদেশ খোদাই করা আছে। এটি দৈর্ঘ্যে সাড়ে নয় ইঞ্চি, প্রস্থে সাড়ে আট ইঞ্চি। রামগঞ্জ তাম্রশাসনটি উদ্ধারের সময় দেখা যায়, এটির একটি অংশ ভেঙ্গে গেছে- তাই সামনের দিকের ১ – ৯ লাইনের শেষের অংশ এবং পিছন দিকের ২৭ – ৩৫ লাইনের প্রথমের কিছু অংশ পড়া যাচ্ছে না।

এই লিপিতে ঈশ্বর  ঘোষের বংশের বংশলতিকা পাওয়া যায়। বংশের শুরু দেখানো হয়েছে ধূর্ত ঘোষের হাতে। তাঁর পুত্র বালা ঘোষ ছিলেন এক অসাধারণ যোদ্ধা। এঁঁর পুত্র ধবল ঘোষ এবং পুত্র বধূ সদ্ভবার পুত্রই হচ্ছেন মহামান্ডলিক ঈশ্বর ঘোষ।

বিখ্যাত ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বাঙলার ইতিহাস’ গ্রন্থের একাদশ পরিচ্ছেদে, ২৬৭ নাম্বার পাতায় ঈশ্বর ঘোষের রামগঞ্জ তাম্রশাসনের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, “রাঢ়দেশের অধিপতির পুত্র ধূর্ত ঘোষ। তাঁর পুত্রের নাম শ্রী বাল ঘোষ। বাল ঘোষের পুত্রের নাম ধবল ঘোষ। সদ্ভাবনা নাম্নী পত্নীর গর্ভে ধবল ঘোষের ঈশ্বর ঘোষ নামক এক পুত্র জন্মগ্রহণ করিয়াছিল। ঈশ্বর ঘোষ ঢেক্করী হইতে পিয়াল্ল মন্ডলান্তপাতি গাল্লিটিপ্যাক্ বিষয় সম্ভোগ দিগ্য়া সোদিকা গ্রামটি ভার্গবগোত্রীয় ভট্ট শ্রী নিব্বোক শর্মা নামক জনৈক যদুর্বেদীয় ব্রাহ্মণকে মার্গ শীর্ষের সংক্রান্তিতে জটোদয় স্নান করিয়া প্রদান করিয়াছিলেন। এই তাম্রশাসন ঈশ্বরঘোষের পঞ্চত্রিংশ রাজ্যাঙ্কে সম্পাদিত হইয়াছিল।”

আবার ফিরে চলি ঐতিহাসিক  ঈশ্বর ঘোষের  কাছে। প্রথমেই যা অনুভূত হচ্ছে, সেটি হচ্ছে বাঙালি জাতির কাছে     ঈশ্বর ঘোষ একেবারে বিস্মৃত,অপাংক্তেয় হয়ে গেছেন। দু- একজনের কাছে তিনি ধর্ম মঙ্গলের কাব্যের একটি চরিত্র বৈ আর কিছু নন ! আর ইতিহাসবিদদের কাছে তিনি একজন সামান্য সামন্ত রাজা মাত্র। কিন্তু এই বিস্মৃতপ্রায় সামন্ত রাজার তাম্রশাসনেই পালযুগের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার এত বিস্তৃত বর্ণনা দেওয়া আছে যে, আর কোন লিপি, শিলালেখ, বা তাম্রশাসনে এমন বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়নি।   ঈশ্বর ঘোষের তাম্রশাসনে সেযুগের রাজা-রানী-রাজ কর্মচারী-অন্যান্য কর্মচারীদের নামের এক বিস্তারিত তালিকা দেখতে পাচ্ছি “ইন্সক্রিপসন অফ বেঙ্গল” নামক ইংরেজী বইটিতে । এই তালিকাটির বঙ্গানুবাদ দেখতে পাচ্ছি বিনয় ঘোষের, “পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি” বইয়ে। সেখান থেকে সম্পূর্ণ তালিকাটি উদ্ধৃতির মধ্যে তুলে ধরছি-” এই মহামান্ডলিক ঈশ্বর ঘোষ তাঁর তাম্রশাসনে যাঁদের উপর আদেশ জারী করছেন তাঁদের মধ্যে আছেন :

রাজন রাজ্ঞী রাজন্যক রানক রাজপুত্র কুমারমাতা মহাসান্ধি বিগ্রহিক মহাপ্রতিহার মহাকরণাধ্যক্ষ মহামুদ্রাধিকৃত মহাক্ষপটলিক মহাসর্বাধিকৃত মহাসেনাপতি মহাপাদমুলিক মহাভোগপতি মহাতন্ত্রাধিকৃত মহাব্যূহপতি মহাদন্ডনায়ক মহাকায়স্থ মহাবলাকষ্টিক দন্ডপানিক কোট্টপতি হট্টপতি ভুক্তিপতি বিষয়পতি ঔথিতাসনিক মহাবলাধিকরণিক মহাসামন্ত মহাকটুক ঠক্কুর অঙ্গিকরণিক অন্ত:প্রতিহার দণ্ডপাল খন্ডপাল দুঃসাধ্যসাধনিকচৌরোদ্ধরণিক উপরিক তদানিযুক্তক আভ্যন্তরিক বাসাগারিক খড়গগ্রাহ শিরোরক্ষিবৃষধানুস্ক একসরক খোল দূত গমাগমিক লেখক দূতপ্ৰৈষনিক পানীয়াগারিক সান্তকিক কর্মকর গৈলমিক শৌলকিক এবং অন্যান্য রাজাজ্ঞাধীন কর্মচারী।”

আমার ক্ষুদ্রবুদ্ধিতে সামান্য প্রশ্ন জাগে- একজন সামান্য সামন্ত নৃপতির অধীনে কি করে এত বিভিন্ন ধরনের রাজকর্মচারী এবং অন্যান্য কর্মচারী থাকতে পারে। কিম্বা ঘুরিয়ে বললে, এত বিচিত্র রাজকর্মচারীদের নিয়োগকর্তা কি কেবলমাত্র একজন সামান্য গোয়ালা সামন্ত রাজা হিসাবেই গণ্য হতে পারেন ?

অনেকেই হয়ত ইছাই ঘোষের দেউল বেড়াতে গেছেন।

রাঢ় বাংলার এক সুবিস্তৃত এলাকা বা তৎকালীন গোপভূমির এক উজ্জ্বল  ইতিহাসের কথা  আমরা প্রায় কেউই জানিনা, আমাদের ইতিহাসের পাতায় মোগল, পাঠান, ইংরেজ থাকে- বাংলার স্থানীয় ইতিহাস থাকেনা। তাই আমরা ইছাই ঘোষ থেকে অমরারগরের প্রাচীন ইতিহাস বিস্মৃত। মিথ ও ইতিহাসের মেলবন্ধনে আমার   বাংলার ইতিহাস তুলে ধরার এই প্রচেষ্টা এখানেই শেষ করছি।

 

তথ্যসূত্র:-

১) গৌড় কাহিনী, শ্রী শৈলেন্দ্র কুমার ঘোষ। ডি এম লাইব্রেরি, ৪২ কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিট, কলকাতা ৬ ।

২)পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি, প্রথম খন্ড, বিনয় ঘোষ। প্রকাশ ভবন, কলিকাতা ৭০০০১২।

৩)মিথ পঞ্চদশ, মন্দিরের মিথ, মিথের মন্দির, কৌশিক দত্ত। পার্চমেন্ট।

৪) গড়ের মা, তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রাম-ডানজোনা, পোষ্ট:- রামপুর, থানা – মহাম্মদ বাজার, জেলা- বীরভূম, ৭৩১১২৭  ।।

৫) বাঙ্গালার ইতিহাস, প্রথম খন্ড, দ্বিতীয় সংস্করণ। শ্রীরাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়  প্রণীত। মনোমোহন প্রকাশনী, কলেজ স্ট্রিট।

৬) INSCRIPTIONS OF BENGAL, NANI GOPAL MAJUMDAR, SANSKRIT PUSTAK BHANDAR. Bidhan Sarani, Kolkata.

 

ছবি পরিচিতি

১) ইছাই ঘোষের দেউলের কাছে, প্রাচীন ভাঙা মন্দির।২) গড় জঙ্গলের পাহারাদার।৩) মেধা মুনির আশ্রমের জগদ্ধাত্রী মূর্তি।৪) ইছাই ঘোষের দেউল।৫) দেউলের পাশেই বয়ে চলেছে অজয় নদ।৬) ইছাই ঘোষের পূজিত প্রাচীন শ্যামরুপা চণ্ডী মন্দিরের উপরে নির্মিত আধুনিক মন্দির।

 


Share your experience
  • 113
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    113
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।