রাবণ দশানন – রামায়ণে ও পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে

Share your experience
  • 649
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    649
    Shares

 

রাবণ দশানন রামায়ণের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র।খলনায়ক।পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলংকরণে শ্রীরামচন্দ্রের পাশাপাশি খলনায়ক রূপে রাবণের চমকপ্রদ উপস্থিতি নিয়ে তথ্যধর্মী সরস আলোচনা করেছে্ন —আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়।

রাবণ- সীতাহরণরামচন্দ্র-মন্দির-গুপ্তিপাড়া
রাবণ- সীতাহরণরামচন্দ্র-মন্দির-গুপ্তিপাড়া

রামায়ণের দু’টি কেন্দ্রীয় চরিত্র হল রাম আর রাবণ। এর মধ্যে শ্রীরাম নায়ক, এবং তাঁকে নিয়ে কত যে কাজ হয়েছে এবং হচ্ছে, তার ইয়ত্তা নেই। অন্যদিকে রাবণ হলেন রামায়ণের সর্বপ্রধান খলনায়ক। খলনায়ক বলেই বেশিরভাগ লেখক আর গবেষকরাই রাবণকে যেন একটু এড়িয়ে চলেন। পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণের একটা বিরাট অংশ হল রামায়ণ, এবং সেখানেও সঙ্গত কারনেই শ্রীরামের ছড়াছড়ি। সেখানে রাবণও আছেন, তবে খলনায়ক রূপে, তাই শ্রীরামের তুলনায় তাঁর উপস্থিতি অনেকটাই কম।

বর্তমান লেখাটিতে পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে রাবণের উপস্থিতি নিয়ে একটি প্রাথমিক আলোচনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে রেফারেন্স টেক্সট হিসেবে আমরা প্রধানতঃ কৃত্তিবাসী রামায়ণকেই অনুসরণ করব, কেননা পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে রামায়ণের ঘটনাবলী রূপায়ণে পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণ শিল্পীরা কৃত্তিবাসী রামায়ণকেই অনুসরণ করেছেন।

সুপার্শ্ব-ও-রাবণ-জোড়বাংলা-মন্দির-ইটণ্ডা
সুপার্শ্ব-ও-রাবণ-জোড়বাংলা-মন্দির-ইটণ্ডা

রাবণ – পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে – উৎস

যে কোনও তথ্যভিত্তিক নিবন্ধে একটি জিনিষ প্রথমেই বলা প্রয়োজন, তা হল তথ্যের উৎস কী তা জানানো। এই লেখাটির তথ্যের উৎস হল লেখকের দেখা ও ফটোগ্রাফি করা পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৭৫টি মন্দির। এই মন্দিরগুলির মধ্যে কিছু মন্দির আসলে মন্দিরগুচ্ছ (উদাহরণ স্বরূপ শ্রীবাটি ৩টি মন্দিরের গুচ্ছ; উচকরণ ৪টি মন্দিরের গুচ্ছ; দুবরাজপুর, নানুর, বনকাটি-অযোধ্যা ও গণপুর ১২-১৪টি করে মন্দিরের গুচ্ছ এবং মল্লেশ্বর ২৫টি মন্দিরের গুচ্ছ), কিন্তু সেগুলিকে একটি মন্দির হিসেবেই গণ্য করা হয়েছে। এই মন্দিরগুলির সিলেকশন ক্রাইটেরিয়া হল এগুলিতে অলঙ্করণ আছে। এই ৭৫টি মন্দিরের মধ্যে ২১টিতে (এদের মধ্যে বালি-দেওয়ানগঞ্জের দুর্গামন্দির, দ্বারহাট্টার রাজরাজেশ্বর মন্দির, কালনার কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির, বিষ্ণুপুরের লালজী মন্দির, হেতমপুরের চন্দ্রনাথ মন্দির, বড়নগরের ভবানীশ্বর মন্দির, পাঁচথুপির নবরত্ন মন্দির ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য) রামায়ণের চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাকি ৫৪টি মন্দিরে রামায়ণের বিভিন্ন দৃশ্য চিত্রায়িত হয়েছে, যা থেকে রাবণ আছেন এমন ছবিগুলি নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

রাজসভায়-রাবণ-সুরুল
রাজসভায়-রাবণ-সুরুল

রাবণ – পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে

প্রথমেই দেখা যাক পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে রাবণকে আমরা কী পরিস্থিতিতে বা কী রূপে দেখতে পাই। এগুলি হল :-
১) সীতাহরণ দৃশ্য। ২) রাবণ-সুপার্শ্ব যুদ্ধ। ৩) রাজসভায় রাবণ। ৪) যুদ্ধক্ষেত্রে রাবণ।
এর মধ্যে সিংহভাগই দখল করে রেখেছে রাম-রাবণের যুদ্ধের দৃশ্যগুলি।
আর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল রাবণের দশমুণ্ড। এই বিষয়টির উপর পৃথক একটি আলোচনা করা হয়েছে।

রাবণ – পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে ছবির মিডিয়াম

একথা সর্বজনবিদিত যে পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণের মিডিয়াম টেরাকোটা (টেরাকোটা আবার দু’ রকমের — ফলক বা প্লাক এবং ইঁট-খোদাই বা কাট-ব্রিক), স্টাক্কো, পাথর এবং ম্যুরাল হলেও টেরাকোটাই প্রধান, এবং টেরাকোটার মধ্যে আবার টেরাকোটা ফলকই সিংহভাগ। ফলে, পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণ বলতে প্রধানতঃ টেরাকোটা ফলকের কাজই বোঝায়। রাবণের ক্ষেত্রেও এর অন্যথা ঘটে নি। অর্থাৎ বর্তমান আলোচনায় আমরা রাবণের যে সব ছবি নিয়ে আলোচনা করব, তার দুয়েকটি ব্যতিক্রম (যেমন গণপুর ও মল্লেশ্বরে ফুলপাথরের কাজ, জগদানন্দপুরে বালিপাথরের কাজ এবং বিষ্ণুপুরের রাধেশ্যাম মন্দিরে মাকড়া পাথরের উপর স্টাকোর প্রলেপ) ছাড়া বাকি সবই টেরাকোটা ফলকের কাজ।

পুষ্পক-রথে-রাবণ-জোড়াদেউল-বৈদ্যপুর
পুষ্পক-রথে-রাবণ-জোড়াদেউল-বৈদ্যপুর

রাবণ – পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে প্রথম আবির্ভাব

পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে রাবণের এন্ট্রি বা প্রথম উপস্থিতি হল সীতাহরণের দৃশ্যে, যদিও এই দৃশ্যটির উপস্থিতি খুবই কম। আমাদের আলোচ্য সিরিজে একটি মাত্র মন্দিরের অলঙ্করণে সীতাহরণ দৃশ্যের একটি টেরাকোটা প্যানেল আছে, সেটি হল হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ার রামচন্দ্র মন্দির। এই প্যানেলটির দু’টি ভাগ – বাঁদিকে দেখা যাচ্ছে একটি বৃত্তের (লক্ষ্মণ গণ্ডি) মধ্যে সীতা বসে আছেন, আর সামনে ছদ্মবেশী রাবণ। আর ডানদিকের অংশে দেখা যাচ্ছে দশানন রাবণ সীতাকে রথে করে নিয়ে যাচ্ছেন, আর ধণুর্ধারী লক্ষ্মণ অন্যদিকে যাচ্ছেন রামের খোঁজে।

রাবণ ও সুপার্শ্ব – পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে

কৃত্তিবাসী রামায়ণের অরণ্যকাণ্ডে জটায়ুর দাদা সম্পাতির পুত্র সুপার্শ্বর সঙ্গে রাবণের এনকাউন্টারের কথা আছে (শ্লোকসংখ্যা ৭০৭ – ৭২৬)। সুপার্শ্ব বৃদ্ধ পিতার জন্য খাদ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সীতাসহ রাবণের আকাশগামী রথ দেখতে পেয়ে হাঁ করে গিলতে যান কিন্তু রথের মধ্যে সীতাকে দেখে নারী অবধ্য বলে এবং ধূর্ত রাবণ সুপার্শ্বর কাছে পরাজয় স্বীকার করে নেওয়ায় রথসহ রাবণকে ছেড়ে দেন।

এই ঘটনাটিকে অনেক মন্দিরের অলঙ্করণেই দেখা যায়। আলোচ্য সিরিজে যে পাঁচটি মন্দিরে আমরা এই দৃশ্যটি দেখতে পাই তা হল বীরভূম জেলার জয়দেব-কেঁদুলির রাধাবিনোদ মন্দির ও ইটণ্ডার জোড়বাংলা কালীমন্দির, হুগলি জেলার দশঘরার গোপীনাথ মন্দির এবং মুর্শিদাবাদ জেলার বড়নগরের চারবাংলা মন্দির ও গঙ্গেশ্বর মন্দির। এর প্রতিটিতেই টেরাকোটা ফলকে সুপার্শ্ব বিশাল ঠোঁট ফাঁক করে রাবণের রথ গিলতে যাচ্ছেন এমন দেখানো হয়েছে।

যুদ্ধক্ষেত্রে-রাবণ-জয়পুর-বাঁকুড়া.
যুদ্ধক্ষেত্রে-রাবণ-জয়পুর-বাঁকুড়া.

রাবণ — রাজসভায় : পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে

পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে এটি একটি বিরল দৃশ্য, যেখানে দশানন রাবণকে রাজসভায় সিংহাসনে উপবিষ্ট দেখানো হয়েছে। আলোচ্য সিরিজে দু’টি মাত্র মন্দিরে এমন ছবি দেখা যায় – বীরভূম জেলার সুরুলের লক্ষ্মীজনার্দন মন্দিরে এবং বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের রাধেশ্যাম মন্দিরে। এর মধ্যে রাধেশ্যাম মন্দিরের কাজটি মাকড়া পাথরের উপর স্টাকোর প্রলেপের কাজ এবং এতে রাবণকে একটি নীচু আসনে বসে থাকতে দেখা যায় ও তাঁর সামনে একজন মাত্র ব্যক্তি হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছেন। অন্যদিকে সুরুলের টেরাকোটা ফলকের কাজটি অনেক ইলাবোরেট। সেখানে সিংহাসনে উপবিষ্ট দশানন রাবণের রাজসভাকে খুব সুন্দর চিত্রায়িত করা হয়েছে। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, বাল্মীকীয় রামায়ণের অরণ্যকাণ্ডের ৩২ তম সর্গের ৫ম শ্লোকে রাবণের রাজসভায় সিংহাসনে বসে থাকার খুব সুন্দর বর্ণনা আছে।

রাম-লক্ষ্মণের-পিছন-থেকে-বিভীষণ-রাবণের-সঙ্গে-যুদ্ধরত-উচকরণ.
রাম-লক্ষ্মণের-পিছন-থেকে-বিভীষণ-রাবণের-সঙ্গে-যুদ্ধরত-উচকরণ.

রাবণ – যুদ্ধক্ষেত্রে

রামায়ণের মূল কাহিনীই হল রাম-রাবণের যুদ্ধ। সপ্তকাণ্ড রামায়ণের লঙ্কাকাণ্ডে এই যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ আছে। আমরা তাতে ঢুকছি না। এখানে আমরা শুধু রাম-রাবণের যুদ্ধ (এবং পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে সেই যুদ্ধের চিত্রায়ণ) নিয়ে আলোচনা করব।

কৃত্তিবাসী রামায়ণে বলা হয়েছে রাবণ মোট চারদিন স্বয়ং যুদ্ধ করেছিলেন। প্রথমদিন (শ্লোকসংখ্যা ১১৬৪ – ১৩০৭) রাবণ যুদ্ধে হনুমান ও নলের কাছে পর্যুদস্ত হলেও লক্ষ্মণকে পরাস্ত করেন, কিন্তু নিজে েরামের কাছে পরাস্ত হন। রাম হনুমানের কাঁধে চড়ে যুদ্ধ করেন (শ্লোকসংখ্যা ১২৭৭ – ১২৭৯)। দ্বিতীয় দিন রাবণ লক্ষ্মণকে শক্তিশেলের আঘাতে মৃতপ্রায় করেন কিন্তু রামের কাছে পরাজিত হয়ে পালিয়ে যান। তৃতীয়দিন রাম ইন্দ্রের রথে চড়ে যুদ্ধ করেন (শ্লোকসংখ্যা ৪৬১২)। এইদিন প্রথমে রাবণ হাতজোড় করে শ্রীরামের স্তূতি করেন (শ্লোকসংখ্যা ৪৭৩৭-৩৮), কিন্তু তারপরেই রামের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেন। তখন রাম বাণচালনা করে বারবার রাবণের মাথা কেটে ফেলেন কিন্তু ব্রহ্মার দেওয়া বরে (শ্লোকসংখ্যা ৫০২৪) প্রতিবারই কাটা মাথা আবার জোড়া লেগে যায় (শ্লোকসংখ্যা ৪৭৭৪ – ৪৭৯৫)।

এরপর চতুর্থদিনের যুদ্ধের আগে হনুমান জ্যোতিষীর বেশে ছলনা করে মন্দোদরীর কাছ থেকে রাবণের মৃত্যুবান নিয়ে আসেন (শ্লোকসংখ্যা ৫০৪২ – ৫০৮৮)। এরপর রাম-রাবণের চতুর্থদিনের যুদ্ধে রাম সেই মৃত্যুবান ছুঁড়ে রাবণকে ভূপাতিত করলেন (শ্লোকসংখ্যা ৫০৯০ – ৫১০৬)। রাবণ কিন্তু তখনই মারা যাননি। তিনি ভূপতিত অবস্থাতেই রামকে রাজনীতি ও সমাজনীতি শিক্ষা দিয়ে তবেই প্রাণত্যাগ করেন (শ্লোকসংখ্যা ৫১২৮ – ৫২২৪)।

কাটামুণ্ড-সহ-রাবণ-উচকরণ
কাটামুণ্ড-সহ-রাবণ-উচকরণ

রাবণ – যুদ্ধক্ষেত্রে : পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে

এখানে আমাদের আলোচ্য বিষয় হল পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে যুদ্ধক্ষেত্রে রাবণের চিত্রায়ণ।
পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে যুদ্ধে রাবণের চিত্রায়ণকে আমরা দু’ভাগে ভাগ করতে পারি –
ক) সাধারণ রাম-রাবণের যুদ্ধদৃশ্য।
খ) যুদ্ধে বিশেষ কোনও ঘটনা।

রাবণ যুদ্ধক্ষেত্রে : পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে রাম-রাবণের যুদ্ধদৃশ্য

পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ মন্দিরের অলঙ্করণেই রামায়ণের দৃশ্য চিত্রায়িত করা হয়েছে এবং তার সবক’টিতেই দশানন কুড়িহাত রাবণের সঙ্গে রাম-লক্ষ্মণের যুদ্ধদৃশ্য আছে। এই যুদ্ধদৃশ্যগুলি এতই কমন যে সাধারণ দর্শকরা সেগুলি খুঁটিয়ে দেখেন না। কিন্তু ঐ যুদ্ধদৃশ্যগুলির মধ্যে কয়েকটি জিনিস খুব ইন্টারেস্টিং। উদাহরণ হিসাবে দু’টি বিষয়ের উল্লেখ করা হল :-
১) রথ এবং ২) রাবণের অস্ত্র। এগুলি নিয়ে পরে আলোচনা করা হচ্ছে।

ঢাল-তরোয়াল-হাতে-রাবণ-দুবরাজপুর.
ঢাল-তরোয়াল-হাতে-রাবণ-দুবরাজপুর.

রাবণ যুদ্ধক্ষেত্রে : পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে বিশেষ যুদ্ধদৃশ্য

১) রাম হনুমানের কাঁধে চড়ে যুদ্ধ করছেন –
এই ঘটনাটি কৃত্তিবাসী রামায়ণের লঙ্কাকাণ্ডের শ্লোকসংখ্যা ১২৭৭ থেকে ১২৭৯ আছে। এর চিত্রায়ণ দেখা যায় মুর্শিদাবাদ জেলার বড়নগরের চারবাংলা এবং গঙ্গেশ্বর মন্দিরের টেরাকোটা প্যানেলে।

২) রাবণ হাতজোড় করে শ্রীরামের স্তূতি করছেন –
কৃত্তিবাসী রামায়ণে উল্লিখিত এই ঘটনাটির (শ্লোকসংখ্যা ৪৭৩৭-৩৮) একটি অতি সুন্দর চিত্রায়ণ দেখা যায় মুর্শিদাবাদ জেলার বড়নগরের চারবাংলা মন্দিরে। প্রসঙ্গতঃ, এই ছবিটিতে রাম হনুমানের কাঁধে চড়ে যুদ্ধ করছেন এমন দেখানো হয়েছে, যদিও তা রামায়ণের সঙ্গে মেলে না। এছাড়া গণপুরের একটি শিবমন্দিরের একটি ফুলপাথরের প্যানেলেও রাবণকে জোড়হস্ত দেখা যায়।
৩) রাবণের কাটা মুণ্ড জোড়া লাগছে —

কৃত্তিবাসী রামায়ণের লঙ্কাকাণ্ডে আছে যে রাম বাণচালনা করে বারবার রাবণের মাথা কেটে ফেলেন কিন্তু ব্রহ্মার দেওয়া বরে (শ্লোকসংখ্যা ৫০২৪) প্রতিবারই কাটা মাথা আবার জোড়া লেগে যায় (শ্লোকসংখ্যা ৪৭৭৪ – ৪৭৯৫)। এই ঘটনাটির সুন্দর চিত্রায়ণ দেখা যায় বীরভূমের উচকরণ গ্রামের শিবমন্দির, হুগলি জেলার তালচিনানের দোলমঞ্চ এবং মালঞ্চ সাহাচকের দক্ষিণাকালী মন্দিরে।

৪) রাবণ-অঙ্গদের মল্লযুদ্ধ –

কৃত্তিবাসী রামায়ণের লঙ্কাকাণ্ডের শ্লোকসংখ্যা ৬২২ থেকে ৬২৭-য়ে অঙ্গদের সঙ্গে রাবণের মল্লযুদ্ধের কথা আছে, যাতে অঙ্গদ রাবণকে পরাস্ত করে রাবণের মুকুট নিয়ে রামের পায়ে সমর্পণ করেন। রাবণ-অঙ্গদের মল্লযুদ্ধের একটি চিত্রায়ণ দেখা যায় বিষ্ণুপুরের শ্যামরায় মন্দিরে। তবে দুঃখের কথা, কয়েক বছর আগেই এই প্যানেলটির ভগ্নদশা ছিল, বর্তমান অবস্থা আমার জানা নেই।

৫) রাবণ-বিভীষণের যুদ্ধ –

কৃত্তিবাস তাঁর রামায়ণের লঙ্কাকাণ্ডের শ্লোকসংখ্যা ৩৬৮২ থেকে ৩৬৮৭-তে রাবণ-বিভীষণের যুদ্ধের কথা বলেছেন। পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে আলোচ্য সিরিজের একটি মন্দিরে আমরা বিভীষণকে রাবণের সঙ্গে যুদ্ধরত দেখি, তা হল বীরভূম জেলার উচকরণের শিবমন্দিরে একটি টেরাকোটা প্যানেলে। সেখানে বিভীষণকে রাম-লক্ষ্মণের আড়াল থেকে রাবণের উপর তির ছুঁড়তে দেখা যায়। এছাড়া জয়দেব-কেঁদুলির রাধাবিনোদ মন্দিরের একটি টেরাকোটা প্যানেলে রামের সঙ্গে যুদ্ধরত রাবণের অন্য পাশে উদ্যত তিরধনুক হাতে একটি ফিগারকে দেখে রাবণের সঙ্গে যুদ্ধরত বিভীষণ বলেই মনে হয়।

রাবণ ও রামের যুদ্ধে ব্যবহৃত রথ : রামায়ণে

রামায়ণের কাহিনী অনুসারে রাবণ প্রথম থেকেই রথে চড়ে যুদ্ধ করেছিলেন, কিন্তু প্রথমে রামের রথ ছিল না। পরে ব্রহ্মার আদেশে ইন্দ্র রামকে সারথি মাতলি সহ নিজের রথটি দেন (লঙ্কাকাণ্ড, শ্লোকসংখ্যা ৪৬১২ – ৪৬১৪)।
কৃত্তিবাসী রামায়ণে রাবণের রথ সম্বন্ধে বলা হয়েছে “চারিচাকা রথখান অষ্ট ঘোড়া বহে” (লঙ্কাকাণ্ড, শ্লোকসংখ্যা ৪৬০৯)।

রাবণ ও রামের যুদ্ধে ব্যবহৃত রথ : পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে

এবার দেখা যাক পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে রাম-রাবণের রথের ব্যাপারে কী দেখানো হয়েছে।
ক) আলোচ্য সিরিজের প্রায় সব মন্দিরের রাম-রাবণ যুদ্ধদৃশ্যে রামকে রথে চড়া অবস্থায় দেখানো হয়েছে। ব্যতিক্রম হল হনুমানের কাঁধে (চারবাংলা ও গঙ্গেশ্বর মন্দির) এবং পায়ে হেঁটে (কোতুলপুরের একটি মন্দিরে)।
খ) কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া সর্বত্রই রাবণকে রথারূঢ় দেখানো হয়েছে। রাবণকে রথহীন দেখানো হয়েছে দুবরাজপুর, কোতুলপুর ইত্যাদি মন্দিরে (যেখানে রামও রথহীন), শুধুমাত্র জয়দেব-কেঁদুলির রাধাবিনোদ মন্দিরের টেরাকোটা প্যানেলে রামকে রথে এবং রাবণকে রথহীন দেখানো হয়েছে।

রাবণ ব্যবহৃত রথ : রামায়ণে ও পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে

রাবণের রথকে বাল্মীকি রামায়ণে “স্বয়ংচালিত” পুষ্পক বিমান বললেও কৃত্তিবাস বলেছেন “চারিচাকা রথখান অষ্ট ঘোড়া বহে”। আবার পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে রাবণের ঘোড়ায় টানা রথ ছাড়াও অন্য কয়েক ধরণের রথ দেখা যায়, তা হল :
১) পক্ষীরাজ অর্থাৎ ডানাযুক্ত ঘোড়ায় টানা রথ (জোড়বাংলা মন্দির, বিষ্ণুপুর)।
২) হাঁসে টানা রথ (বৈদ্যপুর, জোড়বাংলা, শ্যামরায়, হদল-নারায়ণপুর, জয়পুর)।
৩) হাঁস বা ঘোড়া কিছুই নেই (সুপার্শ্ব দৃশ্য, জয়দেব-কেঁদুলি ও যুদ্ধদৃশ্য, মালঞ্চ সাহাচকের কালীমন্দির)। এটাই কি সেই বাল্মীকি-কথিত “স্বয়ংচালিত” রথ?

রথের ঘোড়া : রামায়ণে ও পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে

আগেই বলা হয়েছে বাল্মীকি রামায়ণে বর্ণিত “স্বয়ংচালিত” রথের কোনও ঘোড়া না থাকলেও কৃত্তিবাস বলেছেন রাবণের রথের ঘোড়া আটটি (লঙ্কাকাণ্ড, শ্লোকসংখ্যা ৪৬০৯ )।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে যেখানে রাবণের রথে ঘোড়া দেখানো হয়েছে, সেখানে দৃশ্যমান ঘোড়ার সংখ্যা এক বা দুই। ছবিতে সুপারইম্পোজিশনের ব্যাপারটা মাথায় রাখলে এই সংখ্যাটা ডাবল হতে পারে, অর্থাৎ দুই বা চার, কিন্তু কখনোই কৃত্তিবাসের বলা “রথখান অষ্ট ঘোড়া” নয়।

রথের চাকা : রামায়ণে ও পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে

যদিও কৃত্তিবাস বলেছেন রাবণের “চারিচাকা রথখান” , কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে রাবণের রথের সংখ্যা বিরল ক্ষেত্রেই চার (তিনটি উদাহরণ হল ইলামবাজারের লক্ষ্মীজনার্দন মন্দির, বৈদ্যপুরের জোড়াদেউল এবং ইটণ্ডার জোড়বাংলা কালীমন্দির), অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চারের বেশি।

অস্ত্র : রামায়ণে ও পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে

যদিও কৃত্তিবাস রাবণের অস্ত্রের ব্যাপারে শুধু শক্তিশেল ও বিভিন্ন ধরণের বাণের (অমর্ত, সমর্থ, সূচিমুখী, শিলীমুখী, বিরোচন, সিংহদন্ত, বজ্রদন্ত, কালদন্ত, ক্ষুরপার্শ্ব, অর্দ্ধচন্দ্র, চক্রবান ইত্যাদি – লঙ্কাকাণ্ড, শ্লোকসংখ্যা ১২৫০-৫১) কথাই উল্ল়েখ করেছেন, পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে বাণ অর্থাৎ তির (আর তির ছুঁড়তে ধনুক লাগবেই) ছাড়াও রাবণের হাতে আরও নানারকমের অস্ত্র দেখা যায়। এর মধ্যে আছে তরোয়াল (রাজবলহাট, সুরুল, দশঘরা, জয়পুর, কোতুলপুর, ইটণ্ডা জোড়বাংলা, ইলামবাজার মহাপ্রভু, ইলামবাজার লক্ষ্মীজনার্দন, উচকরণ, বিষ্ণুপুরের মদনমোহন, শ্যামরায়, জোড়বাংলা, মালঞ্চ সাহাচকের কালীমন্দির ইত্যাদি মন্দির), বর্শা (সুরুল, জয়দেব-কেঁদুলি, গুপ্তিপাড়া রামচন্দ্র, ইলামবাজার মহাপ্রভু, উচকরণ ইত্যাদি), ছোরা (দুবরাজপুর), ঢাল (দুবরাজপুর, জয়পুর, ইলামবাজার লক্ষ্মীজনার্দন ইত্যাদি)।

রাবণের-অস্ত্রত্যাগ-চারবাংলা-মন্দির
রাবণের-অস্ত্রত্যাগ-চারবাংলা-মন্দির

রাবণ — দশানন : পশ্চিমবঙ্গের মন্দিরের অলঙ্করণে

পশ্চিমবঙ্গের মন্দিরের অলঙ্করণে রাবণকে প্রায় সব ক্ষেত্রেই দশমুণ্ড দশানন রূপে চিত্রায়িত করা হয়েছে। এর ব্যতিক্রম হল সীতাহরণ দৃশ্য যেখানে ছদ্মবেশী রাবণকে একমুণ্ড বিশিষ্ট মানুষ হিসেবে দেখানো হয়েছে (আলোচ্য সিরিজে গুপ্তিপাড়ার রামচন্দ্র মন্দিরে এইরকম দেখা যায়)। আর একটি ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা যায় বড়নগরের গঙ্গেশ্বর মন্দিরের একটি টেরাকোটা প্যানেলে যেখানে রাবণের ৯টি মুণ্ড (৪ + ১ + ৪) দেখানো হয়েছে। হিন্দু ধর্মশাস্ত্রে কোথাও কোথাও একথা আছে যে রাবণ নিজের দশমুণ্ডের একটি মুণ্ড শিবকে অর্ঘ্য দিয়েছিলেন, তাই তাঁর দশটি নয়, ন’টি মুণ্ড ছিল। তাহলে কি ধরে নিতে হবে যে গঙ্গেশ্বর মন্দিরের অলঙ্করণ শিল্পী নয়টি মুণ্ড বিশিষ্ট রাবণের ছবিটি আঁকার সময় এই কাহিনীটি অনুসরণ করেছিলেন?

দশমুণ্ড-রহস্য

রামায়ণ অনুসারে রাবণের দশমুণ্ড। যতই রাবণকে ‘রাক্ষস’ বলা হোক, কোনও মনুষ্যাকৃতি জীবের দশটি মাথা হওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া ‘রাক্ষস’ আসলে ছিল এক জাতের মানুষই, কোনও মনুষ্যেতর প্রাণী নয়। তাহলে রাবণের দশটি মাথার রহস্যটি কী?
সাধারণ ভাবে বলা হয় যে রাবণের দশজন সাধারণ মানুষের সমান বুদ্ধি ও দৈহিক বল ছিল, তাই তাঁর দশটি মাথা ও কুড়িটি হাতের কল্পনা করা হয়েছে। আবার বহু পণ্ডিত মনে করেন রাবণ চার বেদ ও ছয় দর্শনশাস্ত্রে সুপণ্ডিত ছিলেন, তাই ঐ চার প্লাস ছয় এই দশটি শাস্ত্রে শাস্ত্রজ্ঞ হওয়ার জন্য রাবণের দশটি মাথার কল্পনা করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন রাবণের মাথা একটিই, বাকি ন’টি মাথা ‘নবরস’ অর্থাৎ মানবমনের ন’ ধরণের অনুভূতির (শৃঙ্গার, হাস্য, করুণ, রৌদ্র, অদ্ভুত, বীর, ভয়ানক, বীভৎস ও শান্ত) প্রতীক।

রাবণের দশমুণ্ড : পশ্চিমবঙ্গের মন্দিরের অলঙ্করণে

আগেই বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মন্দিরের অলঙ্করণে দু’-একটি বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া সব ক্ষেত্রেই রাবণকে দশমুণ্ডের অধিকারী বা দশানন দেখানো হয়েছে।
কিন্তু এইখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার সাধারণতঃ খেয়াল করা হয় না। তা হল মন্দিরের অলঙ্করণে রাবণের দশটি মুণ্ডের বিন্যাস। এখানে আমরা এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব।

আলোচ্য সিরিজে দু‘টি মাত্র ব্যতিক্রম ছাড়া সব ক্ষেত্রেই রাবণের একটি বড় কেন্দ্রীয় মাথা (দেহের সঙ্গে সামঞ্জস্য-পূর্ণ) এবং বাকি ন’টি মাথা আকারে ছোট এবং কেন্দ্রীয় বড় মাথাটির দু’পাশে ৪ + ৫ এই ভাবে বিন্যস্ত। দু‘টি মাত্র ক্ষেত্রে (গঙ্গেশ্বর মন্দিরে রাবণ-সুপার্শ্ব প্যানেলে এবং জগদানন্দপুরের রাধাগোবিন্দ মন্দিরে ) দেখা যাচ্ছে কোনও কেন্দ্রীয় বড় মাথা নেই এবং দশটি মাথা ৫ + ৫ এইভাবে বিন্যস্ত।

আবার ৪ + ১ + ৫ এই বিন্যাসের ক্ষেত্রে ৪ টি মাথা কোনদিকে, ডান বা বাঁ, এবং ৫টি মাথাই বা কোন দিকে এটি নিঃসন্দেহে একটি ভাবার বিষয়।

রাবণ – দশমুণ্ডের বিন্যাস : পশ্চিমবঙ্গের মন্দিরের অলঙ্করণে

আমাদের আলোচ্য সিরিজের ৩৯টি রাবণের মধ্যে ২৮টির ডানদিকে ৪টি ও বাঁদিকে ৫টি মাথা (প্রায় ৭২%) এবং ১১টির ডানদিকে ৫টি ও বাঁদিকে ৪টি মাথা (প্রায় ২৮%)।
অর্থাৎ ডানদিকে ৪টি ও বাঁদিকে ৫টি মাথাই সংখ্যায় বেশি।
এখন প্রশ্ন হল, এটা কি random, নাকি কোনও রুল ফলো করে রাবণের মাথাগুলি বিন্যস্ত হয়েছে?

আপাতদৃষ্টিতে রাবণের মুণ্ডগুলির বিন্যাস random মনে হতে পারে, কিন্তু তাতে দু’টি সমস্যা আছে। এক, দু’টি রাশির random distribution সাধারণতঃ ৫০ : ৫০ বা তার কাছাকাছি হয়, ৭২ : ২৮ হয় না। অবশ্য সিরিজ বড় না হলে এই কথাটা সবসময় খাটে না। আর দুই, পশ্চিমবঙ্গের মন্দিরের অলঙ্করণ শিল্পীরা সাধারণতঃ শাস্ত্রীয় ধারণা অনুসারেই কাজ করতেন, শিল্পীর স্বাধীনতা ব্যাপারটি তাঁদের কাজের মধ্যে দেখা গেলেও তাঁরা ট্র্যাডিশন থেকে খুব বেশি দূরে সরেননি। তাই রাবণের দশ মুণ্ডের এই বিন্যাসের (প্রায় ৭২%-য়ে ডানদিকে চারটি মুণ্ড) পিছনে খুব সম্ভবতঃ কোনও শাস্ত্রীয় কারন বা প্রচলিত বিশ্বাস ছিল।
সেই কারন বা প্রচলিত বিশ্বাসটি কী?

কৃত্তিবাসী রামায়ণ বা বাল্মীকীয় রামায়ণে এই প্রশ্নটির কোনও উত্তর পাওয়া যায় না।

রাবণ – মন্দিরের অলঙ্করণে দশমুণ্ডের বিন্যাস : একটি হাইপোথেসিস

এ বিষয়ে একটি হাইপোথেটিকাল মত হল এই মুণ্ডগুলি রাবণের শুভগুণ এবং অশুভ মনোবৃত্তি নির্দেশ করে। যেহেতু ডান দিক ট্র্যাডিশনালি ‘শুভ’ এবং বামদিক ‘অশুভ’ বলে একটি ধারণা প্রচলিত আছে (আমরা ট্র্যাডিশনালি ডানহাত খাদ্যগ্রহণে বা দেবার্চনায় এবং বাঁ হাত শৌচকার্যে ব্যবহার করি), সেহেতু ডানদিকের মুণ্ডগুলি রাবণের ভালো দিক এবং বাঁদিকের মুণ্ডগুলি খারাপ দিকের পরিচয়-জ্ঞাপক। রাবণের ভালো গুণ কম এবং দোষ বেশি ছিল। সম্ভবতঃ এই ধারণা মাথায় রেখেই রাবণের ডানদিকে চারটি ও বাঁদিকে পাঁচটি মুণ্ড দেখানো হয়েছে। মনে রাখতে হবে এটি সম্পূর্ণভাবেই একটি হাইপোথেসিস মাত্র (কৃতজ্ঞতা স্বীকার – এই হাইপোথেসিসটি লেখকের বড় মেয়ে ডঃ অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায়ের, যে নিজে লেফট-হ্যাণ্ডেড বলে লেফট-হ্যাণ্ডেড মানুষদের অসুবিধেগুলি প্রত্যক্ষ ভাবে জানে।)

নয়মুণ্ড-রাবণ-গঙ্গেশ্বর-মন্দির
নয়মুণ্ড-রাবণ-গঙ্গেশ্বর-মন্দির

রাবণ – পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে যা নেই

রাবণ একটি বর্ণময় চরিত্র। সীতাহরণ বা রাম-লক্ষ্মণের সঙ্গে যুদ্ধ করা তাঁর জীবনের একটা দিক মাত্র। তাঁর জীবনের বহু নাটকীয় ঘটনার মধ্যে কয়েকটি যদি পশ্চিমবঙ্গের মন্দিরের অলঙ্করণে স্থান পেতো, তাহলে তাঁর প্রতি কিছুটা সুবিচার করা হত বলে বর্তমান লেখকের মনে হয়। তার মধ্যে রাবণের কৈলাস পর্বত উত্তোলনের চেষ্টা, সঙ্গীতজ্ঞ রাবণের বীণাবাদন, জটায়ুর সঙ্গে যুদ্ধ এবং কার্ত্যবীর্যার্জুনের বা বালীর হাতে পরাস্ত হওয়ার ঘটনাগুলি খুবই নাটকীয়। এগুলি বাদ দিয়ে শিল্পীরা রাবণকে ১০০% ভিলেন বানাতে চেয়েছিলেন বলেই মনে হয়।

আরও পড়ুন কোক্কেরাবেল্লুর – এক প্রকৃতিতীর্থ যেখানে পরিযায়ী পাখিরা গ্রামের মেয়ে

উপসংহার

পশ্চিমবঙ্গের মন্দিরের অলঙ্করণে রাবণ একটি ইন্টারেস্টিং বিষয়। বর্তমান আলোচনাটি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার প্রায় ৭৫টি মন্দিরের অলঙ্করণ নিয়ে বিশ্লেষণ করে করা। সিরিজটি ছোট, তাই একে পাইলট স্টাডি বলা চলে। ভবিষ্যতে কেউ আরও বড় সিরিজ নিয়ে কাজ করলে আরও নতুন ও পরিমার্জিত তথ্য সামনে আসতে পারে।

তথ্যসূত্র
১) কৃত্তিবাসী রামায়ণ, গীতা প্রেস, গোরক্ষপুর।
২) শ্রীমদ্ বাল্মীকীয় রামায়ণ, গীতা প্রেস, গোরক্ষপুর।
৩) বাল্মীকি রামায়ণ, স্বামী অরুণানন্দ, ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ।
৪) আলোকতীর্থ ও আলোকবন্দনা, শৈলেন্দ্রনারায়ণ ঘোষাল শাস্ত্রী।
৩) বিভিন্ন ইন্টারনেট সাইট।

 

 দেখুন    

 

 


Share your experience
  • 649
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    649
    Shares

Facebook Comments

Post Author: আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

asish chottopadhyay
আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৫৬) দুর্গাপুরের একজন প্রতিথযশা স্ত্রীরোগবিশেজ্ঞ। দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার হাসতালে ৩২ বছর অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চাকরি করার পর এখন উনি সম্পূর্ণ ভাবে গরীব ও দুস্থ রোগীদের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত রেখেছেন। দেশভ্রমণ, ফটোগ্রাফি এবং বিভিন্ন বিষয়ে ইংরেজি ও বাংলায় লেখালেখি করা ওঁর নেশা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং বইতে ওঁর তোলা ফটো প্রকাশিত হয়েছে। বাংলায় লেখা ওঁর দুটি ব্যতিক্রমী উপন্যাস, একটি ছোটগল্প-সংগ্রহ, একটি কবিতার বই , একটি ছড়ার বই ও দুটি ভ্রমণকাহিনী আছে, যার মধ্যে একটি উপন্যাস (চরৈবেতি) দুবার আনন্দবাজার পত্রিকার বেস্ট সেলার লিস্টে স্থান পেয়েছিল। ইংরেজিতে ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান ও মেলা নিয়ে লেখা ওঁর শতাধিক ব্লগের প্রায় দেড় লক্ষ ভিউ আছে। বাংলার মন্দিরের উপর ওঁর ইংরেজিতে লেখা একটি গবেষণাধর্মী প্রায় দুহাজার রঙিন ফটোসমৃদ্ধ ফটোগ্রাফিক ই-বুক আছে, যেটি সাধারণ মানুষ, যাঁরা মন্দির ভালোবাসেন কিন্তু খুব পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখা পড়তে চান না, তাঁদের জন্য লেখা।।