রামরাজাতলার রামরাজা

Share your experience
  • 65
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    65
    Shares

রামরাজাতলার রামরাজা

আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

ভূমিকা

আচ্ছা, শ্রীরামের কি গোঁফ ছিল, মানে রাম কি গোঁফ রাখতেন, নাকি ক্লিন শেভড ছিলেন?

প্রশ্নটা শুনে ভাবছেন তো আমার মাথা খারাপ, বা নিদেন পক্ষে বুদ্ধি নেই? না না, আপনাদের কোনও দোষ নেই। এই রকম উদ্ভট্টে চিন্তা মাথায় আসা ছাড়া আমি কিন্তু একদম নিপাট ম্যাঙ্গো পিপুল, অর্থাৎ আম জনতা। কিন্তু ভেবে দেখুন তো, প্রশ্নটা কি একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো?

মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরাম এই মুহুর্তে হট ইন-থিং। তাঁকে নিয়ে তাঁর ভক্ত ও অভক্তরা মিলে এমন হইচই লাগিয়েছে যে তাঁকে নিয়ে কিছু বলতে গেলেই ভক্ত অথবা অভক্তের ব্র্যাণ্ড গায়ে লেগে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। তবুও কিছু ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবার মত পাবলিক চিরকালই থাকে, আম্মো আছি।

যাক সে কথা। আসল প্রশ্নটায় আসি। ভাববেন না মনের খেয়ালে একটা যাচ্ছেতাই সাবজেক্ট নিয়ে আলফাল বকছি। এর পিছনে একটা উদ্দেশ্য আছে।

এই ভূমিকাটুকুর পর আমরা ঐ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বেরোবো। প্রথমে খোদ রামায়ণে, তারপর পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে। সবশেষে যাবো আমাদের আসল উদ্দেশ্য সন্ধানে।

 

কৃত্তিবাসী রামায়ণ ১

রামায়ণে রামের গোঁফ

এই মুহূর্তে আমার কাছে তিনটি রামায়ণ আছে – একটি কৃত্তিবাসী রামায়ণ (গীতা প্রেস, গোরখপুর) ও দুটি বাল্মীকীয় রামায়ণ (গীতা প্রেস, গোরখপুর ও ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের স্বামী অরুণানন্দের)।

প্রথমে বাল্মীকীয় রামায়ণটাই ধরা যাক।

গীতা প্রেসের বাল্মীকীয় রামায়ণের প্রথম খণ্ডটিই আমার কাছে আছে (বালকাণ্ড থেকে কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ড)। এই বইটিতে শ্রীরামের কোনও ছবি নেই।

স্বামী অরুণানন্দের বইটির মলাটে একটি ও ভিতরে ২১টি ছবিতে শ্রীরামকে দেখা যাচ্ছে – সবক’টি ছবিতেই শ্রীরাম ক্লিন শেভড।

এবার কৃত্তিবাসী রামায়ণ।

আমার কাছে যে বইটি আছে, তার মলাটেই রামরাজার ছবি, তাতে শ্রীরাম ক্লিন শেভড। ভিতরে শ্রীরামের আরও পাঁচটি ছবি আছে, সবক’টাতেই শ্রীরাম গোঁফদাড়ি-হীন।

এ তো গেল বইয়ের ছবির কথা। তাতে শ্রীরামের ছবি দেখে কোন ডেফিনিট কনক্লুজনে আসা না গেলেও একটা কথা বলাই যায় যে সাধারণভাবে মানুষের মনে শ্রীরামের যে ছবিটা ভাসে, তাতে শ্রীরাম দাড়িগোঁফ বিহীন।

বাল্মীকি রামায়ণ

এবার ছবি ছেড়ে টেক্সটে আসা যাক। আমার পড়ার অক্ষমতা হতে পারে, কিন্তু আমি এই তিনটি বইতে শ্রীরামের গোঁফদাড়ির কোনও ডিরেক্ট রেফারেন্স পাইনি। শ্রীরাম (ও লক্ষ্মণের) জটার ব্যাপারে রেফারেন্স পাচ্ছি  অযোদ্ধাকাণ্ড ৫২।৬৭ ও ৬৮ শ্লোকে যেখানে শ্রীরাম নিষাদরাজ গুহকে বলছেন “আমি …তপস্বীদের মত জটা ধারণ করবো”, অর্থাৎ তখনও পূর্ণ তপস্বীরূপ ধারণ করেন নি। প্রকৃতপক্ষে পরের শ্লোকেই (অযোদ্ধাকাণ্ড ৫০।৬৯) আছে ‘নরশ্রেষ্ঠ দীর্ঘবাহু রামচন্দ্র বটক্ষীরের দ্বারা লক্ষ্মণের এবং নিজের জটা তৈরী করে জটাধারী হলেন’। কিন্তু এখানে গোঁফদাড়ির ব্যাপারে কিছু বলা হয় নি। তবে তপস্বীদের মত জটা ধারণ করে কি কেউ আর দাড়িগোঁফ কামায়? তাই বাই ডিফল্ট ধরেই নিতে হবে বনবাসের সময় শ্রীরামের গোঁফদাড়ি ছিল। যুদ্ধজয়ের পর রাজ্যাভিষেকের সময় নিশ্চয়ই শ্রীরামের জটা ছিল না, কাটা হয়েছিল, সঙ্গে দাড়িও বিদায় হয়েছিল নিশ্চিত। কিন্তু গোঁফ? লেখা নেই।

এবার আসি পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণের কথায়।

রামরাজাতলার হনুমান

পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে শ্রীরামের গোঁফ

পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে শ্রীরামকে প্রধানতঃ দুই রূপে দেখানো হয় – রামায়ণের নায়ক ও বিষ্ণুর অবতার।

আমার দেখা একশোর বেশি মন্দিরথেকে সংগ্রহ করা এই দুই রকমের শ্রীরামের যত ছবি (টেরাকোটা, স্টাকো বা পাথর) আমার সংগ্রহে আছে, তার মধ্যে শুধুমাত্র একটি রামরাজা প্যানেলে (পূর্ব বর্ধমানের শ্রীবাটির শিবমন্দিরে) শ্রীরামের গোঁফ আছে (শুধু গোঁফ, দাড়ি নয়)। এই ছবিটি টেরাকোটা ফলকের।

যদিও আরও বহু মন্দির আছে যা আমার দেখা হয় নি, তবু আমার দেখা অতগুলি মন্দিরের বহু ছবির মধ্যে একটিমাত্র ছবিতে শ্রীরামের গোঁফ থাকার অর্থ সাধারণ মানুষের ধারণায় শ্রীরামের যে রূপ, তা দাড়িগোঁফ বিহীন।

মন্দিরে শ্রীরামের মূর্তি

আমি বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন মন্দিরে যে সব রামমূর্তি দেখেছি, তার কোথাও সগুম্ফ রাম দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না, অবশ্য এ দিয়ে কোনও সিদ্ধান্তে আসা যায় না।

সগুম্ফ রামরাজা। শ্রীবাটি

অতঃকিম?

উপরের অতবড় আলোচনার উদ্দেশ্য একটাই, তা হল একটা সাধারণ আইডিয়া করা যে শ্রীরামের মূর্তি বা ছবিতে শ্রীরাম সাধারণতঃ গোঁফদাড়ি বিহীন।

এবার আসি আমাদের আসল উদ্দেশ্যে। সেটা হল সগুম্ফ শ্রীরামের পূজা।

যাঁরা জানেন না তাঁদের জন্য বলছি, কলকাতার কাছেই হাওড়া জেলার রামরাজাতলার আড়াইশো বছরেরও বেশি প্রাচীন রামরাজার যে বিখ্যাত পূজাটি চালু আছে, সেই রাম হলেন সগুম্ফ রাম। আজ আড়াইশো বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রতিবছর এখানে গোঁফওলা রামের মূর্তি বানিয়ে পূজার ট্র্যাডিশন সমানে চলছে। আজ চলুন এই পূজাটির একটা ভার্চুয়াল ট্যুর করি।

রামরাজাতলা– কোথায়?

রামরাজাতলা KMDA-য়ের অধীনে হাওড়া জেলার একটি জনবহুল শহর। হাওড়া থেকে সাউথ ইস্টার্ন লাইনের ট্রেনে এবং অনেক বাসে এখানে যাওয়া যায়। রামরাজাতলা স্টেশন থেকে ছ-সাত মিনিটের হাঁটাপথে একটা ঘিঞ্জি বাজার এলাকার মধ্যে বড় মণ্ডপের ভিতর প্রায় চারমাস ধরে শ্রীরামের মাটির মূর্তির পূজা হয়।

ইতিহাস

এই অঞ্চলের জমিদার অযোধ্যারাম চৌধুরী এই পূজার প্রবর্তন করেন। এ সম্বন্ধে প্রচলিত কাহিনীটি হল অযোধ্যারাম চৌধুরী স্বপ্নাদেশ পেয়ে রামচন্দ্রের এই সগুম্ফরূপের এই পূজাটি এখানে বারোয়ারী রামপূজা হিসেবে চালু করেন। তবে রামপূজার শুরুটা মসৃণ ছিল না। আগে এখানকার প্রধান পূজা ছিল সরস্বতী পূজা। তাই প্রথমদিকে এই দুই পূজার আহ্বায়কদের মধ্যে প্রচণ্ড গণ্ডোগোল বাঁধে। তারপর নানারকম আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে ঠিক হয় দুটি পূজাই হবে, তবে সরস্বতীকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য শ্রীরামের মাটির মূর্তি তৈরীর কাজে ব্যবহৃত বাঁশ স্থানীয় ষষ্ঠীতলার বাঁশঝাড় থেকে সরস্বতী পূজার দিন কেটে চৌধুরীপাড়ার শিবমন্দিরে সেইদিনই সেই বাঁশের পূজা দিয়ে শিবরাত্রির দিন থেকে শ্রীরাম-সীতার মূর্তি গড়ার কাজ শুরু হবে। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে।

প্রথমদিকে শ্রীরামের পূজা তিনদিন ধরে হত। পরে সেটা বেড়ে প্রথমে পনেরো দিন ও পরে এক মাসে দাঁড়ায়। বর্তমানে এই পূজাটি শুরু হয় রামনবমীর দিন এবং শেষ হয় শ্রাবণ মাসের শেষ রবিবার, প্রায় চারমাস।  শ্রাবণ মাসের শেষ রবিবার বিশাল শোভাযাত্রা সহকারে মূর্তির বিসর্জন দেওয়া হয় – একে বলা হয় রাম-বিজয়।

এই অঞ্চলের রামরাজাতলা নামটি এই রামরাজার জন্যই হয়েছে।

রামরাজাতলার রামরাজা

রামরাজাতলার রামরাজার সবুজ রঙের সগুম্ফ মূর্তির সঙ্গে সীতা, লক্ষ্মণ, ভরত ও শত্রুঘ্ন ছাড়াও থাকেন বিভীষণ, শিব, ব্রহ্মা, সরস্বতী ও আরো অনেকে। প্রায় বাইশ ফুট উঁচু ও ষোল ফুট চওড়া এই মূর্তি-গুচ্ছে মোট ২৬টি দেবদেবীর মূর্তি থাকে বলে জানা গেল।

আর মূল মণ্ডপের বাইরে শ্রীরামের মূর্তির দিকে মুখ করলে বাঁদিকে আছে প্রায় আটফুট উঁচু হনুমানজীর মূর্তি। এঁর গলায় বিশাল মোটা তুলসীপাতার মালা চোখে পড়ল – এটাই সম্ভবতঃ এখানকার নিয়ম।

রামপূজাকে কেন্দ্র করে এখানে প্রায় চারমাস ধরে একটি মেলা চলে। এটিই পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘতম সময় ধরে চলা মেলা।

এই পূজা এবং মেলা উপলক্ষে এখানে ভীষণ ভিড় হয়। শুধু স্থানীয়রাই নন, বহু দূর দূর থেকে মানুষেরা আসেন পূজা দিতে। আর একটি কথা, শ্রীরামের পূজায় শুধুমাত্র অবাঙালীরাই নন, বাঙালীরাও সমানতালে ভিড় জমান, এবং এই ট্র্যাডিশন চলছে আড়াইশো বছর ধরে।

উপসংহার

রামরাজাতলা কোলকাতার একদমই কাছে। যাতায়াতেরও কোনও অসুবিধা নেই। দেখেই আসুন না এই বিরল গোঁফওলা শ্রীরামকে, যা আড়াইশো বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে আছে।

ছবি–লেখক

 

 

 


Share your experience
  • 65
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    65
    Shares

Facebook Comments

Post Author: আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

asish chottopadhyay
আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৫৬) দুর্গাপুরের একজন প্রতিথযশা স্ত্রীরোগবিশেজ্ঞ। দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার হাসতালে ৩২ বছর অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চাকরি করার পর এখন উনি সম্পূর্ণ ভাবে গরীব ও দুস্থ রোগীদের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত রেখেছেন। দেশভ্রমণ, ফটোগ্রাফি এবং বিভিন্ন বিষয়ে ইংরেজি ও বাংলায় লেখালেখি করা ওঁর নেশা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং বইতে ওঁর তোলা ফটো প্রকাশিত হয়েছে। বাংলায় লেখা ওঁর দুটি ব্যতিক্রমী উপন্যাস, একটি ছোটগল্প-সংগ্রহ, একটি কবিতার বই , একটি ছড়ার বই ও দুটি ভ্রমণকাহিনী আছে, যার মধ্যে একটি উপন্যাস (চরৈবেতি) দুবার আনন্দবাজার পত্রিকার বেস্ট সেলার লিস্টে স্থান পেয়েছিল। ইংরেজিতে ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান ও মেলা নিয়ে লেখা ওঁর শতাধিক ব্লগের প্রায় দেড় লক্ষ ভিউ আছে। বাংলার মন্দিরের উপর ওঁর ইংরেজিতে লেখা একটি গবেষণাধর্মী প্রায় দুহাজার রঙিন ফটোসমৃদ্ধ ফটোগ্রাফিক ই-বুক আছে, যেটি সাধারণ মানুষ, যাঁরা মন্দির ভালোবাসেন কিন্তু খুব পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখা পড়তে চান না, তাঁদের জন্য লেখা।।