রত্নসভাই বড়া অরণ্যেশ্বরার থিরুভলানগাডু-মন্দির ও পৌরাণিক কাহিনী

Share your experience
  • 79
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    79
    Shares

রত্নসভাই দ্বিতীয় গোপুরম, বডারণ্যেশ্বরার

রত্নসভাই বড়া অরণ্যেশ্বরার থিরুভলানগাডু-মন্দির ও পৌরাণিক কাহিনী।আমরা পঞ্চসভাই আলোচনা প্রসঙ্গে দেখেছি যে পাঁচটি মন্দির নটরাজরূপী শিবের নৃত্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এই পাঁচটি মন্দিরই পঞ্চসভাই স্থলঙ্গল এবং এই পঞ্চসভাই স্থলঙ্গলের পাঁচটি মন্দিরই তামিলনাড়ুতে। লিখছেন-আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়।

ঊর্ধ্ব তাণ্ডব ভঙ্গিতে নটরাজ_

এই মন্দিরগুলি এবং সেই মন্দির নটরাজের কোন নাচের  সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত তার একটি তালিকা নীচে দেওয়া হল :-

১) রত্ন সভাই — থিরুভলানগাডু বড়া অরণ্যেশ্বর মন্দির — চেন্নাই শহর থেকে কিছুদূরে — ‘কালী’ তাণ্ডব।

২) কনক সভাই — থিল্লাই নটরাজা মন্দির — চিদাম্বরমে — ”আনন্দ তাণ্ডব।

৩) ভিলি (রজত) সভাই — মীনাক্ষী আম্মান মন্দির — মাদুরাইতে — ‘সন্ধ্যা’ তাণ্ডব।

৪) থামিরা (তাম্র) সভাই — নেল্লাইআপ্পার মন্দির — তিরুনেলভেলিতে —  ‘মুনি’বা ‘ব্রহ্ম’ (জ্ঞান) তাণ্ডব।

৫) চিথিরা (চিত্র) সভাই — কুট্রালানাথার মন্দির — থিরুকুর্টালাম, তেনকাশীতে — ‘ত্রিপুর’ তাণ্ডব।।

আজ আমরা ‘রত্ন সভাই’ থিরুভলানগাডুর বড়া অরণ্যেশ্বর (“Lord of the jungle of North”) মন্দির দর্শনে যাবো।  এই মন্দিরটি আমি ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে দর্শন করেছি এবং এই লেখাটি সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা।

ঊর্ধ্ব তাণ্ডব ভঙ্গিতে নটরাজ_ বডারণ্যেশ্বরার

রত্নসভাই বডা অরণ্যেশ্বরার : অবস্থান

চেন্নাই শহর থেকে ৬৪ কিলোমিটার দূরে থিরুভালুর জেলায় চেন্নাই-আরাক্কুরাম সাবার্বান ট্রেন রুটের শেষ স্টেশন আরাক্কুরামের আগের স্টেশন হল থিরুভলানগাডু। স্টেশন থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রত্ন সভাই বডা অরণ্যেশ্বর/বডা অরণ্যেশ্বরার মন্দির। থিরুভলানগাডুর ভৌগোলিক কো-অর্ডিনেট হল ১৩.০৭ ডিগ্রী নর্থ, ৭৯.৪৬ ডিগ্রী ইস্ট। খেয়াল করে দেখুন, আবার সেই ৭৯ ডিগ্রী ইস্ট! কাকতালীয়, নাকি অন্য কোনও গূঢ় সম্পর্ক আছে?

প্রধান গোপুরম, বডারণ্যেশ্বরার

রত্নসভাই বডা অরণ্যেশ্বরার : পৌরাণিক কাহিনী

একটি পৌরাণিক কাহিনী আগেই বলা হয়েছে। শিব একবার শিবলোকে তন্ময় হয়ে নাচ করছিলেন। তখন তাঁর পায়ের নুপূর থেকে একটি রত্ন খসে মর্তে পড়ে এবং পাঁচ টুকরো হয়ে পাঁচ জায়গায় ছড়িয়ে যায়। ঐ পাঁচটি জায়গাই পঞ্চসভাই স্থলঙ্গল, যার মধ্যে ‘রত্ন সভাই’ হল থিরুভলানগাডু বডা অরণ্যেশ্বরার মন্দির সংলগ্ন ‘রত্ন সভা’ মণ্ডপ।

আর একটি পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এই জায়গায় বট গাছের একটি বিশাল অরণ্য ছিল। সেই জঙ্গলে শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামে দুই ভয়ংকর অসুর বাস করত এবং চারদিকে অত্যাচার করে বেড়াত। তাদের হাত থেকে মুনি-ঋষি ও অন্যান্য মানুষজনকে বাঁচানোর জন্য পার্বতী ভয়ংকরী কালীকে সৃষ্টি করে শুম্ভ-নিশুম্ভকে বধ করতে পাঠালেন। কালী অসুরদের বধ করে তাদের রক্ত পান করে আরও ভয়ংকরী রূপ ধারণ করলেন। তাঁকে শান্ত করার জন্য মুঞ্জিকেশ কর্কোদক নামে এক ঋষি শিবকে আহ্বান করলে পরে শিব সেই অরণ্যে আবির্ভূত হয়ে কালীকে শান্ত হতে বললেন। কালী উদ্ধত স্বরে বললেন শিব তাঁকে নৃত্যে পরাজিত করতে পারলে তবেই তিনি শিবের কথা শুনবেন। শিব তখন একটি বিশেষ ভঙ্গিমার তাণ্ডবনৃত্য নাচলেন (যা ‘কালী তাণ্ডব’ নামে পরিচিত) এবং একসময় নিজে এক পায়ের উপর দাঁড়িয়ে অন্য পা সোজা মাথার উপর তুলে দিলেন।

এই ভঙ্গিটিকে বলা হয় “ঊর্ধ্ব তাণ্ডব” ভঙ্গি যা কালীর পক্ষে করা সম্ভব হল না। কালী পরাজয় স্বীকার করে শান্ত হলেন ও শিবের স্তুতি করলেন। শিব সন্তুষ্ট হয়ে বর দিলেন যে তিনি ঐ বট গাছের অরণ্যে চিরকাল থাকবেন এবং বডারণ্যেশ্বর (তামিলে বডারণ্যেশ্বরার) নামে পরিচিত হবেন। শিব কালীকে আরও বর দিলেন যে ওখানে কালীও চিরকাল থাকবেন এবং আগে কালীর পুজো দিয়ে তারপর শিবের পুজো দিতে হবে। ওখানে শিবমন্দিরের কাছেই কালী মন্দিরও আছে।

পঞ্চ তাণ্ডব ভঙ্গি_বডারণ্যেশ্বরার মন্দির

তৃতীয় একটি পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এখানে শিব তাঁর খুব বড় ভক্ত করাইক্কাল আম্মেইয়ারকে তাণ্ডব নৃত্য দেখিয়েছিলেন। করাইক্কাল আম্মেইয়ার এত বড় শিবভক্ত ছিলেন যে তিনি বহুদূর থেকে পায়ে না হেঁটে হাতে ভর করে হেঁটে এইখানে পৌঁছে হেঁটমুণ্ড হয়েই শিবের নাচ দেখেছিলেন এবং শিবের কৃপায় এখানেই মোক্ষ লাভ করেন।

রত্নসভাই বডা অরণ্যেশ্বরার : মন্দির

বর্তমান মন্দিরটি চোল রাজত্বকালে খৃষ্টীয় ১২শ শতকে নির্মিত হলেও এর খোঁজ খৃষ্টীয় ৫ম শতকেও পাওয়া যায়। খৃষ্টীয় ৭ম শতকের তামিল শৈবগ্রন্থ ‘তেভরম’-য়ে এই মন্দিরটির উল্লেখ আছে।

এখানে শিব বডা অরণ্যেশ্বর (তামিলে বডা অরণ্যেশ্বরার) এবং পার্বতী ভন্দরকুঝালাই আম্মান রূপে অধিষ্ঠিত।

এই মন্দিরের ‘স্থলবৃক্ষ’ (Temple tree) হল বটগাছ। আগেই বলা হয়েছে যে আগে এই জায়গায় বট গাছের অরণ্য বা জঙ্গল ছিল।

আগেই আরও বলা হয়েছে নটরাজ এই মন্দিরে ‘কালী’ তাণ্ডব নৃত্য করেছিলেন। এই নিয়ে একটি আকর্ষণীয় পৌরানিক কাহিনী আছে, যা আমরা আগেই শুনেছি।

এই মন্দিরে নৃত্যরত নটরাজের পা থেকে খসে পড়া রত্ন (চুণি বা পান্না) পড়েছিল, তাই এ হল ‘রত্ন সভাই’, অর্থাৎ রত্ন সভা।

স্থলবৃক্ষ বটগাছ_ বডারণ্যেশ্বরার

মন্দিরের সভামণ্ডপ

দ্রাবিড়ীয় রীতিতে গড়া সুউচ্চ গোপুরম সহ এই মন্দিরটির একটি চোখে পড়ার মতো বৈশিষ্ট্য হল মন্দিরের সভামণ্ডপে ঢোকার মুখে সভামণ্ডপের উপরে পাঁচটি বড় আকারের খোপে পাঁচ ধরণের তাণ্ডব নৃত্যরত শিবের প্রায় মানুষ-প্রমান মূর্তি। পাঁচটি মূর্তির নীচে পরিচয়-জ্ঞাপক লেখা ও নাম্বারিং আছে। প্রবলেম হল নাম্বারিং ইংরিজি ডিজিটে হলেও লেখাটা তামিলে, যা আমার মতো অ-তামিল দর্শকের কাছে অবোধ্য। তবে নাম্বার দেখে আন্দাজ করা যাচ্ছে কোনটা কী (উপরের তালিকা দেখুন)। তবে একটা ব্যাপার লক্ষণীয় — নাম্বারিংটা কিন্তু ১ থেকে ৫ নয়। ১ নম্বর হল কেন্দ্রে, একদিকে ২ আর ৪, অন্যদিকে ৩ আর ৫। এরকম কেন, তা তামিল-ভাষী পুরোহিতদের কাছ থকে জানা গেল না, নেটেও খুঁজে পাইনি।

১ নম্বর মূর্তিটি বডারণ্যেশ্বরারের, এবং এখানে নটরাজ-রূপী শিব “ঊর্ধ্ব তাণ্ডব” ভঙ্গিতে আছেন। তাঁর বাঁ পা মাথার উপর তোলা এবং ডান পা মাটিতে উপুড় হয়ে শোয়া অজ্ঞানতার প্রতীক ‘অপস্মার’ দানবের পিঠের উপর স্থাপিত।

মন্দিরটির বিভিন্ন অংশে স্তম্ভ ও দেওয়ালে খুব সুন্দর পাথরের কাজে বিভিন্ন দেবদেবী, নর্তকী, বাদ্যকর, ফুল-লতাপাতা ও বিভিন্ন পশুপাখির চিত্র দেখার মত। মূল মন্দিরের গর্ভগৃহের দিকে মুখ করে বসে থাকা কালো পাথরের নন্দী ছাড়াও একটি খুব সুন্দর রঙিন অলঙ্করণ করা সাদা রঙের দণ্ডায়মান ষণ্ডমূর্তির্টি দেখার মত।

মূল মন্দিরের সঙ্গে মেরুন রঙের চারচালা ধরণের ছাদযুক্ত একটি সভামণ্ডপকে বলা হয় ‘রত্নসভাই’ অর্থাৎ রত্ন সভা। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে নটরাজ-রূপী শিব ঐখানেই ‘কালী তাণ্ডব’ তথা ‘ঊর্ধ্ব তাণ্ডব’ নৃত্য করেছিলেন।মন্দিরের একপাশে আছে একটি মাঝারি সাইজের বটগাছ। এই বটগাছটিই এখানকার “স্থলবৃক্ষ”(Temple Tree)।

আরও পড়ুন –পঞ্চসভাই স্থলঙ্গল-নটরাজ শিবের নাচের সঙ্গে জড়িত পাঁচটি মন্দির

কাঠের নন্দী, বডারণ্যেশ্বরার
পাথরের ভাস্কর্য ১, বডারণ্যেশ্বরার
পাথরের ভাস্কর্য ৩, বডারণ্যেশ্বরার

 উপসংহার

শিবঠাকুরের খোঁজে বের হলে আপনাকে পঞ্চসভাই স্থলঙ্গলে যেতেই হবে। আজ আমরা তার প্রথম ‘স্থল’ রত্নসভা বডা অরণ্যেশ্বরার মন্দির দর্শন করলাম। পরবর্তী লক্ষ্য ‘কনক সভাই’ চিদাম্বরমের থিল্লাই নটরাজা মন্দির।

ওঁ নমঃ শিবায়।

ঋণ স্বীকার

উইকিপিডিয়া সহ বিভিন্ন ইন্টারনেট সাইট।

ফটো : লেখক


Share your experience
  • 79
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    79
    Shares

Facebook Comments

Post Author: আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

asish chottopadhyay
আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৫৬) দুর্গাপুরের একজন প্রতিথযশা স্ত্রীরোগবিশেজ্ঞ। দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার হাসতালে ৩২ বছর অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চাকরি করার পর এখন উনি সম্পূর্ণ ভাবে গরীব ও দুস্থ রোগীদের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত রেখেছেন। দেশভ্রমণ, ফটোগ্রাফি এবং বিভিন্ন বিষয়ে ইংরেজি ও বাংলায় লেখালেখি করা ওঁর নেশা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং বইতে ওঁর তোলা ফটো প্রকাশিত হয়েছে। বাংলায় লেখা ওঁর দুটি ব্যতিক্রমী উপন্যাস, একটি ছোটগল্প-সংগ্রহ, একটি কবিতার বই , একটি ছড়ার বই ও দুটি ভ্রমণকাহিনী আছে, যার মধ্যে একটি উপন্যাস (চরৈবেতি) দুবার আনন্দবাজার পত্রিকার বেস্ট সেলার লিস্টে স্থান পেয়েছিল। ইংরেজিতে ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান ও মেলা নিয়ে লেখা ওঁর শতাধিক ব্লগের প্রায় দেড় লক্ষ ভিউ আছে। বাংলার মন্দিরের উপর ওঁর ইংরেজিতে লেখা একটি গবেষণাধর্মী প্রায় দুহাজার রঙিন ফটোসমৃদ্ধ ফটোগ্রাফিক ই-বুক আছে, যেটি সাধারণ মানুষ, যাঁরা মন্দির ভালোবাসেন কিন্তু খুব পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখা পড়তে চান না, তাঁদের জন্য লেখা।।

1 thought on “রত্নসভাই বড়া অরণ্যেশ্বরার থিরুভলানগাডু-মন্দির ও পৌরাণিক কাহিনী

Comments are closed.